না জানা এক গল্পের রচয়িতা যিনি

Now Reading
না জানা এক গল্পের রচয়িতা যিনি

যে গল্পটা কেউ জানে না, সেই গল্পটার রচয়িতা আমার বাবা। শুধু আমার না, আমাদের প্রত্যেকের। এই পৃথিবীতে আমরা প্রত্যেকেই তো স্বার্থের পেছনেই ছুটি। একটু খানি ভাল থাকার পেছনে ছুটি। কিন্তু এত সব স্বার্থ আর ভাল থাকার মাঝেও আধো পাকা চুলের একজন মানুষ আমাদের প্রত্যেকের পরিবারেই থাকেন, যে মানুষটা স্বার্থ বোঝেন না। ভাল থাকা বোঝেন না। বোঝেন কেবল নিজের ছেলে মেয়ে আর কয়েক দশক ধরে এক সাথে ঘর সাজিয়ে যাওয়া মানুষটার ভাল মন্দের দায়িত্ব।

নয় বছর বয়সে একটা ক্রিকেট ব্যাট চেয়ে না পাওয়া আক্ষেপটা আমার বেশ পুরোনো। কিন্তু নয় বছর পরে এসে সেই ব্যাট কিনে না দেওয়া বাবা যখন, মাসের দুই তারিখের মাঝে অযুথের হিসেবে টাকা পাঠিয়ে দেন, তখন চোখের কোণায় ঝাপসা এক আবরণ জন্মে। কান্না পায়।

একটা গল্প বলি। আমি তখন বেশ ছোটো। মাত্রই ঢাকায় একটা বেশ টাকা পয়সা ওয়ালা কলেজে ভর্তি হয়েছি। গ্রামের সুতি কাপড়ের পায়জামা ছেড়ে নিউমার্কেটের জিন্স পরতে শুরু করেছি তখন। ঢাকায় যারা নতুন নতুন আসে, তাদের চলাফেরায় একটা কৃত্রিম পরিবর্তন আসে। সেই পরিবর্তন আমার মধ্যেও তখন এসেছে। কোনো এক মাসে বাবার টাকা পাঠাতে পাঠাতে একটু দেরী হয়ে গেল। অন্যান্য মাসে তিনি দুই তারিখের মাঝেই ১৫ হাজার করে টাকা পাঠিয়ে দিতেন। ওটা দিয়ে আমার মেসের বিল আর কলেজের বেতন হয়ে প্রায় হাজার চারেক টাকা বাঁচত। মনে আছে আমার, খুব খারাপ ব্যবহার করেছিলাম ওইদিন বাবার সাথে। ফোনের এপাশ থেকে আমি কেবল বলে যাছি, ছেলেকে টাকা দেয়ার যোগ্যতা নেই, তাকে ঢাকা কেন পড়তে পাঠালে?

ফোনের ওপাশের বাবা হয়তো নিশব্দে কাঁদছিলেন। তাই মুখ ফুটে বলতে পারেন নি, এক মাত্র ছেলেকে যে খুব করে চেয়েছিলাম রাজধানী শহরে থেকে মানুষের মত মানুষ হোক! কিন্তু ছেলেটা আমার বছর ঘুরতে না ঘুরতেই অমানুষ হয়ে গেল!

অমানুষ হওয়ার মত তেমন কিছু অবশ্য আমার মধ্যে ছিল না। ব্ল্যাক সিগারেট খেতাম। খুব একটা দামী ব্র্যান্ড তো আর না। ছেলের সামান্য ব্ল্যাক সিগারেটের দাম যে বাবা দিতে পারেন না, তিনি আবার বাবা হন কী করে!

বাবা হয়তো কেঁদেছিলেন সেদিন খুব। কিন্তু আজ আমি যতটা কাঁদি, এতোটা হয়তো না। তখন আমি আরো কিছুটা বড় হয়েছি। কলেজ পার করে একটা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। কিভাবে যেন ভেতরে একটা পরিবর্তন এলো। আর পরিবর্তনটা চাপের মাঝেই এসেছিল। কারণ চার মাস পর পর ষাট হাজার টাকা সেমিস্টার ফি আসলে বাবার দেয়ার অবস্থা একদমই ছিল না। বাধ্য হয়ে টিউশন ম্যানেজ করতে হল। নিজে যেই মাত্র কামাই শুরু করলাম, ভেতরে অস্বাভাবিক এক ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম। এই পরিবর্তনটা ঢাকায় নতুন নতুন আসার পরের সেই কৃত্রিম পরিবর্তন না। এটা ভেতর থেকে এক ধরনের রিয়েলাইজেসন।

