ধর্মের আড়ালে পরিচালিত ইতিহাসের কুখ্যাত কিছু খুনি কাল্ট

Now Reading
ধর্মের আড়ালে পরিচালিত ইতিহাসের কুখ্যাত কিছু খুনি কাল্ট

‘কাল্ট’ শব্দের অর্থ বিভিন্ন জনের কাছে বিভিন্ন। মূলত “কাল্ট” বলা হয়, যারা শয়তানের উদ্দেশ্যে বিকৃত উপাশনা করে এবং উৎসর্গ হিসেবে পশু কিংবা নরবলী দেয়। এদেরকে ভক্তি সম্প্রদায় ও বলা যায় যারা বিভিন্ন দল বা গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে বসবাস করে। স্বাভাবিকভাবেই তাদের সম্পর্কে ধারণা হতে পারে, যারা এসব কর্মকাণ্ডে লিপ্ত তারা বেশ জঘন্য। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই কাল্ট দলের সদস্যদের দেখতে অনেকটা নিরীহ প্রকৃতির মনে হয়। আদিকালে কাল্ট বলতে বুজানো হত “এমন একটি গোষ্ঠি বা চক্রকে, যারা বাইবেলের এক বা একাধিক মুখ্য বিষয়কে অস্বীকার করে নিজেদের সৃষ্ট ধর্মীয় রীতিতে বিশ্বাসী ছিল”। তাদের ভাষায়, ‘পুনঃজন্ম কিংবা পরিত্রান লাভ করা যায় না’ আর এ শিক্ষাই তারা তাদের দলের সদস্যদের দিয়ে থাকে। বেশিরভাগ কাল্টেরই বিশ্বাস তাদের একজন পরলোকগত আইকন বা গুরু আছেন, যিনি মৃত্যুর পরও আধ্যাত্মিক ক্ষমতা গুনে তাদের রক্ষা করেন। এই পরলোকগত কাল্ট আইকন বা পিতামহ থাকেন সকল বিতর্কের উরদ্ধে। তাঁর সম্পর্কে দলে কেউ বিষেধাগার করা মানেই বেঈমানির সমান, ফলাফল মৃত্যু। তবে কাল্টে পরলোকগত আইকন ছাড়াও একজন জীবিত আইকন থাকেন। তিনি কাল্টের সমস্ত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেন এবং দলের সদস্যদের দীক্ষা প্রদান করেন। আর এই জীবিত আইকন নিজেকে পরলোকগত আইকনের কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত বলে দাবী করেন। জীবিত এই আইকনের সাথে কেউ বিরোধিতা কিংবা বিদ্রোহ করে টিকে থাকতে পারেন না। হয় তাকে দল চ্যুত করা হয় অন্যথা খুন করা হয়। এখানে অন্ধ আনুগত্য ছাড়া কাউকে দলের সদস্য করা হয়না। কাল্টরা নিজেদের একটি ধর্মের অধীন বলে দাবি করলেও, সেই ধর্মের গুরুত্বপূর্ণ কিছু সত্যকে পুরোপুরি অস্বীকার করে। যেমনঃ ক্রিষ্টিয়ান কাল্ট নিজেদেরকে ক্রিষ্টিয়ান বলে দাবি করে, অথচ তারা ধর্মের একাধিক মুখ্য সত্যকে অস্বীকার করে। দুইটি সুপরিচিত ক্রিষ্টিয়ান কাল্ট গোষ্ঠি হচ্ছে, “যিহোবা স্বাক্ষী” ও “মর্মন”। গোষ্ঠি দুটি নিজেদের ক্রিষ্টিয়ান বলে পরিচয় দিলেও ‘যীশু খ্রীষ্টের ঈশ্বরত্ব’ এবং ‘শুধুমাত্র বিশ্বাসের দ্বারা পরিত্রান পাওয়া যায়’ ধর্মের এই গুরুত্বপূর্ণ দুটি ভিত্তিকে অস্বীকার করে। আর ক্রীষ্ট ধর্মের এই দুইটি শিক্ষাকে অস্বীকার করাতেই এদের কাল্ট হিসেবে চিহ্ণিত করার প্রয়াস হয়। তবে যিহোবার সাক্ষিরা নিজেদের কাল্ট হিসেবে মানতে নারাজ, তাদের যুক্তি নেতা হিসেবে তারা কোনো মানুষকে নির্বাচন করে না। তাদের মতে, কোনো বিপদজনক কাল্টের পরিবর্তে ‘যিহোবার সাক্ষি’রা এমন একটা ধর্ম পালন করে, যা এর সদস্যদের এবং সমাজের অন্যান্যদের জন্য উপকার নিয়ে আসে। কালের পরিবর্তনে কাল্টের ধারায় এসছে নানান পরিবর্তন, ধর্মের বাইরে গিয়ে এর প্রবক্তাগণ নিজেদের মতাদর্শ সুকৌশলে চাপিয়ে দিয়েছে তার অনুসারীদের মধ্যে।

