আমি পতিতা বলছি । শেষ পর্ব

Now Reading
আমি পতিতা বলছি । শেষ পর্ব

প্রথম পর্বের পর

মেজাজটা খারাপ হয়েছে আমার আগে আসবে বলে আমাকে ১ ঘণ্টা দাঁড় করিয়ে রেখেছে । ১ ঘণ্টা পর হাঁপাতে হাঁপাতে আসে আমার সামনে । মেজাজটা এতো খারাপ হচ্ছিলো যে , ইচ্ছে করছিলো কষিয়ে একটা থাপ্পড় মারি , কিন্তু না আমি থাপ্পড় তো মারলাম না উল্টো রাসেল কে দেখে কেঁদে দিলাম । যাই হোক আমাকে শান্ত করে রিকশা করে একটা বাসায় নিয়ে গেলো ।

রাসেল আমি যদি আজ হারিয়ে যেতাম । আমার অনেক ভয় করছিলো । ঢাকায় এতো মানুষ !
হা হা হা কি যে বলো না , রাস্তায় এতো জ্যাম ছিল যা বলার বাহিরে । তাই দেরি হয়েছে । আচ্ছা এই সব কথা বাদ দাও তো । যাও হাত মুখ ধুয়ে খাবার খেয়ে নাও । আমি তোমার জন্য হোটেল থেকে খাবার এনে রেখেছি ।

আমি আর কোনো কথা না বলে হাত মুখ ধুয়ে খেয়ে নিলাম । আমি যেই রুমে আছি সেখানে একা আমি একটা মেয়ে না , আমার সাথে অনেক মেয়ে আছে । আর তাদের দেখতে অনেক অদ্ভুত লাগছে । কি রকম ভাবে যেন সেজে আছে । আমি রাসেল কে বললাম ওরা করা ? আর আমার কাজ কি ?
রাসেল বলল ওরা ও নাকি কাজের জন্য ঢাকায় আসছে । আর আমাকে কাল বা পরশু জয়েন করবে ।
আমি আর কোনো কথা বললাম না । আমাকে খাওয়ানো শেষ হলে রাসেল চলে গেলো । আমি একা একটা রুমে শুয়ে পড়লাম । পরের দিন সন্ধ্যায় একটা লোক কে নিয়ে আসলো রাসেল । আমাকে দেখিয়ে কি যেন বলে চলে গেলো লোকটি । আমি রাসেল কে বললাম

রাসেল এই লোকটি কে ?
তুমি যেখানে কাজ করবে তার বস উনি । তোমাকে দেখতে এসেছে । কাল সন্ধ্যা থেকে তোমার কাজ শুরু ।
কাল সন্ধ্যা ? কাল সন্ধ্যা কেন । মানুষ তো দিনে কাজ করে আমি রাতে কেন করবো ?
আসলে এইটা একটা বিদেশী কোম্পানি তো তাই ।

আমি আর কোনো কথা না বলে খেয়ে গতকালের মতো আজকেও শুয়ে পড়লাম । কাল সন্ধ্যায় রাসেলের সাথে যেই লোকটি এসেছে সে আসলো আমার রুমে । আমি খাটের এক পাশে বসে আছি । উনি ঢুকে রুমের দরজা বন্ধ করে দিলো । আমি সাথে সাথে বলে উঠলাম , আপনি কি করছেন দরজা বন্ধ করেছেন কেন ? উনি জবাব না দিয়ে আমার সামনে এসে বসে আমার গায়ে হাত দিচ্ছিল । আমি সাথে সাথে দৌড়ে ঘরের এক কোনায় চলে গেলাম । উনি বলে উঠলো দৌড়িয়ে লাভ নেই । আমার কাছে তোমাকে ধরা দিতে হবে । রাসেল হেব্বি একটা মাল রেডি করেছে আমার জন্য ।

