বর্তমান চাকুরীর বাজার এবং উদ্যোগ প্রয়োজনীয়তা

Now Reading
বর্তমান চাকুরীর বাজার এবং উদ্যোগ প্রয়োজনীয়তা

চাকুরীর পত্রিকাগুলোতে হাজারো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখি আমরা। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেখে আবেদন প্রদানের মাধ্যমে কতজন ব্যাক্তির চাকুরী হয়েছে, সন্দেহ আছে। আর সরকারী চাকুরী তো এখন স্বপ্নে পাওয়া যায়, বাস্তবে নয়।

ষোল কোটি মানুষের বসবাস বাংলাদেশে। এর মাঝে বাংলাদেশে শিক্ষিত জনগোষ্ঠী দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে, যা সত্যিই আনন্দের। কিন্তু আনন্দ তখনই গ্লানীতে পরিনত হয়, যখন যোগ্য প্রার্থী সঠিক জায়গায় স্থান পাচ্ছে না।

এখন মানুষের বুলি হয়ে গেছে,” মামা-চাচার জোর না থাকলে চাকুরী হবে না।“ শুধু মামা-চাচার জোর নয়, চাকুরীর জন্য আরো একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সেটা হচ্ছে টাকার জোর। নিয়োগ দানের সাথে যেসকল কর্মকর্তারা জড়িত থাকেন, তাদের পকেট ভরাতে পারলেও ভালো চাকুরী পাওয়া যায়।

প্রাইভেট কোম্পানি গুলোতে ইন্টারভিউ দেবার সময় বিভিন্ন রকম  প্রশ্নের মাঝে একটা প্রচলিত প্রশ্ন ,”এর আগে কি কোথাও চাকুরী করেছেন? অভিজ্ঞতা ছাড়া আমরা লোক নেবো না ।“ অভিজ্ঞতা কি করে অর্জন করা সম্ভব যদি তারা চাকুরী করার সুযোগটাই না দেন। অনেক ভালো রেজাল্ট করা ছেলে-মেয়েরা চাকুরী খুঁজতে গিয়ে তাদের জীবন সম্পর্কে চিন্তাধারাই পাল্টে ফেলে। যোগ্যতার ভিত্তিতে কতজন ব্যাক্তির এখন চাকুরী হচ্ছে? চাকুরীর বাজারে তেলাপোকাও পাখিতে পরিণত হয় মামা-চাচা আর টাকার জোরে।

বিশাল বেকার ভাণ্ডার বর্তমানে দেশ ও পরিবারের দায়বদ্ধতায় পরিণত হয়েছে। উদ্যোগ গ্রহনের প্রবণতার অভাবে তারা অর্থাৎ বেকার সমাজ শুধুমাত্র একটি চাকুরী পাবার স্বপ্নই দেখে। প্রথম পর্যায়ে তাদের স্বপ্ন থাকে মানসম্পন্ন চাকুরী করবেন। প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহন করবার পর তাদের চাওয়া পাওয়া থাকে, যে কোনো একটি চাকুরী।

গোলমেলে এবং অগোছালো পরিস্থিতি রয়েছে চাকুরী দাতা এবং চাকুরী গ্রহীতাদের মাঝে। যেমন যে ব্যাক্তি অনার্স সম্পন্ন করেছে সে আবেদন করেছে করণিক পদের জন্য। অথচ আবেদন পত্রে হয়তো শুধুমাত্র এস.এস.সি অথবা এস.এস.সি সম্পন্ন করেছে, এমন প্রার্থী চাওয়া হয়েছে। তবে এতো লেখাপড়ার দরকারটা কি? শুধুমাত্র বলার জন্য আর দেখানোর জন্যই তো সার্টিফিকেট নয়।