আসুন ইতিহাসের কুখ্যাতি অর্জন করা কিছু বিপদজনক ‘কাল্ট’ সম্পর্কে ধারণা লাভ করিঃ

১. ক্লু ক্ল্যাক্স ক্ল্যানঃ এরা হচ্ছে সাদাবর্ণের ক্রিশ্চানদের সৃষ্ট সবচেয়ে কুখ্যাত, নৃশংস ও বর্বর গোষ্ঠী। মার্কিন সমাজের ভিতর লুকিয়ে থাকা বিভিন্ন পেশাজীবী মানুষকে নিয়ে সংগঠিত একটি গোপন ও সুগঠিত সন্ত্রাসী সংগঠন এটি। ফলে এদেরকে সাধারণ মানুষ থেকে আলাদা করাটা ছিলো ব্যাপক দুরুহ ব্যাপার। এই বর্ণবাদী গোষ্ঠীর প্রধান লক্ষ্য ছিলো সাদা মানুষের আধিক্য ও প্রাধান্য। সাদা বর্ণের জাতীয়তাবাদ ও কৃষ্ণাঙ্গদের অভিবাসন বিরোধীতা। সংগঠনটির সীমা ছিলো কেবল মার্কিন মুল্লুকে। একটা সময় ‘ক্লু ক্ল্যাক্স ক্ল্যান’ সংগঠনটির নির্যাতনের একক ভুক্তভোগী ছিলো আমেরিকান কৃষ্ণাঙ্গরা।

২. দ্য ইউনিফিকেশন চার্চঃ চার্চটির প্রতিষ্ঠাতা সান মিউঙ মুন ১৬ বছর বয়সে দৈববাণীর মাধ্যমে জানতে পারেন যে, তিনি পৃথিবীতে এসেছেন যীশু খ্রিস্টের অসমাপ্ত কাজ সম্পন্ন করতে, এমনটাই দাবি তার। মুন প্রচার করেন যে, তার প্রতি একান্ত বাধ্যগত হওয়াই একমাত্র মুক্তির পথ। তিনি নিজেকে একজন মুক্তিদাতা হিসেবে দাবী করেন। দক্ষিণ কোরিয়ার কেন্দ্রস্থল সিউলে ১৯৫০ সালে একটি চার্চ প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে ১৯৭০ সালে আমেরিকায় চলে আসেন, উদ্দেশ্য নিজের ধর্মের প্রসার ঘটানো। এক সাথে বহু বিবাহ সম্পাদন করা এই ধর্মের একটি অন্যতম সম্মেলন হিসেবে বিবেচিত। তিনি ১৯৮২ সালে একসঙ্গে প্রায় ৬,০০০ দম্পতির বিয়ে সম্পাদন করিয়ে নিজেকে সামনে নিয়ে আসেন। মুনের ভক্ত ও অনুসারীরা তাদের সঙ্গী নির্বাচনের ভার ছেড়ে দেয় তাদের ধর্মগুরুর উপর। আর বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী থেকে নিজের পছন্দমত সদস্য নির্বাচন করে তাদের একটি দম্পতি হিসেবে রুপ দেন মুন। এদিকে একজন ধর্মপ্রচারকের আড়ালে মুনের অন্য পরিচয় ও প্রকাশ পায়। তিনি একজন ব্যবসায়ী, মাছ ধরার বড়শী, আগ্নেয়াস্ত্র, গাড়ি এবং সংবাদপত্রসহ একাদিক ব্যবসায় জড়িত থাকার প্রমাণ মেলে তার বিরুদ্ধে। তার প্রতিষ্ঠা করা চার্চটির সদস্যদের বিরুদ্ধে অপহরণ ও শিশুদের মগজ ধোলাই করার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে চার্চটি ‘দ্য ফ্যামিলি ফেডারেশন ফর ওয়ার্ল্ড পিস অ্যান্ড ইউনিফিকেশন’ এই নামে সক্রিয়।

