জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট = ABC

Now Reading
জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট = ABC

গত বছর চট্টগ্রামের কিছু কিছু এলাকায় রাস্তার পাশের ড্রেনগুলো কেটে বড় করা হয়েছিল। তার একমাত্র কারণ হল এসব এলাকায় সামান্য বৃষ্টি পরলে পানি উঠোত। কিন্তু তারপরো পানি আটকে থাকত। আমরা যদি ড্রেনের দিকে একটু চোখ দি তাহলে দেখতে পাই প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন ইত্যাদি। এদিকে পানি জমে থাকলে সরকার কে গালি দেই। এসরের জন্য তো আর সরকার দায়ী না। এসবের জনয় দায়ী আমরাই। আমাদের ফেলানো পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতলগুলই ড্রেনের পানি আটকে রাখে। যার কারণে আমরা জলাবদ্ধতার কারণে ভুগি। এলাকাবাসীরা মিলে ঠিক করল সবাই ঐক্য হয়ে ড্রেনের কাজ শুরু করবে।দেশে তো নিজেদের নাম দেয়া জাতীয় ঐক্য ফ্রন্ট আছে। আমরা চাইলে এটিকে জাতীয় ঐক্য বলরতে পারি।

সরকার কে গালি দেয়ার আগে আসুন আমরা নিজেদের মনের চিন্তা ধারা পালটাই। চট্টগ্রামের অনেক এলাকায় গত ১ বছর আগে রাস্তা খুব খারাপ ছিল। ওই রাস্তা দিয়ে হাঁটলেই মানুষের গালি সোনা জেত। সরকারকে গালি দিত। এখন সেই রাস্তা অনেক সুন্দর করা হয়েছে। নিয়মিত পরিষ্কার করা হয়। সত্যি অবাক করার মত। কিন্তু সেসব মানুষগুলোর মুখ থেকে আর প্রশংসা সোনা যায় না। এমনকি আমাদের জাতীয় ক্রিকেট টিমের বোলার তাস্কিনের বাচ্চাকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলাম।
পুরো ভিডিওটি নিচে দেয়া হল।

যে কারণে চট্টগ্রাম হালিশহর এলাকায় জণ্ডিসের প্রকোপ! (অনুসন্ধান)

Now Reading
যে কারণে চট্টগ্রাম হালিশহর এলাকায় জণ্ডিসের প্রকোপ! (অনুসন্ধান)

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিসংখ্যান অনুসারে প্রত্যেক বছর পৃথিবীতে প্রায় দশ লক্ষ মানুষের মৃত্যুর কারণ হল দূষিত পানি। বাংলাদেশ ও এর আওতাভুক্ত আর এর বিভিন্ন জেলা দূষিত পানির দরুন সংক্রমিত হচ্ছে দিনদিন। নদীমাতৃক দেশ হওয়ায় এখানে গ্রাম ও শহর উভয় জায়গায় পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। যে কোন রোগ যা দূষিত পানির মাধ্যমে সংক্রমিত হয় বা ছড়িয়ে থাকে। মানুষ ও অন্যান্য জীবজন্তুর বিভিন্ন রোগের জন্য প্রধানত দায়ী রোগ সৃষ্টিকারী অণুজীব (ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাস) এবং কয়েক রকমের পরজীবী। আর পানি বাহিত রোগের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জন্ডিস, ডায়রিয়া, কলেরা, আর্সেনিক, আমাশয়, টায়ফয়েড, পেটফাঁপা, বদহজম, কৃমি ইত্যাদি। বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান দ্বিতীয় শহর চট্টগ্রাম হটাৎ করেই দূষিত পানির কবলে পড়ে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে বন্দর নগরীর সমুদ্রের তীর ঘেঁষা অন্যতম এলাকা হালিশহর এখন পানিবাহিত রোগের সংক্রমণে জর্জরিত। ইতিমধ্যেই পানিবাহিত রোগ জন্ডিসে (হেপাটাইটিস-ই ভাইরাস) আক্রান্ত হয়ে কয়েকজনের মৃত্যুর অভিযোগ সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়েছে। অন্যদিকে শতশত মানুষের অসুস্থ হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে, যারা চট্টগ্রাম মেডিকেল হাসপাতালসহ স্থানীয় চিকিৎসা কেন্দ্রে জরুরী চিকিৎসা সেবা গ্রহণে ভিড় জমাচ্ছেন। ফলে চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন তড়িৎ গতিতে কিছু ব্যবস্থা নিয়েছে যার মধ্যে রয়েছে আক্রান্ত এলাকায় পানি বিশুদ্ধকরণে এক লাখ ৮৫ হাজার টেবলেট বিতরণ, ১০টি নির্দেশনা সম্বলিত জনসচেতনতামূলক ৫০ হাজার লিফলেট বিতরণ, এলাকা পর্যবেক্ষণ ইত্যাদি।