অর্থনীতি বিদরা এক সময় অতিরিক্ত জনসংখ্যাকে দেশের এবং সরকারের দায় মনে করতেন। কিন্তু বর্তমান আধুনিক অর্থনীতি বিদরা অধিক জনসংখ্যাকে দায় হিসেবে আখ্যা না দিয়ে তাদেরকে জনশক্তি হিসেবে অভিহিত করেছেন। চীনের জনসংখ্যা যখন ১০০ কোটি ছিল, তখন চীন সরকার বলেছিলেন,” আমার দেশের জনগণ বোঝা নয়, কারণ আমাদের ১০০ কোটি জনগণের ২০০ কোটি হাত রয়েছে।“ চীনের জনগণ যথেষ্ট পরিশ্রমী বলে তাদের দক্ষ জনগণের দ্বারা অর্থনৈতিক সাম্য বিধানে সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়নি। আজ সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা বিধান ও প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিতকরণে চীন সফল। যেখানে আমরা আমাদের জনবলকে বোঝা করে রেখে দিয়েছি। জনসংখ্যা বোঝা হতো না যদি উদ্যোক্তা শ্রেণীর অভাব না থাকতো।

লাখ লাখ টাকা খরচ করে আমরা চাকুরীর প্রতিযোগীতায় অংশগ্রহন করতে আপত্তি করি না, কিন্তু তার চেয়ে কিছু কম টাকা বিনিয়োগ করেও একজন উদ্যোক্তা হওয়া সম্ভব। তাতে নিজের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অন্যেরও কর্মসংস্থান করে দেয়া সম্ভব। বর্তমান চাকুরীর বাজারে দর কষাকষির পরিমাণ দিন দিন বেরেই যাচ্ছে।

যেমনঃ

——প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক পদপ্রার্থীদের জন্য পাঁচ লক্ষ থেকে সাত লক্ষ টাকা।

——সরকারি করণিক পদের জন্য পাঁচ লক্ষ থেকে ছয় লক্ষ টাকা।

——সরকারি অফিসার পদ গুলোর জন্য আট লক্ষ থেকে বার লক্ষ টাকা।

——ব্যাংক কর্মকর্তা হতে চাইলে গুনতে হবে আট লক্ষ থেকে পনেরো লক্ষ টাকা।

তবে এর থেকে অধিক পরিশোধের ইচ্ছা থাকলে অগ্রাধিকার থাকবে।

 

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি যদি আরও একটু স্পষ্ট ভাবে দেয়া হতো তবে নিম্নরুপ হবেঃ

 

ক খ গ অধিদপ্তরে চাকুরী

পদের সংখ্যা – ৫৬ জন

পদের নাম সংখ্যা শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা
১।উচ্চমান সহকারী ১০ জন স্নাতক বা সমমানের ডিগ্রী। সংশ্লিষ্ট কাজে ২ বছরের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং প্রদত্ত পদের জন্য অবশ্যই ১০ লক্ষ টাকা প্রদানে ইচ্ছুক হতে হবে।
২।করণিক ৪৬ জন Xyz বিভাগে এইচ.এস.সি বা সমমানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং প্রদত্ত পদের জন্য অবশ্যই ৬ লক্ষ টাকা প্রদানে ইচ্ছুক হতে হবে।

 

[ বিঃদ্রঃ উপরোক্ত পদ্গুলোর জন্য যোগ্যতা সম্পন্ন এবং উল্লেখিত অর্থ প্রদানে ইচ্ছুক ব্যাক্তিদের মাঝে লটারির মাধ্যমে পদপ্রার্থী নির্বাচন এবং নিয়োগ দান করা হবে ]

চাকুরীর জন্য ঘুস দান এবং ঘুষ গ্রহণ একটি ওপেন সিক্রেট বিষয়। তাই যদি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি এরুপ স্পষ্ট ভাবে দেয়া হয় তবে কিছু মানুষের মাঝে এসব চাকুরীর জন্য মিথ্যা আশা জন্ম নেবে না ।

 

প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ গুলোতে বিশ-বাইশ লাখ টাকা খরচ করে ডাক্তারি পড়ানো হয় সন্তানদের। এম.বি.বি.এস পাশের পর একজন ইন্টার্ন ডাক্তারের বেতন খুব সামান্য হয়ে থাকে।

ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার পর প্রাথমিক পর্যায়ে একজন ইঞ্জিনিয়ারের বেতন হয় বার হাজার থেকে ষোল হাজার টাকা।

