চীন সুপার পাওয়ারে পরিণত হলে ১০টি উপায়ে ঘটবে বিশ্বের পরিবর্তন

Now Reading
চীন সুপার পাওয়ারে পরিণত হলে ১০টি উপায়ে ঘটবে বিশ্বের পরিবর্তন

চীন তার লক্ষ্য স্থির করেছে যে আগামীতে তারাই হবে সুপার পাওয়ার দেশের অধিকারী। তারা ইতিমধ্যেই এ লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও কর্ম কৌশল গ্রহণ করেছে। এ ব্যাপারে চীনের প্রেসিডেন্ট শিং জিং পিং জনসম্মুখে ঘোষণা করেছে, আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে তারা বিশ্ব নেতৃত্ব দেবে। ইরাক-সিরিয়াসহ একাধিক দেশে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে ব্যস্ত আমেরিকা। এদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত এককালের দাপুটে রাশিয়া। অন্যদিকে সুনির্দিষ্ট রণকৌশল ও সাহসী পদক্ষেপ নেয়ার অক্ষমতায় ভুগছে ভারতের মতো দেশ। ফলে এই মুহূর্তে একক শক্তির আসন কার্যত টালমাটাল। আর এমন পরিস্থিতিতে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে আমেরিকাকে ধরাশায়ী করার ছক কষছে চীন। অঢেল প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য্য, বিশাল মানব সম্পদ এবং শক্তিশালী অর্থনীতিতে ভর করে কিভাবে এগিয়ে যাওয়া যাবে এমন পরিকল্পনাই করছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

যদি চীন তার লক্ষ্য অর্জন করে তবে বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করবে পৃথিবীর আমূল এক পরিবর্তন, হয়ত আমাদের জীবদশায় তা দেখে যেতে পারব। তেমন যদি হয় ইতিহাসে প্রথমবারের মত আমেরিকার প্রভাব প্রতিপত্তি হ্রাস ঘটবে এবং অন্যদিকে বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হবে চীনের। আমাদের স্পষ্ট কোন ধারণাই নেই বিশ্ব কিরুপ অবস্থায় রুপ ধারণ করবে। চীন তাদের ইমেজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছে কিভাবে বৃহৎ শক্তি রুপে নিজেদের জানান দেয়া যায়।

আফ্রিকা হতে পারে বিশ্ব শক্তিধরের একজনঃ চীনের এমন উত্থান আবার তাদের জন্য মঙ্গল জনক নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আফ্রিকা শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এদিকে অনেকে কল্পনাই করতে পারবেনা আফ্রিকার বিষয়ে চীন খেলার কি দান টাই চালছে। বর্তমান সময়ে আফ্রিকার সাহায্যকারী প্রধান দেশ হিসেবে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। তারা সেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে এবং অদূর ভবিষ্যতে এই পরিমাণ আরো বাড়বে। তারা সেখানে এমন অনেক প্রকল্প নিয়ে এগুচ্ছে যা ২০২৫ সালের মধ্যে বিনিয়োগের লক্ষ্য মাত্রা হবে ১ট্রিলিয়ন ডলার। পাশ্চাত্য দেশ গুলি অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে এখানে বিনিয়োগ করাতে, কেননা এই অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশই স্বৈরচার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বিভিন্ন দেশে আমেরিকান অর্থ বিনিয়োগ হয় রাজনৈতিক সংস্কার এবং গণতন্ত্রায়নের নিমিত্তে। তবে সে ক্ষেত্রে চীন এসব পরোয়া করেনা, তারা আফ্রিকার দারিদ্র বিমোচনে বিনিয়োগ করে যাচ্ছে। তাদের ভাষ্যমতে, আফ্রিকায় বিনিয়োগ করা প্রতি ডলারের বিপরীতে ৬ডলার আয় করছে। ইতিমধ্যে চীন ও আফ্রিকার মধ্যে বেশ ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। চীন চাচ্ছে সে সম্পর্কের প্রসার ঘটিয়ে ব্যপক বিনিয়োগের। ইতিমধ্যে আফ্রিকাও তার সুফল পেতে শুরু করেছে, আফ্রিকার একশ কোটি লোকের মধ্যে ৩০ কোটি লোক ইতোমধ্যে পৌঁছে গেছে মধ্য আয়ের সারিতে। তাদের দারিদ্রতা বলতে গেলে অনেকটাই বিমোচিত হয়েছে। বলা হচ্ছে চীন ও আফ্রিকার এই সম্মীলনে ভবিষ্যতে বিশ্ব পাবে এক নতুন মাত্রা। ‘সুপার পাওয়ার’ হিসেবে বিশ্বে নিজের দাপট বাড়ানোর নকশা তৈরি করে ফেলেছে চীন। আসুন কিছু বিষয়ে আলোকপাত করি কিকি কারণে চীন তার লক্ষ্যস্থলে পৌঁছাতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মন্দাঃ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে নানামুখি সংকট বর্তমান বিশ্বের এই এক নম্বর সুপার পাওয়ার দেশটির ভবিষ্যৎ অনেকটাই অনশ্চিয়তার মুখোমুখি। যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে এই সংকট হতে উত্তরণ লাভ করলেও দীর্ঘ মেয়াদে দেশটি কোনোভাবেই তার অবস্থান ধরে রাখতে পারবে বলে মনে করছেন না আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য তারা নিজেরাই দায়ী এই সংকটের প্রধান কারণ তাদের অতিমাত্রায় ভোগবাদিতা এবং বিলাসিতা। জীবনটা বিলাসীভাবে উপভোগ করতে গিয়ে তারা অধিক মাত্রায় ঋণ করার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আর সাধারণ নাগরিকদের এই মনোভাবকে পুঁজি করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সে দেশে জমজমাট ব্যবসায় করে যাচ্ছে। এর কারণ বিশ্বের স্বল্প সুদে সহজে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সবার শীর্ষে। সেখানকার ব্যাংকগুলো ঋণ আদায়ে যথেষ্ট দীর্ঘ সুত্রিতার সম্মুখীন হচ্ছে। অনেক ব্যাংক ইতিমধ্যেই ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে দেউলিয়া হয়ে গেছে। ২০০৭ সাল থেকে ২০১১ সালের মধ্যে মোট ১৫৪টি বড় আকারের ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেছে। এ ছাড়াও দেশটি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না করে অনুৎপাদনশীল খাতে অতিমাত্রায় পুঁজি বিনিয়োগের ফলে ক্রমশ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। যার প্রভাব সমগ্র অর্থনীতির উপর ভর করেছে। এদিকে দেখা যাচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বহির্বিশ্বের দেশগুলোতে চীনের বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি।  তাই অনেক ক্ষেত্রে এই অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণে চীনের ভুমিকাও জড়িত। চীন চাচ্ছে অর্থনৈতিক কৌশল ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ক্রমশ দুর্বল করে দিতে।

আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাপী ভূমিকাঃ অনেকের অনুমান সত্ত্বেও হয়ত এই মুহূর্তে চীন পৃথিবীর কোথাও তার শক্তি প্রয়োগ করবে না কিংবা কাউকে কমিউনিস্ট হতে প্রলুব্ধ করবেনা। যদি আফ্রিকার সাথে তাদের কোন চুক্তি সম্পাদিত হয়, চীন খুব শান্ত উপায়েই তা নিয়ন্ত্রণ করছে। চীনের সরকারি কিছু চুক্তি আছে আফ্রিকার সাথে যেখানে তারা কোন হস্তক্ষেপ করতে চায়না। যদিও সেক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি সম্পূর্ণ উল্টো, তারা অনুন্নত দেশ এবং স্বৈরশাসক নিয়ন্ত্রিত দেশ সমুহে লিখিত কিংবা অলিখিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু চীন এর নীতি হল তারা সে দেশকে নিজেদের মত থাকতে দিতে চায়। এমনকি সুদান ও জিম্বাবুয়ের মত দেশে বিনিয়োগ সত্ত্বেও তাদের মানবাধিকার, আইন ও বিচার ব্যবস্থায় নুন্যতম প্রভাব বিস্তার করেনি চীন। আর এখানেই পার্থক্য চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। আমেরিকান সামরিক বাহিনী অক্ষম মানেই আমেরিকা অরক্ষিত, এমনকি সমগ্র ইউরোপের যে সকল দেশ গণতান্ত্রিক তাদের ক্ষেত্রেও তাই যারা আমেরিকার সামরিক বাহিনীটিকে তাদের প্রধান রক্ষাকবচ হিসেবে গণ্য করে। কিন্তু চীন এসব গণতন্ত্র নিয়ে ভাবেনা, এবং যদিনা আমেরিকা তার শক্তির প্রদর্শন মাত্রা ছাড়ায় সেক্ষেত্রে অদূর ভবিষ্যতে দেখা যাবে যে চীনা সামরিক বাহিনী সমগ্র বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ সমূহ গ্রাস করে বসবে। রাজনৈতিক মাপকাঠিতে আপাত নিরীহ মনে হলেও প্রয়োজনে চীন তার ভয়ংকর রুপ প্রকাশে দ্বিধা করবে না হয়ত।

বিশ্ব বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি হবে রাজ্য নির্ধারিতঃ চীন এখন ঠাণ্ডা মাথায় তার লক্ষ্য অর্জনে এগুচ্ছে। পৃথিবীর কোথাও অস্ত্র ও বোমা ব্যবহারের পরিবর্তে অন্য পন্থা অবলম্বন করছে। তার মধ্যে আরেকটি হল চীনা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসার। এই পদ্ধতিকে তারা বলছে “ সফট পাওয়ার”। তারা তাদের স্কুল ও বিশ্ব বিদ্যালয় গুলোতে বাধ্যতামূলক রাজ্য নির্ধারিত পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করেছে। এসব পাঠ্য সূচি চীন এবং কমিউনিস্ট পার্টির ভাবধারায় প্রবর্তিত। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের তুলনায় তারা এখন আফ্রিকান ছাত্রদের প্রতি বেশি ঝুঁকছেন তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির ব্যাপারে। কেননা সেই ছাত্ররাই হতে পারে ভবিষ্যৎ রাজনীতিবিদ বা নেতা। শুধুই যে চীনে এই ব্যবস্থা আছে তা কিন্তু নয়, চীনের এই ভাবধারাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে পৃথিবীর ১৪০টি দেশে চালু হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ১৫০০টি মত চীনা স্কুল বা শিক্ষা কেন্দ্র।  সেসব শিক্ষা কেন্দ্রে নিয়োজিত আছে বহু চীনা শিক্ষক যারা প্রতিনিয়ত শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন, কিভাবে চীন উন্নয়নের মডেলে রুপান্তর হচ্ছে এবং পাশ্চাত্য ভ্রান্ত ধারণাগুলো সঠিক রুপ কি হবে। পাশাপাশি চীন সম্পর্কে বিশদ ভাবে জানা এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ঐতিহ্য সম্পর্কে ছাত্রদের মধ্যে ধারণা দেয়া। আর এ সব কিছুই চীনের রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুমোদিত পাঠ।

