চিকুনগুনিয়া ভয়ঙ্কর।

Now Reading
চিকুনগুনিয়া ভয়ঙ্কর।

মশার মাধ্যমে সারাবিশ্বে প্রায় ১১টি রোগ ছড়ায়। চিকুনগুনিয়া তার মধ্যে একটি। আমেরিকান মসকুইটো কন্ট্রোল অ্যাসোসিয়েশনের হিট লিস্টে ম্যালেরিয়ার পরেই চিকুনগুনিয়ার অবস্থান। এটি চিকুনগুনিয়া ভাইরাস(CHIKV)-এর কারণে হয়ে থাকে। এশিয়ান টাইগার মশা (Asian Tiger Mosquito) এবং হলুদ জ্বর মশা (Yellow Fever Mosquito) এই ভাইরাস বহন করে থাকে। আমরা এই রোগটির সাথে নতুন করে পরিচিত হচ্ছি। অনেকেই জানি না কিভাবে এই রোগ ছড়ায়, এই রোগটি প্রাণঘাতী কিনা, এই রোগে কি হয়, কি করতে হবে আক্রান্ত হলে, অসুখ পরবর্তী স্বাস্থ্য সমস্যা এবং বাঁচতে হলে করণীয়গুলো কি হতে পারে। আপনার আসে-পাশেই হয়ত এই রোগবাহী মশা উড়ছে, একটি কামড়েই আপনি হতে পারেন শয্যাশায়ী। চলুন তাহলে জেনে নেই এর আদ্যোপান্ত এবং রুখে দেই চিকুনগুনিয়া।

ধারণা করা হয়, চিকুনগুনিয়া রোগের উদ্ভব হয় আফ্রিকা মহাদেশে, এই সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হওয়া যায় এর নামকরণ থেকে কারণ চিকুনগুনিয়া(Chikungunya) শব্দটি এসেছে আফ্রিকান মাকন্দি(Makonde) ভাষা থেকে। যার অর্থ হল,‘এমন কিছু যেটা বেঁকে যায়’। প্রকৃতপক্ষেই, চিকুনগুনিয়া রোগীর গিরায় এবং দেহের বিভিন্ন জয়েন্টে প্রচণ্ড ব্যাথা হয় রোগী দাঁড়াতে পারে না, প্রচণ্ড ব্যাথায় রোগী কুঁকড়ে যায়। ১৯৫২ সালে সর্বপ্রথম আফ্রিকার মোজাম্বিক এবং তানজানিয়ার মাকন্দি প্লাটেউ(Makonde Plateau) অঞ্চলে এই রোগের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে জানা যায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় সুদীর্ঘ তিনটি বছর পর এই রোগ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। আর ততদিনে আফ্রিকান প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতে চিকুনগুনিয়া মহামারি আকার ধারণ করে। প্রাথমিকভাবে এটি ডেঙ্গু বলে মনে করা হলেও, অবশেষে ১৯৫৫ সালের ১, জানুয়ারিতে তৎকালীন ঐ অঞ্চলের Lulindi Hospital-এর Dr. W. H. R. Lumsden এই রোগটিকে একটি আলাদা রোগ বলে ধারণা করেন এবং স্থানীয় লোকদের দেয়া নামানুসারে এটিকে ডেঙ্গু থেকে একটি আলাদা রোগ ‘চিকুনগুনিয়া’ বলে সেন্ট্রাল আফ্রিকায় একটি রিপোর্ট পাঠান। তার রিপোর্টে উঠে আসে কিছু ভয়াবহ চিত্র। উক্ত অঞ্চলে এই রোগ এতটাই মহামারী আকারে ছড়িয়ে পরেছিল যে, গ্রামগুলোর ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ বাসিন্দা এতে আক্রান্ত হয়ে পড়ে, কিছু বাড়িতে দেখা যায় বাড়ির সবাই আক্রান্ত হয়ে পড়ে আছে। চারদিক থেকে প্রতিনিয়ত নতুন নতুন গ্রাম আক্রান্ত হবার খবর আসতে থাকে, রোগীরা হাসপাতালে ভিড় করতে থাকে। আফ্রিকানদের ভাগ্য বরণ করতে না চাইলে আমাদেরকে এখনি সচেতন হতে হবে।

এই রোগ সম্পর্কে আরো তথ্য

Bangladeshism Official T-Shirt. Bye now!