তবে এতো টাকা খরচ করে লেখাপড়ার পর কতটুকু ফল পাওয়া গেল।

একাউণ্টিং এ অনার্স করে কোন কোম্পানির রিসেপশনিস্ট এর দায়িত্ব পালন করা, মানবিক বিভাগে স্নাতক বা স্নাতকোত্তর হয়ে মার্কেটিং এ চাকুরী করা, এসব ওলট-পালট নিয়োগ অহরহ দেখা যায় আমাদের দেশে।

প্রচলিত চাকুরী হবার মানসিকতার বাইরে গিয়ে বাংলাদেশে কিছু তরুণ ভিন্নতর উদ্যোগ নিয়ে তাদের পেশার ক্ষেত্রকে পরিবর্তন করছে। যেমনঃ—-

কৃষিক্ষেত্রে অভিনব কিছু বিনিয়োগ লক্ষণীয় ভাবে সাফল্য লাভ করেছে বাংলাদেশে। ড্রাগন ফল উৎপাদনের পাশাপাশি কিছু নতুন প্রজাতির ফলের চাষ বর্তমানে বাংলাদেশে সম্ভব। স্ট্রবেরী, আলু বোখারা, মাল্টা সহ বিভিন্ন ধরনের ভেষজ উদ্ভিদের চাষ বর্তমানে লক্ষণীয়। বিভিন্ন ধরনের মসলা চাষেও ভালো সাফল্য দেখা দিয়েছে। আর এসব ক্ষেত্রে যেসব তরুণরা এগিয়ে এসেছে, তারাও উচ্চশিক্ষিত।

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। তাই, কৃষিক্ষেত্রকে আধুনিকতার সাথে উপস্থাপন করাটা শিক্ষিত যুব সমাজের পক্ষেই সম্ভব।

বাংলাদেশে বর্তমানে কুমিরের খামারও রয়েছে। কুমিরের মাংস এবং চামড়া চড়া দামে বিদেশে বিক্রির মাধ্যমে বাংলাদেশ বৈদেশিক মূদ্রাও অর্জন করছে।

সাপের খামারও রয়েছে আমাদের দেশে। সাপের বিষ ওষুধ তৈরীতে ব্যবহৃত হয়। যেমনঃ অ্যান্টিভেনম, ক্যাপটোপ্রিল, বেট্রক্সোবিন (তথ্য সূত্রঃ http://zoltantakacs.com/venom_medicines_snake_toxin_drugs_zoltan_takacs.shtml )। আমাদের দেশের ঔষধ কোম্পানিগুলো চড়া দামে ঔষধ তৈরির এই কাঁচামাল বিদেশ হতে আমদানি করে। যদি সাপের বিষ অর্থাৎ ওষুধের এই কাঁচামাল আমাদের অন্য দেশ হতে আমদানি করতে না হয়, তবে এই বিষয়ে আমরা অনেকটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ হবো।

এই বিষয়গুলো বা এই ক্ষেত্রগুলো উল্লেখ করার একটি বিশেষ কারণ হচ্ছে, প্রশস্ত চিন্তাশক্তি দরকার আমাদের যুব সমাজের। যেন চাকুরীর অপেক্ষায় না থেকে চাকুরী প্রদান করা সম্ভব হয়। তবে এসব ক্ষেত্রে ব্যাক্তিগত উদ্যোগের পাশাপাশি সরকারি সহায়তা বিশেষ প্রয়োজন। উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দানের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রকে প্রশস্ত করা দরকার। গ্রামাঞ্চলে যাদের অধিক জায়গা জমি রয়েছে, তারা সেই জায়গা নিয়ে ভিন্নতর পরিকল্পনা করতে পারে। এতে রাজধানীর ওপর অতিরিক্ত চাপও কমে যাবে।

তাই আসুন, যে যে যার যার জায়গা থেকে কিছু পরিকল্পনার মাধ্যমে উদ্যোক্তা হয়ে উঠি এবং নিজের ও অন্যের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করি।