ঢাকার মধ্যে একদিনের আনন্দ ভ্রমণ – পর্ব ২য়

Now Reading
ঢাকার মধ্যে একদিনের আনন্দ ভ্রমণ – পর্ব ২য়

মানুষের জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সময় গুলো কাটে যখন সে তার পরিবার কে সময় দেয় । সময়টা তখন আরো আনন্দের হয় যখন সেই পরিবার কে নিয়ে বাহির থেকে ঘুরে আসে । ব্যস্ততার জীবনে সময় বের করা খুব কষ্টের হয়ে পড়ে । যত টুকু সময় বের করা হয় সেই সময় যদি পরিবারের সাথে কাটানো যায় তাহলে নিজে মধ্যে রিফ্রেশ একটা ভাব আসে ।

আমি আগের পর্বে ঢাকার মধ্যে কিছু জায়গা দেখিয়ে ছিলাম , যেখানে আপনি চাইলে এক দিনের মধ্যে আপনার প্রিয় মানুষ বা পরিবার কে নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন । আজ আমি আপনাদের আরো কিছু জায়গা এর সাথে পরিচয় করিয়ে দিবো । সামনে ঈদ আসছে , ইচ্ছে করলে আপনি ঘুরে আসতে পারেন এই জায়গা গুলো ।

 

সাফারি পার্ক

গাজীপুরের সাফারি পার্ক – ঢাকার অদূরে অবস্থিত এই সাফারি পার্ক । ঢাকা থেকে যেতে আপনার সময় লাগবে মাত্র ১ ঘণ্টা । ঢাকা থেকে ৪০ কিলো মিটার দূরে অবস্থিত । বাংলাদেশের অন্যতম বিশাল সাফারি পার্ক হচ্ছে এটি । মোট ১২২৫ একর জমির উপর তৈরি করা হয়েছে এই পার্কটি । আন্তর্জাতিক মানের একটি পার্ক যেখানে বন্যা প্রাণীদের সংরক্ষণ করা হয়েছে । বন্যা প্রাণীরা খোলা মেলা পরিবেশ বেড়ে উঠছে । খাঁচার প্রাণী সব উন্মুক্ত করা হয়েছে । ভেতরে প্রবেশ করলে আপনি বাস পাবেন । সেখান করে ঘুরে দেখতে পারেন সম্পূর্ণ পার্কটি । বাস আপনাকে ঘুরে দেখাবে তাদের এই পার্ক । এখানে প্রবেশ মূল্য একটু অন্য রকম । মানে বড়দের জন্য প্রবেশ ফি ৫০ টাকা আর ছোট দের জন্য ২০ টাকা । আর আপনি যদি বাসে করে ঘুরতে চান তাহলে আপনাকে গুনতে হবে ১০০ টাকা । আপনি যদি ক্রাউন এভিয়ারি ঘুরতে চেনা তাহলে আপনাকে গুনতে হবে ১০ টাকা মানে আপনি যেকোনো এভিয়ারি প্রবেশ করলে আপনাকে ১০ টাকা করে দিতে হবে । আপনি শ্রীপুর গামী যেকোনো বাসে উঠে যেতে পারেন । বাস আপনাকে নামিয়ে দিবে বাঘের বাজারে । সেখান আপনি অটো পাবেন ।অটো কে বললেই হবে তারা আপনাকে পার্কে নামিয়ে দিবে । অটো তে করে যেতে সময় লাগবে ২০ মিনিট ।

নুহাস পল্লী

 

গাজীপুরের নুহাশ পল্লী – বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদ এর নুহাশ পল্লীর নাম শুনেন নাই এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিল ।সামনে ঈদ আসছে । আপনি ইচ্ছা করলে আপনার পরিবার কে নিয়ে ঘুরে আসতে পারেন নুহাশ পল্লী থেকে । ঢাকা থেকে আপনাকে প্রথমে গাজীপুর যেতে হবে । ভালো হবে আপনি যদি গুলিস্তান থেকেই রওনা দেন । তা ছাড়া আপনি অন্য যে কোনো জায়গা থেকে যেতে পারেন । আপনি যেখান থেকে যান না কেন আপনাকে নামতে হবে গাজীপুরের পাড়াবাজারে । ড্রাইভার কে বললে ড্রাইভার আপনাকে নামিয়ে দিবে । সেখান থেকে আপনি সি এন জি বা অটো তে করে চলে আসুন নুহাশ পল্লী । আপনাকে প্রবেশ মূল্য পরিশোধ করে ভেতরে ঢুকতে হবে । প্রবেশ মূল্য ধরে হয়েছে ২০০ টাকা । ভেতরে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে সবুজে ঘেরা পরিবেশ । সেই সাথে পুকুর , পিকনিক স্পোর্ট । হরেক রকমের গাছ আপনি দেখতে পাবেন । তাছাড়া আপনি আরো দেখবেন গাছের উপরে বাসা বানানো । বৃষ্টি বিলাস নামের একটি সুন্দর বাড়ি ।

