বাংলাদেশের নদীঃ এক অসহায় কান্না (১ম পর্ব)

Now Reading
বাংলাদেশের নদীঃ এক অসহায় কান্না (১ম পর্ব)

“আজ রক্তনালী শুকিয়ে গেছে, রক্তশূন্য দেশে
কেউবা কাদেঁ সেই জ্বালায়, কেউবা আছে বেশ”

নদী, মাত্র দুটি বর্ণের ছোট্ট একটি শব্দ কিন্তু তার গভীরতা আর তার প্রশস্ততা মানুষের জীবনে রেখেছে এক বিশাল স্থান। নদী নিয়ে কত গল্প কত কবিতা নিয়ে গড়ে উঠেছে কবি লেখকদের সখ্যতা আবার তার বৈরিতাকেই নিয়ে প্রকাশ পেয়েছে সাধারণ জন-মানুষের সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না। রবীন্দ্রনাথ যেমন মানুষের জীবনের ধারাবাহিকতাকে খুঁজে পেয়েছিলেন নদীর মাঝে তেমনি নদী পূর্ণতা পেয়েছে মানুষের জীবনে। আমাদের প্রাণের দেশ বাংলাদেশ, যা এমন একটি ভৌগোলিক অঞ্চলে রয়েছে যার কারণে বাংলাদেশ নদীর দেশ হিসেবেই গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে।

পৃথিবীর আদি সভ্যতা থেকে প্রায় সব সভ্যতাই গড়ে উঠেছে নদীকে কেন্দ্র করে। মোহেঞ্জাদারো ও হরপ্পা সভ্যতা গড়ে উঠেছিলো সিন্ধু নদের অববাহিকায়, সুমেরীয় সভ্যতা ইরাকের ইফ্রেতিস-তাইগ্রিস এর পাড়ে কিংবা চীনের গড়ে উঠা হোয়াংহো ও ইয়াংসি নদীর পাশেই গড়ে ওঠে। নদীই আমাদের বর্তমান সভ্যতাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। নীল নদ, সিন্ধু কিংবা হোয়াংহো সব নদীই বাঁচিয়ে রেখেছে তাদের সভ্যতাকে। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ যার সিংহভাগ অঞ্চল ঘিরে রয়েছে নদী।

বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। উপনদী, শাখা নদী সহ প্রায় ৮০০ টি নদী রয়েছে আমাদের দেশে। যদিও নদীর সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন মতভেদ রয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এর মতে বাংলাদেশে মোট নদীর সংখ্যা ৪০৫টি। এই ৪০৫টি নদী বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে ১০২টি নদী , উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে ১১৫টি নদী , উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ৮৭টি নদী , উত্তর-কেন্দ্রীয় অঞ্চলে ৬১টি নদী , পূর্ব-পাহাড়ি অঞ্চলে ১৬টি নদী এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ২৪টি নদী রয়েছে। এইসব নদী বাংলাদেশের ভূখন্ডের প্রায় ২৪,১৪০ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে বিস্তৃত রয়েছে।

হাজার হাজার ফুট উঁচু পাহাড় থেকে ছুটে চলে আসা জলরাশি স্থলভাগ অতিক্রম করার সময় নদী নামে পরিচিতি লাভ করে। এর ভেতর অনেকের নাম হয় নদী আর কেউবা নাম পায় নদ। নদ ও নদীর পার্থক্য হলো ব্যাকরণগত। যে সকল নদীর নাম নারীবাচক তাদেরকে বলা হয় নদী। আর যে সকল নদীর নাম পুরুষবাচক তাদেরকে বলা হয় নদ।

যে সকল নদী অন্য কোন নদী থেকে সৃষ্টি না হয়ে বরং কোনো প্রাকৃতিক উৎস (হিমবাহ, পর্বত, ঝর্ণা) থেকে সৃষ্টি হয় তাদেরকে বলা হয় প্রধান নদী বলা হয়। বাংলাদেশের প্রধান নদী গুলো হচ্ছে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, ব্রক্ষ্মপুত্র ও কর্ণফুলী। আমাদের দেশের প্রাণসঞ্চার জাগিয়ে রাখতে এইসব নদীর ভূমিকা অনেক। বাংলাদেশের দীর্ঘতম ও বৃহত্তম নদী হচ্ছে মেঘনা। মেঘনা নদীর দৈর্ঘ্য ৬৬৯ কিলোমিটার এবং প্রতি মিনিটে ৩৮১২৯ ঘনমিটার পানি প্রবাহিত হয় এই নদীতে। বিশ্বের ৩য় বৃহত্তম নদী হিসেবে মেঘনা অবস্থান করছে। বাংলাদেশের নদীগুলোর মধ্যে সবচেয়ে নাব্যতাও বেশি মেঘনা নদীর। যার গভীরতা প্রায় ৬০৯ মিটার। আর সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম নদী গোবরা যার দৈর্ঘ্য প্রায় ৪ কিলোমিটার। আর বাংলাদেশের সবচেয়ে খরস্রোতা নদী হচ্ছে কর্ণফুলী নদী।