 

চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন এর বিতরনকৃত লিফলেট

অনুসন্ধানঃ গত মাসেই আমাদের অফিসের একজন এবং দারোয়ান মারাত্মক রকম অসুস্থ হয়ে পড়ে। ডাক্তারি পরীক্ষা নিরীক্ষার পর জানা গেল তারা পানিবাহিত রোগ জণ্ডিসে আক্রান্ত। বিষয়টি আমরা সাময়িক ব্যাধি হিসেবে খুব একটা আমলে নেইনি। এরই মধ্যে জয়েন করেছে নতুন ড্রাইভার আর সপ্তাহ দু-একের মাথায় তারও কঠিন জন্ডিস ধরা পড়েছে। এভাবে আশে পাশের পরিচিত আরো অনেকের খবর পাওয়া যাচ্ছে যারা জণ্ডিসে মারাত্মকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বিষয়টি এখন আর মামুলি মনে হলনা, গোটা এলাকাই এখন ঘোরতর বিপদে। এখানে বলে রাখা ভাল, যাদের অসুস্থ হওয়ার কথা উল্ল্যেখ করেছি তারা ওয়াসার পানি ফুটিয়ে পান করত, সরাসরি নয়। বেশ কয়েকদিন হালিশহরের বিভিন্ন আবাসিক ও অন্যান্য এলাকা পর্যবেক্ষণ করে একটা বিষয় পরিস্কার হয়েছে যে এলাকাটি নগরীর অন্যান্য অংশ হতে অনেকটা ডাউন লেভেলে। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই এখানে হাঁটু সমান পানিতে নিমজ্জিত হয়, বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এই অবস্থা ভয়াবহ আকার ধারণ করে। ইদানীং এক্সেস রোড ও পোর্ট কানেক্টিং রোড সম্প্রসারন ও ড্রেনেজ সংস্কার কার্যক্রম শুরু হয়েছে, ফলে কিছু কিছু জায়গায় ওয়াসা এবং অন্যান্য ব্যক্তিগত পানি সরবরাহের নল ফেটে কিংবা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলশ্রুতিতে বৃষ্টি হলেই সেই ফাটা/বিচ্ছিন্ন নল দিয়ে দীর্ঘদিনের জমে থাকা দূষিত পানি পৌঁছে যাচ্ছে অত্র এলাকার বাসাবাড়িতে। তাছাড়া এখানকার বেশিরভাগ নলকূপও পানিতে তলানো। এই এলাকায় ধনী ও মধ্যবিত্তের সাথে বাস করে নিম্ম আয়ের মানুষ যারা টিউব ওয়েল কিংবা টেপের পানি খেয়ে জীবন নির্বাহ করে। যেহেতু অত্র এলাকার সাধারণ জনগণ দিনের পর দিন নিজের অজান্তে দূষিত পানি সেবন করছে আর তাতেই ভাইরাস সংক্রমিত হচ্ছে তাদের দেহে। আরেকটা উল্ল্যেখযোগ্য বিষয়হলো অত্র এলাকায় কিছু ছোটখাট নামসর্বস্ব কোম্পানি আছে যারা বিভিন্ন বাসা-বাড়ি, অফিস, দোকান ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্লাস্টিকের জারে করে পানি সরবরাহ করে। কিছুদিন পূর্বে এমন একটি পানির জার আমাদের হাতে এসে পৌঁছায় যেখানে আমরা জলজ্যান্ত একটি কেঁচো আবিস্কার করি। তাৎক্ষণিক সেই পানির সাপ্লাইয়ার ও প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজারকে ডাকা হল,  তারা বিএসটিআই কিংবা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের লাইসেন্স প্রাপ্ত দাবী করলেও ট্রেড লাইসেন্স ব্যতীত এর স্বপক্ষে কোন শক্তিশালী প্রমাণ হাজির করতে পারেনি। তারা ল্যাবে পানি পরীক্ষার কিছু কাগজ প্রদর্শন করলেও তা ছিল মেয়াদ উত্তীর্ণ, আমরা সেই ল্যাবের সাথে যোগাযোগ করলে তারা বলল যেহেতু ডকুমেন্ট ঐ প্রতিষ্ঠান নবায়ন করেনি সেহেতু তাদের কোন দায়বদ্ধতা নেই। বিষয়টি ক্লিয়ার হলে পানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটির ম্যানেজারকে দ্রুত পুলিশে সোপর্দ করা হয়। এই হল অবস্থা! সুতরাং এই বিষয়টিকেও স্থানীয়দের গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে যে তারা বিশুদ্ধ পানির নামে ব্যাকটেরিয়া কিনছেন নাতো! পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হালিশহরের অবস্থা আস্তে আস্তে এখন মহামারী আকার ধারণ করেছে।  তাই নগর ব্যবস্থাপক এবং স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের উচিৎ বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার। অন্যথা, যেকোন মুহূর্তে এই বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়তে পারে শহরের অন্য প্রান্তেও।

