মুস্তাফিজ: একজন বৈচিত্র‍্যময়ী বোলার

Now Reading
মুস্তাফিজ: একজন বৈচিত্র‍্যময়ী বোলার

মুস্তাফিজ, বদলে যাওয়া বাংলাদেশের এক নতুন আশ্চর্যের নাম। যার প্রতি তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের এক বিস্ময়কর ভালোবাসা। যাকে বাংলাদেশের মানুষ ভালোবেসে ডাকে ” কাটার মাস্টার ” আর ক্রিকেট বিশ্বের কাছে সে “দ্য ফিজ ( The Fizz)”। যার অর্জনে রয়েছে বিশ্বের সেরা সেরা ব্যাটসম্যানদের মধ্যে ভিরাট কোহলি, রোহিত শর্মা,মাহেন্দ্র সিং ধোনি, ক্রিস গেইল, এবিডি ভিলিয়ার্স, হাশিম আমলা, শহিদ আফ্রিদি, মোহাম্মদ হাফিজ, কেন উইলিয়ামসনদের উইকেট।

মুস্তাফিজুর রহমান একজন বামহাতি মিডিয়াম ফাস্ট বোলার যার প্রথম অভিষেক ঘটে ২৪ এপ্রিল ২০১৫ সালে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একমাত্র টি-২০ ম্যাচে। অভিষেক ম্যাচেই তার ঝুলিতে এসে যায় পাকিস্তান দলের অন্যতম সেরা দুইজন ব্যাটসম্যান শহিদ আফ্রিদি ও মোহাম্মদ হাফিজের উইকেট। মুস্তাফিজের প্রথম উইকেটটি আসে আম্পায়ারের ভুল সিদ্ধান্তে। যেখানে ব্যাটসম্যানরাই তার বল বুঝতে ভুল করছিল সেখানে আম্পায়ারই বা কেনো ভুল করবে না!

মুস্তাফিজ তার ভিতরে যে প্রতিভা রয়েছে তার প্রমান দেন বাংলাদেশ- ভারত মধ্যকার ওডিআই সিরিজে যা তাকে সবার থেকে আলাদা ভাবতে বাধ্য করেছে। সে তার ওডিআই অভিষেকে ভারতের কঠিন ব্যাটিং লাইনআপকে গুঁড়িয়ে দেয় তার নিখুঁত বোলিং লাইন লেন্থ ও কাটারের বৈচিত্র্যের সাহায্যে। ৯.২ ওভার বল করে নিয়ে নেন অভিষেকে ৫ উইকেট নেয়ার কৃতিত্ব এবং অর্জন করেন ম্যাচসেরার পুরস্কার। ২য় ওডিআইতে ৬ উইকেট নিয়ে গড়েন ক্রিকেট ইতিহাসে দুই ম্যাচে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারের রেকর্ড। আর বাংলাদেশ পেয়ে যায় ভারতকে প্রথম ওডিআই সিরিজে হারানোর স্বাদ। শেষ এবং ৩য় ওডিআইতে ২উইকেট নিয়ে ৩ ম্যাচে ১৩ উইকেট শিকারের মাধ্যমে অর্জন করেন অভিষেকে ৩ম্যাচে সেরা উইকেট শিকারির স্থান। এই অভ্যুত্থান এর মধ্যে দিয়ে জানিয়ে ক্রিকেট বিশ্বে রাজত্ব করার জন্য আসছেন এক নতুন রাজা। কিন্তু  তার এইস্থানে আসা মোটেও সহজ ছিলো না। একমাত্র সেরারাই পারে এইরকমভাবে ভাবে সবার মাঝে তার নিজের জন্য জায়গা করে নিতে।

মুস্তাফিজুর রহমান ১৯৯৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সাতক্ষীরা জেলার তেতুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বড় ভাই তাকে প্রতিদিন বাড়ি থেকে ৪০ কি.মি দূরে অনুশীলননের জন্য দিয়ে আসতেন যা তাকে খেলার প্রতি আরও দৃঢ় হতে অনুপ্রেরণা দেয়। ২০১২ সালে মুস্তাফিজ ঢাকায় বিসিবি ফাস্ট বোলার ক্যাম্পে এসে নজর কারেন কোচের। তার নিজ জেলায় অনুষ্ঠিত অনুর্ধ্ব-১৭ লিগে অসাধারণ খেলার জন্য বিসিবি তাকে পেস ফাউন্ডেশনে অন্তর্ভুক্ত করে। সে ২০১৪ সালে অনুর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপেও অংশগ্রহণ করেন। পরবর্তীততে তার বোলিং বৈচিত্র্যের কারনে তাকে পাকিস্তানের বিপক্ষে টি-২০ ম্যাচে খেলার জন্য ডাকা হয়। এরপর থেকে মুস্তাফিজ চলছে আর সাথে চলছে তার বোলিং জাদু।

মুস্তাফিজের বোলিং পরিসংখ্যানঃ
টেস্ট 
ম্যাচ সংখ্যাঃ ৪
রানঃ ২৭৮
উইকেটঃ ১২
বোলিং গড়ঃ ২৩.১৬
৫ উইকেটঃ ০
সেরা বোলিংঃ ৪/৩৭