 

আহসান মঞ্জিল

আহসান মঞ্জিল – পুরান ঢাকার ইসলামপুরে ঠিক বুড়িগঙ্গা নদীর পাশে রয়েছে নবাবদের বাড়ি আহসান মঞ্জিল । নবাব আহসান এর নাম । পুরান ঢাকার একটি ঐতিহ্যবাহী একটি জায়গা ।এই বন্ধে আপনি ঘুরে আসতে পারেন এখন থেকে । আহসান মঞ্জিল যেতে হলে আপনাকে আসতে হবে সদরঘাট । সদরঘাট বা ভিক্টোরিয়া পার্ক গামী যেকোনো বাসে উঠলে আপনাকে নামিয়ে দিবে কোর্টকাছারি । সেখান থেকে আপনি ইচ্ছা করলে হেঁটে যেতে পারবেন অথবা ইচ্ছা করলে আপনি রিকশা করতে যেতে পাবেন । আহসান মঞ্জিল প্রবেশ করতে হলে আপনাকে টিকিট কিনতে হবে । টিকিট এর মূল্য ২০ টাকা । আর অপ্রাপ্তদের জন্য প্রবেশ মূল্য ১০ টাকা । প্রবেশের মুখে আপনাকে জমা দিতে হবে আপনার ব্যাগ । আপনি ভেতরে কোনো ধরনের ক্যামেরা ব্যবহার করতে পারবেন না । ভেতরে আপনার জন্য অপেক্ষা করছে নবাব দের ব্যবহার করা বিভিন্ন জিনিস পত্র । বিশেষ করে আপনাকে অবাক করবে বিশাল হাতির মাথা । অনেক বছর আগের এই হাতির মাথা কে সংরক্ষণ করে রেখেছে তারা । তা ছাড়া আপনি দেখতে পাবেন তাদের খাবার রুম সহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ।

 

লালবাগ কেল্লা

লালবাগ কেল্লা – পুরান ঢাকার আরেকটি ঐতিহ্যবাহী জায়গা হলো লালবাগ কেল্লা । মোগল আমলের তৈরি একটি দুর্গ । পরীবিবির মাজার এখানে অবস্থিত । আপনাকে প্রথম আসতে হবে গুলিস্তানে । সেখান থেকে আপনি রিকশা অথবা লেগুনা যোগে চলে যেতে পারেন পুরান ঢাকার লালবাগে । কেল্লার নাম অনুসারে রাখা হয় এই জায়গার নাম । আপনি ভেতরে বাগান ও বিশাল বড় একটি দীঘি দেখতে পাবেন । বর্তমানে সেখানে পানি নেই । এই দীঘিকে পরীবিবির দীঘি বলা হয় । আপনি ভেতরে একটি সুড়ঙ্গ দেখতে পাবেন । এই সুড়ঙ্গ কে নিয়ে আছে অনেক রকমের গল্প ।তাছাড়া ভেতরে জাদুঘর ও আছে । সকাল ১০ টা থেকে খোলা থাকে । প্রবেশ মূল্য বড় দের জন্য ২০ টাকা আর ছোটদের জন্য ১০ টাকা । সাপ্তাহিক বন্ধ রবিবার ।

চলবে

ঘুরে আসুন আহসান মঞ্জিল

Now Reading
ঘুরে আসুন আহসান মঞ্জিল

যারা অল্প সময়ের জন্য ঢাকার আসে পাশের সুন্দর জায়গা থেকে ঘুরে আসতে চান তাদের জন্য আহসান মঞ্জিল হবে উপযুক্ত স্থান । খুব সুন্দর করে গড়ে তোলা হয়েছে আহসান মঞ্জিল কে ।

