শিশু পার্ক গুলোতে অবাধে চলছে যুবক-যুবতীদের বেহায়াপনা !

Now Reading
শিশু পার্ক গুলোতে অবাধে চলছে যুবক-যুবতীদের বেহায়াপনা !

কি হলো?

শিরোনাম দেখে একটুও অবাক হননি তাইনা? আসলে অবাক হবেনই বা কেন? অবাক হবার তেমন কিছুই তো নেই তাইনা? কারণ, এগুলো তো এখন দৈনন্দিন বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে; আজকের কথা নয়, আরো দশ-বারো বছর আগে থেকেই। শিশু পার্ক এখন আর শিশু পার্ক নেই, হয়ে গেছে এডাল্ট পার্ক

আমি আমার নিজের একটা অভিজ্ঞতা শেয়ার করছি আপনাদের সাথেঃ

২০১১ সালের কথা, ঢাকায় গিয়েছিলাম আমাদের ব্যান্ডের জন্য কিছু যন্ত্রপাতি কিনতে। গিয়ে উঠেছিলাম খালাতো বোনের বাসায়। খালাতো বোনের ছোট ছেলের বয়স তখন মাত্র ৭ বছর। বিকেলে বায়না ধরলো, মামা, চলো পার্কে গিয়ে ফুটবল খেলে আসি, দেখলাম পাশেই সুন্দর একটা পার্ক, গেলাম ওকে নিয়ে। কিন্তু সেখানে যাবার পর আমি যা দেখলাম, তাতে করে আমার সাত বছর বয়সী ভাগ্নেকে ১০মিনিটের ভেতর কার্টুনের কথা বুঝিয়ে বাসায় নিয়ে এলাম; আপাকে জিজ্ঞেস করলাম, পাশের পার্কটা কি এমনই আপা? উনি জিজ্ঞেস করলেন, তুই বাবুকে নিয়ে ওখানে গিয়েছিলি নাকি? যা সত্য তাই বললাম, আপা বললেন, ৩-৪ বছর আগেও বাবু যখন আরো ছোট ছিল, তখন আমি আর তোর দুলাভাই বাবুকে নিয়ে ওখানে যেতাম, কিন্তু ওসব নোংরামো শুরু হবার পর থেকে ওদিকে ভুলেও পা মাড়ানো হয়না।

আমার উপরের এই ঘটনা আমাদের দেশের হাজার হাজার পার্ক বিশেষ করে শিশু পার্ক গুলোতে অহরহ ঘটছে। পার্ক চলে গেছে প্রেমিক-প্রেমিকাদের হাতে, শিশু পার্ক হয়ে গেছে নোংরামোর আস্তানা।

এই ঘটনা এটাও প্রকাশ করে যে, শিশুরা হারিয়ে ফেলছে তাদের খেলার স্থান, এমনিতেই ঢাকা শহরে খেলার মাঠ বা পার্ক নেই বললেই চলে, যা আছে, তাতেও যদি এমন চলতে থাকে, তাহলে তো শিশুদের বিনোদনের জন্য ঐ কম্পিউটার গেমস আর কার্টুনেই নির্ভর করতে হবে।

এখন প্রশ্ন হলো, আমাদের যুবসমাজ কোন পথে এগোচ্ছে?

আপনারা যারা ফেসবুকের দোষ দিবেন, তাদেরকে বলবো, এই সকল নোংরামো – দেশে ফেসবুক জনপ্রিয় হবার আগে থেকেই চলে আসছে। মূলত যুব সমাজের ভেতর সুশিক্ষার অভাব, নৈতিক অবক্ষয়, পরিবারের অসচেতনতা, কম খরচে ফোন হাতের মুঠোয় চলে আসা, ধর্মবোধ কাজ না করা ইত্যাদি বিষয়গুলো এক্ষেত্রে কাজ করেছে।

সুশিক্ষার ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে তরুণ-তরুণীদের ভেতরে। তাদের মাঝে প্রেম-ভালোবাসা একটা রোগের মত ছড়িয়ে পড়েছে। যেন, প্রেম না করতে পারলে জীবনটাই বৃথা হয়ে যাবে। ছোয়াঁচে রোগ যেভাবে ছড়ায়, এর ক্ষেত্রেও তাই হচ্ছে। বন্ধু-নির্বাচন তাই মূখ্য একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক বন্ধু যদি আরেক বন্ধুর কাছ থেকে প্রেম করার বা বান্ধবীকে নিয়ে পার্কে যাবার প্রেরণা পেয়ে থাকে, তবে সেটা বন্ধুত্বের কোন পর্যায়ে পড়ে বলেন তো?