ওডিঅাই
ম্যাচ সংখ্যাঃ ১৬
রানঃ ৬১৯
উইকেটঃ ৩৮
বোলিং গড়ঃ ১৬.২৮
৫ উইকেটঃ ৩
সেরা বোলিংঃ ৬/৪৩

 টি-২০
ম্যাচ সংখ্যাঃ ১৭
রানঃ ৪০৩
উইকেটঃ ২৭
বোলিং গড়ঃ ১৪.৯২
৫ উইকেটঃ ১
সেরা বোলিংঃ ৫/২২

প্রথম শ্রেণি
ম্যাচ সংখ্যাঃ ১৯
রানঃ ১১৬১
উইকেটঃ ৫৬
বোলিং গড়ঃ ২০.১৯
৫ উইকেটঃ ১
সেরা বোলিংঃ ৫/২৮
সূত্রঃ http://www.espncricinfo.com/bangladesh/content/…/330902.html

মুস্তাফিজের বোলিং পরিসংখ্যান দেখলেই বুঝা যায় তার জন্ম হয়েছে ক্রিকেটে নতুন রেকর্ড তৈরি করার জন্য,  ক্রিকেট সহ পুরো পৃথিবীতে বাংলাদেশের নামকে উজ্জল করার। মুস্তাফিজের প্রথম টেস্ট অভিষেক হয় দক্ষিন আফ্রিকার বিরুদ্ধে। ১ম টেস্টেই সে অর্জন করে ম্যাচ সেরা হওয়ার গৌরব।যার ফলে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে অর্জন করে অভিষেক ওয়ানডে এবং টেস্ট ম্যাচে ম্যাচ সেরা হওয়ার খেতাব।

মুস্তাফিজ ২০১৬ সালে ভারতে অনুষ্ঠিত আইপিএল এ ” সানরাইর্জাস হায়দ্রাবাদ” দলে খেলেছেন। সেখানে সে ২০১৬ এর সেরা উদিয়মান ক্রিকেটার হিসেবে খেতাব অর্জন করে এবং তার দল হায়দ্রাবাদকে প্রথম শিরোপা লাভের স্বাদ গ্রহন করতে সাহায্য করে। এছাড়া সেই একই বছর ইংল্যান্ডের কাউন্টি দল সাসেক্সের হয়ে ন্যাটওয়েস্ট টি-২০ খেলেছেন।

মুস্তাফিজ ২০১৫ সালে জায়গা করে নেয় আইসিসি ঘোষিত বর্ষসেরা দলে এবং ২০১৬ সালে লাভ করে বর্ষসেরা উদিয়মান ক্রিকেটার এর খেতাব।

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলে একজন ভালো মানের পেসার পাওয়া এবং তার জাতীয় দলে টিকে থাকা একমাত্র মাশরাফি ছাড়া আর সহজে কাউকে দেখা যায়না। বাংলাদেশের একসময়ের খেলোয়াড়দদের মধ্যে তালহা যুবায়ের, সৈয়দ রাসেল, রবিউল ইসলাম, শাহাদাত হোসেন তারা খুব প্রতিভাবান ছিলো কিন্তু তাদের কারোরই জাতীয় দলে দীর্ঘ সময় ধরে থাকা সম্ভব হয়নি কারণ তাদের ইনজুরি।মুস্তাফিজও ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়েছে। তার ইনজুরি তাকে কিছু সময়ের জন্য তার ধারালো বোলিং অ্যাকশন থেকে দূরে রেখেছে। কিন্তু মুস্তাফিজ ইনজুরি থেকে আসা অফফর্মে ভুগতে থাকা কোনো সাধারণ ক্রিকেটার নন। শ্রীলংকার বিপক্ষে টেস্টে তার বোলিং স্পেল দেখে বুঝা যাচ্ছিলো তার অফফর্ম সাময়িক কিন্তু তার ক্লাস পার্মানেন্ট। আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে নিউজিল্যান্ডের সাথে তার বোলিং জানান দিচ্ছে এইবার আসছি চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে বড় একটা দাগ ফেলতে। মুস্তাফিজ আমাদের দেশের সম্পদ। তাকে সঠিকভাবে পরিচর্যা না করতে পারলে সেও হারিয়ে যাবে অন্যদের মতো। বাংলাদেশকে ভবিষ্যৎ ক্রিকেটে শাসন করতে হবে  আর তার জন্য প্রয়োজন মুস্তাফিজের মতো বৈচিত্র‍্যপূর্ন বোলার।

মুস্তাফিজ এর বোলিং দেখার জন্য বাংলাদেশের মানুষ অন্য যে কোনো প্রান্ত থেকে হলেও ঠিকই সময় বের করে নিয়ে বসবে তার খেলা দেখতে  । তাকে টিভির পর্দায় দেখে ঘরের ছোট্ট ছেলেটিও বলে উঠবে আমাদের মুস্তাফিজ, আমাদের কাটারমাস্টার।