সালটা মনে নেই। তবে কোনো একটা ঈদের আগেকার কথা। যেহেতু টুকটাক ইনকাম করতে শুরু করেছিলাম, তাই ভেতর থেকে ইচ্ছা করতো বাবা মায়ের জন্য কিছু কিনতে। কিন্তু ঢাকার ব্যাচেলর মাত্রই বাস্তবতাটা খুব ভাল করেই জানেন যে, এখানে টিউসন করিয়ে যে ইনকামটা হয়, তাতে করে আসলে নিজেরই চলার ব্যবস্থা থাকে না।

তারপরেও, সেবার আব্বুর জন্যে একটা শার্টের পিস আর মায়ের জন্য একটা ছয়’শ টাকার শাড়ি কেনার টাকা হলো। অবাক হয়ে ভেবে দেখলাম, প্রথমবার… হুম জীবনে প্রথমবার আমি আমার বাবা মায়ের একমাত্র ছেলে হয়ে আমার বাবা মায়ের জন্য কিছু কিনেছি! একটা মানুষ তিনি, সারাটা দিন গাধার মত খাটেন শুধুমাত্র আমাকে আর মা’কে খুশি রাখার জন্য। আমাদের ভাল জামা কাপড় পরতে দেয়ার জন্য। যে মানুষটা প্রতি মাসের দুই তারিখের মধ্যে অযুথের হিসাবে টাকা পাঠিয়ে দেন, সেই মানুষটাই  শতকের হিসাব ডিঙিয়ে নিজের জন্য সামান্য একটা শার্টও কিনেন না। সাদা একটা শার্টে তাকে দেখছি মনে হয় আমার জন্মের পর থেকেই।

বাবা সেবার শার্ট পেয়ে কোনো কথা বলেছিলেন না। একটা ধন্যবাদও না। একটু খুশিও না। একটু মন খারাপও না। কিন্তু আমি ঠিক জানি, তিনি কেঁদেছিলেন। ঠিক তখনকার মত করে, যখন আমি তাঁকে টাকার জন্য যাচ্ছে তাই ভাবে অপমান করতাম!

বাংলাদেশের ক্রিকেটে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকে আনসাং হিরো বলা হয়। সাইড নায়ক অথবা পার্শ্ব চরিত্রে তার ধরা বাধা জায়গা। ব্যাপারটাতে একটা হতাশা আছে। একটা কষ্ট মিশে আছে। রিয়াদকে নিয়ে পাতার পর পাতা রচনা তবু লেখা হয় অনলাইন আর অফলাইনে। কিন্তু যে সাইড নায়ক, আমাদের প্রত্যেকের ঘরেই রয়েছে, তাঁকে নিয়ে কেন আমরা চার লাইন সারসংক্ষেপও লেখি না?

যে মানুষটা ঠিক গাধার মত পরিশ্রম করে আমাদের মুখে খাবার তুলে দেন, তাঁকে নিয়ে আমাদের সামান্য একটু ভাবারও সময় হয় না? মাকে আমরা সহজেই জড়িয়ে ধরে ভালবাসি বলতে পারি। কিন্তু ভারী ফ্রেমের চশমা পরা ভদ্রলোককে কখনো জড়িয়ে ধরা তো দূরে থাক, হাতটা ধরার সংকোচও কাটিয়ে উঠতে পারি না আমরা। কখনো সব লজ্জা ঝেরে ফেলে বলতে পারি না, ভালবাসি বাবা… খুব বেশীই ভালবাসি।

আমাদের প্রত্যেকের বাড়ির আনসাং হিরোর জন্য শুভ কামনা। বেঁচে থাকুন নায়ক, পার্শ্ব নায়ক! না দেখানো, না বলা, না বুঝতে পারা এক সাগর ভালবাসা আপনার জন্য।

ধর্ষণ নিয়ে বিতর্ক মানেই পোশাক বনাম দৃষ্টিভঙ্গি।দায়ী কোনটি?

Now Reading
ধর্ষণ নিয়ে বিতর্ক মানেই পোশাক বনাম দৃষ্টিভঙ্গি।দায়ী কোনটি?

