বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন (২য় পর্ব)

Now Reading
বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন (২য় পর্ব)

বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থান ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এর একটি বিশাল উদাহরণ। বাংলাদেশ যে একটি অনেক দিনের পুরনো ইতিহাস থেকে উঠে আসা দেশ তা প্রমাণ করে এইসব নিদর্শন গুলো। আমাদের নিজেদের বাংলাদেশী বলে পরিচয় দিতে যেনো কার্পণ্য না করি সেই সব অদম্য সাহস ও ইতিহাসে আমাদের যে শান-সৈকত রয়েছে তা প্রকাশ করে এইসব নিদর্শন করে। বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন গুলো তুলে ধরার ধারাবাহিকতায়য় এই লেখার ২য় অংশে আমাদের দেশে যেসব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রয়েছে তা আপানাদের কাছে তুলে ধরছি।Mahasthangarh-2.jpg

মহাস্থানগড়ঃ
বগুড়া জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায় অবস্থিত মহাস্থানগড় বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন পুরাকীর্তি। বাংলার প্রাচীনতম জনপদ ছিল পুণ্ড্র বা পৌণ্ড্র। পুণ্ড্রদের আবাসস্থলই পুণ্ড্র বা পুণ্ড্রবর্ধন নামে পরিচিত। এই পুণ্ড্র রাজ্যের রাজধানী ছিলো পুণ্ড্রনগর। আনুমানিক খ্রিষ্টপূর্ব চার শতকে (৪০০ খ্রিস্টাব্দে) এই নগর গড়ে উঠেছিল। পুণ্ড্রনগর এর বর্তমান নাম মহাস্থানগড়। এটি মৌর্য ও গুপ্ত রাজবংশের প্রাদেশিক রাজধানী ছিলো। কতিথ আছে, এখানে পরশুরামের সাথে ফকির বেশী আধ্যাত্মিক অধিকারী হযরত শাহ সুলতান মাহমুদ বলখী (র.) এর যুদ্ধ হয় এবং সেই যুদ্ধে পরশুরাম পরাজিত ও নিহত হন। এর মাধ্যমে শাহ সুলতান বলখী (র.) এ অঞ্চলে ইসলামের পতাকা উড্ডীন করেন। গড়ের পূর্ব পার্শ্বে রয়েছে করতোর নদীর তীরে অবস্থিত শীলাদেবীর ঘাট। এখানে রয়েছে সম্রাট অশোক নির্মিত বৌদ্ধ স্তম্ভ যা “বেহুলার বাসর ঘর” নামে পরিচিত। বিখ্যাত চীনা পরিব্রাজক “হিউয়েন সাঙ” বৌদ্ধ শিক্ষা অর্জনের জন্য ৬৩৯ থকে ৬৪৫ খ্রিস্টাব্দে এই স্থানে আসেন এবং তার ভ্রমন কথায় এই স্থানের তৎকালীন অবস্থা তুলে ধরেন। মহাস্থানগড়ে একটি ব্রাহ্মী লিপি পাওয়া গেছে। এটি হচ্ছে বাংলার প্রাচীনতম শিলালিপি। মহাস্থানগড়ের দর্শনীয় স্থান শাহ বলখীর মাজার, পরশুরামের প্রাসাদ, খোদার পাথর ভিটা, বৈরাগীর ভিটা, গোবিন্দ ভিটা, লক্ষীন্দরের মেধ, কালীদহ সাগর, পদ্মাদেবীর বাসভবন। ১৮০৮ সালে বুকানন হ্যামিল্টন সর্বপ্রথম স্থানটি আবিষ্কার করেন। ১৮৮৯ সালে কানিংহাম স্থানটিকে প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধন এর রাজধানী হিসেবে সনাক্ত করেন। ২০১৬ সালে সার্ক তাদের সাংস্কৃতিক রাজধানী হিসেবে মহাস্থানগড় এর নাম ঘোষণা করে।7496531178_7afc950327_b.jpg

সোমপুর বিহারঃ
পাল বংশের দ্বিতীয় রাজা শ্রী ধর্মপাল বর্তমান নওগাঁ জেলার পাহাড়পুড়ে একটি বিহার বা বা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। বিহারটির নাম ছিল সোমপুর বিহার একে পাহাড়পুর বিহার ও বলা হয়। অষ্টম শতাব্দীতে তিনি এটি নির্মাণ করেন। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রত্নতাত্ত্বিক খনন কাজের ফলে যত বৌদ্ধ বিহার আবিষ্কৃত হয়েছে তার মধ্যে এটি আয়তনে বৃহত্তম। ১৮০৭ -১৮১২ সালের মধ্যে কোনো এক সময়ে বুকানন হ্যামিল্টন পাহাড়পুর পরিদর্শন করেন। এটি ছিল পাহাড়পুরের প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিক পরিদর্শন। সেই সূত্র ধরে ১৮৯৭ সালে কানিংহাম এই বিশালকীর্তি আবিষ্কার করেন। “সত্য পীরের ভিটা” সোমপুর বিহারের একটি উল্লেখ্যোগ্য স্থান। এই বিহার প্রায় ৩০০ বছর বৌদ্ধদের অতি বিখ্যাত ধর্ম শিক্ষাদান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত লাভ করে। সোমপুর বিহারে বাগদাদের খলিফা হারুন-অর-রশিদের ১২৭ হিজরি (৭৮৮ খ্রিস্টাব্দ) সনের রৌপ্য মুদ্রা পাওয়া গেছে।E-8.jpg