১০৯তম আসরে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলী খেলা

Now Reading
১০৯তম আসরে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলী খেলা

চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলি খেলা এখন বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ হয়ে আছে। বলি খেলা শব্দটি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা,  যার আভিধানিক রুপ হলো মল্লযুদ্ধ বা কুস্তি প্রতিযোগিতা। চাঁটগা ভাষার “বলি” শব্দটি এসেছে বলবান থেকে। কুস্তিখেলায় জয়ীদের বলা হত বলী। বর্তমানে পেশাদার কুস্তিগীর আর লক্ষ্য করা যায় না কিন্তু প্রাচীন এই কুস্তি খেলার ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে চট্টগ্রামের জব্বারের বলী খেলা। বলি খেলার স্বর্ণযুগ ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কাল পর্যন্ত। আর চট্টগ্রাম জেলার সর্বত্র চৈত্র থেকে বৈশাখ মাস পর্যন্ত বলি খেলা হতো সে সময়কালে। এ অঞ্চলের মিয়ানমারের অনেক প্রবাসী ছিলেন যারা মূলত বলি খেলার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। পরবর্তীকালে এ দেশের প্রথিতযশা অনেকেই বলি খেলার পৃষ্ঠপোষকতা শুরু করেন। সে সুত্রে চট্টগ্রামের প্রচলিত বলি খেলার প্রবর্তন করেন আব্দুল জব্বার মিয়া নামের এক সওদাগর। ১৯০৯ সালে অর্থাৎ বাংলা ১৩১৫ সনের ১২ বৈশাখ আবদুল জব্বারের বলি খেলার প্রথম আসরটি বসে, শুরু থেকেই এ আয়োজনের সভাপতি থাকতেন আব্দুল জব্বার নিজেই। আর এভাবেই তার নামানুসারেই বলী খেলার এই আয়োজনটি জব্বারের বলি খেলা নামে পরিচিত হয়ে উঠে। আবদুল জব্বার মিয়া ছিলেন বন্দর নগরীর বদরপাতি এলাকার তৎকালীন প্রভাবশালী সমাজসেবক ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী। স্বাধীন ব্যবসায়ী এই জব্বার বৃটিশ শাসনকে প্রচণ্ডভাবে ঘৃণা করতেন। মূলত তার উৎসাহ অনুপ্রেরণায় দেশের যুব সমাজকে তৎকালীন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অধিক সংগঠিত করতে, প্রেরণা দিতে এবং সংগ্রামী হয়ে উঠার লক্ষ্যে এই খেলাটির প্রচলন করেন। ভিন্নধর্মী এই বলী খেলা আয়োজনের স্বীকৃতি স্বরূপ বৃটিশ সরকার জব্বার মিয়াকে ‘খান বাহাদুর’ উপাধিতে ভূষিত করেন। কিন্তু নিজের আত্মমর্যাদা সমুন্নত রাখতে জব্বার সেই উপাধি প্রত্যাখ্যান করেন। বৃটিশ ও পাকিস্তানি আমলে বৃহত্তর চট্টগ্রাম ছাড়াও তৎকালীন বার্মার আরাকান রাজ্য থেকেও বলী কিংবা কুস্তিগিররা আসত এই খেলায় অংশ নিতে। বলি খেলা শুরুর আগে ঢোল বাজিয়ে প্রচার প্রচারনা চালানো হয়। আর খেলার মঞ্চে সঙ্গী সমর্থকদের নিয়ে ঢোল বাজিয়েও বলিদের প্রবেশ করার রীতি সুদীর্ঘকাল ধরেই হয়ে আসছে। প্রতিযোগিতার বিভিন্ন পর্বে যাচাই বাছাই শেষে একজনকে বিজয়ী ঘোষণা করা হয়।