বয়ঃসন্ধিকালে এগুলোর শুরু, মানুষ তো অনুকরণপ্রিয়, তাই মানুষের দেখাদেখি আরো মানুষ এমন করছে।

ছেলে বা মেয়ে কোথায় যাচ্ছে, কি করছে, বাবা-মা যদি তার সন্তানদের প্রতি নজর না রাখেন, তাহলে তো ছেলে মেয়ে বখে যাবে; পার্কে গিয়ে নষ্টামি করবে এটাই স্বাভাবিক; বাবা-মা কে অবশ্যই সন্তানের সবচাইতে কাছের বন্ধু হতে হবে। তাদেরকে ভালো মন্দ বোঝাতে হবে। নাহলে তারা খারাপ পথে এগোবে। কি ভুল কিছু তো বলিনি তাইনা?

আমি যে শুধুমাত্র যুবক-যুবতীদের দোষ দিবো তা নয়, তাহলে সেটা খুব খারাপ দেখাবে, পার্ক কতৃপক্ষ এখানে বিরাট একটা ভূমিকা পালন করছে। দেখা যায়, এসব পার্কের অধিকাংশই সরকারী জমিতে স্থাপিত এবং কোনো না কোনো রাজনৈতিক প্রভাবশালীর ছত্রছায়ায় এগুলো চলছে। নামে শিশু পার্ক হলেও এগুলো মূলত খারাপ উদ্দেশ্যেই তৈরী করা। ঢুকতে গেলে আপনাকে হয়তো চড়ামূল্যের টিকেট নিয়ে ঢুকতে হবে, আবার ভেতরে গেলেও ভেতরের দোকান থেকে জোরপূর্বক কিছু কিনতে বাধ্য করবে, হয়তো দেখা যাবে, ১০টাকার একটা চিপস ২৫-৩০টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। সাথে তো এলাকার বখাটে ছেলেদের উৎপাত থাকেই। কথা কাটাকাটি হতে পারে, সাথে থাকা মেয়েটি বা প্রেমিকা তার সম্ভ্রম খোয়াতে পারে, আর মোবাইল, মানিব্যাগ কেড়ে নেয়া তো খুব নরমাল একটা বিষয়। সত্যি কথা হল, কতৃপক্ষই এগুলো করে থাকে। এটা তাদের বিজনেস বলতে পারেন। স্মার্ট চাঁদাবাজি আরকি! ভুক্তভোগীরা এর বিরুদ্ধে কিছু বলার সাহসও রাখেন না, কারণ তারা এসেছেনই তো বয়ফ্রেন্ড বা গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ফাজলামো করতে। তাইনা?

আমি খুলনা শহরে বড় হয়েছি, ছোটবেলায় খালিশপুরের ওয়ান্ডারল্যান্ড নামক একটা পার্কে প্রায়ই যেতাম, বিভিন্নপ্রকার রাইড ছিল, সচল ছিল সব, অনেক কিন্ডারগার্ডেন স্কুল বা খুলনা শহরের নামীদামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সেখানে পিকনিক করতে যেতো। ছোটদের জন্য পারফেক্ট একটা পার্ক ছিল। কিন্তু দেশ ছাড়ার আগে ২০১২ সালে একবার সেই ছোটবেলার স্বৃতিগুলো মনে করতে ভেতরে ঢুকেছিলাম, নাহ! সেই দিন হারিয়ে গেছে। এখন হয়ে গেছে বড়দের পার্ক, তারা সেখানে শারীরিক কার্যকলাপে ব্যস্ত।

আমি জানিনা, এভাবে দিন দিন চলতে থাকলে, যুবসমাজের ভবিষৎ কি হবে, এরা সামনে কেমন বাবা-মা হবে? প্রশাসন যে একেবারে নীরব তাও বলবো না, কারণ প্রায়ই পুলিশকে রেইড দিতে দেখা যায় এসব স্থানে, কিন্তু প্রভাবশালী নেতাদের দাপটে তা খুব কমই দেখা যায়। আমরা এখনই যদি এইসব অসভ্যপনা আর নোংরামোপনার বিরুদ্ধে রুখে না দাঁড়ায়, তাহলে আরো পাচঁ বছর পর দেখা যাবে আমাদের সন্তানদের জন্য নেই কোনো উপযুক্ত খেলার স্থান, শিশুপার্ক, থাকবেনা কোনো বিনোদনের স্থান, বাড়বে ধর্ষণ, বাড়বে ছিনতাই, বখাটেদের উৎপাত সর্বোপরি সামাজিক অবক্ষয় চরম মাত্রায় প্রকাশ পাবে!

আমার এই লেখাটি প্রশাসনের নজরে এলে অবশ্যই দ্রুত পদক্ষেপ নিতে অনুরোধ জানাচ্ছি, এমনও তো হতে পারে, আপনি জেলা প্রশাসক হয়ে সরকারী চেয়ারে বসে আছেন আর আপনার ছেলে বা মেয়ে কোনো পার্কে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা খেয়ে পত্রিকার নিউজ হয়েছে!