পদ্মা নদীর মাঝি (প্যারোডি)

Now Reading
পদ্মা নদীর মাঝি (প্যারোডি)

একঃ

নৌকা চলছে। পানিতে জাল ফেলার ছপাত ছপাত শব্দ হচ্ছে। শত শত নৌকা দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে নৌকা বাইচ চলছে। জেলে পাড়ার মানুষ জীবিকার জন্য পদ্মার উপর নির্ভরশীল। জেলে পাড়ারই এক গরীব জেলের নাম কুবের। সে মাছ ধরতে পদ্মার বুকে নেমেছে।

বোটম্যান কুবের পদ্মানদী থেকে এইমাত্র বড়শি দিয়ে যে মাছটি ধরলো তা আপাত দৃষ্টিতে ইলিশ বলেই মনে হচ্ছে। তবে এসব মাছকে বিশ্বাস নেই। ফটোশপ আবিষ্কারের পর থেকে সব মাছই নিজেকে ফটোশপে ইডিট করে ইলিশ মাছ হিসাবে পরিচয় দেয়। সবাই-ই সেলিব্রেটি হতে চায়। ইলিশ হচ্ছে সেলিব্রেটি মাছ।

গনেশ বলল, ‘কুবের বাই, এইডা কী ধরলা? শার্ক নাকি?’

কুবের বিরক্ত হয়ে বললো, ‘তুই আসলেই একটা গোবর গনেশ। পদ্মানদীতে আবার শার্ক আছে নাকি? যা আছে সব ফটোশপের শার্ক। আমারটা জেনুইন ইলিশ।’

‘ফটোশপ কী?’

‘তুই চুপ থাক তো। মাছটা পর্যন্ত তোর কথা শুইনা বিরক্ত হইতাছে।’

গনেশ চুপ করে গেল। কুবেরের এসব কথায় সে কিছু মনে করেনা। সে জানে, কুবের যতই রাগারাগি করুক, সে মানুষটা বড় ভালো। এক কথায় মাটির মানুষ। মেড অফ সয়েল।

গনেশ সাদামাটা নির্বোধ টাইপের মানুষ। ছাত্র জীবনে আগের রাতে প্রশ্ন পেয়েও পরীক্ষায় এ প্লাস পেতে পারতোনা। দিন দুনিয়ার কঠিন সব প্যাচ সে বোঝে না। সে কুবেরের সাথে পদ্মার বুকে মাছ ধরে। তারপর দুজনে মিলে ভাগাভাগি করে নিয়ে যায়। গনেশ অংকে দুর্বল হওয়াতে কুবের দুই একটা বেশী নেয়। দুর্নীতি থেকে জেলে পাড়াও মুক্ত নয়। এভাবেই পদ্মার বুকে ভর করে বেঁচে থাকে দুটি পরিবার।

দুইঃ

পদ্মা আজ উত্তাল। বর্ষার এই মৌসুমটাই জেলেদের জন্য বছরের সেরা সময়। কুবের আর গনেশ নৌকা নিয়ে মাছ ধরতে বের হয়েছে। কুবের চুপ করে আছে। একটু আগে খবর এসেছে কুবেরের একটা পুত্র সন্তান হয়েছে। এটা শুনেই কুবের চুপ হয়ে গেছে। গনেশ ব্যাপারটা ধরতে পারছেনা। বাসায় বউ থাকলে মাঝে মাঝে দুই একটা সন্তান হয়, এই পর্যন্ত সে জানে। কিন্তু এই সন্তান হওয়ার সুবিধা অসুবিধাটা সে ধরতে পারেনা কারণ সে নিজে ঘর জামাই। কুবের যেহেতু ঘর জামাই না, তাই সে সুবিধা অসুবিধাটা ভালোই ধরতে পারে এবং সন্তান হওয়ার খবর এলে চুপ মেরে যায়।

গনেশ বলল, ‘কুবের বাই, একটা গীত গাও।’