নতুনভাবে চীনের ইতিহাস রচিতঃ  চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ১৯তম দলীয় অধিবেশনে প্রায় ২,৩০০ প্রতিনিধির উপস্থিতিতে সিপিসি’র মহাসচিব হিসাবে ৫বছরের জন্য মনোনীত হয়ে পুনরায় দেশটির প্রেসিডেন্ট পদে অভিষিক্ত হয়েছেন শি জিনপিং। পার্টির পলিট ব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দলের অভ্যন্তরে তার ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এমনকি, বেঁচে থাকলে নজিরবিহীনভাবে তৃতীয় দফাতেও তিনি শীর্ষ পদে আসীন হতে পারেন। পাঁচ বছর অন্তর সিপিসি-র কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যসংখ্যা প্রায় নয় কোটি যার মধ্যে সেন্ট্রাল কমিটির সদস্যসংখ্যা ২০৪৷ পার্টির সিদ্ধান্তনুযায়ী শি জিনপিং ও তাঁর মতাদর্শকে সরকারিভাবে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে৷ চীনের অবিসংবাদিত নেতা মাও সে তুং এর পর এই বিরল সন্মান ও ক্ষমতা শি জিংকে চীনের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতায় পরিণত করেছে৷ চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মাও সে তুং এবং তার উত্তরসূরি দেং জিয়াওপিং এর পর তৃতীয় ব্যক্তি হলেন শি জিং যিনি এই বিরল সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।

এদিকে শি জিং এর মতাদর্শের একটি মূল নীতি হলো অর্থনীতি থেকে সোশ্যাল মিডিয়া অবধি সমাজজীবনের প্রতিটি অঙ্গে ও প্রতিটি ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকাকে সম্যক গুরুত্ব দেওয়া৷ প্রেসিডেন্ট শি জিং পার্টির জাতীয় কংগ্রেস উদ্বোধনের সময় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে, চীন ২০৫০ সালের মধ্যে ‘‘ বিশ্ব নেতৃস্থানীয় দেশে’’ পরিণত হবে।

ইউরোপে বিভক্তির সম্ভাবনাঃ  ইউরোপের বিভক্তি হবে সমগ্র বিশ্বের জন্য বিপদজনক। তবে শঙ্কার বিষয় হচ্ছে যে, ইউরোপে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখন বিভক্তি প্রতীয়মান। বিবিসির ‘ক্রসিং ডিভাইডস’ শীর্ষক এক জরিপে দেখা গেছে, অনেক ইউরোপিয়ান মনে করছেন তাদের দেশগুলোতে এখন যেসকল বিভক্তি দৃশ্যমান, দশ বছর পূর্বেও তা ছিল বিরল। শতকরা ৪৭ ভাগ মানুষই মনে করছেন, সমাজে সহনশীলতা অনেকটাই লোপ পেয়েছে, বেড়েছে অস্থিরতা।

‘ইপসস মরি’ নামক অনলাইনের আরেক জরিপের হিসেব অনুযায়ী, ইউরোপের ২৭টি দেশের ৬৬ ভাগ মানুষ মনে করেন তারা জাতিগতভাবে অনেক বেশি বিভক্ত। আর ৪৪ ভাগ মানুষ মনে করেন, বিশ্বব্যাপী যে উত্তেজনা চলছে তার মূল কারণ হচ্ছে রাজনীতি। এছাড়া অধিকাংশ ব্রিটিশ মনে করেন ব্রিটেনে অভিবাসী ও সেদেশের নাগরিকদের মধ্যে স্পষ্ট বিভক্তি আছে। জরিপে ১১টি ইউরোপিয়ান দেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। দেশগুলো হলো- জার্মানি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, হাঙ্গেরি, ইটালি, পোল্যান্ড, স্পেন, সুইডেন, সার্বিয়া, যুক্তরাজ্য এবং রাশিয়া। আর যদি তাই হয় তবে এই বিভক্তি কৌশল হিসেবে কাজে লাগাতে পারে চীন। কেননা যে কোন বিষয়ে বিভক্তি মানেই পরস্পর দুইটি পক্ষ, আর বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষ হিসেবে চীন বরাবরই ভূমিকা রেখে এসেছে।

তাইওয়ান হতে পারে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুঃ তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার লক্ষ্যে ‘তাইওয়ান ট্র্যাভেল অ্যাক্ট’ নামক পাস হওয়া বিলে স্বাক্ষর করাতে চীন প্রয়োজনে যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। মার্কিন সিনেট কর্তৃক সর্বসম্মতিক্রমে পাস হওয়া বিলটিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বাক্ষর করলে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনে পরিণত হওয়ার অপেক্ষায়। প্রশ্ন জাগতে পারে এমন কি আছে বিলটিতে যা চীনের ঘোরতর আপত্তির কারন। বিলটিতে উল্লেখ আছে, তাইওয়ানের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা ‘সম্মানজনক প্রোটোকলে আমেরিকা সফর করতে পারবেন এবং শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এর সুযোগ লাভ করবেন। বিপরীতে যেকোনো পর্যায়ের মার্কিন কর্মকর্তারাও তাইওয়ান সফরে গিয়ে তাদের সমকক্ষদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবেন।

দীর্ঘদিন ধরেই চীন স্বায়ত্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবী করে আসছে। যে কোন কিছুর বিনিময়ে তাইওয়ান করায়ত্ত করতে তারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাই যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক এই সিদ্ধান্তে বেইজিং আপত্তিস্বরূপ প্রতিবাদ জানিয়েছে এই কারণেই যে, বিষয়টি ‘এক চীন’ নীতির পরিপন্থি। এদিকে চীন তার সামরিক শক্তি তাইওয়ান প্রণালি থেকে শুরু করে জেমস শোয়াল অঞ্চল পর্যন্ত মোতায়েন করেছে। এই অঞ্চলেই অবস্থিত বিতর্কিত পার্সেল দ্বীপপুঞ্জ, ম্যাকক্লিসফিল্ড ব্যাংক এবং স্পার্টলি দ্বীপপুঞ্জ। চীনা সেনাবাহিনী তার সর্বশেষ সংস্কারের আওতায় সাব মেরিন বহরকে উক্ত অঞ্চলে মোতায়েন করেছে। তাই ধারণা করা হচ্ছে যেকোন উত্তেজনাকর মুহূর্তে তাইওয়ান আক্রান্ত হতে পারে চীন কর্তৃক।

