বাংলা সাহিত্যের রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ – প্রথম পর্ব

Now Reading
বাংলা সাহিত্যের রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ – প্রথম পর্ব

রহস্য কার না ভালো লাগে? হোক সে রহস্য বিদেশী কি দেশী, পাতায় পাতায় জমাট রহস্য আর এডভেঞ্চারের হাতছানি সবার কাছেই সমান প্রিয়। স্কুল পড়ুয়া কিশোর-কিশোরী থেকে ঝাপসা চোখের চশমা পরা দাদু, সবার কাছেই রহস্য, অভিযান আর রহস্য সমাধানকারী প্রিয়। এ ধরনের লেখা যখন পড়তে বসি, চোখের সামনে পুরো একটা পৃথিবী ফুটে ওঠে। বেশিরভাগ সময় একটা মূল চরিত্রকে পুঁজি করেই আমরা এগিয়ে যাই। সেই চরিত্র যদি বারে বারে ফিরে আসে, তাহলে তো কথাই নেই। সেই নাম গুলো আর তাদের কাজ করার ধরন থেকে চালচলন সবই যেন হয়ে যায় আমাদের জীবনের অংশ। এমন নয় যে প্রতিবার কেবল একজনই সবাইকে কুপোকাত করছে। রহস্য গল্পের প্রধান চরিত্র তথা যে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গোয়েন্দাগিরি করে তার সাথে থাকে হয় বিশ্বস্ত কোন বন্ধু অথবা সহকারী (যে সাধারনত বইয়ের কাহিনীকার ভুমিকায় থাকে)। অনেক সময় এই কাহিনীকার বন্ধু ছাড়াও এদিক সেদিকে আরও চরিত্র থাকে একদল। তাদেরকেও আমরা মনে রাখি, তাদের সাথে হাসি-কাঁদি আবার রহস্যের সমাধানও করি। রহস্য উপন্যাসের আলোচনা করছি বলে কেবল যে খুন-মারপিট, চুরি-ডাকাতি এর কাহিনী হবে সে কিন্তু না, রহস্য উপন্যাস বা গল্প অনেক সময় কেবল রুদ্ধশ্বাস অভিযানও হয়ে থাকে। গুপ্তধন, হারানো সভ্যতার খোঁজ অথবা ইতিহাসের মুছে যাওয়া অংশ খুঁজে বের করা।

বিদেশী সাহিত্যে এই রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজের অনেক বই আছে। যারা বুদ্ধির কাটাকুটির সাথে রাজ্যের ঝাপাঝাপিও করে নিজেদের অমর করে রেখেছে। এদের মাঝে প্রথমেই যে নাম গুলো মনে পরে সেগুলো, শার্লক হোমস অথবা চ্যালাঞ্জার (আর্থার কোনান ডোয়েল), এরকুল প্যোয়ারো আর মিস মারপেল (অগাথা ক্রিস্টি), অগাস্ত দ্যুপে (এডগার এল্যান পো), জেমস বন্ড (ইয়ান ফ্লেমিং), অ্যালান কোয়াটারমাইন (হেনরি রাইডার হ্যাগার্ড) সহ আরও অনেকে। বইপোকা পাঠক মাত্রই এদের সবাই চেনে। বাংলা সাহিত্যেও এমন কীর্তিমান চরিত্র সংখ্যা খুব কম নয়। সবার আগে যদিও গোয়েন্দা হিসেবে মাথায় ফেলুদা, ব্যোমকেশ বক্সী আর তিন গোয়েন্দার নাম আসে। তুখোড় এডভেঞ্চারে মনে পরে কুয়াশা, মাসুদ রানা আর ঋজু’দার কথা। কিন্তু তাঁদের পূর্বসূরি আর উত্তরসূরি আরও অনেকই আছে। ধারাবাহিক ভাবে সেই সব চরিত্র এবং তাদের লেখকদের সাথে সবার পরিচয় করিয়ে দেয়ার ইচ্ছা থাকল।

বাংলা সাহিত্যের শুরু অনেক আগে হলেও সামাজিক আর ঐতিহাসিক সাহিত্যের চর্চায় তা সীমাবদ্ধ ছিল বহু বছর। উনিশ শতকের শেষের দিকে বাংলা সাহিত্যে রহস্য কাহিনীর আভাস দেখা যায়। পাঁচকরি দে, দিনেন্দ্র কুমার রায়রা সেই প্রথম দিকের রহস্য সিরিজের বইয়ের পথিকৃৎ। যদিও সেগুলো বাংলায় লেখা, কিন্তু মূল কাহিনী নির্ভরশীল ছিল পুরোপুরি ইংরেজি গল্পের উপরই আর এই লেখার ধরনেও ছিল বিদেশী গল্পের প্রভাব।