ইতিহাস –
কোন এক ফরাসির কাছ থেকে ১৮৩৫ সালে আব্দুল গনি কিনে নেয় এই প্রাসাদটি । যখন ফরাসি থেকে কিনে নেন তখন প্রাসাদের অবস্থা কিছুটা খারাপ ছিল । পরবর্তী কালে ১৮৭২ সালে আব্দুল গনি এটিকে আবার পূর্ণ নির্মাণ করেন । তার ছেলে আহসানউল্লাহ এর নাম অনুসারে তিনি এই প্রাসাদের নাম রাখেন আহসান মঞ্জিল । কিন্তু প্রাসাদটি বেশি দিন টিকে থাকতে পারেনি । ১৮৯৭ সালে ১২ জুন শক্তিশালী ভূমিকম্পে ভেঙে যায় আহসান মঞ্জিল এর অনেকখানি অংশ । পরবর্তী কালে আবার তা পূর্ণ নির্মাণ করেন নবাব আহসানউল্লাহ ।
এটি ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত । ইসলামপুর ব্রিটিশ আমল থেকে বিখ্যাত ছিল তাদের বাণিজ্যের জন্য । এখানে নানান জিনিস পত্র পাওয়া যেত । ঢাকার সাথে তখন বিভিন্ন অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল এই বুড়িগঙ্গা নদী । পরবর্তী কালে নদীর পানি দূষিত হওয়ার কারণে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে এখন আর আগের মতো পণ্য আনা নেয়া হয়ে না । ১৯৭১ সালে দেশ স্বাধীন হলে নবাবের পরিবার বিদেশে চলে যায় । নবাব যাদের উপর দায়িত্ব দিয়ে যান তারা ভালো মত দেখা শুনা না করার কারণে তাদের প্রাসাদ ক্ষতির সম্মুখীন হলে , তখন নবাব সিদ্ধান্ত নেন তাদের এই জায়গাটা তারা নিলাম করে দিবেন । কিন্তু তৎকালীন সরকার এই জায়গার গুরুত্ব বুঝতে পেরে নিলাম সিদ্ধান্ত বাতিল করান । এবং নবাব থেকে নিয়ে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থান ঘোষণা করেন । পরবর্তী কালে জনসাধারণের জন্য জাদুঘর নির্মাণ করেন ।

কি আছে আহসান মঞ্জিলে ?

এই প্রাসাদের ছাদের উপরে আছে কে বিশাল গম্বুজ ।যা একসময় ঢাকার সবচেয়ে বড় গম্বুজ ছিল । আগের দিনের নবাবের এই প্রাসাদে বসে সারা ঢাকা শহর কে পরিচালনা করতো । মূল প্রাসাদের আঙিনা দিয়ে সুবিশাল সিঁড়ি দেখতে পাওয়া যায় ।যা মূলত প্রাসাদের মূল ফটকের সাথে যুক্ত । আপনি যদি সেই সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যান , তাহলে আপনি নাচের ঘর দেখতে পাবেন । আর যদি সিঁড়ি দিয়ে দাঁড়িয়ে নিচ বরাবর তাকান তাহলে আপনার সামনে ফুটে উঠবে বাংলার অপরূপ সৌন্দর্য । আপনি সামনে মাঠের মত দেখতে পাবেন , আর আপনার চোখ যদি একটু সামনে যায় তাহলে আপনি বুড়িগঙ্গা নদী দেখতে পাবেন । আর দেখবেন ইসলামপুর এর মানুষের জীবন যাত্রা এর কিছু চিত্র ।