উৎপাদন খাতে চীনের আমূল পরিবর্তন অভিসম্ভাবীঃ চীনের প্রেসিডেন্ট শিং জিং পিং মেড ইন চায়না : ২০২৫ নামে এক পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন। আর চীনের এই মহাপরিকল্পনায় কার্যত দুশ্চিন্তায় পড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রশ্ন জাগতে পারে কি এমন আছে সেই পরিকলনায়। পৃথিবীর যে কোন দেশে এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে কোন দোকানে ঢুকে চোখ বুলালেই দেখা যাবে পণ্যের অর্ধেকই চীনের তৈরি। মেড ইন চায়নার এই সাফল্যের কাহিনী কম বেশি সকলেরই জানা। কেননা এত সস্তায় কোন জিনিস পৃথিবীর আর কেউ এখনো পর্যন্ত তৈরি করতে পারেনি। কিন্তু পণ্যের গুনগত মান নিয়ে মানুষের মধ্যে একটি নেতিবাচক ধারণা আছে। কেননা চীনের ব্যর্থতা হচ্ছে তারা এখনো বিশ্ববাজারে নিজেদের ব্র্যান্ডগুলিকে সেভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি, যেভাবে পেরেছিল এশিয়ার অন্য আরেক জায়ান্ট জাপান। চীনের পন্য গুলোতে তাদের কোন নিজস্বতা নেই বলে প্রচার আছে, কেননা তারা পন্যের হুবুহু নকল করতেই অভ্যস্থ। তাই চীন এখন ‘মেড ইন চায়নার’ এই ভাবমূর্তি সম্পূর্ণ বদলে দিতে বদ্ধ পরিকর। চীনের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে তার ম্যানুফাকচারিং খাত। আর সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভিন্ন কৌশলে নতুন ট্রেড মার্ক সংযোজন করতে চায় চীন।

তারা যে পরিকল্পনাটি গ্রহণ করেছে মূলত তা তিন ধাপের। ২০২৫ সাল সেই পরিকল্পনার প্রথম ধাপ মাত্র। ২০২৫ সাল নাগাদ চীন যেসব পণ্য তৈরি করবে, তার সবকিছুরই গুনগত মান তারা বাড়াতে চায়। এ লক্ষ্যে শিল্প-কারখানাগুলোর উৎপাদনে তারা প্রয়োগ করবে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি। এছাড়াও এমন কিছু চীনা ব্র্যান্ড তারা তৈরি করবে, যেগুলো কিনতে ঝাঁপিয়ে পড়বে বিশ্ববাসী।

পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে ২০৩৫ সাল, এ সময়কালে চীনা কোম্পানিগুলো বিশ্বের বাকী সব কোম্পানিকে প্রযুক্তি, পণ্যের গুনগত মান এবং সুনামে ছাড়িয়ে যেতে চায়। এ লক্ষ্যে তারা নতুন উদ্ভাবনের দিকে মনোনিবেশ করবে এবং বিশ্ব নেতৃত্ব দেবে।

আর ২০৪৯ সাল হচ্ছে পরিকল্পনার তৃতীয় ধাপ, আধুনিক চীন যখন উদযাপন করবে তার প্রতিষ্ঠার একশো বছর। এই মহেন্দ্রক্ষণে চীন ম্যানুফ্যাকচারিং জগতে  বিশ্বের এক নম্বর শক্তি হয়ে উঠার পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে।

মেড ইন চায়না : ২০২৫ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে চীনা কম্পানি আর চীনা ব্র্যান্ড বিশ্ব বাজারে চীনা আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। আর এটাই যুক্তরাষ্ট্রকে মাথা ব্যথার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা দেবে।

চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের সম্ভাবনাঃ সাম্প্রতিককালের ঘটনা প্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে আমেরিকা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দূরত্ব ক্রমশ বাড়ছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সভায় এখন এই বিষয়টি প্রকাশ্য। যুক্তরাষ্ট্র কোন প্রস্তাব করলে চীন যেমন ভেটো দিয়ে আটকে দেয় ঠিক তেমনি চীনের প্রস্তাবের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র একই ভূমিকা পালন করে। একদিকে চীন মরিয়া সুপার পাওয়ার দেশে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও মরণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে নিজের অবস্থান সংহত রাখতে। কেউ যেন কারো চেয়ে কম নয়, আর কেউ কাউকে ছেড়েও কথা বলছেনা। এসবের বাইরেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে চীন এখন অনেকটাই মুখোমুখি। বিশ্বে প্রবাহমান বিভিন্ন সমুদ্র সীমানা দখল নিতে এই দুই শক্তিধর রাষ্ট্র চেষ্টার ত্রুটি রাখছেনা। কৌশল হিসেবে নিজেদের মিত্র রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তারা জোটবদ্ধ হয়ে শক্তির মহড়া প্রদর্শন করে তা বাস্তবায়ন করতে চায়। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং বিমান বাহিনীর বিরুদ্ধে লেজার রশ্মি ব্যবহার করছে চীন, এমনটাই অভিযোগ মার্কিন সেনা কর্মকর্তাদের। চীনের লেজার আক্রমণে অনেকটাই দিশেহারা যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্তৃপক্ষের দাবী, গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এমন ২০ টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে যেখানে চীন লেজার ব্যবহার করার সমস্ত প্রমাণ তাদের রয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী যে লেজার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়, তা মার্কিন সামরিক ঘাঁটির কাছাকাছি অবস্থিত চীনা সামরিক ঘাটি থেকে এর উৎস বলে মনে করা হয়। তবে চীনের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন ও অমূলক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

এদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং তাঁর সম্প্রতি এক ভাষণে বলেছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে চীনের সেনাবাহিনী বিশ্বের অন্যতম সেরা বাহিনীতে পরিণত হবে। তিনি আরো ঘোষণা দিয়েছেন যে, জাতীয় পুনর্গঠনের লক্ষ্যে নিজেদের পরিবর্তিত করার সময় এসেছে এবং সমস্ত বিশ্বকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক পাওয়ার দেখানোর জন্য তারা তৈরি হচ্ছে।” চীনের সেনাবাহিনী সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টির অধীনস্থ। সেনার হাইকমান্ড হলো সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন, যার চেয়ারম্যান স্বয়ং জিনপিং। তিনি এই বাহিনীর ‘কোর লিডার’ বা সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে মনেনীত হয়েছেন। জিনপিং এখন একাধারে দলের শীর্ষ নেতা, দেশের প্রেসিডেন্ট ও সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ডার, যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে তাকে এখন আর বেগ পেতে হবেনা। ২০১২সালে জিনপিং প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই ক্রমাগত চীনের সামরিক শক্তি বাড়াতে তৎপর ছিলেন। বর্তমানে চীনের সামরিক বাজেট প্রায় ১৪ হাজার কোটি ডলার এরও অধিক, যা আমেরিকার পর সর্বোচ্চ। ২০৩৫-এর মধ্যে বাহিনীকে বিশ্বের অন্যতম সেরা করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছেন জিনপিং। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মাথা ব্যথার অন্যতম কারন এখন চীনের সামরিক উত্থান। দুই দেশই রয়েছে যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে, তাই আশংকা বিরাজ করছে যেকোন মুহূর্তে পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার। অভিসম্ভ্যাবি সেই যুদ্ধে দুই দেশই তাদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। যদি কোন কারনে যুদ্ধ বেঁধে যায়, সে ক্ষেত্রে বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে ভবিষ্যৎ সুপার পাওয়ার কে হবে।

 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মঞ্চায়নে অবতীর্ণ হওয়া বিশ্ব শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহের দ্বন্ধ

Now Reading
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ মঞ্চায়নে অবতীর্ণ হওয়া বিশ্ব শক্তিধর রাষ্ট্রসমূহের দ্বন্ধ

১৯৩৯ সালের ১সেপ্টেম্বর পোল্যান্ড আক্রমণের মাধম্যে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করেন হিটলার। এই যুদ্ধ (১৯৩৯-১৯৪৫) দীর্ঘ ছয়বছর স্থায়ী ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধেও পৃথিবীর ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলো দুভাগে বিভক্ত হয়ে গিয়েছিল, এর একটি পক্ষ অক্ষশক্তি অন্যটি মিত্রশক্তি। অক্ষশক্তির মধ্যে ছিল জার্মানি, ইতালি এবং জাপান অন্যদিকে তাদের প্রধান প্রতিপক্ষ মিত্রশক্তি গঠিত হয়েছিল ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমন্বয়ে। যদিও অপ্রত্যাশিতভাবে রাশিয়াও ছিল মিত্রশক্তির দলে। যুদ্ধে একের পর এক জার্মানির পরাজয়ের প্রেক্ষিতে ১৯৪৫সালের এপ্রিলে জার্মানি ও ইতালি মিত্র বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে। হিটলার নিজেকে ধরা না দিয়ে আত্মহত্যা করেন এবং ইতালির একনায়ক মুসোলিনিকে গ্রেফতার পরবর্তী হত্যা করা হয়। অন্যদিকে, ১৯৪৫সালের ২আগস্ট যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও রাশিয়া পটাসডাম সম্মেলনে জাপানকে আত্মসমর্পণ করতে বললে জাপান তা প্রত্যাখ্যান করে। পরে ৬ ও ৯ আগস্ট হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে আনবিক বোমা বর্ষণ করা হয় ফলে ১৪ আগস্ট ১৯৪৫ জাপান শর্তহীনভাবে আত্মসমর্পণ করে।  এখানে একটা কথা বলা ভাল আর তা হচ্ছে জাপান কর্তৃক পার্ল হারবারে হামলা। ১৯৪১ সালের ৭ডিসেম্বর হাওয়াই এর ওয়াহু দ্বীপে অবস্থিত পার্ল হারবারে মার্কিন নৌ ও বিমান ঘাঁটিতে জাপান বিমান হামলা চালিয়ে তা ধ্বংস করে দেয়। জাপানী বিমান হামলায় চোখ খুলে যায় মার্কিনীদের, তারা সিদ্ধান্ত নিল জাপানে মরনাস্ত্রের আঘাত হানার। তারা পারমাণবিক বোমা তৈরির পরিকল্পনা হাতে নিল। ১৯৪৫ সালের ১৬জুলাই নিউ মেক্সিকোর মরুভূমিতে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক বোমার সফল পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ঘটায়। এর ঠিক তিন সপ্তাহ পর হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা বর্ষণ করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছিল আনবিক বোমার ভয়াবহতা। বিংশ শতাব্দীতে এ ঘটনা পরবর্তী বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরণের প্রভাব ফেললেও বৃহৎ শক্তিগুলো কখনো মরনাস্ত্র তৈরি, উৎপাদন ও পরীক্ষা থেকে পিছ পা হয়নি। বিংশ শতাব্দী প্রত্যক্ষ করেছে আটটি দেশের উত্থান, যারা নিজেদেরকে পারমাণবিক শক্তির অধিকারী হিসেবে ঘোষণা করেছে। নিরস্ত্রীকরণের ক্ষেত্রে কিছু কিছু অগ্রগতি হলেও (এনপিটি চুক্তি ও সিসিবিটি চুক্তি স্বাক্ষর) বৃহৎ শক্তিগুলোর ভূমিকা বরাবরই প্রশ্নের সম্মুখীন ছিল। পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার ও উৎপাদন বন্ধের ব্যাপারে তারা কখনো আন্তরিক ছিলনা। এমনকি জাতিসংঘও এ ব্যপারে তেমন কোন বড় ভূমিকা পালন করতে পারেনি। বিংশ শতাব্দীতে এটা ছিল একটা বড় ব্যর্থতা যে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করেও সভ্য সমাজ মরনাস্ত্র প্রতিযোগিতায় নিজেদেরকে নিয়োজিত করেছিল।