শত বছরের ঐতিহ্য ধারণ করে বলী খেলার এই ঐতিহ্য এখনও টিকে আছে। বলী খেলা উপলক্ষে লালদীঘি ও এর আশে পাশের রাস্তা সমুহে যান চলাচল সম্পূর্ণ রুপে বন্ধ রাখা হয়, তাছাড়া প্রতি বছর মেলার ব্যাপ্তি সম্প্রসারিত হওয়ায় সড়কের উপড়ই ব্যাবসায়িরা বসছে তাদের পসরা সাজিয়ে। বলি খেলার অন্যতম বৈশিষ্ট্য, স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রামীণ লোকজ মেলা যা খেলাকে কেন্দ্র করে লালদীঘির আসে পাশে ৩দিন ধরেই চলতে থাকে। বর্তমানে দেশের অন্যতম বড় লোকজ উৎসব হিসেবে প্রসিদ্ধ এই মেলা। বলি খেলা শুরুর প্রায় সপ্তাহখানেক আগে হতেই বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ব্যবসায়ীরা তাদের বিক্রির সামগ্রী নিয়ে হাজির হন লালদীঘি মাঠে। মাটির তৈজষপত্র, মুড়ি-মুড়কি, বেত বাঁশের জৈতষপত্র, শীতলপাটি, ছোট ছোট হাতের তৈরি খেলনা, রঙিন হাতপাখায় সাজে মেলা প্রাঙ্গন। চট্টগ্রামের মানুষের মুখে প্রচলিত আছে, এমন কোন জিনিস নেই যা এই মেলায় পাওয়া যায় না। তাই সারাবছর গৃহস্থ নর নারী মুখিয়ে থাকে এ মেলার অপেক্ষায়। সারা বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মেলায় যোগ দেয় সর্বস্তরের মানুুষ। এই মেলার স্থায়িত্বকাল ৩দিন হলেও স্থানীয়ভাবে এর প্রভাব থেকে যায় গোটা মাস ধরেই। 

শতবর্ষী আব্দুল জব্বারের বলিখেলাকে বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশ করার উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। এ উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জাতিসংঘের শিক্ষা বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা ইউনেস্কোর কাছে আবেদন করতে যাচ্ছে। স্থানীয়ভাবে না রেখে বৃহৎ পরিসরে পৌঁছে দিতে এই আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।  শত বছর পূর্ব থেকেই তার ধারাবাহিকতা ঠিক রেখে উৎসব মুখর পরিবেশে প্রতি বছরের ১২ বৈশাখ অর্থাৎ ২৫এপ্রিল চট্টগ্রামের নগরীর লালদীঘি ময়দানে এ ঐতিহ্যবাহী বলী খেলা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এবার ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলি খেলার ১০৯তম আসর বসতে যাচ্ছে বিপুল উৎসাহ উদ্দীপনায়। জব্বার মিয়ার বলী খেলা ও বৈশাখী মেলা চট্টগ্রাম তথা বাংলাদেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও অহংকারে পরিণত আজ।

