জন্টু একটি কুকুরছানার নাম !

Now Reading
জন্টু একটি কুকুরছানার নাম !

: জন্টু এদিকে আয়?

: হারামজাদা এদিকে আয় , ওইদিক গেলে বাবা বারান্দা থেকে দেখে ফেলবে, তাড়াতাড়ি আয়!

পকেট থেকে বিস্কুট বের করে, হাত নেড়ে আয়… আয় বলে ডাকতেই চলে আসছে। জন্টুকে তাড়াতাড়ি ওর ঘরে ডুকিয়ে দরজার সামনে একটা ইট চাপা দিয়ে রেখেছি, যাতে করে বের হতে না পারে।

জন্টুকে আমি গত মাঘ মাসে নিয়ে আসি।

বাংলা মাসের নাম মনে আছে, আমার দাদির কারণে মাঘ মাস আসলেই দাদির মুখে শুনা যায় ” মাঘের শীত বাঘের গায়েও লাগে “।

প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় মনে মনে দোয়া করি যাতে দাদির সাথে দেখা না হয়। দেখা হলেই সেই বিচ্ছিরি হলুদ রঙ এর সোয়েটার টা গায়ে দিতে হয় । গায়ে দিয়ে দেওয়ার সময় বলবে, “দাদু মাঘের শীত বাঘের গায়েও লাগে,আমার লক্ষী দাদুসোনা সোয়েটার গায়ে দিয়ে স্কুলে যাও, গায়ে না দিলে ঠান্ডা লেগে যাবে যে ।”

সেদিন ও চুপি চুপি স্কুলে যাওয়ার জন্য ঘর থেকে বের হচ্ছিলাম, কিন্তু কপাল খারাপ দাদির সাথে দেখা। ঘ্যান-ঘ্যান করেও লাভ হয় নি, হলুদ সোয়েটার গায়ে দিয়েই বের হতে হয়েছিলো।

বিকেলে স্কুল ছুটির পর বাসায় আসছিলাম তখন দেখলাম রাস্তার ধারে বসে কয়েকটা ছেলে আগুন পোহানোর জন্য গোল হয়ে বসে আছে । তাদের একজনের কোলে কালো রং এর একটি কুকুর ছানা।

কুকুর ছানাটি একটা ভেজা কাপড় দিয়ে মোড়ানো। আমি আগ্রহ নিয়ে ওদিকে গেলাম- কুকুরছানাটির কাছে যাওয়ার সাথে সাথে কেরোসিন এর গন্ধ পেলাম। কুকুর ছানাটির গলায় ছোট্ট একটি ঘন্টা ও দেখতে পেলাম।

বুঝতে পারলাম, ওরা কুকুর ছানাটিকে আগুনের মধ্যে ছেড়ে দিবে- ভয়ে কুকুর ছানাটি দৌড়াবে সাথে ঘন্টা টি টুনটুন করে বাজবে ।এই বিবৎস ঘটনা দেখার জন্য সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে বসে আছে ।

তাদের সবার চোখে মুখে এক ধরনের আনন্দের আভা- নাকি এই এক হিংস্রতা? অন্যের কষ্ট দেখার পৌশাচিক আনন্দ।

আমি জিজ্ঞেস করলাম,

“কুকুরের গায়ে কেরোসিন মাখাইছোস কেন?”

:” তোর কি? ভাগ এখান থেকে নাইলে থাপ্পড় খাবি। ”

আমি কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। কুকুরের জন্য কি ওদের সাথে ঝগড়া করবো? এমনিতেই ওরা আমার থেকে বয়সে বড় তার উপর আমি একা।

কুকুরছানাকে এভাবে রেখে চলে আসার কথা ভাবতে পারছিলাম না।

আমি কুকুরছানাকে বাঁচানোর জন্য ছেলেগুলোর উপর ঝাপ দি।

কিন্তু কিছু করার আগেই কয়েকটা কিল -ঘুষি নাকে মুখে পড়তে থাকে। ব্যাথায় কাতরাতে কাতরাতে চিৎকার দিতে গিয়েও গলায় দলা পাকিয়ে গেলো । নিঃশ্বাস সঞ্চয় করে সমস্ত প্রাণশক্তি দিয়ে চিৎকার দিলাম- গলা দিয়ে শব্দ বের হলো কিনা ঠিক বুঝলাম না !

তখন রাস্তা দিয়ে বড় কেউ যাচ্ছিলো।

উনি আমার চিৎকার শুনে এগিয়ে আসলো। আমাকে ওদের হাত থেকে বাঁচায়, বকা দিয়ে ওদের তাড়িয়ে দেয়। বকা খেয়ে সবাই পালিয়ে যায় -কুকুরছানাটি পড়ে থাকে আগুনের ধারে ,আগুনের আভা তার শিশুসুলভ চোখে বেশ বেমানান দেখাচ্ছিলো।

আমি কোনো কিছু না ভেবেই কুকুরছানাটি নিয়ে বাসার দিকে রওনা দি।

আমার বাবা কুকুর বিড়াল দু চক্ষে দেখতে পারে না, কুকুরছানাটিকে নিয়ে কি করবো ছোট্ট আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না।

একবার ভাবলাম এটাকে তো আগুন থেকে বাঁচালাম ই। রাস্তার পাশে ছেড়ে দি। যেদিকে খুশি যাক।তাতে আমার কি?!

