ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার কবলে ইরান

Now Reading
ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার কবলে ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান দন্ধের কারণে ইরানের ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ কঠিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। তিনি আরো যোগ করেন, ইরানের যেকোনো আগ্রাসন রুখতে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে তারা যৌথভাবে কাজ করে যাবেন। ওয়াশিংটনে এক বক্তৃতায় তিনি এই হুঁশিয়ারি দিয়ে ইরানকে আগাম সতর্ক বার্তা দিল।  এদিকে রাষ্ট্র বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সত্যি সত্যি এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয় তবে ইরানকে তার অর্থনীতি সচল রাখতে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে।

সকল জল্পনা কল্পনা অবসান ঘটিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৫ সালের  আলোচিত “ইরান ডিল” নামক পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসেছেন। তিনি বারংবার তার বিভিন্ন বক্তৃতায় উল্ল্যেখ করেছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার পথে হাঁটবেন না। যেকোন মুল্যেই এই চুক্তি বাতিল করে দেবেন,  ট্রাম্পের ঘোষণার পর ইরান প্রসঙ্গে এই প্রথম মার্কিন প্রশাসনের নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর হুমকির প্রতি নিন্দা প্রকাশ করেছে পাল্টা জবাব দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ জারিফ। পম্পেওর হুমকির প্রত্যুতরে জাভাদ জারিফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ব্যর্থ নীতিমালার হাতে বন্দি এবং এর ফলে তাদেরও পরিণতি ভোগ করতে হবে। এদিকে পম্পেওর বিবৃতিতে সমালোচনা করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতিমালা বিষয়ক কমিটির প্রধান ফেডেরিকা মোঘেরিনি। তিনি বলেন, ২০১৫ সালের ঘোষিত “ইরান ডিল” থেকে বেরিয়ে গিয়ে কিভাবে মধ্যপ্রাচ্যকে নিরাপদ করা যায় তা কার্যকরভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন পম্পেও। তিনি বলেন, এই চুক্তির কোন বিকল্প নেই এবং তা রক্ষা করা মার্কিন প্রশাসনের কর্তব্য। উল্লেখ্য যে, ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে গেলেও বাকী ৫সদস্য দেশ জানিয়েছে তারা যেকোন মুল্যে চুক্তি রক্ষা করে চলবে।

ইরান এর বিরুদ্ধে আরোপিত শাস্তিমূলক নিষেধাজ্ঞাকে মার্কিন প্রশাসনের প্ল্যান ‘বি’ বলা হচ্ছে। পম্পেও জোরালোভাবে বলেন, এখন থেকে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার যেকোনো ‘নতুন চুক্তি’ করার পূর্বে ওয়াশিংটনকে ১২টি শর্তের কথা ভাবতে হবে। যার মধ্যে সিরিয়া থেকে ইরানের সেনা প্রত্যাহার করাসহ ও ইয়েমেনের বিদ্রোহীদের ওপর সকল প্রকার সমর্থন প্রত্যাহার আবশ্যক বলে উল্লেখ করেন তিনি। এদিকে পম্পেও বলেন, নতুন এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের ওপর নজিরবিহীন আর্থিক চাপ প্রয়োগ করা হবে।

তবে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের কাছেই এখন একটাই পথ খোলা আর তা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে নীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা বন্ধ করে তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনা এবং তেহরান তার পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগসহ ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করা। যদি সত্যিই এর পরিবর্তন ঘটে তবেই ওয়াশিংটন তার নিষেধাজ্ঞা থেকে সরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

“ইরান ডিল” থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিল যুক্তরাষ্ট্র!

Now Reading
“ইরান ডিল” থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিল যুক্তরাষ্ট্র!

২০১৫ সালে ছয় জাতির মধ্যাস্ততায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতা হয়। জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) নামের ওই সমঝোতা ‘ইরান ডিল’ নামেও পরিচিত। ইরানের সঙ্গে চুক্তিকারী দেশগুলো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি এবং চীন। ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি রোধে পশ্চিমা বিশ্ব বহু বছর ধরে দেশটির ওপর বাণিজ্য অবরোধ আরোপ করেছিল। কিন্তু কোনভাবে কাজ না হওয়ায় ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নেতৃত্বে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে সরে আসার শর্তে দেশটির ওপর থেকে অবরোধ উঠিয়ে নিতে উক্ত চুক্তিটি সম্পাদন করা হয়। চুক্তি মোতাবেক এতদিন এগুচ্ছিল সবকিছু। কিন্তু নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হটাত ইরানের সঙ্গে বহুজাতিক পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দেওয়ায় চরম অস্বস্তিতে পড়েছে চুক্তির বাকী দেশ সমূহ। চুক্তি মোতাবেক প্রতি ছয় মাস পরপর তা নবায়ন হয়। সেটি নবায়নের সময় ঘনিয়ে এলে ট্রাম্প জানিয়ে দেয় তিনি চুক্তি নবায়নে সম্মতি দেবেন না। বেশ কিছুদিন ধরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের সঙ্গে ছয় জাতির ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি বহুবার দিয়েছেন। এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগ থেকেই বলে এসেছেন যে বারাক ওবামা ইরানের সঙ্গে যে চুক্তি করেছে, তা ‘জঘন্য, ধ্বংসাত্মক ও বোকামি’। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে তিনি ওই চুক্তি বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দেন তার নির্বাচনী প্রচারণায়। এখন ট্রাম্প চাইছেন ইরানের সামরিক শক্তি আরও সীমিত করার বাধ্যবাধকতা যুক্ত করে নতুন একটি চুক্তি করতে।