একনজরে দেখে নিই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ কি কি কারনে সংঘটিত হয়েছিলঃ

i) ভার্সাই চুক্তিঃ এই চুক্তির ফলে জার্মানি তার যাবতীয় উপনিবেশ হাত ছাড়া করল। শুধু তাই নয়, উপনিবেশে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ লগ্নী করা হয়েছিল তাও বিফলে গেল। সবদিক থেকে জার্মানিকে দুর্বল করাই ছিল ভার্সাই চুক্তির লক্ষ্য। সুতরাং এটা অনুমেয় ছিল যে জার্মানি এ চুক্তির শর্ত মনে প্রাণে স্বীকার করে নেবে না।

ii) দীর্ঘ যুদ্ধ বিরতিঃ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী শান্তি, নিরাপত্তা ও গণতন্ত্র বিপন্ন হয়ে পড়েছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যখন ভার্সাই চুক্তি স্বাক্ষরিত হল তখন দেখা গেল গণতন্ত্র, নিরাপত্তা ও শান্তি কোনটাই নিরাপদ নয়। সে জন্য দুই মহাযুদ্ধের মধ্যখানের সময়টাকে শান্তিপূর্ণ নয় বলে দীর্ঘ যুদ্ধ বিরতি বলা হয়।

iii) অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদঃ ভার্সাই চুক্তি জার্মানিকে নিঃস্ব করেছিল। চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পর জার্মানির একমাত্র লক্ষ্য ছিল যে, কোন প্রকারে যুদ্ধপূর্ণ অবস্থায় ফিরে যাওয়া। জাপান ও ইতালি মনে করেছিল যে, আন্তর্জাতিক বানিজ্যে সব রকম সুযোগ সুবিধা থেকে তারা বঞ্চিত। তাই অর্থনৈতিক পুনর্গঠনকে তারা অপরিহার্য মনে করেছিল।

iv) আন্তর্জাতিক নৈরাজ্যঃ আন্তর্জাতিক নৈরাজ্যকে অনেকেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্যতম কারণ মনে করে। লীগ অফ নেশনস যৌথ নিরাপত্তা ব্যবস্থা সুনিশ্চিত করতে ব্যর্থ হওয়ায় লীগের সদস্যবৃন্দ ও অন্যান্য রাষ্ট্র শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য সনাতন পদ্ধতির আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছিল, আর এ পদ্ধতি হল জোট তৈরি করা। অনেকের মনে তখন  এ বিশ্বাস জন্মেছিল যে, লীগের সফল হওয়া মানে যুদ্ধের সম্ভাবনা কমে যাওয়া আর ব্যর্থতা মানে যুদ্ধ অনিবার্য।

v) নিরস্ত্রীকরণে ব্যর্থতাঃ লীগ অফ নেশনস এর প্রণেতাগণ মনে করেছিলেন শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে নিরস্ত্রীকরণ অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু এই স্বদিচ্ছাকে ফলপ্রসূ করতে হলে বৃহৎ শক্তিবর্গের যে পরিমাণ সহযোগিতা ও লীগ কর্তৃপক্ষের দৃঢ়তা প্রয়োজন তার কোনটাই ছিলনা।  বৃহৎ শক্তিবর্গ অস্ত্র উৎপাদনের অশুভ প্রতিযোগিতায় নিজেদের নিমজ্জিত করেছিল। অস্ত্র প্রতিযোগিতা বন্ধ না হওয়ায় তা যুদ্ধের জন্ম দিয়েছিল।

vi) উগ্রজাতীয়তাবাদঃ হিটলারের ধারণা ছিল জার্মানজাতি পৃথিবীর মধ্যে একমাত্র উৎকৃষ্ট ও শ্রেষ্ঠজাতি, অন্যরা নিকৃষ্ট। অতএব নিকৃষ্টের উপর শ্রেষ্ঠের কর্তৃত্ব থাকা খুবই স্বাভাবিক। জার্মানজাতি গোটা ইউরোপের উপর প্রাধান্য বিস্তার করবে এই স্বপ্নে হিটলার বিভোর ছিলেন। স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদান করতে গিয়ে তিনি এক সর্বধ্বংসী যুদ্ধের ঝুঁকি নিয়েছিলেন।

vii) সর্বাত্মকবাদঃ হিটলার ও মুসোলিনি উভয়েই গণতন্ত্রকে একটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিয়েছিলেন। তাঁরা গণতন্ত্রকে সম্পূর্ণরুপে ধ্বংস করে সর্বাত্মকবাদ এর পথকে সর্বোৎকৃষ্ট উপায় বলে মেনে নিয়েছিলেন। তখন জার্মানি, জাপান ও ইতালির কাছে নিজেদের সংকীর্ণ জাতীয়তাবোধ ছাড়া অন্য কোন মূল্যবোধ যথাযথ মর্যাদা পায়নি।

viii) অন্যান্য কারণঃ এ ছাড়া লোকার্ণো চুক্তি, ওয়াশিংটন নৌ-সম্মেলনসহ কেলগ-ব্রিয়াণ্ড চুক্তি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ কারণ হিসেবে গণ্য করা হয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী পরস্পর বিরোধী দুই মতাদর্শের বিকাশ ঘটেছে যা আজো বিদ্যমান। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসানের পর বিশ্ব রাজনীতিতে একটি সদুরপ্রসারী ফলাফল আমরা প্রত্যক্ষ করি। আমরা এও দেখতে পাই বৃহৎ শক্তি হিসেবে ফ্রান্স ও ব্রিটেনের পতন হয়েছে এই যুদ্ধ পরবর্তী অন্যদিকে  বৃহৎ শক্তি হিসেবে আবির্ভাব ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রের। উত্থান ঘটেছে সোভিয়েত ইউনিয়নের আর বিস্তৃতি বাড়িয়েছে স্নায়ু যুদ্ধের, যা নতুন আরেক বিশ্বযুদ্ধের ধামামা ক্রমাগত বাজিয়েই চলছে।