৩. দ্য পিপলস টেম্পলঃ জেমস ওয়ারেন জিম জোন্স একজন আমেরিকান রাজনৈতিক কর্মী এবং কমিউনিটি সংগঠক ছিলেন। তিনি তার শৈশব থেকে গির্জা, হাসপাতাল, রেস্টুরেন্ট, একটি ক্রীড়াঙ্গন পার্ক ও পুলিশ বিভাগে বিভিন্ন পদে, অনেক বিশিষ্ট প্রতিষ্ঠানে একীভূত সময় কাটিয়েছেন। ১৯৫০ সালে জিম জোন্স ইন্ডিয়ানাপোলিসে পিপলস টেম্পলের কাজ শুরু করেন। জোন্স ছিলেন মূলত বর্ণবাদ বিরোধী ও সমাজতান্ত্রিক ঘরানার যা তিনি প্রচার শুরু করেন। জোন্সের প্রচার আকৃষ্ট হয়ে তার পিপলস টেম্পলে যোগ দিয়েছিল বেশ কিছু আফ্রো-আমেরিকান। তিনি তার প্রচারে খ্রিস্টান ধর্মের সাথে সাথে সাম্যবাদ, সমাজতন্ত্র এবং সাদা-কালোদের সম অধিকারকেও জোর দিতেন। ১৯৬৫ সালে জোন্স তার ১০০ অনুসারীসহ ক্যালিফোর্নিয়ায় আগমন পরবর্তী ৫ বছরে তা বেড়ে দাড়ায় প্রায় হাজারের কাছাকাছি অনুসারী। তিনি তার অনুসারীদের নিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার সমাজতান্ত্রিক দেশ গুইয়ানায় ১৯৭৭ সালে গড়ে তোলেন নিজের নামে শহর ‘জোন্সটাউন’। তার প্রতিষ্ঠা করে ‘পিপলস টেম্পল’র বিরুদ্ধে অন্যতম অভিযোগ ছিল আর্থিক অনিয়ম, শারীরিক নির্যাতন ও শিশু নির্যাতন। যা সেসময় সংবাদপত্রে নেতিবাচক সংবাদ প্রকাশিত হত নিয়মিত, জোন্স এতে বেশ ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে পড়তেন এবং অপমানিত বোধ করতেন।

৪. দ্যা ব্রাঞ্চ ডেভিডিয়ানঃ উগ্র ও চরমপন্থি হিসেবে পরিচিত ডেভিড কোরেশ চার্চ থেকে বিতাড়িত হয়ে ব্রাঞ্চ ডেভিডিয়ান নামের একটি অপ্রথাগত বিশ্বাসীদের দলে যোগ দেন। দলটির নেতা ছিলেন লয়েস রডেন, তাঁর সাথে ঘনিষ্ঠতার ফলে দলতির পরবর্তী নেতা নির্বাচিত হন কোরেশ। কিন্তু দলের নেতা নির্বাচিত হয়েই কোরেশ নতুন মতবাদ প্রচার করেন এবং যৌনতায় অধিক অভ্যস্থ হয়ে পড়েন। তার স্ত্রী সংখ্যা ছিল ১৯ জন এছাড়াও তিনি প্রচার করেন, সকল বয়সের নারীই হল তার আত্মিক পত্নী, এমনকি বিবাহিতরাও। তার নতুন এই মতবাদের জন্য কোরেশ সবচেয়ে বিতর্কিত ছিল। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র মজুদ ও শিশুদের যৌন নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ ছিল। প্রায় ১৩ জন শিশুর সাথেও তিনি যৌনকর্মে লিপ্ত হয়েছিলেন যাদের বয়স ছিল ১২ বছরের নিচে। কোরেশ তার অনুসারীদের রক্তাক্ত না হওয়া পর্যন্ত নির্যাতন করতেন যাদের মধ্যে থাকত নারী ও শিশু। নিষ্ঠুর কোরেশকে দমনে ১৯৯৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে টেক্সাসে ব্রাঞ্চ ডেভিডিয়ানদের সদর দপ্তরে অভিযান পরিচালনা করে দ্য ফেডারেল ব্যুরো অব অ্যালকোহল, টোব্যাকো অ্যান্ড ফায়ার-আর্মস। কিন্তু চরমপন্থি কোরেশ ও তার অনুসারীরা আত্মসমর্পণ না করে মারাত্মক রকমের গোলাগুলি শুরু করলে এই অভিযানে যোগ দেয় এফবিআই।  ব্রাঞ্চ ডেভিডিয়ানদের এই হার না মানা প্রায় ৫১ দিনের যুদ্ধে কোরেশসহ তার ৭৬ জন অনুসারীকে হত্যা করা হয়।

