রমজান মাস এবং আমরা।

Now Reading
রমজান মাস এবং আমরা।

রোজা চলে এলো। সংযম সিয়াম সাধনার মাস এই রমজান মাস। আর কদিন পরেই সব মুসলিম প্রধান দেশগুলোর মানুষদের এক মাসের জন্য জীবনধারা বদলে যাবে।এই গরমের ক্লান্ত দুপুরে যখন সব মা বোনেরা ভাতঘুমের আরামে বিভোর, আর কদিনপর এই সময়টায় তারা বিভোর থাকবে নিত্য নতুন ইফতারী আইটেম বানানোর প্রস্তুতি নিয়ে।
এখন পাল্লা দিয়ে চলবে ইফতারের আইটেম বাড়ানোর আয়োজন; কার ইফতারের টেবিল কতো ভরপুর থাকবে তা নিয়ে। কয় পদের জুস্ করা হলো না হলো তা নিয়েও চলবে বাকবিতন্ডা। আজওয়া খেজুর নাকি মরিয়ম খেজুর, ট্যাং নাকি রুহ্আফজা? ভাজা পোড়া আইটেম বেশি থাকবে নাকি স্বাস্থ্যকর কিছু; এই নিয়েও কিছু তর্ক বিতর্ক চলবে বেশ কয়দিন। বাজারে ছোলা,পেয়াজ,তেল,শসা, বেগুনের আকাশচুম্বী দাম হবে। এরমধ্যে কোনটার দাম ১০০ টাকা কেজি ছাড়িয়ে যাওয়ার ইস্যু নিয়ে দেশের খবরের কাগজ গুলো নানান ফিচার করবে। হোটেল মোটেল গুলোতে ঘনঘন ইফতার পার্টি হবে। টিভির খবর পাঠিকাদের পুরো মাস ঘোমটা পরিহিত অবস্থায় দেখা যাবে। শপিং মলগুলো তে ভীড় বাড়তে থাকবে। ঈদ ফ্যাশন বলে বলে নানারকম ভূত-অদ্ভুত ফ্যাশন চালু হবে। এক শ্রেণীর ক্রেতারা সেসব কিনতে না পারলে ডিভোর্স বা আত্মহত্যা করবে। রাস্তায় রাস্তায় চাঁদাবাজি বেড়ে যাবে। ছিনতাই,চুরি ডাকাতির খবর ঘনঘন শোনা যাবে। যথাযথ স্হানে পার্ক করা গাড়ি খোঁড়া যুক্তি প্রদর্শনের কারনে অযথা কেস খাবে। কার ঈদ ড্রেস কতো গর্জিয়াস হলো, ঈদের জুতো কতো ফ্যাশনেবল হলো সেই প্রতিযোগিতা চলবে। মসজিদে কিছু সিজনাল মুসুল্লীদের আনাগোনা দেখা যাবে।……. সবই হবে। হবেনা প্রকৃত অর্থে যাকে সংযম করা বলে,সেটাই।
ইসলাম আমাদের সংযমী হতে বলেছে, রোজার মাস আমাদের সেই শিক্ষাটাই দেয় মূলত। সংযম খাবার দাবারের উপর, টাকা-পয়সা খরচের উপর, নিজেদের ব্যবহারের উপর, রোজকার জীবনযাপনের উপর। অতিরন্জিত যে কোন কিছুকে ইসলমা সমর্থন করেনা। অথচ আমরা সেটাই দিব্যি ভুলে থাকছি। খাঁটি মনে এসব কিছু অনুসরণ করছে,এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। সেই কম সংখ্যক মানুষগুলো যখন ইসলামের এই সত্যি দিক গুলো তুলে ধরতে চায়,আমরা তাদের নিয়ে মজা করি। তাদের জীবনযাপন প্রণালী নিয়ে ঠাট্টা করি, হেয় করি। আমরা যাকাত দেই প্রচার করে ঢাকঢোল পিটিয়ে,সামাজিক স্টাটাস ঠিক রেখে। অমুক এতোটা শাড়ী দিচ্ছে, তমুক কে তারচেয়েও বেশি দেয়া চাই। মসজিদে মসজিদে নামাজের পর দোয়া করা হবে তাদের জন্যই যারা কিনা টাকার পরিমানটা হাযার ছাড়িয়ে দিচ্ছে। অথচ ইসলাম কিন্তু বলে, এমনভাবে দান করতে যাতে ডান হাত দান করলে বাম হাত টের না পায়। দেখা যাচ্ছে আমরা কেউ মূল সংযম পালন করতে পারছিনা। বরং সংযমের নামে চরম অসংযমী আচরণ করছি। কিন্তু মুখে ঠিকই “রমজান মাস সংযমের মাস,সিয়াম সাধনার মাস” বলে বলে নানা ধরনের টকশো আরও কতো কি! ইহকাল পরকাল ব্যাপারগুলো যেন শুধু বইয়ের ব্যাপার হয়ে গেছে। সবাই জানে,কিন্তু কেউ মানে না। যেন পরোয়াই করেনা। তারা বোধহয় মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে “নিশ্চই আল্লাহ্ পরম দয়ালু ও ক্ষমাশীল”। সৃস্টিকর্তা ওরা যাই করুক না কেন ক্ষমা করেই দিবেন।