সোজা কথায় বললে, শীতলপাটি বিছিয়ে কলা পাতায় যদি ফ্রাইড রাইস আর চিকেন ফ্রাই খেতে দেয়া হয় অনেকটা সেই রকম অবস্থা। বাঙালি গল্পে যদি বাঙ্গালিপনা না থাকে, বেশভূষা আর কথায় বাংলার টান না থাকে, তাহলে সে গল্পের স্বাদ হয়ে যায় লবন ছাড়া তরকারীর মতন। এই লবন ছাড়া কাহিনী দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও ধীরে ধীরে নিজস্ব চিন্তাধারায় আর বাঙ্গালির বাঙালিপনা শুরু হয় বাংলা সাহিত্যে। এই ঘরানার প্রথম দিকের লেখকরা ছিলেন হেমেন্দ্র কুমার রায়, নিহারঞ্জন গুপ্ত আর শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায়। পরবর্তীতে সেই হাল ধরেন গুণী লেখক ওপার বাংলায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সমরেশ মজুমদার, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়। আর এদেশে কাজী আনোয়ার হোসেন, রকিব হাসান, রোমেনা আফাজ সহ অনেকে।

প্রহম পর্বের আলোচনায় হেমেন্দ্র কুমার রায় এর লেখা নিয়ে আলোচনা করা যাক। হেমেন্দ্র কুমার লেখালেখি শুরু করেছিলেন অল্প বয়স থেকেই। ঠাকুরবাড়ির পত্রিকা “ভারতী” থেকে লেখা লেখির শুরু। ছোটদের জন্য লেখালেখি করতে করতে একসময় সিরিজ লেখায় মন দেন তিনি। ১৯৩০ সালে তাঁর লেখা প্রথম কিশোর রহস্য উপন্যাস প্রকাশ করেন। এরপর প্রায় চল্লিশ বছর ধারাবাহিক ভাবে লিখে গেছেন প্রায় আশিটি কিশোর উপন্যাস। সেই সাথে ছোট গল্প আর অন্য লেখা তো আছেই। বড়দের জন্য লেখা আর গানের কথাও লিখেছেন অনেক। তাঁর লেখা গল্প থেকে তৈরি হয়েছে বাংলা আর হিন্দি ছায়াছবি আর ধারাবাহিক টিভি সিরিজ।

এবার নজর ফেরাই তাঁর লেখা গল্পের মূল চরিত্রগুলোর দিকে। বিমল-কুমার সিরিজ আর জয়ন্ত-মানিক সিরিজ হেমেন্দ্র কুমার রায়ের দুইটি আলাদা বইয়ের সিরিজ। যদিও কিছু বইয়ে রহস্য সমাধানের জন্য তারা এক সাথে কাজ করেছে। কিন্তু মুলত এ দুটি আলাদা সিরিজ। হেমেন্দ্র কুমার রায় সিরিজ লেখায় ছিল অসাধারণ দক্ষতা। তিনি একই সময় দুইটি ভিন্ন সিরিজ এর বই লিখেছেন। “বিমল-কুমার” সিরিজ আর “জয়ন্ত-মানিক” সিরিজ।

“বিমল-কুমার” সিরিজ মূলত এডভেঞ্চার কাহিনী। কাহিনীর প্রেক্ষাপট সমগ্র বাংলা, ভারতের অন্য অঞ্চল, দুর্গম সব দেশ এমন কি পৃথিবীর বাইরে পর্যন্ত বিস্তৃত। সিরিজের প্রধান দুই চরিত্র বিমল এবং কুমার। কুমার চরিত্রটি বাংলার সাধারণ এক যুবকের ছায়ায় গড়া। সুঠাম দেহের অধিকারী অকুতোভয় আর রোমাঞ্চপ্রিয় এক যুবক। সিরিজের প্রথম কাহিনী ‘যকের ধন’ শুরু হয় কুমার এবং তার পরিবারের কাছে থাকা কিছু গুপ্তধনের সংকেত দিয়ে। সেই রহস্য সমাধানে যোগ দেয় বয়সে বছর তিনেকের বড় বিমল। লম্বা চওড়ায় বিমল থেকে বড় আর ক্ষুরধার বুদ্ধি। যদিও সাহস বা বুদ্ধিরধার দুই জনেরই আছে, কিন্তু বিমল এর প্রভাব যেন একটু বেশি। গল্পের বাঁক গুলো বিমলের হাত ধরেই আগায়। এই সিরিজের বেশ কিছু পার্শ্ব চরিত্র আছে, যারা না থাকলে কাহিনী কেমন যেন ম্যাড়ম্যাড়ে লাগতে থাকে। এর মাঝে প্রথমেই যার নাম আসে সে হল, কুমারের পোষা দেশী কুকুর ‘বাঘা’ যার বীরত্তের কাহিনী ঘুরিয়ে ফিরিয়ে অনেক গল্পেই পাওয়া যায়। এর পরেই আসে ‘রামহরি’। বিমলের কাজের লোক এই রামহরি বেশিরভাগ কাহিনীর অপরিহার্য এক অংশ। গায়ে গতরে শক্তপোক্ত রামহরি রান্নাবান্নার কাজে যেমন পারদর্শী তেমনি বিমল আর কুমার কে নানান বিপদ থেকে বাঁচাতেও পারদর্শী। এর বাইরে উল্লেখ করার মত আর এক চরিত্র ‘বিনয় মজুমদার’। বয়েসে বিনয় কুমারদের থেকে দিগুনের বেশি হলেও, তার জ্ঞানের বহর আর এডভেঞ্চার প্রীতির কারনে অনেক বইয়েই তারও উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘সুন্দর বাবু’ বলে একজন পুলিশ চরিত্রও এই সিরিজে দেখা যায়। তার বিবরণে আসছি একটু পরে।