ময়নামতিঃ
কুমিল্লার বিখ্যাত ঐতিহাসিক স্থান “ময়নামতি” এলাকাটি প্রকৃতপক্ষে একটি প্রাচীন নগরী এবং বৌদ্ধ বিহারের অবশিষ্টাংশ। সপ্তম – দ্বাদশ শতাব্দীরর মধ্যে এই নগরী ও বিহারগুলো নির্মিত হয়েছিল। রাজা মানিকচন্দ্রের স্ত্রী রানী ময়নামতির নামানুসারে এ স্থানের নামকরণ করা হয়। ময়নামতির পূর্ব নাম ছিল রোহিতগিরি। প্রত্নতাত্ত্বিকদের মতে, ময়নামতি জয়কর্মান্তবসাক নামক একটি প্রাচীন নগরীর ধ্বংসাবশেষ। এখানকার উল্লেখযোগ্য স্থাপনা হলো শালবন বিহার, আনন্দ ভিহার, ভোজবিহার, লাল মাই পাহাড়, কুটিলা মুড়া, ইটাখোলা মুড়া, রূপবান মুড়া, চারপত্র মুড়া, রানির বাংলো ইত্যাদি।

কোটিবর্ষঃ
দেবকোট বা কোটিবর্ষ ছিল বাংলার এক প্রাচীন শহর। এটি পুণ্ড্রবর্ধন ভুক্তির একটি অংশ বিশেষ। দিনাজপুর জেলার বানগড় গ্রামে এই শহরের ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়েছে। দেবকোট কখনো কখনো ইখতিয়ারউদ্দিন মুহাম্মদ বিন বখতিয়ার খলজির রাজধানীও ছিল।Rajshahi-Nilkhuthi-1.jpg

বড়কুঠিঃ
বড়কুঠি বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলের সর্বপ্রাচীন এবং সবচেয়ে আকর্ষণীয় ইমারত। অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রথমে এটি নির্মিত হয় বলে ধারণা করা হয়। ওলন্দাজ বা ডাচরা তাদের ব্যবসা কেন্দ্রের জন্য এই কুঠি নির্মাণ করে। ১৮৩৩ সালে ওলন্দাজরা বাংলা ছেড়ে চলে গেলে এর মালিকানা ইংরেজদের হাতে চলে যায়। ওলন্দাজদের আমলে কুঠিটি ছিল বেশ সুরক্ষিত এবং এর ছাদের উপর থেকে কামানের গোলা নিক্ষেপ করা যেত।১৯৫৩ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় বড়কুঠি ভাইস চ্যান্সেলর এর অফিস ও বাসভবনে পরিণত করা হয়। বর্তমানে এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের টিচার্স ক্লাব হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।Uttara_Ganabhaban_Natore.jpg

উত্তরা গণভবনঃ
দিঘাপাতিয়া রাজবাড়ী (উত্তরা গণভবন) নাটোর জেলায় অবস্থিত। এটি দিঘাপাতিয়া মহারাজদের বাসস্থান ছিল। এটি বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের উত্তরাঞ্চলীয় সচিবালয়। ১৭৪৩ সালে রাজা দয়ারাম এটি নির্মান করেন। ১৮৯৭ সালে প্রলয়ঙ্করী ভূমিকম্পে রাজপ্রাসাদটি ধ্বংস্তূপে পরিণত হয়। পরে রাজা প্রমদ নাথ এটি পুনঃনির্মাণ করেন। ১৯৬৭ সালে তৎকালীন গভর্নর মোনায়েম খান একে গভর্ণরের বাসভবন হিসেবে ঘোষণা করেন। পরে ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই রাজবাড়ীর নামকরণ করেন “উত্তরা গণভবন”।Hussaini-Dalan-1.jpg

ইমাম বাড়াঃ
প্রায় সাড়ে ৩০০ বছরের পুরনো মুঘল আমলের অন্যতম একটি নিদর্শন হোসেনি দালান বা ইমামবাড়া। এই ইমামবাড়াটি ঢাকার বকশিবাজার এলাকায় অবস্থিত। এটি মূলত শিয়া মুসলিমদের উপাসনালয়। ইমারতটি হযরত মুহাম্মদ (স) এর দৌহিত্র ইমাম হোসেন (রহ) এর কারবালার প্রান্তরে শাহাদাত বরণের স্মরণে নির্মাণ করা হয়। মুঘল সম্রাট শাহজাহানের আমলে এটি নির্মিত হয়। ধারনা করা হয় হিজরী ১০৫২ সনে সৈয়দ মীর মুরাদ এটি নির্মাণ করেন। ২০১১ সালে এর ব্যাপক সংস্কার কাজ করা হয় এবং এর পুরো ব্যয়ভার বহন করে ইরান সরকার।

বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থান ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো বাংলাদেশের মানুষের মাঝে তুলে ধরার লক্ষ্যে এর পরের লেখা হবে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক মসজিদ গুলো নিয়ে।