অসংযমী রোজদারদের রোজা বা ইবাদত কতোটা কবুল হয় কিনা হয় সেই বিতর্কে গিয়ে আমার কোন সওয়াব যখন জুটবেইনা তখন সেই বিতর্কে নাই বা গেলাম। তারচেয়ে বরং নিজেরাই নিজেদের আয়না দেখানোর ফলে সামান্য হলেও যদি একটু আত্মশুদ্ধি হয় আমাদের কারো, তাহলেই এই লিখনীর সার্থকতা।আমাদের মধ্যে অনেকেই আছি এমন যে সবই জানি,বুঝি, তবু গড়িমসি করি, “কাল থেকে ঠিক মানুষ হবো” নীতিতে চলতে চলতে আমাদের সেই “কাল” আর আসে না। কেমন এক আলসেমি পেয়ে বসে সামান্য আধঘন্টার কোন নামাজ পড়তে গেলে। অথচ এর চেয়েও সময় সাপেক্ষ,কষ্ট সাপেক্ষ কোন কাজ কতো অবলীলায় করে ফেলছি। আমরা যেম এমনই! ফিক্সড প্রাইসের দোকানে গিয়ে বিনা বাক্য ব্যায়ে গুচ্ছের দাম দিয়ে কিছু কিনে ফেলতে দ্বিধা করিনা,কিন্তু চরম গরমে গন্তব্যে পৌছানোর জন্য রিকশা নিলে সেই গরীব রিকশাওয়ালার সাথে সামান্য পাঁচ টাকা নিয়ে ঝগড়া করতে আমাদের বাঁধে না। তখন আমাদের সংযমবোধ পুরোদমে জেগে ওঠে। “নাহ্। এইবেলা মিতব্যয়ী হবোই হবো!”
আমাদের বোধবুদ্ধির আসলেই তুলনা হয়না। আমরা দান করবো তাও প্রচার করে, জাঁকজমক করে। যেখানে সওয়াব প্রাপ্তির আশা থেকে বেশী আশা থাকে প্রচারের। লোকদেখানো এই দান আদতে কতোটা গ্রহনযোগ্য সেটার বিচার ভার আল্লাহ’র। তবে আমাদের সময় থাকতেই সাবধান হয়ে যাওয়া উচিৎ। আমরা ভুলেই যাই যে আমাদের মূল গন্তব্য সেই সাড়ে তিন হাত মাটির ভিতরেই। সেটা মাথায় রেখেই আমাদের জীবনযাপন করা উচিৎ। রোজার মাসের যে ফজিলত তা যদি আমরা নুন্যতম পরিমানটুকুও উপলব্ধি করতে পারতাম,তবে আমাদের ইফতারের টেবিলে নানা ইফতারী আইটেম যতোটুকু থাকা উচিৎ,ততোটুকুই থাকতো। শপিংমল গুলো খালি থাকতো। আমাদের দান খয়রাত গুলো বাস্তবিক দানখয়রাত ভাবেই গৃহীত হতো। আমাদের মনটা আসলেই উদার হতো।আমরা সত্যিকার ভাবে উপলব্ধি করতে পারতাম একজন অনাহারীর কষ্টটা। তাকে বা তাদের মতো কাউকে দু’চার টাকা বেশি দিয়ে সাহায্য করতে আমাদের বাঁধতো না।যাকাত শব্দটার মূল অর্থই আমাদের বোধগম্য হতো। আমরা প্রকৃত অর্থেই মুসলমান হতাম। এসব কথাই আমরা প্রত্যেকে সেই শৈশব থেকে জানি। কিন্তু অবহেলা করে,শুধু কথার কথা ভেবে পুরোপুরি অবহেলা করে আমরা যে যার মতো আয়েশি জীবনযাপন করছি। এভাবে একটা সময় আসবে আমরা হাড়ে হাড়ে পস্তাবো, কিন্তু সেদিন অনেক দেরী হয়ে যাবে। তখন আমাদের করনীয় কিছুই থাকবেনা। অতএব, সাধু সাবধান!