দেখেন আপনি ভুল করছেন । আমি কাজ করতে এসেছি । গ্রামে আমার বাবা । খুব অসহায় । আমার কোনো ক্ষতি করবেন না । আমাকে যেতে দিন । রাসেল কোথায় । এই বলে আমি চিৎকার চেঁচামেচি করা শুরু করলাম ।
উনি বলে উঠলো রাসেল তোমাকে আমার কাছে আজ রাতের জন্য বেঁচে দিয়েছে । এখন তুমি আমার । এই কথা বলে হিংস্র ক্ষুধার্ত বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো । আমি কত না চিৎকার করছি । উনাকে আমি বাবা বলেও ডাকছি নিজের ইজ্জত টুকু বাঁচানোর জন্য ।কিন্তু না কোনো কিছু তে কাজ হচ্ছে না । আমার কান্নায় সেদিন সেই রুমের বাতাস পর্যন্ত কেঁদে ছিল । কিন্তু ওই নর পিচাশের মন একবার কেঁদে উঠেন । সেদিন থেকে আমার অস্তিত্ব বিলীন হয়ে গিয়েছে । সারা রাত চলে আমার উপর অমানবিক নির্যাতন । ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে আমাকে উলঙ্গ রেখে আমার দেখার উপর ২ হাজার টাকা রেখে উঠে চলে যায় ।
আচ্ছা পাঠক আপনাদের কাছে একটা প্রশ্ন আমার ইজ্জত কি ২ হাজার টাকা ? আপনার মা বোনের ইজ্জত কি ২ হাজার টাকা ?
কিছুক্ষণ পর রাসেল আসে আমার রুমে । কি আমার ভালোবাসা ! আহা আমাকে উলঙ্গ দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি আমার ভালোবাসা । আমার এই নির্যাতিত দেখার উপর চলে আরেক দফা নির্যাতন । বিশ্বাস করেন এইবার আমি চিৎকার করেনি । আমি নড়াচড়াও করেনি । শুধু কান্না করেছি , নীরব কান্না । আমাকে এমন একটা ঘরে রাখা হয়েছিল আশে পাশে কি ঘটছে বলাও যায়না ।

তারপর থেকে আমাকে আর জোর করতে হয়নি , আমি নিজে স্বেচ্ছায় গিয়েছি তাদের সাথে । আর যেটাকে কামাই করেছি তা দিয়ে আমি এতিমদের খাইয়েছি । সেদিন থেকে আজ পর্যন্ত নিজের বাবাকে একটা টাকাও পাঠায়নি । কিভাবে পাঠাবো ? নিজের দেহ বেচা টাকা কিভাবে নিজের বাবাকে খাওয়াই ।

আর রাসেল এর অবস্থা হলো . রাসেল দুই বছর পর একটি মেয়েকে বিয়ে করে । কিন্তু তাদের কোনো বাচ্চা হচ্ছিলো না । অনেক চেষ্টার পর একটা বাচ্চা হলো , তাও মেয়ে ! কিন্তু মেয়েটি সর্ব অঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বী । না কথা বলতে পারে না ভালো ভাবে হাঁটতে পারে । রাসেল কোনো দিন তার সন্তানের মুখে বাবা ডাক শুনেনি । আমি যেখানে আজ দেহ ব্যবসা করি এখানে অনেক মেয়ের আশা হয়েছে তার হাত ধরে । আজ রাসেল ভালো হয়ে গিয়েছে . কিন্তু আমার মতো অনেক মেয়ের কান্নার আর্তনাদ মিশে আছে তার আশে পাশে ।

আজ আমি আপনাদের ভদ্র সমাজে পতিতা । কিন্তু আপনারা ?

আমি পতিতা বলছি । পর্ব ১ম

Now Reading
আমি পতিতা বলছি । পর্ব ১ম

একদিন একটা আননোন নাম্বার থেকে আমার নাম্বার এ কল আসে । গল্পটা আমাদের এভাবেই শুরু । আমার নাম নীলা । বাবা কৃষক , যার কারণে বেশিদূর আমার লেখা পড়া আলোর মুখ দেখেনি । মা মারা গিয়েছে ছোট বেলায় । বড় হয়েছি নানুর কাছে । বাবার সাথেই নানুর বাসা ছিল । নানু বুড়ো হয়ে যাবার কারণে আমার দিকে তেমন খেয়াল রাখতে পারতো না । আর আমাদের পরিবারকে যদি বলতে চাই এক কথায় , তাহলে বলবো আমরা দিন আনি দিন খাই । অনেক সময় চুলায় আগুন জ্বলে না । পাঠক নিশ্চয়ই আপনাদের মনে প্রশ্ন জাগছে আমি কেন এই সব কথা বলছি ? কারণ আমার পতিতা হয়ে উঠার পিছনে অনেকটা আমার পরিবারের দায় ছিল । যাই হোক মূল গল্পে ফিরে আসি ।