চিকুনগুনিয়ার অতীত ইতিহাস খুব একটা আশাজাগানিয়া বা সুখকর কিছু নয় কিন্তু এই আধুনিক যুগে এসেও বাস্তবতা খুব একটা পরিবর্তন হয়নি। কারণ এতগুলো বছর পার হয়েও কোন বিজ্ঞানী এর প্রতিরোধক আবিষ্কার করতে পারেনি, পারেনি কোন প্রতিষেধক আবিষ্কার করতে। আরও ভয়ের বিষয় হচ্ছে, এই জ্বর প্রাথমিকভাবে সেরে গেলেও পরে আবার দেখা দিতে পারে এবং প্রাথমিক পর্যায়ে কোন মেডিক্যাল টেস্টের মাধ্যমে শতভাগ নিশ্চিত হওয়া যায় না এই রোগেই আপনি আক্রান্ত কিনা। এই বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ কামাল বলেন,‘অসুস্থতার প্রথম ৫ দিনের মধ্যে রাশি-পিসিআরকে সিআইএইচভি বা ডেনভ নিউক্লিক অ্যাসিড সরাসরি সনাক্ত করতে হবে সন্দেহজনক ক্ষেত্রে থেকে সিরাম করা উচিত। ইমিউনোসাস দ্বারা অ্যান্টি-সিআইএইচভি এবং এন্টি-ডিএনএইএন আইজিএম অ্যান্টিবডিগুলির জন্য উপসর্গের সূচনা হওয়ার ৫ বা তার বেশি দিনের পরে সিরাম নমুনা সংগ্রহ করা উচিত। যদি প্রাথমিক ফলাফল নেতিবাচক হয় এবং ডেঙ্গু বা চিকুনগুনিয়া এখনও সন্দেহের সাথে থাকে, তবে অসুস্থতার পর সাত দিন বা তারও বেশি সময় ধরে শরীরে সিরাম সংক্রমিত হওয়া উচিত এবং আইজিএম অ্যান্টিবডি সনাক্ত করতে পুনঃপরীক্ষা করা উচিত।’ অর্থাৎ আক্রান্ত হওয়ার ৫-৭ দিনের পর মেডিক্যাল টেস্টে রক্তে চিকুনগুনিয়া ভাইরাস(CHIKV)আছে কিনা তা নির্ণয় করা যায়। রোগ নির্ণয়ের পরও এই ভাইরাসের পরিপূর্ণ চিকিৎসা করা সম্ভব না কারণ এখনও এই ভাইরাস ধ্বংসকারী কোন অ্যান্টি-বায়োটিক খুঁজে পাওয়া যায়নি। ডাক্তারগণ এই পর্যায়ে জ্বর কমানোর জন্য প্যারাসিটামল এবং ব্যাথানাশক ট্যাবলেট খাবার পরামর্শ দেন। গত ২০/০৫/২০১৭ তারিখ সন্ধ্যায় কথা হয় নয়াপল্টনের ইসলামি ব্যাংক স্পেসালাইজড এন্ড জেনারেল হাসপাতালের ডাক্তার মোঃ মাইদুল ইসলামের সাথে, তিনি জানান শুধু মাত্র ঐদিন হাসপাতালে চিকুনগুনিয়ার উপসর্গ নিয়ে ১২ জন ভর্তি হয়েছে আসে-পাশের এলাকা থেকে তবে একইভাবে আরো কত জন ভর্তি আছে সেই বিষয় নিশ্চিত করতে পারেননি। তিনি জানান এছাড়াও প্রতিদিন অনেকেই ভাইরাস জ্বর নিয়ে আউটডোরে চিকিৎসা নিতে আসছে। ডাক্তারের চেম্বারের বাইরে কথা হয় জ্বরে আক্রান্ত রোগী নিয়ে আসা খিলগাঁও তালতলার বাসিন্দা নাহিদ হাসানের সাথে তিনি বলেন, তারা একটি মেস ভাড়া নিয়ে ১১ জন থাকেন। গত সপ্তাহে তার মেসে একসাথে ৬ জন আক্রান্ত হয় এর আগের সপ্তাহে তিনি সহ আরো ৩ জন জ্বরে আক্রান্ত ছিলেন। এছাড়াও বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রায়ই খবর আসছে নতুন করে আক্রান্ত হবার। সরকারের পক্ষ থেকে সভা-সেমিনার আয়োজন, ওষুধ ছিটানো সহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

প্রতিরোধমূলক ব্যাবস্থা গ্রহণ জরুরী

চিকুনগুনিয়া রোগের প্রতিকারে কার্যকরী কোন মেডিসিন না থাকায় আমাদেরকে এর প্রতিরোধের দিকে বেশী গুরুত্ব দিতে হবে।

