গ্যাসের দাম বৃদ্ধি হলে বছরে ব্যয় বাড়বে ২৬ হাজার কোটি টাকা

Now Reading
গ্যাসের দাম বৃদ্ধি হলে বছরে ব্যয় বাড়বে ২৬ হাজার কোটি টাকা

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনে (বিইআরসি) গ্যাস বিতরণকারী ছয়টি কোম্পানির প্রস্তাবনা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গ্রাহক পর্যায়ে সরবরাহকৃত প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের বর্তমান গড় মূল্য সাত টাকা ৩৫ পয়সা। এ মূল্য বাড়িয়ে গড়ে ১৪ টাকা ৯২ পয়সা নির্ধারণ করতে চায় কোম্পানিগুলো। বর্তমানে গ্যাস বিতরণকারী সব কোম্পানি লাভে রয়েছে।
তবে ব্যয়বহুল তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) আমদানির পরিমাণ বেড়ে গেলে তাদের ব্যয় বেড়ে যাবে। সেই যুক্তি দেখিয়ে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির দাবি জানিয়েছে তারা।

গত ১১ থেকে ১৪ মার্চ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত বিইআরসির গণশুনানিতে বলা হয়, ২০১৮ সালের ১৮ আগস্ট জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ শুরু করা হয়েছে। দেশীয় গ্যাসের সঙ্গে মিশিয়ে এলএনজি যাচ্ছে গ্রাহকদের কাছে। আগামী এপ্রিলে নতুন করে ৫০ কোটি ঘনফুট এলএনজি জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।
আগামী অর্থবছরে দৈনিক ৮০ কোটি ঘনফুট এলএনজি সরবরাহ করা হবে ধরে গ্যাসের দাম প্রাক্কলন করা হয়েছে। এ অবস্থায় প্রতি হাজার ঘনফুট এলএনজি ১০ মার্কিন ডলার দরে দেশীয় গ্যাসের সঙ্গে মিশিয়ে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের গড় সরবরাহ মূল্য পড়বে ১২ টাকা ১৯ পয়সা। এর সঙ্গে সঞ্চালন ও বিতরণ মার্জিন এবং ১৫ শতাংশ ভ্যাটসহ গ্যাসের নতুন দর প্রস্তাব করা হয়েছে।
পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেশে গ্যাস সরবরাহ করা হবে তিন হাজার ৫৫ কোটি ৭০ লাখ ঘনমিটার। ২০১৯-২০ অর্থবছরে তা বেড়ে হবে তিন হাজার ৪৭৪ কোটি ৪০ লাখ ঘনমিটার। বর্তমান দর সাত টাকা ৩৫ পয়সা হিসাবে আগামী অর্থবছর গ্রাহকদের ব্যয় দাঁড়াত ২৫ হাজার ৫৩৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। তবে প্রস্তাবিত দর ১৪ টাকা ৯২ পয়সা হিসাবে সরবরাহকৃত গ্যাস বাবদ গ্রাহকদের গুনতে হবে ৫১ হাজার ৮৩৮ কোটি পাঁচ লাখ টাকা।
অর্থাৎ প্রস্তাবিত হারে গ্যাসের দাম বাড়লে জনগণের ব্যয় বেড়ে যাবে ২৬ হাজার ৩০১ কোটি ২১ লাখ টাকা।
বিইআরসি’র প্রস্তাবনা অনুযায়ী, আবাসিক গ্রাহকদের এক চুলায় মাসিক বিল ৭৫০ টাকা থেকে বেড়ে হবে এক হাজার ৩৫০ টাকা। জোড়া চুলায় মাসিক বিল ৮০০ টাকা থেকে বেড়ে এক হাজার ৪৪০ টাকা হবে। মিটারযুক্ত আবাসিক সংযোগে প্রতি ঘনমিটার গ্যাসের দাম ৯ টাকা ১০ পয়সা থেকে ১৬ টাকা ৪১ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। গাড়িতে ব্যবহার করা সিএনজির দাম প্রতি ঘন মিটার ৪০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫৬ টাকা ১০ পয়সা এবং সার কারখানায় ব্যবহার করা গ্যাসের দাম ইউনিট প্রতি দুই টাকা ৭১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে আট টাকা ৪৪ পয়সা করার দাবি করা হয়েছে। শিল্প-কলকারখানায় প্রতি ইউনিট গ্যাসের দাম সাত টাকা ৭৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ২৪ টাকা পাঁচ পয়সা, বিদ্যুেকন্দ্রের গ্যাসের দাম প্রতি ইউনিট তিন টাকা ১৬ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৯ টাকা ৭৪ পয়সা এবং ক্যাপটিভ পাওয়ারে ৯ টাকা ৬২ পয়সা থেকে ১৮ টাকা চার পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাবনা দিয়েছে বিতরণ কোম্পানি।

বিইআরসির চেয়ারম্যান মনোয়ার ইসলাম বলেন, শুনানি শেষ হওয়ার পর ৯০ দিনের মধ্যে দাম নির্ধারণের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানানোর বিধি রয়েছে। এর মধ্যেই সিদ্ধান্ত জানানো হবে। তবে কোম্পানিগুলো তাদের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দামবৃদ্ধির প্রস্তাব করেছে বলে কমিশনও মনে করে। দাম পুনর্নির্ধারণে ও মূল্যায়নে এটিও বিবেচনায় থাকবে।

