যে কারণে চট্টগ্রাম হালিশহর এলাকায় জণ্ডিসের প্রকোপ! (অনুসন্ধান)

Now Reading
যে কারণে চট্টগ্রাম হালিশহর এলাকায় জণ্ডিসের প্রকোপ! (অনুসন্ধান)

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুসারে প্রত্যেক বছর পৃথিবীতে প্রায় দশ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর কারণ হল দূষিত পানি। বাংলাদেশ ও এর আওতাভুক্ত আর এর বিভিন্ন জেলা দূষিত পানির দরুন সংক্রমিত হচ্ছে দিনদিন। নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় এখানে গ্রাম ও শহর উভয় জায়গায় পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। যে কোন রোগ যা দূষিত পানির মাধ্যমে সংক্রমিত হয় বা ছড়িয়ে থাকে। মানুষ ও অন্যান্য জীবজন্তুর বিভিন্ন রোগের জন্য প্রধানত দায়ী রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীব (ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাস) এবং কয়েক রকমের পরজীবী। আর পানি বাহিত রোগের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জন্ডিস, ডায়রিয়া, কলেরা, আর্সেনিক, আমাশয়, টায়ফয়েড, পেটফাঁপা, বদহজম, কৃমি ইত্যাদি। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান দ্বিতীয় শহর চট্টগ্রাম হটাৎ করেই দূষিত পানির কবলে পড়ে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বন্দর নগরীর সমুদ্রের তীর ঘেঁষা অন্যতম এলাকা হালিশহর এখন পানিবাহিত রোগের সংক্রমণে জর্জরিত। ইতিমধ্যেই পানিবাহিত রোগ জন্ডিসে (হেপাটাইটিস-ই ভাইরাস) আক্রান্ত হয়ে কয়েকজনের মৃত্যুর অভিযোগ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। অন্যদিকে শতশত মানুষের অসুস্থ হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যারা চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালসহ স্থানীয় চিকিৎসা কেন্দ্রে জরুরী চিকিৎসা সেবা গ্রহণে ভিড় জমাচ্ছেন। ফলে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন তড়িৎ গতিতে কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে যার মধ্যে রয়েছে আক্রান্ত এলাকায় পানি বিশুদ্ধকরণে এক লাখ ৮৫ হাজার টেবলেট বিতরণ, ১০টি নির্দেশনা সম্বলিত জনসচেতনতামূলক ৫০ হাজার লিফলেট বিতরণ, এলাকা পর্যবেক্ষণ ইত্যাদি।

 

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন এর বিতরনকৃত লিফলেট

অনুসন্ধানঃ গত মাসেই আমাদের অফিসের একজন এবং দারোয়ান মারাত্মক রকম অসুস্থ হয়ে পড়ে। ডাক্তারি পরীক্ষা নিরীক্ষার পর জানা গেল তারা পানিবাহিত রোগ জণ্ডিসে আক্রান্ত। বিষয়টি আমরা সাময়িক ব্যাধি হিসেবে খুব একটা আমলে নেইনি। এরই মধ্যে জয়েন করেছে নতুন ড্রাইভার আর সপ্তাহ দু-একের মাথায় তারও কঠিন জন্ডিস ধরা পড়েছে। এভাবে আশে পাশের পরিচিত আরো অনেকের খবর পাওয়া যাচ্ছে যারা জণ্ডিসে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বিষয়টি এখন আর মামুলি মনে হলনা, গোটা এলাকাই এখন ঘোরতর বিপদে। এখানে বলে রাখা ভাল, যাদের অসুস্থ হওয়ার কথা উল্ল্যেখ করেছি তারা ওয়াসার পানি ফুটিয়ে পান করত, সরাসরি নয়। বেশ কয়েকদিন হালিশহরের বিভিন্ন আবাসিক ও অন্যান্য এলাকা পর্যবেক্ষণ করে একটা বিষয় পরিস্কার হয়েছে যে এলাকাটি নগরীর অন্যান্য অংশ হতে অনেকটা ডাউন লেভেলে। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই এখানে হাঁটু সমান পানিতে নিমজ্জিত হয়, বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এই অবস্থা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ইদানীং এক্সেস রোড ও পোর্ট কানেক্টিং রোড সম্প্রসারন ও ড্রেনেজ সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়েছে, ফলে কিছু কিছু জায়গায় ওয়াসা এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত পানি সরবরাহের নল ফেটে কিংবা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে বৃষ্টি হলেই সেই ফাটা/বিচ্ছিন্ন নল দিয়ে দীর্ঘদিনের জমে থাকা দূষিত পানি পৌঁছে যাচ্ছে অত্র এলাকার বাসাবাড়িতে। তাছাড়া এখানকার বেশিরভাগ নলকূপও পানিতে তলানো। এই এলাকায় ধনী ও মধ্যবিত্তের সাথে বাস করে নিম্ম আয়ের মানুষ যারা টিউব ওয়েল কিংবা টেপের পানি খেয়ে জীবন নির্বাহ করে। যেহেতু অত্র এলাকার সাধারণ জনগণ দিনের পর দিন নিজের অজান্তে দূষিত পানি সেবন করছে আর তাতেই ভাইরাস সংক্রমিত হচ্ছে তাদের দেহে। আরেকটা উল্ল্যেখযোগ্য বিষয়হলো অত্র এলাকায় কিছু ছোটখাট নামসর্বস্ব কোম্পানি আছে যারা বিভিন্ন বাসা-বাড়ি, অফিস, দোকান ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্লাস্টিকের জারে করে পানি সরবরাহ করে। কিছুদিন পূর্বে এমন একটি পানির জার আমাদের হাতে এসে পৌঁছায় যেখানে আমরা জলজ্যান্ত একটি কেঁচো আবিস্কার করি। তাৎক্ষণিক সেই পানির সাপ্লাইয়ার ও প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজারকে ডাকা হল,  তারা বিএসটিআই কিংবা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের লাইসেন্স প্রাপ্ত দাবী করলেও ট্রেড লাইসেন্স ব্যতীত এর স্বপক্ষে কোন শক্তিশালী প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। তারা ল্যাবে পানি পরীক্ষার কিছু কাগজ প্রদর্শন করলেও তা ছিল মেয়াদ উত্তীর্ণ, আমরা সেই ল্যাবের সাথে যোগাযোগ করলে তারা বলল যেহেতু ডকুমেন্ট ঐ প্রতিষ্ঠান নবায়ন করেনি সেহেতু তাদের কোন দায়বদ্ধতা নেই। বিষয়টি ক্লিয়ার হলে পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজারকে দ্রুত পুলিশে সোপর্দ করা হয়। এই হল অবস্থা! সুতরাং এই বিষয়টিকেও স্থানীয়দের গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে যে তারা বিশুদ্ধ পানির নামে ব্যাকটেরিয়া কিনছেন নাতো! পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হালিশহরের অবস্থা আস্তে আস্তে এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে।  তাই নগর ব্যবস্থাপক এবং স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচিৎ বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার। অন্যথা, যেকোন মুহূর্তে এই বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়তে পারে শহরের অন্য প্রান্তেও।