আমি “তাদের” মতো হতে চাই।

Now Reading
আমি “তাদের” মতো হতে চাই।

ছোটবেলায় বাবাকে তার দিন শুরু করতে দেখতাম পেপার দিয়ে৷ আস্তেআস্তে কখন যেন নিজের মধ্যেও এই অভ্যাসটা ঢুকে গেল টের ও পেলামনা৷ তখন খবর মানে ছিলো টুকটাক সব খবর মজা করে পড়া, যেটাকে বলে স্বেচ্ছায় খবর জানত‌ে চাওয়ার জন্য খবরের কাগজ পড়া। এক কাপ গরম চা ন‌িয়‌ে পেপার পড়ার স‌েই মূহুর্তটা ছ‌িলো দ‌িন‌ের সবচ‌ে প্র‌িয় সময়। এখন‌ো খুব ম‌িস কর‌ি!

এখন ক‌েমন য‌েন সব বদল‌ে গেল‌ো হঠাৎ কর‌ে। সেই মানুষগুল‌ো বদল‌ে গ‌েলো; ঘর বদল‌ে গ‌েলো; খু্ব অবাক হয়‌ে দ‌েখলাম স‌েই পেপারের খবর গুল‌োও ক‌েমন বদল‌ে গেল‌ো। দ‌িন ক‌ে দ‌িন জঘন্য থ‌েকে এত‌ো জঘন্যতর হত‌ে লাগল‌ো য‌ে আর ন‌িত‌ে না প‌েরে পেপার পড়াই বন্ধ কর‌ে দ‌িলাম। তত‌োদ‌িন‌ে ফ‌েসবুক‌ের সদর্প আগমন। খবর না জানত‌ে চাইল‌েও না জ‌েনে উপায় ন‌েই! এই বাজ‌ে, জঘন্য, মন খারাপ করা খবরগুল‌োর ভীড়‌ে ভাল‌ো খবর গুল‌ো কই য‌েন হার‌িয়‌ে গ‌েলো। এখন দ‌িন শুরু হয় ওসব মন খারাপ করা ছব‌ি সহ খবর দ‌েখে; দ‌িন শ‌েষ হয় ওসব খবরের ব্যর্থ আপড‌েট দ‌েখে। ন‌িজ‌েকে হতাশ লাগ‌ে। ক‌ি কারন‌ে এমন হয়‌ে গ‌েলো ক‌ে জান‌ে! পার‌িবার‌িক বন্ধন গুল‌ো ক‌েমন ঠুনক‌ো হয়‌ে গ‌েলো। পরিবারের সবাই ম‌িল‌ে এক সাথ‌ে খ‌েতে বসার যে আনন্দ তা য‌েন ক‌োথায় হার‌িয়ে গ‌েছে। “শ্রদ্ধাব‌োধ” ব্যাপারটা য‌েন এখন শুধু বইয়ের মধ্য‌ে খুঁজ‌ে পাওয়া যায়। “বন্ধুত্ব” মান‌ে য‌েন উশৃঙ্খলতা প্রকাশ‌ের আর‌েক নাম।”য‌ৌনতা” হয়‌ে গ‌েছে হ‌িংস্রতার আর‌েক নাম। “বিনোদন” হয়ে গেছে স্যাটেলাইটের সিরিয়াল গুলো নির্ভর। পুরো পরিবার নিয়ে লুডু বোর্ডে বা ক্যারাম বোর্ডে সময় কাটানো যেন বা ব্যাকডেটেড কিছুর নামান্তর। কাকে কে কি দোষ দেবে?