আমি মোবাইল আননোন নাম্বার খুব কম ধরি । কিন্তু কি বুঝে যেন সেদিন ধরলাম । অপর প্রান্ত থেকে একজন বলল আমি আপনাকে অনেক ভালোবাসি । আমি এই কথা শোনার পর কিছু না বলেই লাইন কেটে দেই । ভয়ে তখন বুক ধরফর করছিলো । এই প্রথম কেউ আমাকে এই সব কথা বলল । কিছুক্ষণ পর আবার কল আসে সেই নাম্বার থেকে । আমি কল ধরিনি ।

২ মাস পর আবার কল আসে সেই নাম্বার থেকে । আমি প্রায় ভুলে গিয়েছিলাম তখন কার কথা । কল ধরার সাথে সাথে বলে আমাকে মাফ করে দিন । আমি অবাক হয়ে বলি কে আপনি ?
কিছু দিন আগে আপনার নাম্বারে আমার বন্ধু ভুল করে কল দিয়ে i love you বলেছে । আসলে ও একটু দুষ্ট ধরণের । আমি ওর পক্ষ আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি ।
এভাবে আমাদের কথা শুরু হয় ।
প্রথম দিকে কিছু দিন পর পর আমাকে কল দিয়ে কথা বলতো । তার পর কল আসাটা অনেকটা নিয়মিত হয়ে পড়েছে । আমি ও উনাকে ভালো লাগা শুরু হয়েছে । উনি কিভাবে যেন কথা বলতেন । একদম মায়ায় জড়ানো কথা । আমি হারিয়ে যেতাম তার কথায় ।

এক সময় আমাদের পরিচয় ভালোবাসায় পরিণত হয় । উনার পরিচয়টা দেয়া যাক । উনার নাম রাসেল । ঢাকায় অনেক বড় একটা কোম্পানিতে পিয়ন হিসেবে কাজ করে । শুনেছি ভালো বেতন পান । বাবা নেই , মা কে নিয়ে থাকে । একটা বোন ছিল বিয়ে হয়েছে ৪ বছর । উনার মা মেয়ে দেখছেন তার জন্য । কিন্তু উনি চান একটা গ্রামের মেয়ে বিয়ে করবে , যাতে করে উনার মা কে দেখে শুনে রাখতে পারে । খুব ভালো মানুষ । মেয়েদের অনেক সম্মান দিয়ে কথা বলে । এমন কোনো সময় ছিল না উনি কল ধরে আমাকে সালাম দেননি ।

একদিন আমি তাকে বলি , আমার পরিবার তো অনেক গরিব তোমার মা কি আমাকে মেনে নিবে ? আমি তো দেখতেও সুন্দর না , আমাদের টাকা পয়সাও নেই । মাঝে মাঝে মনে হয় আমাকে কি তুমি সত্যি ভালোবাসো ?

অরে দূর পাগলী ভালোবাসা কি চেহারা দিয়ে হয় নাকি । ভালোবাসা মনের বেপার । তোমার সাথে আমার মনের অনেক মিল । যার সাথে যার মনের মিল তার সাথেই তো বাসা বাধা যায় । আর টাকা পয়সা কয়দিন , ভালোবাসা চিরদিন ।

আসলে এর আগে আমি কোনো ছেলের সাথে মেশা হয়ে উঠেনি । ছেলে মানুষ মনে হয় অনেক ভালো হয় তাই না ? অভাবের সংসার নিজে যদি কিছুটা সাহায্য করতে পারি পরিবার কে তাহলে অনেক ভালো হয় । এইভাবে রাসেল কে বলি আমি তো তেমন লেখা পড়া করিনি , কোনো রকম ক্লাস ৪ পাশ করেছি । এর আগে আমি কখনো ঢাকায় আসিনি । আমি চাচ্ছিলাম ঢাকায় এসে একটা কাজ করতে । প্রথম দিকে উনি অনেক রাগ করেছে এই কথা শুনে । ভয়ে উনাকে আর কখনো বলিনি আমি কাজ করতে চাই । মাস খানিক যেতে না যেতে উনি আমাকে বলল , তুমি কিছু দিন আগে বলেছিলে একটা কাজের জন্য । আমি অনেক ভেবে দেখলাম আসলে তুমি যদি কাজ করো তাহলে একদিকে তোমার পরিবার ভালো চলবে আরেক দিকে তুমি বাস্তবতাকে চিনবে । আর তাছাড়া এখন পর্যন্ত তোমাকে ছবিতে ছাড়া সামনা সামনি দেখাও হয়নি । এই উসিলায় তোমার সাথে দেখাও হবে আমার । আমি শুনে খুব খুশি হলাম । আমি আমার ভালোবাসার মানুষের সাথে দেখা করতে পারবো আর কিছু ইনকাম করে পরিবার কে দিতে পারবো । এদিক সেদিক না ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম আমি ঢাকায় যাবো ।