ক) বাসার আশ-পাশ পরিষ্কার রাখতে হবে, এমন কিছু যদি দেখা যায় যেখানে পানি জমতে পারে সেটি সরিয়ে ফেলতে হবে।

খ) কোন পাত্রে যদি ৩ দিনের বেশি পানি জমে থাকতে দেখেন তাহলে সেই পাত্রটি সহ পানিগুলো ফেলে দিলে ভালো হয়। কারণ মশা যদি সেখানে ডিম পেড়ে থাকে তাহলে অনেক সময় সেই পাত্রের গায়ে ডিম লেগে থাকে এবং পরবর্তীতে সেখানে পানি জমলে সেই ডিম থেকে মশা পুনঃরায় জন্মাতে পারে।

গ) এই রোগবাহী মশা সাধারণত দিনের বেলায় কামড় দেয়। সুতরাং, দিনের বেলাতেও ঘরে কয়েল বা মশারি টাঙ্গিয়ে ঘুমাতে হবে।

ঘ) বাসার পাশে ঝোপ-ঝাড় থাকলে সম্ভব হলে ওষুধ ছিটানোর ব্যাবস্থা করতে হবে।

ঙ) বাসার ছোট বাচ্চাদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখতে হবে, তাদের কে সম্ভব হলে মশারির ভিতরে রাখা, নাহলে মশা নিরোধক ক্রিম দেহের উন্মুক্ত স্থানে লাগিয়ে রাখতে হবে। কারণ চিকুনগুনিয়া বাচ্চা এবং বয়স্কদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে।

আক্রান্ত হলে কি করবেন

আক্রান্ত হয়ে গেলে ভয় পাবেন না। মনে সাহস রেখে রোগ মোকাবিলা করবেন।  চিকুনগুনিয়া কষ্টদায়ক হলেও এই রোগে মৃত্যু অনিবার্য নয়। ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ ইনফেকসাস ডিজিস, ইটালি-এর ল্যাবরেটরি অফ ভাইরোলজির পাঁচজন ডাক্তার ২০১৩ সালে একটি গবেষণালব্ধ প্রতিবেদন প্রকাশ করেন, সেখানে বলা হয় চিকুনগুনিয়ায় মৃত্যুহার প্রতি ১,০০০ জনে ১ জন এবং সেটা শুধু মাত্র বয়স্ক এবং বাচ্চাদের ক্ষেত্রে।  তাই বয়স্ক এবং বাচ্চাদের মধ্যে এর লক্ষণ দেখা দিলে কালবিলম্ব না করে ডাক্তারের শরণাপন্ন হবেন। রোগীকে প্রচুর পরিমাণে তরল খাবার খেতে দিবেন এবং মশারির মধ্যে রাখবেন। কারণ চিকুনগুনিয়ার ভাইরাস এক সপ্তাহ পর্যন্ত রক্তে থাকে, এই সময় জীবাণুবহন করছে না এমন মশা রোগীকে কামড় দিলে সেই মশার মাধ্যমে ঘরের অন্যরা আক্রান্ত হতে পারে। রোগীকে ডাক্তারের কাছে নেয়ার আগেই ঘরে সাধারণ জ্বরের চিকিৎসা দিতে পারেন তবে মনে রাখবেন কোনভাবেই রোগীকে স্টেরয়েড, হরমোন বা অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ দিবেন না। সাধারণত ৫ থেকে ৭ দিন এবং কোন কোন রোগী ৩ দিনেই অনেকটা সুস্থবোধ করে তবে জয়েন্টে এবং হাড়ের ব্যাথা সারতে অনেকটা প্রায় ৪৫ থেকে ৬০ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। একবার এই জ্বর থেকে পরিপূর্ণ সুস্থ হয়ে গেলে আমাদের দেহে প্রাকৃতিকভাবে প্রতিরোধক তৈরি হয়। সুতরাং ভবিষ্যতে আর আক্রান্ত হবার ভয় থাকে না।

ধন্যবাদ পোস্টটি পড়ার জন্য।

রেফারেন্সঃ
https://www.ncbi.nlm.nih.gov/pubmed/23912863
http://www.bbc.com/bengali/news-39931663
https://en.wikipedia.org/wiki/Chikungunya
https://academic.oup.com/trstmh/article-abstract/49/1/28/1904613/An-epidemic-of-virus-disease-in-Southern-Province?redirectedFrom=fulltext
http://www.mosquito.org/mosquito-borne-diseases
https://www.cdc.gov/chikungunya/