৫. অর্ডার অব দ্যা সোলার ট্যাম্পলঃ ১৯৮৪ সালে জেনেভায় প্রতিষ্ঠিত হয় অর্ডার অব দ্যা সোলার ট্যাম্পল, এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ম্যাম্ব্রো ও জুরেট। প্রতিষ্ঠাতা জুরেট নিজেকে যীশু খ্রিস্ট এবং মধ্যযুগের একজন ধর্মযোদ্ধা হিসেবে দাবী করত, তিনি এও প্রচার করেন তার পুনর্জন্ম হয়েছে বলে। ম্যাম্ব্রোর ছেলে এলি বাবার মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন না তিনি বাবার ভবিষ্যতবাণীকে ভুয়া আখ্যায়িত করে আরো অনেককে নিয়ে অর্ডার অব দ্যা সোলার ট্যাম্পল ত্যাগ করেন। অন্যদিকে অর্ডার অব দ্যা সোলার ট্যাম্পলের বাকী অনুসারীদের বিশ্বাস ছিল, পৃথিবীতে সব কিছুর ধ্বংস ঘনিয়ে আসছে, তাই তাদের নতুন গ্রহে পুনরুত্থানের প্রয়োজন। পৃথিবীতে তাদের মৃত্যু ঘটলেও সিরিয়াস নামক তারকার কেন্দ্রে ঘূর্ণায়মান একটি গ্রহে তাদের পুনর্জন্ম হবে, আর তাদের সেখানে নিয়ে যাবে ম্যাম্ব্রোর আধ্যাত্মিক শক্তিসম্পন্ন মেয়ে ইমানুয়েল। সেই বিশ্বাস থেকে ঘনিষ্ঠ ১২ জন সহচর নিয়ে যীশু খ্রিস্টের ন্যায় ম্যাম্ব্রো শেষ নৈশভোজের আয়োজন করে এবং আহার শেষে  ঘরে আগুন লাগিয়ে সকলেই আত্মাহুতি দেয়।  ১৯৯৪ সালের ৪ ও ৫ অক্টোবর তারিখে সুইজারল্যান্ড এবং কানাডায় একযোগে ‘অর্ডার অব দ্যা সোলার ট্যাম্পল’র ৫৩ জন অনুসারী আগুনে পুড়ে আত্মাহুতি দেন। আর নিহতদের মধ্যে প্রতিষ্ঠাতা ম্যাম্ব্রো ও জুরেট ছাড়াও ছিল এলির লাশ। তবে ধারণা করা হয় এলিকে জোড়পূর্বক খুন করা হয়েছে। এর ঠিক পরের বছর ১৯৯৫ সালের ডিসেম্বরে অর্ডার অব দ্যা সোলার ট্যাম্পলের ১৬জন অনুসারীর মৃতদেহ পাওয়া যায় ফ্রান্সে যারা আত্মাহুতি দিয়েছিল পূর্ববর্তীদের মতোই।  