কুবের গাইলো, ‘মেরী আশিকি আব তুম হি হো।’ সাথে সাথে নৌকা একদিকে কাত হয়ে গেল।

গনেশ চিৎকার করে বলল, ‘কুবের বাই, তাড়াতাড়ি গীত থামাও, তুমি তো আমারে ডুবায়া মারবা।’

গীত বন্ধ হয়ে গেল। কুবের একটা আকিজ বিড়ি ধরালো। নৌকা এখন তীরের কাছাকাছি। গনেশ নৌকা তীরে ভেড়ালো। তীরের ওইখানে জমিদারের মুহুরী শেতলবাবুকে দেখা গেল। শেতলবাবু লোকটা বিরাটা ধান্ধাবাজ। বেশ কয়েকবার কুবেরের কাছ থেকে ইলিশ মাছ নিয়ে গেছে কিন্তু টাকা দেবার নাম নেই। অবশ্য কুবের ফটোশপের ইলিশগুলোই আসল ইলিশ বলে চালিয়ে দিয়েছে। কুবের ঠিক করে রেখেছে আজ যদি শেতলবাবু মাছ চায় তাহলে তার খবরই আছে।

কুবেরকে দেখে শেতলবাবু এগিয়ে এল।

‘কি রে কুবের, তোর হাতে ওটা কি? ফটোশপের ইলিশ নাকি?’

‘না, আসল ইলিশই। নগদ টাকা দিলে বেচুম। নাইলে বেচুম না।’

‘বেচুম না মানে! তাড়াতাড়ি ইলিশটা ব্যাগে ভর।’

কুবের ইলিশটা ব্যাগে ভরে শেতলকে দিতেই শেতল ব্যাগ নিয়ে হন হন করে হাটা শুরু করল।

কুবের বলল, ‘কী হইলো টাকা দেন।’

‘পরে নিস।’

‘ওই অখন দ্যান। নিজে খামু না? পোলাগো চায়নিজ খাওয়ামু না?’

শেতল কোন উত্তর না দিয়ে হাটা শুরু করল।

গনেশ বলল, হালা ডাকাইত। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকা টাকা এই হালায়ই সরাইছে।

কুবের এবার গনেশকে ফিসফিস করে বলল, ‘গনেশ, একটা মোটা দেখে দড়ি আন তো। এরে আজকে ডাবগাছের লগে টাইট কইরা বাইন্দা রাখুম। বিনা পয়সায় অরিজিনাল ইলিশ খাবি? খাড়া, তোরে ইলিশ খাওয়াইতাছি।’

গনেশ দড়ি আনামাত্র কুবের আর গনেশ মিলে শেতলবাবুকে ডাবগাছের সাথে শক্ত করে বেধে ফেলল। বেধে কিছুক্ষন কাতুকুতু দিল। শেতলবাবু হা করে তাকিয়ে রইলো।

কুবের বলল, এইবার বিনা পয়সায় ডাব খা।

তিনঃ

কুবেরের বাসায় তার স্ত্রী মালার ছোট বোন কপিলা বেড়াতে এসেছে। মালার দুটি পা-ই পঙ্গু, সে সারাদিন শুয়ে থাকে। শুয়ে শুয়ে স্টার প্লাসের ষড়যন্ত্রমূলক নাটক দেখে। মালাকে কুবেরের ভালো লাগেনা। কপিলাকে তার দারুন মনে ধরেছে, ছিপছিপে টাইপের একটা মেয়ে। কপিলার দিকে তাকালে কুবের যৌবনের হাতছানি শুনতে পায়, কিন্তু নিজের দিকে তাকালে সে বার্ধ্যকের হাতছানি শুনতে পায়।