গত কয়েকদিন ধরেই দেশের অন্যতম এক আলোচনীয় বিষয় হলো ধর্ষণ।

আসলে গত কয়েকদিন না।এর আগেও কয়েকবার এই টপিক নিয়ে সরগরম হয়ে উঠেছিল দেশ।এইতো সেদিন তনুকে ধর্ষণ ও হত্যা করে কিছু নরপশু।যদিওবা আজ পর্যন্ত এর বিচার পাবার মতো কোনো প্রক্রিয়া আমরা দেখতে পারিনি।তাই যা হবার তাই হচ্ছে।পুনরায় একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি হয়েছে কিছুদিন আগে।তবে এবার আর কাউকে তনুর মতো প্রাণ দিতে হয়নি।তবে যা ক্ষতি হয়েছে তা পূরণীয় নয়।একই সাথে এইসব বিষয় জানান দিচ্ছে জাতি ক্রমাগত অবক্ষয় এর।

তবে আজকের টপিকটা একটু ভিন্ন।এখানে আমরা আলোচনা করবো এইসব ধর্ষণের কারণ কি?কি মনে করে এসব নিয়ে এখনকার সমাজ?কেমন চিন্তাধারা প্রদর্শন করছে আমাদের তরুণ-তরুণীরা?চলুন দেখি তারা কি ভাবে আর তাদের চিন্তা কতটুকু ঠিক বা ভুল।

কিছুদিন ধরে দেখলাম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে বর্তমান সময়ে কোনো ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতন এর কোনো টপিক উঠলেই শুরু হয় কাঁদা ছোড়াছুড়ি।ছেলেদের অধিকাংশ স্বাভাবিক ভাবে বা বরাবরের মতোই মেয়েদের পোশাক নিয়ে কথা বলে।অনেকে আবার ‘বোরকা’ পড়ার এডভাইস দেয়।আবার অনেকে বলে অন্তত হিজাব পড়া উচিত।

ছেলেদেরকে দিয়েই শুরু করি যদিও আমরা বলি ‘লেডিস ফার্স্ট’।উপরে লিখিত কথাগুলো বেশিরভাগ ছেলেই বলে থাকে।অনেকে আবার এসবের সাথে কিছু বাণী জুড়ে দেয়।আমি তাদের বলবো তাদের কথা ঠিক তবে যুক্তিসংগত নয়।বোরকা,হিজাব এসব কিছুই হয়ে দাঁড়াবে না যখন আপনার উদ্দেশ্য হবে পিশাচ এর মতো।যখন আপনি নারীর মর্যাদা দিতে না পেরে তার পোশাকের উপর আঙুল দেবেন।নিজের ভেতর লুকিয়ে থাকা খারাপ উদ্দেশ্যকে সামলাতে না পেরে হামলা করে বসবেন একজন নিরীহ মেয়ের উপর?কোথায় বলা আছে এমন পাষণ্ড টাইপ কাজ করার কথা?নিজেকে সামলে রাখার মতো শক্তি কি আমাদের দেয়া হয়নি?আমরা কি এতই কাপুরুষ যে গায়ের জোঁড়ে মায়ের জাতির সম্মানহানি করবো?

আমি কিছুদিন আগে এই টাইপের কমেন্টকারী কয়েকজনের ফেসবুক আইডি ঘুরে আসি।তাজ্জব হয়ে যাই তাদের টাইমলাইন,ছবির কালেকশন দেখে।বেশিরভাগ ব্যক্তির সাথেই অসংখ্য মেয়ে আইডির যোগ রয়েছে।তবে এসব মেয়ের কোনো ছবিতেই তাদের বোরকা পড়া অবস্থায় দেখলাম না।তবে চিন্তা করে দেখুন ওই ব্যক্তির চিন্তাধারা কতটা মারাত্মক।আমাদের যুবসমাজের বেশিরভাগ এর এই অবস্থাই চলছে।নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গির কথা না বলে দায় চাপিয়ে দিচ্ছি আরেকজনের ঘাড়ে।আমাদের ছেলেদেরই কাতুকুতু বেশি।আর যাই বলুন এটা বিশ্বাস করাই লাগবে।আমরা যদি নিজেদের দৃষ্টি বা নজর ঠিক রাখি তবে কখনই এমনটা হতো না।

আমার কথার সাথে অনেকেই একমত হতে নাও পারেন।আবার অনেকে অনেক নীতিকথা বলে নিজের পাণ্ডিত্যের পরিচয় দিতে পারেন।তবে আমি একটা কথাই বলবো নিজের দিকটা ঠিক রাখলে এমন পাপের কর্ম কখনো হতো না।তাই দোষটা আমাদের অর্থাৎ ছেলেদেরই নিতে হবে।কারণ আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ঠিক থাকলে এমন কাজ হওয়া প্রায় অসম্ভব।