প্রথমে আপনাকে টিকিট কেটে ভেতরে ঢুকতে হবে । বর্তমানে টিকিটের মূল্য বাংলাদেশী দের জন্য ২০ টাকা । সার্ক ভুক্ত দেশের জন্য ১০০ টাকা আর বিদেশী নাগরিকদের জন্য ২০০ টাকা । টিকিট কেটে আপনার প্রয়োজনীয় মালামাল কাউন্টারে জমা দিয়ে টোকেন নিয়ে নিন । এই টোকেন পরবর্তী কালে বের হওয়ার সময় কাউন্টারে দেখিয়ে আপনার মাল বুঝে নিবেন । ভুলেও টিকিট ফেলে দিবেন না ।কারণ মূল ভবনে প্রবেশ করার জন্য আপনার টিকিটি লাগবে । আপনি সোজা হেঁটে যাবার পথে ফুলের বাগান দেখতে পাবেন । সোজা হেঁটে হাতের ডান পাশ ধরে গেলে আপনি ভবনের প্রবেশ পথ দেখতে পাবেন । টিকিটে দেখিয়ে ভেতরে ঢুকলে প্রথমে পরবে রণ সাজে সজ্জিত এক সেনা । যুদ্ধে যাওয়ার আগে এই রকম পোশাক পরিধান করা হতো । আপনি সেই রাস্তা ধরে সামনে আসলে দেখতে পাবেন কিছু ছবি আর বই নিয়ে একটি ঘর । এখান থেকে আপনি ছবি কিনে নিতে পারেন কারণ ভেতরে মোবাইল বা ক্যামেরা দিয়ে ছবি তোলা সম্পূর্ণ নিষেধ । তার পরের কামরায় আপনি বিশাল আকারের ঝাড়বাতি দেখতে পাবেন । আর সাথে আহসান মঞ্জিল এর সুন্দর কিছু ছবি দেখতে পাবেন । একের পর এক কামরায় আপনি এক এক রকমে জিনিস দেখতে পাবেন । একটি কামরা আছে যেখানে নবাবদের সময় চিকিৎসা করার যন্ত্রপাতি আছে । আপনি দেখলে অবাক হয়ে যাবেন । কারণ এই সব যন্ত্রপাতি এখন দেখতে পাওয়া যায়না বললেই চলে । আপনি একটু সামনে আসলে দেখতে পাবেন বিশাল একটা হাতির মাথার খুলি । খুব সুন্দর চক চক করছে । আমি যখন প্রথম দেখি তখন অনেকটা অবাক হয়ে যাই । কারণ মাথার সাইজটা বিশাল ছিল । তার পর আপনি দেখতে পাবেন একটা কামরা যেখানে নবাবরা বসে খাবার খেয়ে থাকতো । বিশাল বড় তাদের খাবার রুম।রুম দেখে বোঝা যায় , তারা যখন খাবার খেতে বসতো, তখন অনেক মানুষ এক সাথে বসতো । প্রথম তোলা ঘোরা শেষ হলে আপনি উপরের কামরায় যেতে পারবেন । সেখানে বিভিন্ন নবাব সহ বাংলাদেশে অনেক নামীদামী ব্যক্তিদের ছবি আছি । তার পাশের কামরায় গেলে দেখতে পাবেন নবাবদের ঘুমানোর ঘর ও কিছু আসবাবপত্র যা তারা বিভিন্ন সময় ব্যবহার করেছেন । এছাড়া আপনি আরও অনেক কিছু দেখতে পাবেন । যা আপনাকে প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করবে ।

কিভাবে আসবেন ?

আপনি ঢাকার বাহিরে বা ঢাকার ভিতরে যেখানেই থাকেন না কেন আপনাকে প্রথমে গুলিস্তান অথবা সদরঘাট আসতে হবে । সেখান থেকে ইসলামপুর হয়ে কাউকে জিজ্ঞেস করলে দেখিয়ে দিবে আহসান মঞ্জিল কোথায় ।

সাবধানতা

আপনি কাউন্টার মাল জমা দেয়ার সময় অবশ্যই নিজের মোবাইল , টাকা সাথে রাখবেন । ইচ্ছা করলে পানির বোতল সাথে রাখতে পারেন । আর ভুলেও ভেতরে ছবি তোলার চেষ্টা করবেন না । যদি করেন তাহলে ভেতরে নিয়োজিত ব্যক্তিদের কাছ থেকে খুব বেশি ভালো ব্যবহার পাবেন না ।

বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ( ১ম পর্ব )

Now Reading
বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ( ১ম পর্ব )