প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে যে সব ভুলের কারণে জার্মানির পরাজয় ঘটেছিল

Now Reading
প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে যে সব ভুলের কারণে জার্মানির পরাজয় ঘটেছিল

এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ১৯১৪ সালের জুলাই মাসের ২৮ তারিখে অস্ট্রো-হাঙ্গেরি এবং সার্বিয়ার মধ্যেকার যুদ্ধের মাধ্যমে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের সূচনা ঘটে। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই এই যুদ্ধের প্রভাব পুরো ইউরোপ জুড়ে ছড়িয়ে পরে। পরবর্তিতে যা আটলান্টিক পার হয়ে মার্কিনমুল্লুকে বিস্তার ঘটে। তবে এশিয়ার কিছু দেশও এই ধ্বংসযজ্ঞে মেতে উঠেছিল। ১৯১৪ থেকে ১৯১৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ছিল এই মহাযুদ্ধের ব্যাপ্তি, এতে উভয়পক্ষের হতাহতের সংখ্যা এবং ধ্বংসযজ্ঞ এতটাই ভয়াবহ ছিল যে যা অতীত কালের অন্য সকল যুদ্ধের নৃশংসতা কে হার মানিয়েছে! শুধু তাই নয়, যে পরিমাণ অর্থনৈতিক ও ভৌগলিকভাবে যে পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা বিশ্বের জন্য ছিল পুরোপুরি নতুন এক অভিজ্ঞতা। এই যুদ্ধে বিশ্বের একাধিক রাষ্ট্রের অংশগ্রহণের ফলে এটাকে বলা হয় মহাযুদ্ধ বা বিশ্বযুদ্ধ।

প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে সামরিক দিক থেকে জার্মানি ছিল সব দিক থেকে শ্রেষ্ঠ। কিন্তু রনাঙ্গনে ভুল চাল দেয়া হচ্ছে যুদ্ধ কৌশলের ব্যর্থতা। আসুন জেনে নিই কি কি কারণ ছিল জার্মানির পরাজয়ের পেছনে?

প্রথমত, জার্মানির পক্ষে দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পরিচালনা করা সম্ভব ছিলনা। কিন্তু ব্রিটেন ও ফ্রান্স উপনিবেশগুলো থেকে অর্থ ও লোকবল সংগ্রহ করে যুদ্ধকে বিলম্বিত করে।

দ্বিতীয়ত, সেনা পরিচালনা করার দিক থেকে জার্মানির বেশ অসুবিধা ছিল। ইউরোপের পূর্ব ও পশ্চিম সীমান্তে জার্মানিকে সেনা সমাবেশ করতে হয়েছিল- ফলে জার্মান সেনাবাহিনী দুভাগে বিভক্ত হয়ে যায়, যা তাদের যুদ্ধে পরাজয়ের অন্যতম কারণ।

তৃতীয়ত, রাশিয়ার বিপুল পরিমাণ সেনাবাহিনীর সামনে জার্মানি তার নিজ ভূখণ্ডে নিজস্ব সেনাবাহিনীকে এক রনাঙ্গন থেকে অন্য রনাঙ্গনে স্থানান্তর করা অসম্ভব ছিল। চারদিক হতে মিত্র পক্ষ জার্মানির সীমান্তে চাপ সৃষ্টি করলে জার্মানির বিপর্যয় ঘটে।

চতুর্থত, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও আমেরিকার নৌ বাহিনীর তুলনায় জার্মান নৌবাহিনী ছিল অপেক্ষাকৃত দুর্বল। যা তাদের পরাজয়ের অন্যতম কারণ হিসেবে স্বীকৃত।

পঞ্চমত, সমুদ্রের উপর ব্রিটিশ নৌ শক্তির প্রাধান্য জার্মানির অর্থনৈতিক কাঠামোর উপর প্রচণ্ড আঘাত হানে। এছারা নিতান্ত প্রয়োজনীয় খাদ্যের অভাব ও অপুষ্টির ফলে জার্মানদের প্রতিরোধব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ে। সর্বোপরি প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ ছিল একটি জনযুদ্ধ।

এসব কারণে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে জার্মানি হেরে যায়। জার্মানির পরাজয় ছিলো তাদের জন্য অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক এবং জাতিগত অপমান। কিন্তু যে উগ্রবাদ জার্মানিকে প্রথম বিশ্ব যুদ্ধে টেনে নিয়ে গিয়েছিল, সেই উগ্রবাদিতার কারণেই জার্মানি পুনরায় দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সূচনা করেছিল।

“ইরান ডিল” থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিল যুক্তরাষ্ট্র!

Now Reading
“ইরান ডিল” থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিল যুক্তরাষ্ট্র!

