3
New ফ্রেশ ফুটপ্রিন্ট
 
 
 
ফ্রেশ!
REGISTER

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মঞ্চায়নে অবতীর্ণ হওয়া বিশ্ব শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহের দ্বন্ধ

Now Reading
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মঞ্চায়নে অবতীর্ণ হওয়া বিশ্ব শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহের দ্বন্ধ

১৯৩৯ সালের ১সেপ্টেম্বর পোল্যান্ড আক্রমণের মাধম্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করেন হিটলার। এই যুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫) দীর্ঘ ছয়বছর স্থায়ী ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও পৃথিবীর ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো দুভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল, এর একটি পক্ষ অক্ষশক্তি অন্যটি মিত্রশক্তি। অক্ষশক্তির মধ্যে ছিল জার্মানি, ইতালি এবং জাপান অন্যদিকে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ মিত্রশক্তি গঠিত হয়েছিল ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে। যদিও অপ্রত্যাশিতভাবে রাশিয়াও ছিল মিত্রশক্তির দলে। যুদ্ধে একের পর এক জার্মানির পরাজয়ের প্রেক্ষিতে ১৯৪৫সালের এপ্রিলে জার্মানি ও ইতালি মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। হিটলার নিজেকে ধরা না দিয়ে আত্মহত্যা করেন এবং ইতালির একনায়ক মুসোলিনিকে গ্রেফতার পরবর্তী হত্যা করা হয়। অন্যদিকে, ১৯৪৫সালের ২আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও রাশিয়া পটাসডাম সম্মেলনে জাপানকে আত্মসমর্পণ করতে বললে জাপান তা প্রত্যাখ্যান করে। পরে ৬ ও ৯ আগস্ট হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আনবিক বোমা বর্ষণ করা হয় ফলে ১৪ আগস্ট ১৯৪৫ জাপান শর্তহীনভাবে আত্মসমর্পণ করে।  এখানে একটা কথা বলা ভাল আর তা হচ্ছে জাপান কর্তৃক পার্ল হারবারে হামলা। ১৯৪১ সালের ৭ডিসেম্বর হাওয়াই এর ওয়াহু দ্বীপে অবস্থিত পার্ল হারবারে মার্কিন নৌ ও বিমান ঘাঁটিতে জাপান বিমান হামলা চালিয়ে তা ধ্বংস করে দেয়। জাপানী বিমান হামলায় চোখ খুলে যায় মার্কিনীদের, তারা সিদ্ধান্ত নিল জাপানে মরনাস্ত্রের আঘাত হানার। তারা পারমাণবিক বোমা তৈরির পরিকল্পনা হাতে নিল। ১৯৪৫ সালের ১৬জুলাই নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক বোমার সফল পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটায়। এর ঠিক তিন সপ্তাহ পর হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা বর্ষণ করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছিল আনবিক বোমার ভয়াবহতা। বিংশ শতাব্দীতে এ ঘটনা পরবর্তী বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরণের প্রভাব ফেললেও বৃহৎ শক্তিগুলো কখনো মরনাস্ত্র তৈরি, উৎপাদন ও পরীক্ষা থেকে পিছ পা হয়নি। বিংশ শতাব্দী প্রত্যক্ষ করেছে আটটি দেশের উত্থান, যারা নিজেদেরকে পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হিসেবে ঘোষণা করেছে। নিরস্ত্রীকরণের ক্ষেত্রে কিছু কিছু অগ্রগতি হলেও (এনপিটি চুক্তি ও সিসিবিটি চুক্তি স্বাক্ষর) বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূমিকা বরাবরই প্রশ্নের সম্মুখীন ছিল। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার ও উৎপাদন বন্ধের ব্যাপারে তারা কখনো আন্তরিক ছিলনা। এমনকি জাতিসংঘও এ ব্যপারে তেমন কোন বড় ভূমিকা পালন করতে পারেনি। বিংশ শতাব্দীতে এটা ছিল একটা বড় ব্যর্থতা যে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেও সভ্য সমাজ মরনাস্ত্র প্রতিযোগিতায় নিজেদেরকে নিয়োজিত করেছিল।

