একটি টিভির আত্মকাহিনী

Now Reading
একটি টিভির আত্মকাহিনী

আমি একটি অত্যাধুনিক ৪২” এল ই ডি টিভি। পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট এই পরিবারের ড্রয়িংরুমে আমার অবস্থান। ওরা আমাকে অনেক যত্ন করে রাখে। রোজ ঝেড়ে মুছে পরিষ্কার করে ঝা চকচকে করে রাখে আমার শরীরটাকে। বড্ডো ভালেবাসে। আমিও ওদের যথাযথ সেবা দিতে সবসময়েই সচেষ্ট থাকি। আমিও ওদের ভালেবাসি। যেদিন ওদের বাসায় আমার প্রথম আগমন ঘটলো, আমাকে নিয়ে ওদের আহ্লাদিপনার কমতি ছিলোনা। পাশের বাসার ভাবীদের ভিন্ন অজুহাতে ডেকে এনে আমাকে দেখাচ্ছিলো,আমার শেপ, আমার আকৃতি, আমার ছবির কেয়ালিটি। সব্বার বাহ্ বাহ্ পেতে পেতে আমারও কেমন যেন গর্ব হচ্ছিলো নিজেকে নিয়ে। বাসার অন্য ফার্নিচারগুলো আমাকে কেমন হিংসুটে চোখে দেখছিলো! অনেক মজা লাগছিলো বটে! আমি সবচে, সব্বার চেয়ে সেরা,হিংসা তো তাদের হবেই, দোষের কিছুনা।যেমন দোষের না আমার এই অহংকার করাটা।
ডিশ্ কানেকশন লাগানোর পর শুরু হলো আমার পথ চলা।

আমাকে সামনে রেখে পরিবারের সবার কত আড্ডা, চা কফি,কোক! সবচে বয়োকনিষ্ঠ সদস্যটি সুযোগ পেলেই কার্টুন নেটওয়ার্ক ছেড়ে বসে থাকে। একা একা হাসে, হুহ্-হাহ্ করে। আমার মজা লাগে,মায়া লাগে। সবচে’ বিরক্ত লাগে যখন বাড়ীর বয়োজ্যেষ্ঠ মহিলাটি কিসব প্যানপ্যানানি সিরিয়াল নামক জিনিষটাকে ছেড়ে দেয় আমার মধ্যে। ঐ কথায় কথায় কান্নাকাটি,মরে গিয়েও আবার বেঁচে ফিরে আসা,সামান্য সব ছুঁতো ধরে অসামান্য সব ঘটনা, ঝগড়াঝাটি আমার মধ্যে চলতে চলতে আমি নিজেই ক্লান্ত হয়ে পড়ি, ওরা বোঝেনা। আমারই সিরিয়ালের ওদের মতো মরে নস্ট হয়ে যেতে মন চায়, আবার বেঁচে ফিরে আসতে আর একদম মন চায়না। রিমোট নিয়ে যখন বাড়ীর কর্তার সাথে ঐ কত্রীর ঝগড়া টাইপ কথোপকথন চলে, আমার খুব খুউব ইচ্ছা করে বেচারা কর্তার পক্ষ নিয়ে কিছু বলি। নিজের অক্ষমতায় তখন নিজেরই কষ্ট হয়। হায় প্রযুক্তিবিদগণ! এতো এতো কিছু আবিস্কার করেছেন, আর একটু কষ্ট করে আমাদের দু’চারটা মনের কথা বলতে পারার ব্যাপারটা যদি আবিষ্কার করতে পারতেন! কিছু চাইবার থাকতোনা! মাঝে কিছুদিন আমার ভিতরের খবরের এক চ্যানেলে শুনতে পাচ্ছিলাম স্টার জলসা নামক সেই ভয়ানক চ্যানেলটা নাকি বন্ধ হয়ে যাবে। নিজের কানকে বিশ্বাস হচ্ছিলোনা, সত্যিই এমন দিন আসবে? নাহ্! আসলেই তেমন দিন আসলোনা।

থাক! দুঃখের সাতকাহন গেয়ে আর কি হবে। কিছুই যখন করার নেই,কারোরই যখন আমাকে বোঝার নেই, কি লাভ আর এই দুঃখ করে! তারচে’ বরং সবচে মজার সময় কাটানোর কথা বলে মন হালকা করা যাক। বাড়ীর ছেলেটিকে আমার সেইরকম লাগে! কারন? ও আমাকে ছাড়লেই ইতংবিতং চ্যানেলগুলো ফেলে খেলার চ্যানেলগুলো দেখে। শান্তি শান্তি লাগে কেমন যেন।খেলার উত্তেজনা আমার মতো জড় পদার্থের একটা টিভির ভিতরেও ছড়িয়ে পড়ে কিভাবে যেন। কিন্তু সমস্যার কথা, এই ছেলেটির ভাগ্যে টিভি দেখা জুটেনা তার অফিসিয়াল নানান ব্যস্ততার কারনে। তার স্ত্রীর মতো আমিও ছেলেটির অপেক্ষায় থাকি। তার স্ত্রীর সংসারের কাজ করতে করতে আমার সামনে বসা খুব একটা হয়ে ওঠেনা। সেও হয়তো বসার সুযোগ পেলে সিরিয়াল ই দেখতো! তবে রাতে তারা টোনাটুনি মিলে যখন আমার সামনে বসে কোন মুভি দেখে অন্তরঙ্গ সময় কাটায়,চানাচুর বা মুড়ি খায়, ভালো লাগে আমার। তবে রোজ রোজ এই খেলা বা ওদের একসাথে বসে মুভি দেখার ব্যাপারটা হয়না আমার সাথে।তবে আমি রোজ চাই আজও খেলা হোক,আজও ওরা মুভি দেখতে বসুক। আমার ক্লান্ত লাগেনা তখন। তবে আমাকে দিয়ে বেশিরভাগ সময়েই সিরিয়াল দেখানো হয়। অবলা আমি একটু প্রতিবাদ ও করতে পারিনা।

