বিভক্ত কোটা সংস্কার আন্দোলন!

Now Reading
বিভক্ত কোটা সংস্কার আন্দোলন!

কোটা সংস্কারের আন্দোলনটি স্পষ্টতই এখন বিভক্ত হয়ে পড়েছে। বিদ্যমান কোটা পদ্ধতির সংস্কার চেয়ে বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ গত ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে আন্দোলন চালিয়ে আসছে। শুরুতে একসাথে একই দাবীতে আন্দোলন করলেও এখন দুটি গ্রুপ আলাদাভাবে বিভক্ত। কোটা সংস্কার প্রশ্নে এই আন্দোলনের শুরু থেকে যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করে এতদুর পর্যন্ত নিয়ে এসেছে সেই অংশের ২০জন প্রতিনিধির সাথে প্রধানমন্ত্রীর প্রেরিত প্রতিনিধি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সচিবালয়ে বৈঠকে করেছেন। তিনি আন্দোলনকারীদের ইতিমধ্যেই আশ্বস্ত করেছেন যে সরকার বিষয়টি ইতিবাচকভাবে নিয়ে ভাবছে। বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়কে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। মে মাসের ৭ তারিখের মধ্যে সরকার কোটা সংস্কারের দাবি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই সিদ্ধান্ত দেবে। সরকারে এমন আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে চলমান আন্দোলন আগামী ৭ মে পর্যন্ত স্থগিত করতে রাজি হন আন্দোলনকারীরা। কিন্তু একই দাবীতে আন্দোলন করা অন্য আরেকটি পক্ষ স্থগিতের এই সমঝোতা মেনে নিতে নারাজ। তারা সরাসরি সরকারের এই সময় নেয়ার বিরোধিতা করে আন্দোলন চালিয়ে যেতে ইচ্ছুক। আন্দোলন স্থগিত করার বিপক্ষে যারা রয়েছে এর মধ্যে তারা নিজেরাই একটি আলাদা কমিটি গঠন করেছেন। তারা সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা প্রথার সংস্কারের দাবিতে ক্রমাগত শ্লোগান দিয়ে অন্যদের সমবেত রাখছেন।

এদিকে ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবনে হামলা বিষয়ে করা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন জনাব ওবায়দুল কাদের। আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সাথে পৌনে ২ঘণ্টার বৈঠকে তিনি জানিয়েছেন যে বা যারাই ঘটনার সাথে জড়িত তাদের যেকোন মুল্যেই শাস্তির আওতায় আনা হবে।  তিনি বলেন কোটার সঙ্গে ভিসির সম্পর্ক কী? বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে কোটা সংস্কারের সঙ্গে কেন যুক্ত করা হলো? একাত্তরের অপারেশন সার্চলাইটের ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক হত্যাযজ্ঞ ঘটেছে। অনেক শিক্ষক-ছাত্র-কর্মচারীর রক্তে ভেসে গেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সবুজ চত্বর। কিন্তু সেদিনও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসির বাসভবন আক্রান্ত হয়নি। আজ স্বাধীন বাংলাদেশে স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর যে ঘটনা ঘটেছে। এটা একাত্তরের বর্বরতাকেও হার মানায়। ‘শোয়ার কক্ষও রক্ষা পায়নি, সব তছনছ করে দিয়েছে হামলাকারীরা। বাথরুমের কমোড পর্যন্ত ভেঙে ফেলা হয়েছে। ভিসি সাহেবের পরিবারের সোনার গয়না লুট হয়েছে। বাড়ির আসবাবপত্র বাড়ির বাইরে নিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।’ এটা কেমন বর্বরতা! এই নারকীয় বর্বরতার সঙ্গে যারা জড়িত, কোনো অবস্থাতেই তাদের ছাড় নয়।

কোটা সংস্কারের দাবিতে রোববার বিকেলে কর্মসূচি শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা কলেজসহ রাজধানীর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। তারা শাহবাগ মোড় অবরোধ করে আন্দোলন শুরু করলে রাস্তা থেকে তাদের হটিয়ে দিতে রাতে জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। এতে আহত হয় বেশ কিছু শিক্ষার্থী, পরে তারে পিছু হটে বিক্ষিপ্তভাবে ক্যাম্পাসে অবস্থান নেয়। বিভিন্ন জাতীয় সংবাদ মাধ্যমের রিপোর্টে জানা যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজিলাতুন্নেছা মুজিব ও কুয়েত মৈত্রী হলের ছাত্রীরা মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাসে ঢুকলে কয়েক হাজার শিক্ষার্থীর অনিয়ন্ত্রিত জমায়েত তৈরি হয়। ফলে আন্দোলনের উত্তপ্ততা ছড়ায়, আর সে  মুহূর্তেই ভিসির বাসভবনে হামলা ও ব্যাপক ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। সেসময় দুটি মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলে অগ্নিসংযোগ করা হয়।

ভিসির বাসভবনে হামলায় জাতীয় সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী। কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলনকারীদের চাপে মুক্তিযোদ্ধা কোঠা সংকুচিত না করতেও তিনি সরকারকে অনুরোধ করেন।ইতিমধ্যে দেশের শিক্ষকদের বিভিন্ন পরিষদ, রাজনৈতিক দল, বিশিষ্ট ব্যাক্তিবর্গ, বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন সহ বিভিন্ন পেশাজীবীরা ভিসির বাসভবনে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দোষীদের শাস্তি দাবী করেছেন।  

এদিকে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান এর সভাপতিত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জরুরী সিন্ডিকেট সভায় হামলার এ ঘটনাকে পূর্বপরিকল্পিত বলে উল্ল্যেখ করা হয়। সভায় উপাচার্যের বাসভবনে হামলা এবং উপাচার্য ও তার পরিবারের সদস্যদের প্রাণনাশের চেষ্টা বিশ্ববিদ্যালয় ও দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির একটি অপপ্রয়াস বলে মতামত ব্যাক্ত করেন সিন্ডিকেট সদস্যরা। তারা উপাচার্য ভবনে হামলাকারীদের বিচারের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকতর নিরাপত্তা জোরদারে সরকারের প্রতি অনুরোধ জানান।  সিন্ডিকেটের সভায় উপাচার্যের বাসভবনে হামলার বিষয়ে খতিয়ে দেখার জন্য পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করে ঘটনার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও দোষীদের চিহ্নিত করে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে প্রতিবেদন পেশ করতে বলা হয়।