একনজরে দেখে নিই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি কি কারনে সংঘটিত হয়েছিলঃ

i) ভার্সাই চুক্তিঃ এই চুক্তির ফলে জার্মানি তার যাবতীয় উপনিবেশ হাত ছাড়া করল। শুধু তাই নয়, উপনিবেশে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ লগ্নী করা হয়েছিল তাও বিফলে গেল। সবদিক থেকে জার্মানিকে দুর্বল করাই ছিল ভার্সাই চুক্তির লক্ষ্য। সুতরাং এটা অনুমেয় ছিল যে জার্মানি এ চুক্তির শর্ত মনে প্রাণে স্বীকার করে নেবে না।

ii) দীর্ঘ যুদ্ধ বিরতিঃ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী শান্তি, নিরাপত্তা ও গণতন্ত্র বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যখন ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হল তখন দেখা গেল গণতন্ত্র, নিরাপত্তা ও শান্তি কোনটাই নিরাপদ নয়। সে জন্য দুই মহাযুদ্ধের মধ্যখানের সময়টাকে শান্তিপূর্ণ নয় বলে দীর্ঘ যুদ্ধ বিরতি বলা হয়।

iii) অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদঃ ভার্সাই চুক্তি জার্মানিকে নিঃস্ব করেছিল। চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর জার্মানির একমাত্র লক্ষ্য ছিল যে, কোন প্রকারে যুদ্ধপূর্ণ অবস্থায় ফিরে যাওয়া। জাপান ও ইতালি মনে করেছিল যে, আন্তর্জাতিক বানিজ্যে সব রকম সুযোগ সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত। তাই অর্থনৈতিক পুনর্গঠনকে তারা অপরিহার্য মনে করেছিল।

iv) আন্তর্জাতিক নৈরাজ্যঃ আন্তর্জাতিক নৈরাজ্যকে অনেকেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ মনে করে। লীগ অফ নেশনস যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় লীগের সদস্যবৃন্দ ও অন্যান্য রাষ্ট্র শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য সনাতন পদ্ধতির আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল, আর এ পদ্ধতি হল জোট তৈরি করা। অনেকের মনে তখন  এ বিশ্বাস জন্মেছিল যে, লীগের সফল হওয়া মানে যুদ্ধের সম্ভাবনা কমে যাওয়া আর ব্যর্থতা মানে যুদ্ধ অনিবার্য।

v) নিরস্ত্রীকরণে ব্যর্থতাঃ লীগ অফ নেশনস এর প্রণেতাগণ মনে করেছিলেন শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে নিরস্ত্রীকরণ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু এই স্বদিচ্ছাকে ফলপ্রসূ করতে হলে বৃহৎ শক্তিবর্গের যে পরিমাণ সহযোগিতা ও লীগ কর্তৃপক্ষের দৃঢ়তা প্রয়োজন তার কোনটাই ছিলনা।  বৃহৎ শক্তিবর্গ অস্ত্র উৎপাদনের অশুভ প্রতিযোগিতায় নিজেদের নিমজ্জিত করেছিল। অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ না হওয়ায় তা যুদ্ধের জন্ম দিয়েছিল।

vi) উগ্রজাতীয়তাবাদঃ হিটলারের ধারণা ছিল জার্মানজাতি পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র উৎকৃষ্ট ও শ্রেষ্ঠজাতি, অন্যরা নিকৃষ্ট। অতএব নিকৃষ্টের উপর শ্রেষ্ঠের কর্তৃত্ব থাকা খুবই স্বাভাবিক। জার্মানজাতি গোটা ইউরোপের উপর প্রাধান্য বিস্তার করবে এই স্বপ্নে হিটলার বিভোর ছিলেন। স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদান করতে গিয়ে তিনি এক সর্বধ্বংসী যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়েছিলেন।

vii) সর্বাত্মকবাদঃ হিটলার ও মুসোলিনি উভয়েই গণতন্ত্রকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন। তাঁরা গণতন্ত্রকে সম্পূর্ণরুপে ধ্বংস করে সর্বাত্মকবাদ এর পথকে সর্বোৎকৃষ্ট উপায় বলে মেনে নিয়েছিলেন। তখন জার্মানি, জাপান ও ইতালির কাছে নিজেদের সংকীর্ণ জাতীয়তাবোধ ছাড়া অন্য কোন মূল্যবোধ যথাযথ মর্যাদা পায়নি।

viii) অন্যান্য কারণঃ এ ছাড়া লোকার্ণো চুক্তি, ওয়াশিংটন নৌ-সম্মেলনসহ কেলগ-ব্রিয়াণ্ড চুক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পরস্পর বিরোধী দুই মতাদর্শের বিকাশ ঘটেছে যা আজো বিদ্যমান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর বিশ্ব রাজনীতিতে একটি সদুরপ্রসারী ফলাফল আমরা প্রত্যক্ষ করি। আমরা এও দেখতে পাই বৃহৎ শক্তি হিসেবে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের পতন হয়েছে এই যুদ্ধ পরবর্তী অন্যদিকে  বৃহৎ শক্তি হিসেবে আবির্ভাব ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের। উত্থান ঘটেছে সোভিয়েত ইউনিয়নের আর বিস্তৃতি বাড়িয়েছে স্নায়ু যুদ্ধের, যা নতুন আরেক বিশ্বযুদ্ধের ধামামা ক্রমাগত বাজিয়েই চলছে।