৬. ঠগী সম্প্রদায়ঃ সুলতানি শাসনামলের বহু পূর্ব হতেই ঠগী নামক একটি গোষ্ঠী ছিল ভারতে। মূলত ঠগীরা ছিল ভারতীয় এক বিপদজনক ধর্মীয় সম্প্রদায় অর্থাৎ খুনি কাল্ট। ঠগীরা ছিল কেবল সনাতন ধর্মের অনুসারী এবং আদিম কালীর উপাসক সম্প্রদায়। ইতিহাস বলছে, ঠগীরা যত মানুষ হত্যা করেছে পৃথিবীর কোনও সংগঠিত খুনি কাল্ট এই পরিমাণ নিরীহ মানুষ হত্যা করেনি। ১৮৩০ সালেই কেবল প্রায় ৩০,০০০ মানুষকে শ্বাসরুদ্ধ করে হত্যা করে ঠগীরা, তারপর সেইসব মৃতদেহ তারা উৎসর্গ করেছে  দেবী কালীর উদ্দেশ্যে। ভারতীয় ইতিহাসে ঠগীদের নৃশংসতা একটি কলঙ্কজনক অধ্যায় হিসেবে রচিত।  ঠগীরা বংশপরম্পরায় খুন ও দস্যুবৃত্তি জড়িয়ে পরেছে, আর শৈশব থেকেই ঠগী পিতা তার ছেলেকে শিক্ষা দিত কীভাবে ফাঁস দিয়ে শ্বাসরোধ করে মানুষ হত্যা করা যায়। দশ বছর বয়স হতেই একজন ঠগী বালক এ জঘন্য শিক্ষা লাভ করত এবং বয়স আঠারোর্ধ হলেই সে মানুষ হত্যার অনুমতি পেত। ঠগীরা সাধারণত হলুদ বা গেঁড়ুয়া রঙের শক্ত কাপড়ের তৈরি রুমাল ব্যবহার করত গলায় ফাঁস লাগানোর ক্ষেত্রে, আর তা কৌশলে পেঁচিয়ে হত্যা শেষ করত। খুন করতে অন্য উপায় অবলম্বন করতনা কারণ তাদের মতে, কালীর আদেশ রক্তপাত নিষিদ্ধ। তারা বিশ্বাস করে তাদের আদি পিতা কালীর কাছ হতে রপ্ত করেছিল ফাঁস দিয়ে হত্যার রক্তপাতহীন পদ্ধতি। যাকে খুন করত তার লুঠের মাল ভাগ করে নিয়ে মৃতদেহটিকে কালীর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করত ঠগীরা। আর এ কারণেই তাদের বিশেষ একটি কাল্ট বা উপাসক সম্প্রদায় বলা হয়। ১২৯০ সাল থেকে শুরু করে ১৮৪০ সাল পর্যন্ত দেবী কালীর নামে এই ঠগীরা প্রায় ২০ লক্ষ মানুষকে হত্যা করেছিল যাদের সকলেই ছিল নিরীহ পথচারী। 

৭. আইএসআইঃ পাশ্চাত্যের গোপন ও প্রকাশ্য-মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী দল ‘আইএসআইএ’ এর উত্থান কোনো কল্পকাহিনী নয়। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন হামলার সময় সর্বপ্রথম আত্মপ্রকাশ করে ‘আইএসআই’  অর্থাৎ ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক। পরে নাম পরিবর্তন করে হয় আইএসআইএল। আরেক সন্ত্রাসী দল আল-কায়দার পর তাদেরই উত্তরসূরি হিসেবে নতুন সংস্করণে এসেছে আইএসআইএল পুরো অর্থ ইসলামিক স্টেট অফ ইরাক এন্ড লিভান্ট। ‘আইএসআইএল মূলত একটি ওয়াহাবি-সালাফি পন্থি জঙ্গি সংগঠন যা  গ্রুপটির নাম থেকেই বোঝা যায় আর তারা উগ্র/কথিত সালাফি ইসলামের ভিত্তিতে ইরাক ও আশশাম তথা লেবানন, ফিলিস্তিনসহ প্রাচীন সিরিয়ায় একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যদিও তাদের কর্মকাণ্ডের সাথে উদ্দেশ্য সাংঘর্ষিক।

