সেন্ট মার্টিন যেতেও এখন ভিসা লাগবে…

Now Reading
সেন্ট মার্টিন যেতেও এখন ভিসা লাগবে…

সেন্ট মার্টিন
সাধারণত স্থানীয়দের কাছে “নারিকেল জিনজিরা” নামে পরিচিত। এটি বাংলাদেশে একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। এটি বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্ব অংশে একটি ছোট দ্বীপ, যা আমাদের দেশের দক্ষিণ অংশে পরিণত হয়েছে। এটি নাফ নদীর মুখ থেকে মায়ানমারের উত্তর-পশ্চিম উপকূলে প্রায় 8 কিলোমিটার পশ্চিমে অবস্থিত। এটির আকার মাত্র 8 বর্গ কিলোমিটার।

বিশেষজ্ঞরা এই দ্বীপটিকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন। উত্তর অংশকে নারিকেল জিনজিরা বলা হয়। এটা ২,১৩৪ কিমি দীর্ঘ এবং ১,৪০২ মি প্রশস্ত। দক্ষিণাঞ্চলীয় অংশটি দক্ষিনাপারা নামে পরিচিত এবং এর দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ যথাক্রমে ১৯২৯ মিটার এবং ১৮৯০ মিটার। মধ্যম অংশ যা স্থানীয়ভাবে মধ্যপারা নামে পরিচিত।যার দৈর্ঘ্য এবং প্রস্থ যথাক্রমে ১৫২৬ মি এবং ৫১৮ মিটার। এই দ্বীপটিতে রয়েছে জীবজন্তু এবং উদ্ভিদ কোরাল, মল্লুস্ক, মাছ, অ্যামফিবিয়ান, কচ্ছপ, স্ন্যাল, পাখি এবং স্তন্যপায়ী। নারকেল গাছ ছাড়াও এখানে অনেক গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসলও রয়েছে।

PC: Natural Beauty

এখানে প্রায় ৫৫০০ বাসিন্দা এবং তারা প্রাথমিকভাবে মাছ ধরেই জীবনযাপন করে। চাল এবং নারকেল, এখানের সবচেয়ে সাধারণ ফসল।শেওলা সংগ্রহও এই দ্বীপে খুব সাধারণ ফসল। পানি থেকে তা সংগ্রহ করার পর, স্থানীয় লোকজনেরা এটিকে শুকায় এবং অবশেষে মিয়ানমারে রপ্তানি করে। অক্টোবর ও এপ্রিলের মাঝামাঝি প্রতিবেশী এলাকার জেলেরা দ্বীপের ট্রানজিট পাইকারি বাজারে তাদের ধরা মাছগুলি নিয়ে আসে। কেন্দ্রে এবং দক্ষিণে প্রধানত কৃষিভূমি এবং অস্থায়ী হাট। বেশিরভাগ কৌতুহলী জিনিস দ্বীপের উত্তরের উত্তরে। খামারবাড়ি এবং অস্থায়ী হাট প্রধানত এই দ্বীপের কেন্দ্র।

নীল আকাশ ও সমুদ্রের নীল পানি একসঙ্গে মিলে, উপকূলের উপর বাঁধা নৌকা, নান্দনিক নারকেল গাছের সারি এবং ঢেউগুলির মৃদু বাতাসের নরম স্পর্শ বাংলাদেশের প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মাটিন এর সৌন্দর্য বর্ণনার একটি ছোট প্রচেষ্টা।

সেন্ট মার্টিনের বালি, পাথর, প্রবাল বা জীববৈচিত্র্য এবং ভ্রমণ পাইথন জ্ঞানের মানুষের অনন্য অবকাশ কেন্দ্র পরিষ্কার জলে জেলি মাছ, সব ধরনের সামুদ্রিক মাছ, কচ্ছপ ইত্যাদি সেন্ট মার্টিন এবং তার সংলগ্ন এলাকার রহস্যের এক জীবন্ত পাঠ হয়ে উঠেছে।

PC: Printerest

প্রধান দ্বীপ ছাড়াও এখানে কিছু ছোটো ছোটো দ্বীপ রয়েছে।যার মধ্যে একটি দ্বীপ রয়েছে যা চেরদিয়া বা চেরাদ্বীপ নামে পরিচিত যার অর্থ “পৃথক দ্বীপ”। যদিও সেন্ট মার্টিন দ্বীপে ছোট ছোট দ্বীপগুলির সংখ্যা অনেক তবে চেরাদ্বীপ দর্শনার্থীদের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয়। চেরাদ্বীপের মধ্যে রয়েছে সবুজ গুল্ম এবং পানিতে প্রচুর প্রবাল।