কিন্তু বাংলাদেশ আজ মরুভূমি হওয়ার দিকে একটু একটু করে যাত্রা করছে। বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলো আন্তর্জাতিক বা আন্তঃসীমান্ত নদী। আন্তঃসীমান্ত নদী এমন ধরণের নদী যা এক বা একাধিক দেশের রাজনৈতিক সীমা অতিক্রম করে। বাংলাদেশের আন্তঃসীমান্ত নদীর সংখ্যা প্রায় ৫৮টি যার ভেতর ৫৫ টি নদীই এসেছে ভারতের সীমান্ত পেরিয়ে। অন্য বাকি ৩টি নদী সাঙ্গু, মাতামুহুরি ও নাফ এসেছে মায়ানমার থেকে। বাংলাদেশ থেকে ভারতে প্রবেশ করেছে এরূপ নদীর সংখ্যা মাত্র ১টি (কুলিখ নদী)। আর বাংলাদেশ থেকে ভারতে আবার ভারত থেকে বাংলাদেশে আসা নদীর সংখ্যা মাত্র ৩টি। আত্রাই, পুণর্ভবা ও ট্যাঙ্গন সেই ৩টি নদী।আন্তঃসীমান্ত নদী গুলো বাংলাদেশের জলবায়ু, অর্থনৈতিক ভারসাম্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় বিরাট ভুমিকা রাখে। অপরদিকে এই নদীগুলো তাদের স্রোতের সাথে পলি মাটি বহন করে যা নদীর তলদেশ ভরাট করে ফেলে এই কারনে অনেক সময় দেখা দেয় বন্যার প্রকোপ।
কিন্তু ভারত এইসব নদীর উপর বাঁধ নির্মাণ করে আমাদের জলবায়ু এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করার পিছনে অনেক বড় ভূমিকা পালন করছে। কোনো আন্তর্জাতিক নদীর উপর বাঁধ নির্মাণ করে এর গতিপথ পরিবর্তন করতে চাইলে অন্য যে দেশে এই নদী গিয়েছে তাদের অনুমতি নিয়ে বাঁধ নির্মাণ করতে হয় এবং আন্তর্জাতিক আইন অনুসারে তাদেরকে সেই নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা প্রদান করতে হবে। ভারত সেই আন্তর্জাতিক নিয়মের কোনো তোয়াক্কা না করে আমাদেরকে আমাদের পানির ন্যায্য হিস্যা প্রদান করেছে না। এই কারণে আমাদের দুই দেশের মাঝে রয়েছে বহুদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা।

ভারত বাংলাদেশে আসা আন্তঃসীমান্ত নদী গঙ্গা নদীতে ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তা নদীর উপর গজলডোবা বাঁধ, বরাক নদীর উপর টিপাইমুখ বাঁধ প্রদান করছে। ভারত দিবাং বাঁধ নামে নতুন একটি বাঁধ এর পরিকল্পনা করছে যা ভারতের অরুণাচল প্রদেশে ব্রক্ষ্মপুত্র নদের উপর করা হবে। এই বাঁধ যদি দেয়া হয় তাহলে দিবাং বাঁধ হবে ভারতের সবচেয়ে বড় বাঁধ।
বড় নদীর উপর বাঁধ নির্মাণ করে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করলে তা বাঁধ নির্মাণ অঞ্চল এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য এর ব্যাপক ক্ষতি করে। ভারত এইসব আন্তর্জাতিক নদীর উপর জল বিদ্যুৎ কেন্দ্র কিংবা তাদের খরা প্রবণ অঞ্চলে পানি দেয়ার জন্য বাঁধ প্রদান করে আমাদের দেশের জন্য ব্যাপক ক্ষতি করছে।যার ফলে আমাদের অর্থনৈতিক ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়া সহ নানা ধরনের ক্ষতি সাধন করছে।
এই লেখার ২য় পর্বে আমরা তুলে ধরবো কিভাবে ভারতের এইসব বাঁধের কারণে আমাদের দেশের উত্তরাঞ্চাল মরুভূমি হয়ে যাচ্ছে। কিভাবে ফারাক্কা বাঁধ আমাদের ক্ষতি করছে, কিংবা টিপাইমুখ বাঁধ আমাদের জন্য কি কোনো সুখ বয়ে এনেছে?