সিরিয়াল ব্যাপারটা কি না দেখলেই নয়? এত্তো কত্তো চ্যানেল আমার ভিতর! কত্তো কত্তো মজার জিনিস হয়। ডিসকভারী বা এনিমেল প্লানেট দেখলেও তো দাদীমা!! তাও না বোঝ তো নিজের দেশেরই নাটকগুলো না হয় দেখো। তা না দেখে বস্তাপঁচা ওসব সিরিয়ালে কি মজা পাও, বুঝি না বাপু! সিরিয়াল দেখে দেখে মাথায় দুষ্ট বুদ্ধি চাপাও আর সংসারে কোথাও পান থেকে চুন খসলেই ক্যাক করে ধরো। সাধারন “ভুল করে হয়ে গেছে” এভাবে ভেবে ব্যাপারটা ভুলে গেলেই হয়। তা কিভাবে হবে? সিরিয়ালের প্রভাবে তা হতে দিলে তবেই না! সেদিন আমার সামনেই তো বউটাকে সামান্য এক গ্লাস পানি আনতে দেরী হওয়ায় তার বাপ-মা তুলে কথা বললে। ডায়ালগ গুলো সবই কোথা থেকে আমদানি হলো তা বুঝতে তো আমার বাকি ছিলোনা। নেহাৎ কিছু বলতে পারার ক্ষমতা নেই বলে চুপ মেরে থাকা ছাড়া গতি ছিলোনা।কিন্তু ভিতরে ভিতরে মরমে মরে যাচ্ছিলাম যে বৌটার কথা গুলো শুনানোর একটা কারন বা মাধ্যম আমি নিজে! আজ আমি যদি না থাকতাম,হয়তো বৌটা এসব কথা শোনার হাত থেকে বাঁচতো। আসলেই কি বাঁচতো? না বাচলেও অন্তত আমি তো আর কোন মাধ্যম হিসেবে থাকতামনা। আমার জড় বিবেকটাও অনুশোচনায় বিদ্ধ হতোনা। আমার খুব প্রশ্ন করতে মন চায়, আমি একটা জড় পদার্থ,এক হাল ফ্যাশনের টিভি, আমার তাতেই বিবেক বোধটা কাজ করে, তুমি সৃস্টির সেরা জীব মানুষ হয়েও তোমার বিবেকে বাঁধে না?

সিরিয়াল তোমাকে কি শিখাচ্ছে একবার ভাবোতো দাদীমা! তোমার বাসার পরিবেশ নষ্ট করছে এই সিরিয়াল।তারচে’ বরং দাদার সাথে বসে খবর দেখতে দেখতে চা খাও, ঝগড়া হবেনা দেখো। ছেলের বৌকেও বিপক্ষের দল ভাববে না। তাকে ডেকে দু’চারটা ভালো কথা বলোই না। বা তাকে নিয়েই নিজের দেশের নিজের সংস্কৃতির একটা কোন নাটক দেখো। তুমি সবচে’ বড়। তোমাকে দেখেই তো বাকিরা শিখবে,তাই না দাদীমা। কাল যদি তোমার নাতি তোমার পাশে বসে এই সিরিয়াল গিলে,তো পরশু সে নিজেই ঘরের এসব ঝগড়াঝাটি গুলোকেই সাধারন ব্যাপার হিসাবে ধরে নেবে। তুমি তোমার প্রজন্মের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মটাকেও প্রভাবিত করছো। একটা ভালো সিরিয়াল দেখাও আমাকে যেখান থেকে শিখার কিছু আছে! ৬৬৬
নিজের ভালো নাকি পাগলেও বোঝে। মানুষ হিসাবে তো এটা এই শ্রেনীর মানুষগুলোরও বোঝার কথা। আমি সামান্য এক ৪২” এল ই ডি টিভি। এক সময় আমার নিজেকে নিয়ে বেশ গর্ব হতো, এখন নিজেকেই কেমন ঘেন্না হয়।ঘরে ঘরে এতো ঝগড়া, অশান্তির মূলে যেন আমি নিজে!