ব্যাগ গুছিয়ে বাবার চোখের পানি উপেক্ষা করে নতুন জীবনের উদ্দেশ্য রওনা দিলাম ঢাকা । যাওয়ার সময় শুধু গাড়িভাড়া নিয়ে গিয়েছিলাম । কাৰণ রাসেল বলেছে আমার জন্য বাস স্ট্যান্ডে অপেক্ষা করবে । ভয় ও লাগছিলো আরেক দিকে আনন্দ লাগছিলো এখন থেকে আমার বাবা কষ্ট কিছুটা হলেও কমবে । কিন্তু আমি এখনো জানিনা ঢাকায় কি কাজ করবো । রাসেল বলেছে আমার জন্য নাকি অনেক ভালো একটা কাজ জোগাড় করে রেখেছে । গাড়িতে উঠে ঘুমিয়ে গিয়েছি , স্বপ্নে দেখলাম রাসেল কে নিয়ে খুব সুখে আছি , আমাদের ঘরে খুব সুন্দর একটা মেয়ে হয়েছে । কখন যে ঢাকায় আসলাম টের পেলাম না ।

বাস স্ট্যান্ড এ নেমে মেজাজটা এতো খারাপ হলো । কারণ …….

 

চলবে ।

স্মৃতি

Now Reading
স্মৃতি

নদীর তীরটায় বসে স্টিমারগুলোর যাওয়া আসা নিরিক্ষন করছি মনোযোগ সহকারে ৷ মেয়েটা কখন এসে পাশে বসলো টেরই পাইনি ৷ পাশ ফিরতেই চমকে উঠলাম,
> তুমি এখানে? (আমি)
> সেতো দেখতেই পাচ্ছো
> এত যায়গা থাকতে আমার পাশেই বসতে হলো?
> আমার ইচ্ছা, কোন সমস্যা?
> না, তোমার যেখানে মন চায় বসো, দাড়াও, শুয়ে গড়াগড়ি খাও, আমি যাই…
বলে উঠতে যাবো, মেঘা হাত টেনে ধরে বসালো আবার ৷ হ্যা, মেয়েটার নাম মেঘা ৷ আমরা পরষ্পর ক্লাসমেট ৷ ক্লাসের সেরা সুন্দরীদের মধ্যে মেঘাও একজন ৷ আর আমি প্রিতম, বলা যায় ক্লাসের সবচেয়ে নির্বাক ছেলেটা ৷ ক্লাস ওফ থাকলে সবাই বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়, আর আমি একা একা বসে থাকি, এত শোরগোল আমার ভাললাগেনা ৷ প্রকৃতির সাথে নিরব বন্ধুত্ব ওরা বুঝবে না ৷
কিছুদিন ধরে যেখানেই যাই, মেঘা সেখানে গিয়ে আমার সাথে প্রকৃতির বন্ধুত্ব ফাটল ধরানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে ৷ বিরক্তি লাগে, সেটা বোঝার চেষ্টাই করে না ৷
> ওই, কি ভাবছো? (মেঘা)
> তোমার কথা (বলে ভাবলাম, কি বললাম?)
> তাহলে ভাবো, মন দিয়ে ভাবো
> আমি আসলে ভাবছিলাম, তুমি আমায় এভাবে বিরক্ত করে কি মজা পাও?
> খুব বিরক্ত করি?
> আমার একা থাকতেই ভাল লাগে ৷ তুমি বুঝতে চাওনা কেন সেটা?
> আমি আমার উত্তর পাইনি
> কোনটার?
> খুব বিরক্ত করি?
> হ্যা (কঠোর ভাবে বললাম)
মেঘা আমার দিকে করুনভাবে তাকালো কিছুক্ষন, তারপর উঠে চলে গেল ৷
কেমন যেন একটু খারাপ লাগলো ৷ একটু ভাল করেও নিষেধ করে দিতে পারতাম ৷ না, সরি বলা দরকার ৷ কিন্তু তারপর থেকে এই তিনদিন কলেজেই আসলোনা মেঘা ৷ ওর এক বান্ধবীর থেকে বাসার ঠিকানা নিয়ে কলেজ শেষে ওর বাসায় গেলাম ৷ কলিংবেল চাপতেই একজন মধ্যবয়সী মহিলা দরজা খুলল,