কপিলার চাল চলন বড়ই রহস্যময়। সে চোখে কাজল দেয়, বাচ্চা মেয়েদের মত চুলে বেণি করে। কুবেরের দিকে কেমন কেমন করে তাকায়। এমনকি কপিলার ফেসবুক অ্যাকাউন্টের নামও ‘মিষ্ট্রিয়াস গার্ল’। রহস্যে ভরপুর এই নারীর আকর্ষন ক্যারেক্টার ডিলা কুবেরের মধ্যে আরো বেশী উন্মাদনা ছড়িয়ে দেয়। এর নামই কি তবে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা? কুবের বুঝতে পারেনা, হোয়াট ইজ লাভ।

কুবের আলগোছে কপিলার পাশে গিয়ে বসলো। কপিলা উঠানে বসে পান খাচ্ছিল।

‘কী রে কপিলা কখন আইছস?’

‘মাঝি মনডা ভালা না।’

‘ক্যান কী হইছে? ফেসবুকে লাইক কম পাস? ছবি কি ফটোশপ দিয়া ইডিট না কইরাই দিছস নাকি?’

‘না, শেতলবাবু আমার শাড়ির আচল চাইপা ধরসিল আসার সময়। বলসে আমারে উঠায়া নিয়া যাবে।’

‘চিন্তা করিস না। ওরে ডাবগাছের সাথে বাইন্দা থুইছি। বিনা পয়সায় ইলিশ খাইতে চাইছিল। এখন বিনা পয়সায় ডাব খাইতাসে।’

‘মাঝি, মনডা কাতর বড়। আমার জামাই শ্যামাদাস আমার গায়ে হাত তুলসে গতকাল।’

‘শ্যামাদাসরেও তাইলে ডাব গাছের লগে বানতে হইব।’

‘আমি ওর লগে আর সংসার করুম না।’

‘এইটা ভালো সিন্ধান্ত নিছস। শোন, তুই আর আমি মিলা নতুন সংসার ……’

কুবের আর কিছু বলার আগেই কুবেরের সদ্য জন্ম নেয়া পুত্র সন্তান চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করলো। কুবের বুঝতে পারলো, জেলে পাড়ার শিশুর ক্রন্দন কোনদিন বন্ধ হয়না। এই পাড়ায় অতিরিক্ত শব্দ দূষণের এটিও অন্যতম কারণ।

চারঃ

হোসেন মিয়ার সাথে কুবেরের রিলেশান সেইরকম। হোসেন মিয়া কুবেরকে দেখলেই খুব যত্ন আত্তি করে। কিন্তু সব কথার শেষ কথা একটাই, কুবেরকে ময়না দ্বীপে যেতে হবে। হোসেন মিয়া ময়না দ্বীপের মালিক। লুংগি আর স্যান্ডোগেঞ্জি পড়ে গুলিস্তানের গোলাপশাহ মাজারের পাশে বেলের শরবত বিক্রি করতে করতে হোসেন মিয়া কিভাবে একটা দ্বীপ কিনে ফেললো তা কারো কাছেই বোধগম্য না। উইকিলিকসও এই ব্যাপারে নীরব।

আজও হোসেন মিয়া কুবেরকে ধরে বসলো।

‘কুবের বাই, ময়না দ্বীপে চইলা যাও, তোমার সব কষ্ট দূর হইয়া যাইব।’

‘সব কষ্ট দূর হইলে অসুবিধা আছে হোসেন ভাই। কিছু কষ্ট থাকন দরকার।’

‘ওইখানে তোমারে আমি বিরাট একটা জমি দিমু।’

‘বিরাট জমি দিয়া আমি কী করুম? শুনছি, সেইখানে বাঘ সিংহ, কুমির এমনকি ডাইনোসরও আছে। জানিনা সেইগুলা ফটোশপের কিনা। তবে এগুলার সাথে বসবাস করা আমার সম্ভব না।’

‘তুমি চাইলে আমি কপিলারেও তোমার লগে যাওয়ার ব্যবস্থা কইরা দিমু। দুইজনে সেইখানে গিয়া সেইরকম ফুর্তি করবা।’

‘ইয়ে, কবে যাইতে হইব? দিন তারিখ ফিক্স করো।’

পাঁচঃ

কুবের সিন্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে সে ময়না দ্বীপে যাবে। কপিলাকে এ কথা জানাতেই কপিলা বলল, মাঝি আমারে সঙ্গে নিবা?