“Cold War” বা স্নায়ু যুদ্ধের গোড়াপত্তন

Now Reading
“Cold War” বা স্নায়ু যুদ্ধের গোড়াপত্তন

ইংরেজি ‘Cold War’ শব্দের বাংলায় বিভিন্ন প্রতিশব্দ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- ‘ঠাণ্ডা লড়াই’, ‘স্নায়ু যুদ্ধ’, ‘শীতল যুদ্ধ’, ‘প্রচার যুদ্ধ’ ইত্যাদি। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে “কোল্ড ওয়ার” বা ঠাণ্ডা লড়াই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধত্তোর বিশ্বরাজনীতির চালিকাশক্তি ছিল এই ঠাণ্ডা লড়াই। আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতি-প্রকৃতি, বিশ্বের দুই পরাশক্তির মধ্যকার দ্বন্ধ ইত্যাদি সবকিছুই এই ঠাণ্ডা লড়াইকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। মূলত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বিশ্ব রাজনীতি ও ঠাণ্ডা লড়াই অনেকটা সমার্থক হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্কের উত্থান-পতন, উত্তেজনা ও দ্বন্ধ সব কিছুর মূলে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে দায়ী ছিল ঠাণ্ডা লড়াই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধত্তোর পৃথিবীতে যুগপৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের “পরাশক্তি” বা “Super Power” হিসেবে আবির্ভাব ঘটে। উভয়ের মধ্যকার উত্তেজনার সময়কে ঠাণ্ডা লড়াই হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিলো এটি। এই দুই পরাশক্তি সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে স্বীয় কূটনৈতিক তথা অর্থনৈতিক, সামরিক ও প্রচারণা শক্তির মাধম্যে ক্ষমতা, প্রভাব ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে এবং পৃথিবীকে দুটি পরস্পর বিরোধী শিবিরে বিভক্ত করে ফেলে। বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্র এভাবে দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে একটি যুদ্ধোদ্দ্যম অবস্থার সৃষ্টি করে। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, ঠাণ্ডা লড়াই মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বা “Psychological War” যা দুটি বিরোধী মতাদর্শগত দ্বন্ধ থেকে উদ্ভূত। এ দ্বন্ধের অর্থ ছিল সরাসরি প্রথাগত যুদ্ধে অবতীর্ণ না হয়ে একে অপরকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক কলা-কৌশলগতভাবে পরাভূত করা। এ ঠাণ্ডা লড়াইয়ের দুই প্রতিপক্ষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের স্বীয় প্রভাববলয় বা “Sphare of Influence” বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নিয়োজিত থেকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যা চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে নব্বই দশকের গোড়ার দিক পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

এভাবে “যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়” সাধারনত এ ধরনের সম্পর্ককে বলা হয় ‘Cold War Relationship’। কাজেই ঠাণ্ডা লড়াই ছিল দুই জোটের মধ্যে এমন একটি যুদ্ধোন্মাদ সম্পর্ক, যে সম্পর্ক যুদ্ধ সৃষ্টি করেনি, কিন্তু যুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পেরেছিল। উল্লেখ্য যে, ঠাণ্ডা লড়াইয়ের ইঙ্গিত আমরা পাই উইনস্টন চার্চিলের ১৯৪৬সালের ৫মার্চ ওয়েস্ট মিনিস্টার কলেজের এক বক্তৃতার মাধম্যে। অবশ্য চার্চিল সরাসরি ‘Cold War’ কথাটি ব্যবহার করেননি। কিন্তু তিনি বলতে চেয়েছিলেন যে, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যে মৈত্রীর বন্ধন স্থাপিত হয়েছিল তা অবলুপ্ত হতে চলেছে। তার পরিবর্তে সৃষ্টি হয়েছে সন্দেহ, হিংসা ও অবিশ্বাস। চার্চিল ছাড়া অন্য একজন Cold War শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি হলেন বার্নাড বারুচ, যিনি মূলত একজন আমেরিকান ব্যবসায়ী ছিলেন। পরে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। সাউথ ক্যারোলাইনা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে তিনি বলেছিলেন, “Let us not be deceived- today we are in the midst of the Cold War”- তবে আমেরিকার ওয়াল্টার লিপম্যান এই Cold War শব্দটি সংবাদপত্রে প্রথম ব্যবহার করেন ১৯৪৭সালে। এ শব্দের মাধম্যে তিনি আমেরিকা ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সম্পর্ক বোঝাতে চেয়েছিলেন, যার মধ্যে ছিল বেশ সন্দেহ ও ভীতি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এই “ঠাণ্ডা লড়াইকে” কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল। এই ঠাণ্ডা লড়াইয়ের কতকগুলো বিশেষ বৈশিষ্ট উল্ল্যেখযোগ্য। যেমনঃ