> কে? (মহিলা)
> আন্টি আমি প্রিতম, মেঘার ক্লাসমেট
> ওহ, আমি মেঘার মা ৷ আসো, ভেতরে আসো
আমাকে বসতে বলে তিনি ভেতরে চলে গেলেন ৷ কিছুক্ষণ পর মেঘা আসলো ৷ নিরবে দাড়িয়ে আছে দেখে বললাম,
> সরি মেঘা, আমার ঐদিন ওভাবে বলা উচিত হয়নি
> (নিরব)
> কিছু বলবে না?
> ইটস্ ওকে
> হুম, তাহলে আজ আসি
> মা তোমার জন্য নাস্তা আনছে, একটু পরে যাও ৷ চলো তোমায় চারদিকটা ঘুরিয়ে দেখাই ৷
> ঠিক আছে
মেঘাদের বাড়িটা অনেক বড়, অনেকগুলো রুম ৷ কিন্তু মানুষ মাত্র তিনজন ৷ মেঘার রুমটাও দেখলাম ৷ বেশ সাজানো গোছানো ৷ হটাৎ মেঘার মায়ের ডাকে মেঘা আমাকে ওর রুমে বসতে বলে চলে গেল ৷ আমি বসে বসে ওর বইখাতা নাড়াচাড়া করতে লাগলাম ৷ টেবিলের উপর একটা খোলা ডায়রি দেখলাম ৷ লিখতে লিখতেই রেখে গেছে কেউ ৷ নিয়ে পড়তে লাগলাম ৷ কিছুক্ষন পর মেঘা আসলো ৷ আমার হাতে ওর ডায়রিটা দেখে কেমন যেন চুপসে গেলো ৷
> তুমি আমার ডায়রি পড়ছো কেন? (মেঘা)
> এতদুর ভাবার আগে তোমার আমার সম্পর্কে ভাল করে জেনে নেওয়া উচিত ছিল
> সেজন্যই তো কখনো দাবি করিনি (মেঘা)
> আমি যখন গ্রামে থাকতাম, আমার একটা খেলার সাথী ছিল, প্রেমা ৷ আমাদের অজান্তে ছোটবেলা থেকে আমাদের বিয়ের কথাও হয়ে ছিল আমাদের বাবা মার মধ্যে ৷ সারাদিনই একসাথে কাটতো আমাদের ৷ কিন্তু মাধ্যমিক শেষের পথে এক এক্সিডেন্টে ওর বাবা মা দুজনেই মারা যায় ৷ আর ওকে ওর মামা বিদেশে নিয় যায় তার কাছে ৷ ও চলে যাওয়ার পরই আমার জীবনে ওর অস্তিত্বটা বুঝতে পারি ৷ ভালবাসা কি যখন একটু একটু বুঝতে শিখলাম, তখন বুঝলাম আমি ওকে ভালবাসি ৷ পরে মার থেকেই জানলাম যে আমাদের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল ৷
> এখন সে কোথায়? (মেঘা কাঁপা গলায় বলল)
> জানিনা, চেষ্টা করেছি অনেক, কিন্তু ওর কোন খোজ পাইনি এখনো
> যদি কখনো খুজে না পাও?
> জানিনা
> প্রিতম, যদি কখনো তাকে ফিরে পাও, আমি তোমাদের মাঝে বাঁধা হবোনা কখনই
মেঘার দিকে তাকালাম ৷ কেমন করে যেন তাকিয়ে আছে ৷ আমি কিছু না বলে বেরিয়ে আসলাম ৷ সেদিনের পর থেকে মেঘার সাথে টুকটাক ভালো মন্দ কথা হতে থাকে ৷ যত দিন যায়, তা বাড়তেই থাকে ৷ মেঘার কেয়ার নেওয়া, নিঃস্বার্থ ভাবে ভালবেসে যাওয়ার কাছে আমিও যেন দুর্বল হয়ে পড়ি ৷ তবু প্রেমাকে শেষ বারের মত একবার খোজার দাবি মেঘা ফিরিয়ে দেয় না ৷ কিন্তু এবারও কোন সন্ধান করতে পারলাম না ৷ পড়াশুনা শেষ করে একটা বেসরকারি কোম্পানীতে জয়েন করেছি ৷ বাসা থেকে বিয়ের চাপ দিচ্ছে, তাই মাকে মেঘার কথা বললাম ৷ তারপর পারিবারিকভাবেই আমাদের বিয়ে হলো ৷ বিয়ের তিন বছর হয়ে গেছে ৷ হ্যা, সূখেই আছি আমি ৷ আজ আরও একটা সুখের দিন ৷ আমাদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা বাড়তে চলেছে ৷ কিছুক্ষণ পর নার্স এসে জানালো,