এবার আসি মেয়েদের ব্যাপারে।মেয়েদের আমি তেমন কোনো দোষ দেবো না।তবে আমি জানিনা কোন কারণে একদিনের জন্য আমরা পহেলা বৈশাখ,পহেলা ফাল্গুনসহ আরো কয়েকখানা দিন পালন করি।এখনকার জেনারেশান মানে আমরা সত্যি বলতে একটু উপভোগ করার জন্য দিনগুলোতে রাস্তায় নামি।কাজে দেশের কোনো সংস্কৃতি-ঐতিহ্য এর ধার ধারি না শুধু দিনগুলো আসলেই নানান সাজে নিজেদের উপস্থাপন করি বাঙালি হিসেবে।এসবের কোনো মূল্য নেই।দিনরাত পশ্চিমা সংস্কৃতির পেছনে দৌড় দিতে দিতে আজ আমরা ওয়েস্টার্ন জগতে পা দেয়ার চেষ্টা করছি।আমাদের মনে রাখতে হবে আমরা বাঙালি।আমাদের আছে গৌরবের এক ঐতিহ্য।একজন জিন্স-শার্ট পড়া বাঙালি মেয়ের চাইতে শাড়ি পড়া বাঙালি মেয়েকে দেখতে আরো বহুগুণ সুন্দর লাগে।বিশ্বাস না হলে দয়া করে একবার যাচাই করে দেখবেন।বাঙালির গৌরবকে ধরে রাখা আমাদেরই কর্তব্য।তাই আমাদের পশ্চিমা অশ্লীলতাকে ছুঁড়ে ফেলে নিজেদেরকে একদিনের নয় চিরদিনের বাঙালি করে তুলতে হবে।তবে আমি মানুষের নিজ ইচ্ছাকে শ্রদ্ধা করি।তাই কেউ সেই পশ্চিমাদের ফলো করতে চাইলে তার প্রতি সমবেদনা এইযে তার কোনো সৌন্দর্য এর মাধ্যমে অন্তত প্রকাশ পাবে না।কারণ বাঙালির সৌন্দর্য বাঙালির সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যতেই লুকিয়ে আছে।যদি আপনি এখন পর্যন্ত ইউরোপ-আমেরিকান মডেলদের ফলো করে এসে থাকেন আর যদি ভেবে থাকেন আপনি নিজের সৌন্দর্যতা প্রকাশ করছেন।তবে আফসোস আপনি এই কাজটিতে ব্যর্থ।

আমি একজন সাধারণ বাঙালি।ধর্ষণ এর মতো কাজ আমার জন্য অপমানের।কারণ এই কাজ দ্বারা আমার মায়ের জাতির উপর কেউ আঘাত এনেছে বলেই আমি মনে করি।আমি ঘৃণা করে তাদের যারা বলে নারী কেবল তার পোশাকের কারণেই ধর্ষিত হয়।খারাপ লাগে এইসব কথা শুনে।কোন সমাজে থাকি আমরা যেখানে নারীকে বিবেচনা করা হয় তার পোশাক দিয়ে?আপনি আজ পোশাকের সমালোচনা করছে কয়দিন পর আপনার বোন বা মেয়েকেই ওই পোশাকে দেখা গেলে আপনি ভেবে দেখুন আপনার মতো লোকেরা কি ভাবতে পারে মনে মনে।ভাগ্যিস বিজ্ঞানীরা এখনো মানুষের প্রতি সেকেন্ডের চিন্তাধারা জানার মতো কোনো প্রযুক্তি তৈরি করতে পারেনি।নইলে সৃষ্টিকর্তাই ভালো জানেন আমাদের কি হতো।

পরিশেষে বলতে চাই ধর্ষণ বিতর্কে পোশাকের ব্যাপারটা প্রায় নিরর্থক।কারণ ধর্ষণের মতো নিকৃষ্ট বিষয় থেকে আজ ছোট বাচ্চারাও রেহাই পাচ্ছে না।এই সবই আমাদের অর্থাৎ ছেলেদের নৈতিক অবক্ষয় আর অশ্লীলতাকেই আমাই দায়ী করি।আর মেয়েদের বলবো ভারতীয় বা পশ্চিমা রঙ ঢং ছেড়ে জাতির ঐতিহ্যকে কাছে টেনে নিতে হবে।বাঁচাতে হবে দেশের সংস্কৃতি।

নিজেরা এভাবে চলতে পারলেই হয়ত একদিন আমাদের দেশে ধর্ষণকারীদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে হবে না।করতে হবে না তনুর মতো মেয়েদের ধর্ষণ আর হত্যার বিচারের জন্য অপেক্ষা।

“বদলে যেতে হবে আমাদেরই”