১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে প্রতিদন্ধিতাই হচ্ছে এ যুদ্ধের মূল কথা। আর ঠাণ্ডা লড়াইয়ের রাজনীতিকে ‘Bipolar Politics’ বা দ্বিপক্ষীয় রাজনীতিও বলা হয়।

২. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়েই বিভিন্ন রাষ্ট্রের উপর প্রভাব বিস্তার করতে এবং তাদের সাহায্য ও সহযোগিতা লাভ করতে বিশেষভাবে সচেষ্ট হয়।

৩. উভয় পক্ষই ‘স্নায়ু যুদ্ধ’ সম্বন্ধে তাদের নীতিকে রাজনৈতিক মতবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একদিকে গণতন্ত্র ও ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে ‘ঠাণ্ডা লড়াই’ পরিচালনা করে। অপরদিকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার নামে ঠাণ্ডা লড়াই পরিচালনা করে। তার ফলে এটি অনেক পরিমাণে ‘ঠাণ্ডা লড়াই’ এর রুপ ধারণ করে এবং উভয় পক্ষই প্রচারনার উপর বেশ গুরুত্ব আরোপ করে।

৪. ঠাণ্ডা লড়াইয়ে দুপক্ষই যথা সম্ভব সামরিক প্রস্তুতি বাড়ানো সত্ত্বেও প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে বিরত থাকে। এ লড়াইকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অঞ্চলে দুপক্ষের বন্ধু রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ আরম্ভ হলেও উভয় পক্ষই  যুদ্ধকে সেই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ রাখার জন্য চেষ্টা করে।

৫. ঠাণ্ডা লড়াই মূলত সামরিক ও জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যুতে অধিক গুরুত্ব প্রদান করে যা পূর্ব ও পশ্চিম এ দুটি বিবাদমান শিবিরে বিভক্ত। এবং সমগ্র বিশ্ব এক অনভিপ্রেত যুদ্ধের চাপে ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।

যে কারণে ঠাণ্ডা লড়াইয়ের সূত্রপাতঃ

প্রথমত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপের যেসব অঞ্চলে বিভিন্ন মিত্রশক্তি প্রবেশ করে তারা সেখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিজেদের আদিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন এর সদ্ব্যবহার করতে সচেষ্ট হয়। অপরদিকে যুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলো দুর্বল হয়ে পড়ায় তাদের মধ্যে সোভিয়েত ভীতি বিশেষভাবে সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম ইউরোপের সাথে চুক্তি স্থাপন করে সোভিয়েত বিরোধী এক জোট সৃষ্টি করে।

দ্বিতীয়ত, আদর্শগত সংঘাতও ঠাণ্ডা লড়াইয়ের জন্ম দেয়। আমেরিকা তথা পশ্চিম বিশ্বের ধনবাদী আদর্শ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক আদর্শের দ্বন্ধ এ ক্ষেত্রে উল্ল্যেখযোগ্য।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তিগত উন্নতির সাথে সাথে ঠাণ্ডা লড়াইয়ের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের ক্ষেত্রে এই প্রতিযোগিতা পরিলক্ষিত হয়, অস্ত্রসজ্জার খেত্রেও এটা দেখা যায়।

চতুর্থত, পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাস এই মনস্তাত্ত্বিক কারণের জন্যও ঠাণ্ডা লড়াইয়ের সৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, আণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকান মনোভাব উভয়ের মধ্যে একধরনের সন্দেহ সৃষ্টি করেছিল।

পঞ্চমত, তৃতীয় বিশ্বের স্বাধীন জাতিগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তার খাতিরে বৃহৎ শক্তিবর্গের ছত্রছায়ায় থাকতে চেয়েছিল। এই নেতৃত্ব লাভের জন্য আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয় এবং ঠাণ্ডা লড়াই দেখা দেয়।

[email protected]