চিটাগং টু চাট্টগ্রাম

Now Reading
চিটাগং টু চাট্টগ্রাম

হাস্যকর একটা কাজ করে ফেলতে চাইছে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি। নিকার সভার মাধ্যমে চট্টগ্রামের ইংরেজি ভার্সন অর্থাৎ নামটা পরিবর্তন করতে চলেছে তারা। এখন থেকে নাকি ইংরেজি চিটাগং এর স্থলে ছাট্টাগ্রাম লিখতে বা বলতে হবে। বিষয়টা অনেকটা এমনি। Chittagong এর পরিবর্তে এখন থেকে Chattogram লিখতে হবে। অর্থাৎ Cha=ছা,  tto=ট্টো, gram=গ্রাম… নিজে একবার চেষ্টা করে দেখুননা উচ্চারণটা কেমন? হাস্যকর তাইনা? ভুল শুধরানোর নামে আরেক মস্তবড় ভুলে পড়তে যাচ্ছি। ইতিমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়াসহ অনেক ক্ষেত্রে সবাই সরব হয়েছেন। সবার যুক্তি ইংরেজিতে “China” যদি বাংলায় “চীন” হতে পারে, “India” যদি বাংলায় “ভারত” হতে পারে, “Egypt” যদি বাংলায় “মিশর” হতে পারে, “Turkey” যদি বাংলায় “তুরস্ক” হতে পারে, “Delhi” যদি বাংলায় “দিল্লি” হতে পারে, “Saudi Arabia” যদি বাংলায় “সৌদি আরব”হতে পারে, “Mecca” যদি বাংলায় “মক্কা” হতে পারে, তবে ২৬০বছরের ঐতিহ্য ইংরেজি “Chittagong” নাম থাকতে সমস্যা কোথায়? 

আছে কোন উত্তর? কারো খেয়াল খুশিতেতো আর নিজেদের এই ঐতিহ্য নষ্ট হতে পারেনা। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দ হতেই সারা বিশ্ব চিটাগং নামটির সাথে পরিচিত। এই নামেই বিশ্বব্যাপী এই অঞ্চলের একটি পরিচিতি ঘটেছে। এখন যদি খাম খেয়ালীর বসে নামটির পরিবর্তন করা হয় তবে এই পরিচিতিতে মারাত্মক প্রভাব পড়বে। একটু পেছনে ফিরে গেলেই আদি একটি নামের সাথে সামঞ্জস্য পাওয়া যায়। অনেক নামের ভেতর খোঁজ মেলে চট্টগ্রামের আদি নাম ছিল “চিত তৌ গং”। যার বাংলা অর্থ দাড়ায় যুদ্ব নয় শান্তি। আজ থেকে বহুশত বছর পূর্বে সাগর পথে বহিশত্রুর বারংবার আক্রমনে অতিষ্ট হয়ে তৎকালীন মগ রাজা শান্তি প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সাগরের নিকটবর্তী পোতাশ্রয়ে এক সুুউচ্চ টাওয়ার নির্মান করে তাতে লিখে দেন “চিত তৌ গং” কথাটি। যা পোতাশ্রয় থেকে অনেক দূরে চলাচল করা জাহাজ থেকে চোখে পরত। পরবর্তীকালে টাওয়ার এর লেখা টার উপর ভিত্তি করেই পোতাশ্রয় টির নাম হয়ে যায় “চিত তৌ গং”। আর এই চিটাগং ই হল “চিত তৌ গং” এর পরিবর্তিত রূপ। যা পরবর্তিতে এই অঞ্চলে বাঙালীদের আগমনে পরিবর্তন এবং পরিবর্ধনের মধ্য দিয়ে বাংলায় চট্টগাম রূপ ধারন করেছে। সুতরাং পরিবর্তন যদি করতেই হয় তবে বাংলায় চট্টগ্রাম নামটি পরবর্তন করা যুক্তিযুক্ত।

বাংলা উচ্চারণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে বাকী ৪ জেলার ইংরেজি নামের বানানেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। সেইসব নামেও রয়েছে গড়মিল ও অসামঞ্জস্য। সুনির্দিষ্ট কোন বিধান বা নীতিমালা না থাকা সত্ত্বেও কেবল প্রস্তাবনার উপর ভিত্তি করেই এই সিদ্ধান্তটি নেয়া হচ্ছে। গত সোমবার ২এপ্রিল ২০১৮ইং প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় নামের বানান পরিবর্তনের এই প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।

 

চট্টগ্রাম এর নাম পরিবর্তন নিয়ে ষড়যন্ত্র!