গ্যাসের দাম বৃদ্ধিতে বিপাকে পড়বে সাধারন জনগণ

Now Reading
গ্যাসের দাম বৃদ্ধিতে বিপাকে পড়বে সাধারন জনগণ

গ্যাস বিতরণকারী কোম্পানিগুলো গত ডিসেম্বরে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দেয় বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনকে (বিইআরসি)। গতকাল বুধবারও দুটি গ্যাস বিতরণ কোম্পানির প্রস্তাবের ওপর গণশুনানি হয়েছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির পরিপ্রেক্ষিতে দেশে গ্যাসের দাম বাড়ানোর বিষয়টি অনুমিতই ছিল। গত বছরের এপ্রিল থেকে দেশে এলএনজি আমদানি শুরু হয়, যার দাম পড়ছে প্রতি ঘনমিটারে প্রায় ৩০ টাকা। এ দর দেশীয় গ্যাসের চার গুণের বেশি। এলএনজির কারণে ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় গত ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগেই গ্যাসের দাম বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। গণশুনানি করে বিইআরসি গ্যাসের দাম কিছুটা বাড়িয়েছিল। অবশ্য ভোটের আগে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় গ্যাসের বাড়তি দাম সাধারণ মানুষের ঘাড়ে চাপায়নি। সাড়ে চার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিয়ে সেটি সমন্বয় করা হয়।
ভোটের দুই মাস পর এখন আবার গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরু করেছে বিইআরসি। নতুন করে গ্যাসের দাম বাড়ানোর উদ্যোগে সাধারণ মানুষ হিসাব কষছে, দুই চুলার বিল বাবদ তাদের খরচ কতটা বাড়বে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব ক্ষেত্রে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির মাশুল দিতে হবে সাধারণ মানুষকে।
ব্যবসায়ীরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির ব্যয় ওঠাবেন। সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে গ্যাসের বাড়তি দাম ওঠাবে। পরিবহন ব্যবসায়ীরা বাড়াবেন ভাড়া। এমনকি ভোজ্যতেল-চিনির দামেও পড়তে পারে গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রভাব। বাংলাদেশ ট্যারিফ কমিশন ভোজ্যতেল ও চিনির কাঙ্ক্ষিত মূল্য হিসাব করতে একটি ব্যয় বিবরণী অনুসরণ করে। সেখানে দেখা যায়, প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনে গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্য বাবদ ব্যয় ৫০ পয়সা। তেলের ক্ষেত্রে তা ৬০ পয়সা।
গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে সেটার প্রভাব তেল-চিনির ওপর পড়বে। সব মিলিয়ে বাড়বে জীবনযাত্রার ব্যয়, যা উসকে দেবে মূল্যস্ফীতিকে। বিতরণকারীরা মূল্যবৃদ্ধির যে প্রস্তাব দিয়েছে, তা আঁতকে ওঠার মতো। এবারের প্রস্তাবে সব ধরনের গ্যাসের দাম গড়ে ১০৩ শতাংশ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে, যা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি।
শিল্প খাতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়বে রপ্তানি খাত। যেসব পণ্যের একটি বড় অংশ দেশে আমদানি হয়, তাদের বিপদটাও কম নয়। রপ্তানি খাতে উৎপাদন খরচ বেড়ে গিয়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। দেশে উৎপাদন খরচ বাড়লে বাজার পেয়ে যেতে পারে আমদানি পণ্য।

বিইআরসি গত অক্টোবরে গ্যাসের বাড়ানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তা চ্যালেঞ্জ করে ক্যাবের আহ্বায়ক ও স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন চলতি বছরের জানুয়ারিতে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদনটি করেছিলেন। নতুন করে দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া শুরুর পর তিনি হাইকোর্টে একটি সম্পূরক আবেদন করেন, যার ওপর গতকাল শুনানি হয়। আদালতে আবেদনকারীপক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া, সঙ্গে ছিলেন আইনজীবী রিপন কুমার বড়ুয়া। পেট্রোবাংলার পক্ষে শুনানিতে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। আর বিইআরসির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী এ এফ এম মেসবাহ উদ্দিন।

গ্যাসের দাম নিয়ে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে বিইআরসি কার্যালয়ের সামনে গতকাল বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে বাম গণতান্ত্রিক জোট। বাম জোটের নেতারা দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়ার কড়া সমালোচনা করেন। এ সময় তাঁরা গ্যাসের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়া বন্ধ না হলে হরতাল কর্মসূচির হুমকি দেন। সমাবেশে বাসদের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, সিপিবির কেন্দ্রীয় নেতা রুহীন হোসেন প্রিন্স প্রমুখ বক্তব্য।
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম গন মাধ্যমে বলেন, গণশুনানির কার্যক্রম স্থগিত করা হয়নি। ফলে গণশুনানি চলতে আইনগত কোনো বাধা নেই।

Page Sidebar