বিমল-কুমার অভিযানের অখণ্ড সংস্করনের পৃষ্ঠা সংখ্যা ১১৪৫ এবং এই সিরিজের মোট কাহিনী সংখ্যা জানামতে ২৮টি।

“জয়ন্ত-মানিক” সিরিজ হেমেন্দ্র কুমার রায়ের সৃষ্ট অপর এক অসামান্য সিরিজ। এটি মূলত গোয়েন্দা কাহিনী নির্ভর সিরিজ। অসম্ভব প্যাঁচালো আর মাথা ঘুরিয়ে দেয়া ধরনের রহস্য সব খুঁজে পাওয়া যায় ‘জয়ন্ত-মানিক’ সিরিজের বই গুলোতে। গড়পড়তা খুনের মামলা থেকে রাজবাড়ির গোপন সংগ্রহ চুরি, জাঁদরেল ডাকাত থেকে ভিনদেশী গুপ্তঘাতক সব ধরনের কাহিনী আছে এই সিরিজে। জয়ন্ত আর মানিক চারিত্রিক দিক থেকে বিমল আর কুমার থেকে কিছুটা ভিন্ন। বিমল কুমাররা বহির্মুখী, পুরো পৃথিবী দাপিয়ে বেড়ায় আর রহস্য খুঁজে ফেরে, জয়ন্ত মানিকরা মাথা ঘামানোর মত কাজ পেলেই বর্তে যায়। দৈহিক গঠনের দিক দিয়ে জয়ন্ত চরিত্রটি অনেকটা বিমলের মতই। কিন্ত মূলত সে একজন গোয়েন্দা। অসম্ভব তীক্ষ্ণ যার বুদ্ধি আর বিশ্লেষণী ক্ষমতার অধিকারী। অবসরে বাঁশি বাজাতে পছন্দ করে। সামনাসামনি মারামারিতে অপটু নয়। বুদ্ধির সাথে সাথে দৈহিক ক্ষমতাও তার অসাধারণ। মানিক চরিত্রটি মূলত নিবেদিতপ্রান সহকারী গোছের। সাধারণ কৌতূহলী ধরনের একজন যুবক। জয়ন্তের প্রানের বন্ধু আর সব কাজের ভাগীদার। বিপদের মুখে পরা হোক, হোক জটিল কোন কাহিনীর সমাপ্তি টানা অথবা শত্রুর সাথে লড়াই করা সবখানেই জয়ন্তের সাথে অবিচ্ছেদ্য নাম মানিক।তার পছন্দের কাজ সুযোগ পেলেই সুন্দর বাবুর সাথে খুনসুটি করা অথবা তাকে নিয়ে মজা করা। ‘সুন্দরবাবু’ চরিত্রটি টক-ঝাল-মিষ্টি আচারের মত। পেশায় পুলিশ ইনিস্পেক্টর ‘সুন্দর বাবু’। ভোজন বিলাসী, খানিকটা আরাম প্রিয় মানুষ, গোলগাল শরীর আর মুদ্রাদোষ কথায় কথায় ‘হুম!’ বলা। পুরো সিরিজ জুড়ে নানান অদ্ভুত কান্ড কারখানা করে হাসির উদ্রেক করান এই সুন্দর বাবু। যদিও ভূতে তার ভীষণ ভয়, তার পরেও রহস্য আর এডভেঞ্চার যত কঠিনই হোক, পিছিয়ে আসার লোক নন তিনি।

এই সিরিজের অখণ্ড সংস্করণের পৃষ্ঠা সংখ্যা ১১০১ এবং মোট কাহিনী রয়েছে ৩২টি।

প্রায় নব্বুই বছর আগে শুরু হয়েছিল এই সিরিজ গুলো। সে সময়ও লেখা হয়েছিল শিশু কিশোরদের কথা মাথায় রেখেই। সমসাময়িক চিন্তাধারা থেকে একটু অন্যরকম হওয়াটা তাই খুবই স্বাভাবিক। তাই প্রেক্ষাপট আর প্রযুক্তির ব্যাবহার অদ্ভুত মনে হতে পারে। কাহিনী সুক্ষতার মাপকাঠিতে হয়ত অনেক বেশি কল্পনা নির্ভর মনে হবে গল্প গুলো। কিন্তু নিছক আনন্দ পাওয়ার ক্ষেত্রে এই দুই সিরিজের কাহিনী পাঠকদের মন্দ লাগবে না বলেই আমার বিশ্বাস।