Now Reading
চট্টগ্রাম এর নাম পরিবর্তন নিয়ে ষড়যন্ত্র!

বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রামকে নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন এক ষড়যন্ত্র। এবার সরাসরি খড়গ বসাতে চাচ্ছে তার দেহে অর্থাৎ ইংরেজি নামটা পুরোপুরি মুছে দেয়ার উদ্যেগ নেয়া হয়েছে। ইংরেজিতে চিটাগং বলার একটা রেওয়াজ সেই ব্রিটিশ আমল থেকেই এমন নয়যে স্বাধীন পরবর্তী এর নামকরণ হয়েছিল। কিন্তু বদলে যাওয়ার পথে এখন সে নিয়ম। সিদ্ধান্ত হতে চলেছে এখন থেকে নাকি চট্টগ্রামকে ইংরেজিতেও ‘চট্টগ্রাম’ লিখতে হবে। তবে এ নাম পরিবর্তনের তালিকায় চট্টগ্রামের সাথে আরো আছে বরিশাল, কুমিল্লা, বগুড়া ও যশোর জেলার নাম তাদেরও ইংরেজি বানান পরিবর্তন করা হচ্ছে। মূলত বাংলা নামের সঙ্গে মিল করতেই এ পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার, মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম এমনটাই জানান। তিনি বলেন পাঁচটি জেলার নামের ইংরেজি বানানের অসংগতি দূর করতে আগামীকাল সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) সভায় এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে আরো জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এতে সভাপতিত্ব করবেন।

সরকারের সকল উন্নয়ন এর উদ্দ্যেগ প্রশংসনীয়, কিন্তু এমন একটা বিষয়ের উপর তারা হস্তক্ষেপ করছে যেটার সাথে চট্টগ্রামবাসীর রয়েছে হৃদ্যতায় প্রায় ২৬০বছরের দীর্ঘ সম্পর্ক। চট্টগ্রামের ঐতিহ্য হাজার বছরের যা তিলে তিলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এর নামেও রয়েছে বেশ বৈচিত্র্য, প্রায় ৪৮টি নামের খোঁজ মেলে চট্টগ্রাম নিয়ে। ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে চট্টগ্রাম মোঘল সম্রাজের অংশ হয়, পরবর্তীতে আরাকানদের পরাজিত করে মোঘলরা দখল করে নিয়ে এর নাম রাখেন ইসলামাবাদ। ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দে মীর কাশিম আলী খান ইসলামাবাদকে(চট্টগ্রাম) ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে হস্তান্তর করে দেয়। ব্রিটিশ অধিভুক্ত হওয়ার পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চট্টগ্রামকে ইংরেজিতে চিটাগং হিসেবেই নামকরণ করে। সেই হতে এখন পর্যন্ত চট্টগ্রাম ইংরেজিতে চিটাগং হিসেবেই লেখা হয়ে আসছে এবং বিশ্বব্যাপী সমাদৃত হয়ে আসছে। সারা বিশ্বের কাছে চিটাগং পোর্ট এর আলাদা একটা কদর আছে সেই ব্রিটিশ পিরিয়ড থেকেই। কেবল প্রসিদ্ধ এই নামের বদৌলতে চিটাগং তথা বাংলাদেশকে চিনে নেয় বিশ্ব। কিন্তু বৃহত্তর স্বার্থের কথা বিবেচনা না করেই ইংরেজি চিটাগং নামের পরিবর্তনে তোড়জোড় শুরু করেছে চট্টগ্রাম বিদ্বেষী সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কিছু কর্মকর্তা।

চট্টগ্রামের ইংরেজি বানান Chittagong এর পরিবর্তে বানান Chattagram করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রস্তাব দেয়ার প্রস্তুতি নেয়া হয়েছে। জেলার নামের বানান বাংলা উচ্চারণের সঙ্গে ইংরেজিতে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বিধি বা নীতিমালা নেই। কেবল নতুন বিভাগ, জেলা, উপজেলা, থানা কিংবা প্রশাসনিক ইউনিট গঠনের সিদ্ধান্ত নিতে নিকার সভার আহ্বান করা হয়। যে নিকার সভার মাধম্যে নামের এই পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে সেই কমিটির আহ্বায়ক হচ্ছেন প্রধামন্ত্রী। এখন প্রশ্ন হচ্ছে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ বিষয়ে স্বদিচ্ছা আছে কিনা?