বাংলাদেশ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এর একটি অনন্য উদাহরণ। বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন গুলোর মাধ্যমে বুঝা যায় আমাদের বীরত্ব গাঁথা ইতিহাস একশো বা দুশো বছরের নয় বা আমরা কোনো পরগাছা জাতির মতো নই যারা অন্যদের থেকে উঠে এসেছি। বাঙালীদের রয়েছে হাজার বছরের ইতিহাস, আমরা ইতিহাসে সাক্ষী রেখে এসেছি অদম্য সাহস ও শক্তির। প্রাচীন কাল থেকেই বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড ছাড়াও এর আশেপাশের অঞ্চল গুলোতে উন্নত সভ্যতা বেড়ে উঠছিলো তার প্রমাণ হচ্ছে আমাদের এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন গুলো। এসব নিদর্শন গুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরণের মসজিদ, মন্দির, নগর, দুর্গ ও প্রাতিষ্ঠানিক ভবন। বিভিন্ন তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে প্রায় ২৫০০টি ঐতিহাসিক প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে যার মধ্যে ২০১৬ সালের জুন মাস পর্যন্ত প্রায় ৪৫২টি প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এর সন্ধান পাওয়া গেছে। এসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন গুলোর আবিষ্কার, রক্ষণাবেক্ষণ ও যাবতীয় দেখা শুনার কাজ বাংলাদেশ প্রত্নতাত্ত্বিক অধিদপ্তর এর। আজকের এই পর্বে আমরা বাংলাদেশের ঐতিহাসিক নগর, দূর্গ ও ভবন গুলো তুলে ধরবো।

1435227910..jpg

উয়ারী বটেশ্বরঃ
উয়ারী ও বটেশ্বর নরসিংদীর বেলাব উপজেলায় অবস্থিত দুটি পাশাপাশি গ্রাম। ঢাকা থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে এই গ্রাম দুটি অবস্থিত। গ্রাম দুটির পাশ দিয়ে প্রাচীন কাল থেকে বয়ে গেছে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ ও এর শাখা আড়িয়াল খাঁ, গঙ্গাজলি ও কয়রা নদী। এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থলের সন্ধান পাওয়া গেছে। বিশেষজ্ঞদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা দ্বারা ধারণা করা হয়েছে এটি প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো। ২০০০ সালে কার্বন-১৪ (যা দ্বারা বিভিন্ন ফসিলের বয়স নির্ধারণ করা হয়) তার সাহায্যে আবিষ্কৃত কিছু প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন গুলোর পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে উয়ারী বসতিটি প্রায় খ্রিষ্টপূর্ব ৪৫০ অব্দের। যার মাধ্যমে বুঝা যাচ্ছে এখানে মৌর্য যুগের একটি সভ্যতার যাত্রা শুরু হয়েছে। ইতিহাস বেত্তাদের মতে, পুণ্ড্রনগরে সভ্যতা গড়ার কিছু আগে এই নগর সভ্যতা নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে প্রাপ্ত চারটি পাথরে নিদর্শন প্রস্তর যুগের বলে মনে করা হচ্ছে। ২০১০ সালে এখানে ১৪০০ বছরের ইট নির্মিত প্রাচীন বৌদ্ধ পদ্মমন্দির আবিষ্কৃত হয়। ১৯৩০ সালের দিকে স্থানীয় স্কুল শিক্ষক মুহাম্মদ হানিফ পাঠান প্রথম উয়ারী বটেশ্বরকে সুধী সমাজের নজরে নিয়ে আসেন। ২০০০ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ববিভাগের প্রধান সুফি মোস্তাফিজুর রহমান এর নেতৃত্বে প্রথম খনন কাজ শুরু হয়। তিনি জানান উয়ারী বটেশ্বর একটি সমৃদ্ধ, সুপরিকল্পিত প্রাচীন গঞ্জ ( একটি বাণিজ্যিক নগর) “সৌনাগড়া” যা গ্রিক ভূগোলবিদ, টলেমী তার বই “জিওগ্রাফিয়াতে” উল্লেখ করেছেন। উয়ারী বটেশ্বরে শেষ খনন কাজ চালানো হয় ২জানুয়ারি ২০১৭ তে।

ahsanmonjil1.jpg

আহসান মঞ্জিলঃ
আহসান মঞ্জিল ঢাকার নবাবদের প্রাসাদ ছিল। এটি বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে ঢাকার কুমারটুলিতে অবস্থিত। মুঘল আমলে বরিশালের জমিদার শেখ এনায়েতউল্লাহ এ প্রাসাদটি তৈরি করেন। তার পুত্রের থেকে ফরাসিরা এটি কিনে ব্যবসা কেন্দ্রে পরিণত করে। ঢাকার নবাব খাজা আলিমউল্লাহ ১৮৩০ সালে ফরাসিদের নিকট হতে ক্রয় করে এটিকে আবার প্রাসাদে পরিণত করেন। নবাব আব্দুল গণি নিজ পুত্র খাজা আহসানউল্লাহর নাম অনুসারে এটিকে “আহসান মঞ্জিল” নামকরণ করেন। ১৮৯৭ সালে ঢাকায় ভূমিকম্প আঘাত হানলে আহসান মঞ্জিলের ব্যাপক ক্ষয় ক্ষতি হয়। পরবর্তীকালে নবাব আহসানউল্লাহ তা পুনঃনির্মাণ করেন। ১৯০৬ সালে আহসান মঞ্জিলে অনুষ্ঠিত এক সভায় মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯২ সালে আহসান মঞ্জিলকে “আহসান মঞ্জিল জাদুঘরে” রূপান্তর করা হয়।