সেন্ট মার্টিন দ্বীপ খুব জনপ্রিয় একটি পর্যটক স্থান।কিন্তু গত 5 বছর সেন্ট মার্টিনের পরিদর্শক জনসংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।যার ফলে দ্বীপটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বর্তমানে দ্বীপের আশেপাশে ঘাসের বিভিন্ন প্রজাতির কচ্ছপ হারিয়ে যাচ্ছে যা সংরক্ষণের জন্য অনেক প্রচেষ্টা চলছে।এর পাশাপাশি প্রবালও প্রতিরক্ষা হারাচ্ছে। গত ৭বছরে সেন্ট মার্টিন প্রায় তার ২৫% প্রবাল প্রতিরক্ষা হারিয়েছে।

আর তাই সরকার আগামী ১ মার্চ থেকে সেন্ট মার্টিন দ্বীপে পর্যটকদের রাতারাতি থাকার জন্য নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
এছাড়াও সেন্ট মার্টিন দ্বীপের চেরাদ্বীপ ও গোলাপিপা এলাকায় যাওয়ার জন্য কোনও দর্শনার্থীদের অনুমতি দেওয়া হবে না।
২৩ সেপ্টেম্বর একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপের বিপন্ন জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়।
৯ সেপ্টেম্বর পরিবেশ অধিদপ্তর আন্তঃমন্ত্রণালয় এর সভায় সেন্ট মার্টিন আন্তঃমন্ত্রণালয় দ্বীপের জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের চিত্র তুলে ধরে একটি প্রতিবেদন দেয় যার ভিত্তিতে কমিটি এসকল সিদ্ধান্ত নেয়।

প্রতিবেদনের মতে,প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ২০ হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিন দ্বীপ পরিদর্শন করতে আসেন এবং রাতে সেখানে অবস্থান করেন যার ফলে দ্বীপটির জীব বৈচিত্র্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন সংস্থা থেকে নির্মাণ করা রাস্তার ফলে দ্বীপটির ক্ষতি বাড়ছে।
আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটির স্বল্পমেয়াদি সিদ্ধান্তে বলা হয়েছে, দ্বীপটিতে মোটরসাইকেল, গাড়ি, স্পিডবোট চলাচল করতে পারবে না। সমুদ্রসৈকতটির ভাঙন রক্ষায় জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে যা তীরের মহামূল্যবান প্রবালের ক্ষতি হচ্ছে এবং ভাঙন বাড়ছে। এই ধরনের ব্যাগ ফেলানো বন্ধ করতে বলেছে কমিটি।এছাড়াও রাতে হোটেলগুলোর বাতি জ্বালানোর ফলে কচ্ছপের প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। তাই রাতে দ্বীপে কোনো ধরনের আলো জ্বালানো যাবে না। আগামী ছয় মাস থেকে এক বছরের মধ্যে এসব সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হবে বলে জানানো হয়েছে।

এছাড়াও পরিবেশ ও বনসচিব আবদুল্লাহ আল মহসিন চৌধুরী বলেন- সেন্ট মার্টিন দ্বীপের সব স্থাপনা অবৈধ। এসব স্থাপনা সরিয়ে নিতে মালিকদের নোটিশ দেওয়া হয়েছে। দ্বীপে চলাচলকারী জাহাজের সংখ্যা ২০ থেকে কমিয়ে দুটিতে নামিয়ে আনা হবে। দ্বীপে সব ধরনের নতুন স্থাপনা নির্মাণ নিষিদ্ধ করে পুরোনো স্থাপনাগুলো উচ্ছেদ করা হবে এবং সেখানে কোনো জেনারেটর ব্যবহার করা যাবে না। আপাতত সৌরশক্তি ব্যবহার করতে হবে। দ্বীপে জমি কেনাবেচাও করা যাবে না।

দ্বীপটির সব হোটেল উচ্ছেদ করে জমি অধিগ্রহণ করা হবে। দ্বীপে বসবাসকারীদের অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে। দীর্ঘ মেয়াদে এই দ্বীপটি শুধুমাত্র জীববৈচিত্র্যের জন্য সংরক্ষণ করা হবে।

আর সবচেয়ে মূল্যবান তথ্যটি হচ্ছে, সেন্ট মার্টিন দ্বীপে যেতে হলে অনলাইনে নিবন্ধন করতে হবে এবং দিনে ৫০০জনের এর বেশি পর্যটক সেখানে যেতে পারবে না। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর তত্ত্বাবধানে পরিবেশ রক্ষা করে এই পর্যটন চলবে।