এদিকে জেলার নামের বাংলা উচ্চারণের সাথে ইংরেজিতে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে হতেই হবে সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো বিধি বা নীতিমালা না থাকা সত্ত্বেও মন্ত্রীপরিষদ কেন এত উৎসাহী হয়ে উদ্যেগটি নিচ্ছেন তা বোধগম্য নয়। ইতিমধ্যেই এ নিয়ে বেশ প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে চট্টগ্রামের স্থানীয় জনগণের মাঝে। সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব কম বেশি সকলে। প্রায় প্রত্যেকেই বিষয়টি নিয়ে বেশ মর্মাহত। সকলেরই অভিন্ন দাবী ইংরেজিতে চিটাগং থাকলে কোন সমস্যা নেই বরং পরিবর্তনে সমস্যা বাড়বে। এখানকার মানুষ ইংরেজিতে চিটাগং বলতেই বেশ গর্বেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। স্থানীয় বিজ্ঞাপনসহ অনেক ক্ষেত্রেই চিটাগং ব্যাবহার করা হয়, এমনকি অনেক প্রতিষ্ঠানের নামের সাথেও তা যুক্ত। সবাই আশংকা করছেন যে নাম পরিবর্তনের এই উদ্দ্যেগে না জানি চিটাগং এর ঐতিহ্যও বিলীন হয়ে যায়! শুধু নাম পরিবর্তন হলেই যে দায় মুক্তি ঘটবে তা কিন্তু নয়, এর সাথে অন্যান্য সামগ্রিক বিষয়ে একটি পারিপার্শ্বিক চাপ সৃষ্টি হবে। প্রায় প্রত্যেকেই দ্বিধাহীনতায় ভুগবে ইংরেজি নামের ক্ষেত্রে। এই নাম পরিবর্তন শুধু যে সরকারি দলিলাদিতেই হবে তা কিন্তু নয় পর্যায়ক্রমে প্রাইভেট সেক্টরে এর প্রভাব বিস্তার ঘটবে। বেশিরভাগ মানুষের মত আমারও মত অন্তত নাম পরিবর্তনের পূর্বে একটা জরিপ চালানোর বিশেষ প্রয়োজন ছিল। কারো ইচ্ছা অনিচ্ছায়তো এত বছরের নামের গৌরব ঐতিহ্যকে মুছে দিয়ে এর অস্তিত্ব অস্বীকার করা যাবেনা। প্রসঙ্গতই অনেকের ধারণা- মন্ত্রীপরিষদে চট্টগ্রাম বিদ্বেষীদের প্রভাব বেশি, হয়ত চট্টগ্রামকে বেকায়দায় ফেলতে তাদের এই হীন চক্রান্ত! নাম পরিবর্তন করে চট্টগ্রামকে পিছিয়ে দিতে তাদের তৎপরতা। অন্যথা কোন প্রকার সভা সেমিনারে আলাপ আলোচনা না করে, জনমত উপেক্ষা করে একটা অঞ্চলের দীর্ঘ ঐতিহ্যগত নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নেয়ার অর্থই হচ্ছে সেই অঞ্চলের জনগণকে চরম অপমান করার শামিল। তাই সংশ্লিষ্টদের প্রতি অনুরোধ দয়া করে এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসুন, চট্টগ্রামের মানুষ ইংরেজিতে চিটাগং বলতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে আসছে যুগ যুগ ধরেই। প্রয়োজনে জনমত জরিপ চালান তবুও তড়িৎ সিদ্ধান্তে এমন কিছু করবেননা যেটা সত্যিকার অর্থেই জনগণ দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়!