> কনগ্রাচুলেশান, আপনার মেয়ে হয়েছে
> আমি কি এখন ভেতরে যেতে পারি? (আমি)
> আজ যেতে পারবেন না
> কেন?
> অনেক কষ্টে আপনার স্ত্রীকে বাঁচানো গেছে ৷ ডাক্তার আপা না থাকলে ওনাকে বাঁচানো সম্ভব হতো না ৷ কাল পর্যন্ত ওনার কাছে যেতে পারবেন না
> ওহ, কোন ডাক্তার আপা?
> আসুন, ওনার কেবিন দেখিয়ে দিচ্ছি
> চলুন
নার্স কেবিন দেখিয়ে দিয়ে চলে গেল
> আসতে পারি? (আমি)
> আসুন
> আমি মেঘার হাসবেন্ড
> ওহ, কনগ্রাচুলেশন
> থ্যাংক ইউ, কিন্তু আমাকে ভেতরে যেতে দিচ্ছে না
> কালকের আগে যেতে পারবেন না ৷ আর দুজনেই এখন বিপদমুক্ত ৷ চিন্তার কিছু নেই
> অনেক ধন্যবাদ আপনাকে, আসি
> ওকে
উঠতে যাবো, তখনি চোখ আটকে গেলো টেবিলের উপরের নেমপ্লেটে প্রেমার নাম দেখে ৷ এবার ভাল করে তাকালাম ওনার দিকে ৷ ঘাড়ের কাছে কাটা দাগ দেখে চিনতে ভুল হলো না যে এই আমার সেই প্রেমা ৷ কি বলবো ভেবে পেলাম না ৷ নিরবেই বেরিয়ে আসলাম ৷ সাজানো জীবনটা যেন এক মুহুর্তেই এলোমেলো হয়ে গেলো ৷ দুদিনের মধ্যে আর একবারও প্রেমার সামনে গেলাম না ৷ আজ মেঘাকে নিয়ে বাড়ি যাচ্ছি ৷ মেঘাকে গাড়িতে বসিয়ে আমি প্রেমার কেবিনে আসলাম ৷ প্রেমা জানলার পাশে দাড়িয়ে ছিল ৷ পায়ের শব্দ পেয়ে আমার দিকে তাকিয় বলল,
> কিছু বলবে? (নির্বিকার ভাবে বলল)
তুমি বলায় অবাক হয়ে তাকাতে দেখে বলল,
> তুমি আমায় চিনতে পারো, আর আমি তোমায় চিনবো না, এটা কেমন করে ভাবলে
> (নিরব)
> কেমন আছো?
> ভালই (গলাটা ধরে আসছে)
> মেঘাকে অনেক ভালবাসো, তাই না?
> হুম, বিয়ে করেছ?
> খুজে পাইনি যে তোমায়
> আমিও খুজতে কম করিনি, কিন্তু এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে
> হুম, সে দাবিও নেই আমার ৷ তবে একটা অনুরোধ রাখবে
> বলো
> মেয়ের নাম প্রেমা রাখবে?
> হুম
প্রেমা আবার জানলার দিকে ফিরে দাড়ালো ৷ আমি কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে বেরিয়ে আসলাম ৷ চোখটা ভেজা অনুভব করলাম ৷ তাই মেঘার চোখে পড়ার আগেই মুছে নিলাম ৷ গাড়িতে উঠলাম ৷ মেয়েটাকে কোলে নিলাম ৷ ওর পলকহীন চোখজোড়া তাকিয়ে আছে আমার দিকে, আর আমিও ৷ গাড়ি ছুটে চলেছে দুপাশের অতীতকে পেছনে রেখা, ছুটছে আপন ঠিকানায়, জীবনের শেষ ঠিকানায়…….