২০০৬ সালের শেষের দিকে বেশ কয়েকটি সন্ত্রাসী গ্রুপের মধ্যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার পর ‘আইএসআই’- আনুষ্ঠানিকভাবে আবু ওমর আল বাগদাদিকে তাদের নেতা বলে ঘোষণা করে। কিন্তু ২০১০ সালের ১৯ এপ্রিল আবু ওমর নিহত হলে গ্রুপটির নতুন প্রধান হয় আবুবকর আল বাগদাদি যার নেতৃত্বে মধ্যপ্রাচ্যে গ্রুপটি ব্যাপক বিস্তার ঘটায়। তখন  ‘নতুন বিন লাদেন’ নামে খ্যাত বাগদাদিকে ধরিয়ে দিতে তৎকালীন মার্কিন সরকার দশ লাখ ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। মূলত বাগদাদির আসল নাম ছিল আবু দায়া। যদিও সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে অন্যরকম চিত্র, তাদের পরিচয় নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা…! শোনা যাচ্ছে বাগদাদির পূর্বের ইহুদী নাম। নাম যাই হউক এই বাগদাদি অর্থাৎ আবু দায়া ইরাকি নাগরিকদের অপহরণের পর তাদের বিরুদ্ধে ফতোয়া এবং একগাদা অভিযোগ দাঁড় করিয়ে প্রকাশ্যেই তাদের ফাঁসি দিয়ে দিত। ভাবুনতো কি নির্মম ও নিষ্ঠুর মনের অধিকারী ছিলেন তিনি। ২০০৫ সালে তাকে হত্যা ও অপহরণসহ নানা ধরনের সন্ত্রাসী তৎপরতার অভিযোগে গ্রেফতার করে ২০০৯ সাল পর্যন্ত ইরাকের উম্মে কাসর শহরের একটি মার্কিন কারাগারে বন্দি রাখা হলেও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন সেখানে তাকে উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। অন্যথা তার বিরুদ্ধে এত হত্যা অভিযোগের পরও কেন মুক্তি দেয়া হল? শুধু তাই নয় সাথে মুক্তি দেয়া হয় হাজার হাজার চরমপন্থি বন্দীকে কাসরের ‘বুকা’ কারাগার থেকে। পরবর্তীতে বাগদাদি ২০১১ সালে বাগদাদের একটি মসজিদ বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেয়। এ ছাড়াও সে ইরাকের সুন্নিদের প্রতিনিধি বা নেতা হিসেবে খ্যাত খালেদ আল ফাহদাওয়িকেও হত্যার দায়ে অভিযুক্ত হয়। ইরাকের কয়েকটি আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে দক্ষ বাগদাদি গোপনে বিচরণ করে, তার কর্মী ও ভক্তরদের মধ্যে খুব কমই তার সাক্ষাৎ পেয়েছে। সে প্রায় সব সময়ই তার মুখ ঢেকে চলেন যাতে কেউ তাকে চিনতে না পারে। ২০০৩ সালের আগেও সে আল-কায়দার সদস্য ছিল বলে ধারনা করা হয় আর আল-কায়দার অন্য যে কোনো নেতার চেয়ে এই আবুবকর বাগদাদি অনেক বেশি উগ্র চিন্তাধারায় বিশ্বাসী বলে জানা যায়।

৮. বোকো হারামঃ বিশ্বের ভয়ংকর জঙ্গি সংগঠনগুলোর তালিকার শীর্ষে রয়েছে নাইজেরিয়ার বোকো হারাম৷ ২০০২ সালে এই জঙ্গি সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন মোহাম্মদ ইউসুফ। নাইজেরিয়ার উত্তরাঞ্চল ও তার প্রতিবেশী দেশগুলোতে সন্ত্রাস ও ভীতির অপর নাম ‘বোকো হারাম’৷ নাইজেরিয়ার যে সব শহর ও গ্রামে নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল এবং যে অঞ্চলগুলোতে বিদেশি পর্যটকরা গমন করেন, সে সব জায়গাকে হামলা এবং অপহরণের কেন্দ্রবিন্দু বানায় বোকো হারাম৷  ২০১৫ সালে আবু বকর শেকাউ-এর নেতৃত্বে এই জঙ্গি গোষ্ঠীটি ৬ হাজার ৬৪৪ জন মানুষকে হত্যা করেছে ৷ তাদের হামলায় আহত হয়েছে প্রায় ১,৭৪২ জন ৷ যাদের বেশিরভাগই বেসামরিক নাগরিক ৷ এছাড়া হাজারো কিশোরীকে অপহরণ করে এখনো মুক্তি দেয়নি বোকো হারাম, আজো অজানা সেইসব কিশোরীদের ভাগ্যে কি ঘটেছে৷

সূত্রঃ www.msn.com, cnn.com, telegraph.co.uk, , top5s.co.uk, bizarrepedia.com, thoughtco.com