lal-bag-kella20151124110441.jpg

লালবাগ কেল্লাঃ
লালবাগ কেল্লা মুঘল আমলের ঐতিহাসিক একটি নিদর্শন। এটি পুরান ঢাকার লালবাগে অবস্থিত একটি দুর্গ। এই কেল্লার পূর্ব নাম আওরঙ্গবাদ দুর্গ। সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে তার তৃতীয় পুত্র শাহজাদা মুহাম্মদ আজম শাহ ১৬৭৮ খ্রিষ্টাব্দে এর নির্মাণ কাজ শুরু করেন। সুবেদার শায়েস্তা খাঁর আমলে এই কাজ অব্যাহত থাকে। তবে তার কন্যা পরিবিবি (প্রকৃত নাম ইরান দুখত রাহমাত বানু ) এর মৃত্যুর পর এই কেল্লাকে অপয়া মনে করে ১৬৮৪ সালে এর নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেন। কেল্লা এলাকাতে পরিবিবির সমাধি অবস্থিত এবং কেল্লার উত্তর- পশ্চিমাংশে বিখ্যাত শাহী মসজিদ অবস্থিত। ১৮৪৪ সালে এলাকাটি “আওরঙ্গবাদ” নাম বদলে “লালবাগ” নাম রাখা হয় এবং দুর্গটি “লালবাগ কেল্লা” নামে পরিচিতি লাভ করে।

sonargao20170509122952.jpg

সোনারগাঁওঃ
সোনারগাঁও বর্তমানে নারায়ণগঞ্জ জেলার একটি উপজেলা। পূর্বে মেঘনা, পশ্চিমে শীতলক্ষ্যা, দক্ষিণে ধলেশ্বরী এবং উত্তরে ব্রহ্মপুত্র নদ দ্বারা বেষ্টিত একটি বিশাল জনপদ সোনারগাঁও। এর পূর্বনাম সুবর্ণগ্রাম। ঈসা খাঁর স্ত্রী সোনা বিবির নামানুসারে সোনারগাঁও এর নামকরণ করা হয়। সোনারগাঁর দর্শনীয় স্থান – সোনাবিবির মাজার, পাঁচবিবির মাজার, গিয়াস উদ্দিন আজম শাহের মাজার, হোসেন শাহ নির্মিত একটি সদৃশ্য মসজিদ, গ্রান্ড- ট্রাঙ্ক রোড ইত্যাদি। সোনারগাঁও এর পানাম নগরী উনিশ শতকে উচ্চবিত্ত ব্যবসায়ীদের বাসস্থান ছিলো।

dscn1852.jpg

বড় কাটরা ও ছোট কাটরাঃ
বড় কাটরা ঢাকার চকবাজারে অবস্থিতে মুঘল আমলের নিদর্শন। সম্রাট শাহজানের পুত্র শাহসুজার নির্দেশে আবুল কাশেম ১৬৪১ সালে বুড়িগঙ্গার তীরে এই ইমারতটি নির্মাণ করেন। ছোট কাটরাও ঢাকার চকবাজারে অবস্থিত শায়েস্তা খাঁর আমলে তৈরি একটি ইমারত। তিনি এটি সরাইখানা বা প্রশাসনিক কাজে ব্যবহারের জন্য নির্মাণ করেন। ১৬৬৩ সালে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ১৬৭১ সালে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয়।

বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন গুলো খুবই মূল্যবান। এই লেখার প্রথম অংশে কয়েকটি ঐতিহাসিক স্থান ও দুর্গের বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরা হলো। পরবর্তিতে আমরা বাংলাদেশের সকল প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন গুলো আপনাদের সামনে তুলে ধরবো।