এদিকে ট্রাম্পকে চুক্তিতে ধরে রাখতে না পারার বিষয়টি যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের মিত্রদেশগুলোর চরম কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে, এই চুক্তির পক্ষে অবস্থান বজায় রেখে কাজ করে যেতে বদ্ধ পরিকর বাকী দেশগুলো। বাকী পাঁচ দেশের মধ্যে দুই দেশ নিজেদের সহ্য করতে পারেনা বলা চলে রাশিয়া আর যুক্তরাজ্য পরস্পর জাতশত্রু। যুক্তরাজ্য চাইছে যুক্তরাষ্ট্র যেন এই চুক্তিতে থাকে কেননা তাদের ছাড়াই চুক্তি কার্যকর রাখতে গেলে শর্ত মোতাবেক ইরানের সঙ্গে ইউরোপের কোম্পানিগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্য অব্যাহত রাখতে হবে। তাদের মিত্র ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উপেক্ষা করে আদৌ কি তারা কাজ করতে পারবে? এই চুক্তি বাঁচাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ইউরোপীয় মিত্ররা খুব বেশি যে অগ্রসর হতে পারবে তা নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি যেকোন উপায়ে এই চুক্তি বজায় রাখার পক্ষে। ট্রাম্পের চুক্তি থেকে সরে আসার ঘোষণা পরবর্তী যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি এক যৌথ বিবৃতিতে ‘দুঃখ ও উদ্বেগ’ প্রকাশ করে বলেছে, তারা চুক্তিটি কার্যকর রাখতে কাজ করে যাবে। তারা বিবৃতিতে এও প্রত্যাশা করেছে, চুক্তি কার্যকর রাখতে বাধা হয় এমন সকল পদক্ষেপ বাস্তবায়নে যেন যুক্তরাষ্ট্র বিরত থাকে।

তবে চুক্তি স্বাক্ষরকারী অপর দুই দেশ রাশিয়া ও চীন বরাবরই ইরানের প্রতি নমনীয় ও বন্ধু প্রতিম। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান চুক্তি থেকে সরে আসার ঘোষণা দেয়ার পাশাপাশি তিনি ইরানের ওপর সর্বোচ্চ অবরোধ আরোপেরও ঘোষণা দেন। একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষরের মাধম্যে করে তিনি ইরানের সঙ্গে সব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাবসা বাণিজ্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। পাশাপাশি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অবরোধ অমান্যকারী কোম্পানিগুলোকে কঠিন সাজার মুখোমুখি হতে হবে। এমতাবস্থায় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে ইরানের সঙ্গে বিদ্যমান লেনদেন চুকিয়ে নিতে ছয় মাস সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে।

সম্প্রতি জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এ বিষয়ে জরুরী বৈঠক করেন। তারা যৌথভাবে ওই চুক্তি থেকে সরে না আসার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করেন। কিন্তু কার্যত দীর্ঘদিনের মিত্র এসব দেশের সব ধরণের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ফলে এটিকে একপ্রকার ইউরোপের মিত্রদের কূটনৈতিক পরাজয় হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। বিশেষত যুক্তরাজ্যের জন্য এমন পরিস্থিতি বেশ অস্বস্থির। কেননা ইরান চুক্তির এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের অবস্থান অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের চিরশত্রু রাশিয়ার দিকেই ঝুঁকে গেল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেড়িয়ে ব্রেক্সিট নিয়ে দর কষাকষিতে অন্যান্য মিত্রদের সাথে টানাপোড়নে রয়েছে যুক্তরাজ্য। তাই ইউরোপের অন্যতম শক্তি জার্মানি ও ফ্রান্সের মন রক্ষার্থে চাইলেও “ইরান ডিল” থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করতে পারছেনা যুক্তরাজ্য।এদিকে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া এক ভাষণে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ঐতিহাসিকভাবে অনুশোচিত’ হতে হবে। ২০১৫ সালে তেহরানের সঙ্গে বহুজাতিক শক্তিগুলোর করা পরমাণু চুক্তির বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে এমন সতর্কবার্তাই দিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সিদ্ধান্ত মোকাবেলায় ইরানের সদুরপ্রসারি পরিকল্পনা রয়েছে। রুহানি বলেন, যদি এমন কিছু ঘটে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পূর্ব থেকেই দেয়া আছে।

Page Sidebar