২০১৫ সালে ছয় জাতির মধ্যাস্ততায় ইরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতা হয়। জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন (জেসিপিওএ) নামের ওই সমঝোতা ‘ইরান ডিল’ নামেও পরিচিত। ইরানের সঙ্গে চুক্তিকারী দেশগুলো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি এবং চীন। ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি রোধে পশ্চিমা বিশ্ব বহু বছর ধরে দেশটির ওপর বাণিজ্য অবরোধ আরোপ করেছিল। কিন্তু কোনভাবে কাজ না হওয়ায় ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার নেতৃত্বে একটি সমঝোতা চুক্তি হয়। ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি থেকে সরে আসার শর্তে দেশটির ওপর থেকে অবরোধ উঠিয়ে নিতে উক্ত চুক্তিটি সম্পাদন করা হয়। চুক্তি মোতাবেক এতদিন এগুচ্ছিল সবকিছু। কিন্তু নতুন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হটাত ইরানের সঙ্গে বহুজাতিক পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দেওয়ায় চরম অস্বস্তিতে পড়েছে চুক্তির বাকী দেশ সমূহ। চুক্তি মোতাবেক প্রতি ছয় মাস পরপর তা নবায়ন হয়। সেটি নবায়নের সময় ঘনিয়ে এলে ট্রাম্প জানিয়ে দেয় তিনি চুক্তি নবায়নে সম্মতি দেবেন না। বেশ কিছুদিন ধরেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের সঙ্গে ছয় জাতির ওই চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার হুমকি বহুবার দিয়েছেন। এমনকি ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগ থেকেই বলে এসেছেন যে বারাক ওবামা ইরানের সঙ্গে যে চুক্তি করেছে, তা ‘জঘন্য, ধ্বংসাত্মক ও বোকামি’। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে তিনি ওই চুক্তি বাতিল করার প্রতিশ্রুতি দেন তার নির্বাচনী প্রচারণায়। এখন ট্রাম্প চাইছেন ইরানের সামরিক শক্তি আরও সীমিত করার বাধ্যবাধকতা যুক্ত করে নতুন একটি চুক্তি করতে।

এদিকে ট্রাম্পকে চুক্তিতে ধরে রাখতে না পারার বিষয়টি যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের মিত্রদেশগুলোর চরম কূটনৈতিক ব্যর্থতা হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে, এই চুক্তির পক্ষে অবস্থান বজায় রেখে কাজ করে যেতে বদ্ধ পরিকর বাকী দেশগুলো। বাকী পাঁচ দেশের মধ্যে দুই দেশ নিজেদের সহ্য করতে পারেনা বলা চলে রাশিয়া আর যুক্তরাজ্য পরস্পর জাতশত্রু। যুক্তরাজ্য চাইছে যুক্তরাষ্ট্র যেন এই চুক্তিতে থাকে কেননা তাদের ছাড়াই চুক্তি কার্যকর রাখতে গেলে শর্ত মোতাবেক ইরানের সঙ্গে ইউরোপের কোম্পানিগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্য অব্যাহত রাখতে হবে। তাদের মিত্র ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উপেক্ষা করে আদৌ কি তারা কাজ করতে পারবে? এই চুক্তি বাঁচাতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে ইউরোপীয় মিত্ররা খুব বেশি যে অগ্রসর হতে পারবে তা নিয়ে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি যেকোন উপায়ে এই চুক্তি বজায় রাখার পক্ষে। ট্রাম্পের চুক্তি থেকে সরে আসার ঘোষণা পরবর্তী যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও জার্মানি এক যৌথ বিবৃতিতে ‘দুঃখ ও উদ্বেগ’ প্রকাশ করে বলেছে, তারা চুক্তিটি কার্যকর রাখতে কাজ করে যাবে। তারা বিবৃতিতে এও প্রত্যাশা করেছে, চুক্তি কার্যকর রাখতে বাধা হয় এমন সকল পদক্ষেপ বাস্তবায়নে যেন যুক্তরাষ্ট্র বিরত থাকে।

তবে চুক্তি স্বাক্ষরকারী অপর দুই দেশ রাশিয়া ও চীন বরাবরই ইরানের প্রতি নমনীয় ও বন্ধু প্রতিম। ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান চুক্তি থেকে সরে আসার ঘোষণা দেয়ার পাশাপাশি তিনি ইরানের ওপর সর্বোচ্চ অবরোধ আরোপেরও ঘোষণা দেন। একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষরের মাধম্যে করে তিনি ইরানের সঙ্গে সব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের ব্যাবসা বাণিজ্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন। পাশাপাশি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, অবরোধ অমান্যকারী কোম্পানিগুলোকে কঠিন সাজার মুখোমুখি হতে হবে। এমতাবস্থায় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে ইরানের সঙ্গে বিদ্যমান লেনদেন চুকিয়ে নিতে ছয় মাস সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে।

সম্প্রতি জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা ম্যার্কেল এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাখোঁ যুক্তরাষ্ট্র সফরে গিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে এ বিষয়ে জরুরী বৈঠক করেন। তারা যৌথভাবে ওই চুক্তি থেকে সরে না আসার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অনুরোধ করেন। কিন্তু কার্যত দীর্ঘদিনের মিত্র এসব দেশের সব ধরণের চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। ফলে এটিকে একপ্রকার ইউরোপের মিত্রদের কূটনৈতিক পরাজয় হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। বিশেষত যুক্তরাজ্যের জন্য এমন পরিস্থিতি বেশ অস্বস্থির। কেননা ইরান চুক্তির এই প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের অবস্থান অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের চিরশত্রু রাশিয়ার দিকেই ঝুঁকে গেল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেড়িয়ে ব্রেক্সিট নিয়ে দর কষাকষিতে অন্যান্য মিত্রদের সাথে টানাপোড়নে রয়েছে যুক্তরাজ্য। তাই ইউরোপের অন্যতম শক্তি জার্মানি ও ফ্রান্সের মন রক্ষার্থে চাইলেও “ইরান ডিল” থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করতে পারছেনা যুক্তরাজ্য।এদিকে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া এক ভাষণে ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ঐতিহাসিকভাবে অনুশোচিত’ হতে হবে। ২০১৫ সালে তেহরানের সঙ্গে বহুজাতিক শক্তিগুলোর করা পরমাণু চুক্তির বিষয়ে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইঙ্গিত করে এমন সতর্কবার্তাই দিলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সিদ্ধান্ত মোকাবেলায় ইরানের সদুরপ্রসারি পরিকল্পনা রয়েছে। রুহানি বলেন, যদি এমন কিছু ঘটে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সংস্থা এবং ইরানের পরমাণু শক্তি সংস্থাকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পূর্ব থেকেই দেয়া আছে।