কিন্তু কুকুরছানাটির উপর মায়া পড়ে যায়, ফেলে রেখে আসা সম্ভব হয় না।

গাছের ছায়া ধরে বাড়ির পথে হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে থাকলাম ।

তারপর মনে আসলো আমাদের বাসার পিছনের গেট দিয়ে কেউ যাওয়া আসা করে না। দুই তিনটা কাঠ দিয়ে একটা ঘর বানিয়ে রাখলেই হয়।

প্রতিদিন সকালে আর বিকেলে চুপিচুপি গিয়ে খাবার দিয়ে আসবো। কেউ ভাববে ও না ওখানে একটা কুকুরছানা আছে।

এই ভেবে আনন্দে আমার চোখে পানি এসে গেলো। আমার একটা কুকুরছানা আছে এটা ভাবতেই চোখ ঝকঝক করে।

আমি মহা আনন্দে, দুইটা কাঠ আর একটা টিনের কাটা অংশ দিয়ে কুকুরছানাটির জন্য ঘরের মতো বানাই।

কুকুরেরছানার কি নাম রাখা যায় এটা নিয়ে রাত দিন ভাবতে থাকি। শেষ পর্যন্ত ঠিক করলাম জন্টু নাম রাখবো। নামটা তেমন পছন্দ হয়নি কিন্তু আর কোনো নাম মনে আসছিলো না তখন। জন্টু নামই বারবার মাথার ভিতর ঘুরছিলো।

প্রতিদিন সকালের নাস্তা আমার রুমে নিয়ে আসতে শুরু করলাম -খাওয়ার জন্য। সকালের নাস্তা থেকে একটা রুটির অর্ধেক আর ভাজি রেখে দিতাম। কিছুক্ষন পর চুপিচুপি নিচে নেমে জন্টুকে রুটির ছেঁড়া অংশ দিয়ে আসতাম।

খাওয়ানোর সময় খেয়াল রাখতাম যাতে কেউ চলে না আসে, খাওয়া শেষে জন্টুকে আবার ওর ঝুপড়িতে ঢুকিয়ে ইট দিয়ে চেপে দিতাম- যাতে বের হয়ে বাগানে ঘুরোঘুরি করতে না পারে।

বিকালেও একই কাজ করতাম।

আমার একটা কুকুরছানা আছে এটা ভাবতেই আনন্দ হতো। সারাদিন কুকুরছানা নিয়ে ভাবতাম, আর নতুন নতুন নাম খুঁজে বেড়াতাম।

কিন্তু এভাবে বেশীদিন কাটানো গেলো না।

জামশেদ চাচা একদিন কুকুরছানার খোঁজ পেয়ে যায়। জামশেদ চাচা- আমাদের এখানে বাগানের দেখা শুনা করে আর বাড়ির বাজার করে দেয়। জামশেদ চাচা কুকুরছানার কথা বাবাকে বলে দেয়।

বাবার মেজাজ খারাপ হলে- রুমের দরজা বন্ধ করে স্কেল দিয়ে বাড়ি দিতে শুরু করে যতক্ষন না জ্ঞান হারাচ্ছি । আমি তো ভয়েই শেষ।

কিন্তু বাবা সেদিন কিছুই বললো না। শুধু জামশেদ চাচাকে নিজের রুমে ডেকে নিয়ে বলেছে, এটাকে বস্তায় ভরে দূরে কোথাও রেখে আসো।

জামশেদ চাচা তাই করলেন।

কিন্তু তিনদিন পর সকাল বেলায় বারান্দায় বসে নাস্তা খাওয়ার সময় দেখলাম, কুকুরছানাটি গেইটের সামনে এসে হাজির। ক্রমাগত লেজ নেড়ে ঘেউ ঘেউ করে নিজের আনন্দ প্রকাশ করে যাচ্ছে ।

বাবা বারান্দায় দাঁড়িয়ে শুধু দেখেছে – কিছুই বলেনি।

জামশেদ চাচা এবার বস্তায় ন্যাপথলিন দিয়ে দেয়- যাতে আর ঘ্রাণ শুকে শুকে ফিরে আসতে না পারে।

ন্যাপথেলিন দিয়েও লাভ হয় নি।

সাত – আটদিন পর বিধ্বস্ত অবস্থায় এসে হাজির হয়। এবার আর ঘেউ ঘেউ করে নিজের আনন্দ প্রকাশ করেনি- গম্ভীর আর ভয়ার্ত চোখে গেইটের সামনে ঘুর ঘুর করতে থাকে।

বাবা, জামশেদ চাচাকে ডেকে নিয়ে বলে, এই কুকুরেরছানা যদি আবার ফিরে আসে তাহলে তোমার চাকরি নট।

জামশেদ চাচা কি করেছেন জানি না!!

কিন্তু দশ বার দিন পরেও যখন জন্টু আর ফিরে আসে নি ।তখন মনের মধ্যে ভয় উদয় হলো ,এবার হয়তো বস্তায় ভরে কোথাও আর রেখে আসে নি,বস্তার ভিতরে ইট দিয়ে পুকুরে বা দিঘীর মধ্যে ফেলে দিয়েছে।

একদিন ভয়ে ভয়ে জামশেদ চাচাকে জিজ্ঞেস করলাম, ” আপনি কি কুকুরছানাটিকে বস্তায় ভরে পানিতে ফেলে দিয়েছেন?”

: “না না! কি বলো বাবা! কিভাবে পানিতে ফেলে দি? আমারো তো বাচ্চা আছে বাবা।”

আমি আর কখনো কিছু জিজ্ঞেস করিনি।

আমি অপেক্ষা করতে থাকি,হয়তো কোনো একদিন ফিরে আসবে। গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ঘেউ ঘেউ করতে করতে নিজের ছোট লেজটি বাতাসের মধ্যে দোল খাওয়াবে।

মাঝেমধ্যেই জন্টুর কথা মনে পড়ে। খুব মায়া হয়। মায়া বড়ই অদ্ভূত জিনিস।