কুবের একটু ইমোশনাল ফ্লেভার আনার জন্য বলল, ‘সে কী ! তুই যাবি ক্যান? আমার জীবনের কোন অর্থ নাই, গরীব মানুষ, আমার বাঁচা মরা কোন আলাদা বিষয় না। তাই আমি যাইতাছি। তুই হইতাছস লাক্স ফটোসুন্দরী প্রতিযোগীতার ৫০ তম ক্যান্ডিডেট। তোর সামনে উজ্জল ভবিষ্যত। বিরাট মঠেল হবি তুই।’

‘তা তো ঠিকই বলসো, মাঝি। আচ্ছা ঠিক আছে তুমিই যাও।’

‘ইয়ে, না মানে, চল। এত করে যখন যাইতে চাইতাছস তাইলে চল।’

এই দৃশ্য দেখে দূর থেকে হোসেন মিয়ার চোখ ভিজে গেল। সে মনে মনে বলল, এর নামই ভালোবাসা। এই ভালোবাসা স্বর্গ থেকে আসে, তারপর পদ্মা নদী দিয়ে ময়না দ্বীপে চলে যায়।

পরিশিষ্টঃ

প্রকৃতির কন্যা পদ্মার বুকে বয়ে চলেছে একটি নৌকা। পদ্মা আজ শান্ত। এই নৌকায় দুইজন মানুষ – কুবের এবং কপিলা। তারা এখন তাদের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে স্ট্যাটাস আপডেট করছে।

কুবের তার ফেসবুকে লগিন করে স্ট্যাটাস দিল, On the way to MOYNA deep. Really nice. (With Kopila)

স্ট্যাটাসে রাশু এবং গোপী এসে কমেন্ট করলো, ‘ওসাম হইসে।’

সেই স্ট্যাটাস মালার চোখেও পড়ল।

মালা সাথে সাথে কমেন্ট দিল, ‘আমিও আসতাছি ময়না দ্বীপে খাড়াও। আইসা প্রেম পীড়িতি ছুটামু।’

কুবের দ্রুত মালার কমেন্ট রিমুভ করে দিল। কপিলা এইসব কমেন্ট দেখলে ঝামেলা হতে পারে।

কপিলা তার নিজের অ্যাকাউন্টে লগিন করে স্ট্যাটাস দিল, I have got my prince Kuber. Good Bye Shema Das.

ক্রিকেটার রুবেল হোসেন, বাংলার নায়ক শাকিব খান এবং শিল্পী আরেফিন রুমী এসে স্ট্যাটাসটি লাইক করলো।

শ্যামাদাস এই স্ট্যাটাস দেখামাত্র তাতে কমেন্ট দিল, ‘ফিরা আয় কইতাছি। নাইলে আমিও ময়না দ্বীপে আমু। আইসা লাঠি দিয়ে পিটায়া তরে বাসায় ফিরায়া আনুম।’

কপিলা দ্রুত শ্যামাদাসের কমেন্টটি রিমুভ করে দিল যাতে কুবেরের চোখে না পড়ে।

পদ্মার বুকে নৌকা বয়ে চলেছে। সূর্য প্রায় অস্তমিত। ময়না দ্বীপের কাছাকাছি এসে গেছে তারা দু’জন। দূর থেকে ময়না দ্বীপকে দেখে মৃত্যুপুরীর মত মনে হচ্ছে। এই দ্বীপে কেউ থাকে বলে মনে হল না। বোটম্যান কুবেরের কিছুটা ভয় লাগলো। ভয় কমানোর জন্য সে গাইলো, মেরী আশিকি আব তুম হি হো। সাথে সাথে নৌকা একদিকে কাত হয়ে গেলো।