পারিবারিক শিক্ষার দোষ দিয়ে একতরফা ভাবে চাপিয়ে দেয়াটাও ভুল হবে। পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব বলে পুরোপুরি পাশ কাটানোও যাবেনা,কেননা সেখানেও প্রশ্ন জাগে,ঐ প্রভাবে প্রভাবিত হতে বলেছিল কে? তাহলে? ব্যাপারটা ভাববার বিষয় তো অবশ্যই। বাঙ্গালি আমরা, স্বভাবতই নিজের দোষ দেখবোনা, কাউকে না কাউকে, কিছু না কিছুকে তো দায়ী করেই ছাড়বো। তাই তো ধর্ষনের মতো ব্যাপারেও সাফাই গাইবো ধর্ষিতার ড্রেস আপ নিয়ে।হোক সে হিজাব পরিহিতা, বা হোক সে পাঁচ বছরের শিশু। “বিচার চাই” বলে শাহবাগে আবার আরেক দফা আন্দোলন হবে কিছুদিন। তারপর…… সেই পুরনো উক্তি, “বিচারের বাণী নিভৃতে কাঁদে” বলে যে যার জায়গায় পুনরায় ফিরে যাওয়া। এই তো হয়ে আসছে,তাই না?

নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে ভুগতে সবাই কেমন যেন ছা পোষা কেরাণী টাইপ হয়ে যাচ্ছি, যা হয় হোক, মেনে নিচ্ছি। কেন মেনে নিচ্ছি? কেন সজাগ হয়েও ঘুমিয়ে থাকার ভান করছি? শান্তি তে থাকা যদি এর কারন হয় তো সেই শান্তিতে থাকতে কি পারছি আদৌ? ভাবার বিষয়, ভাবছি। লেখার বিষয়,লিখছি। পড়ার বিষয়, পড়ছি। কিন্তু এই বিষাক্ত সমস্যাটা থেকে সমাধানের কোন পথ কেউ খুঁজে পাচ্ছিনা। দুর্নীতি আমাদের জীবনযাপনে এমন ভাবে ঢুকে গেছে যে আমাদের “নীতি” শব্দটার উপরে অবিশ্বাস চলে আসছে। অন্যায় হলে থানা পুলিশের কাছে স্বাভাবিক ভাবে যেতেও আমাদের অনীহা, “কি হবে গিয়ে?” তারচেয়ে ভালো, মেনে নাও, মেনে নাও। বিবেক কে জোর করে ঘুম পাড়িয়ে চোখের সামনে ঘটে যাওয়া অন্যায়গুলোকে আমরা না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে যাই। পারলে,সুযোগ বুঝে অপরাধস্হলে ঘটনা ঘটাকালীন মূহুর্তকে স্মরনীয় করে রাখতে কিছু সেলফি তুলে তাজা তাজা ফেসবুকে আপলোড করে দেই কিছু লাইক পাবার আশায়। তবু ঝুঁকি নিয়ে সেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করিনা, পাছে নিজেই না আবার বিপদে পড়ি।

এভাবেই সবাই হয়ে পড়ছি আত্মকেন্দ্রিক, স্বার্থপর এক সুশিক্ষিত জাতি,যারা কিনা আর কিছুকে দোষ না দিতে পারলে নিজেদের রাজনৈতিক নেতা নেত্রীদের দোষ দিতে খুব ভালোবাসি। “ঐ আমলে ভালো ছিলাম” বলে চিল্লাচিল্লি আর গলাবাজি করে আসর জমাতে আমাদের জুড়ি নেই। তবু প্রতিবাদটা নিজের থেকে শুরু করবোনা! হতাশায় ভুগছে পুরো জাতি।

এরমধ্যেও আশার কথা হাতেগোনা কিছু মানুষ তাদের সাধ্যমতো সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে দ্বিধাবোধ করছেনা। কি পাবো,কি পাবোনা- সেই কুটিল হিসাব না কষে তাৎক্ষনিক ভাবে হাজির হয়ে যাচ্ছে নিজেদের তল্পিতল্পা সহ, “যা থাকে কপালে” ভাব নিয়ে। একটু হলেও যদি কারো কোনও উপকারে আসতে পারে এই ভেবে তারা নিজেদের পাশাপাশি একটা বাহিনীও তৈরী করে ফেলেছে,যারা এখন চাইলে এখনি কোন দুর্ঘটনায় ঝাঁপিয়ে পড়তে রাজি। আমি আর আমার মতো হতাশাবাদী খবর বিমুখ মানুষগুলো আবারো একটু আশাবাদী হই। আবার আমাদের স্বপ্ন দেখানেওয়ালারা নিজেদের স্বপ্নকে আমাদের সাথে এক করে প্রমান করতে চাইছে যেন ওরাও তো আধুনিক কালেরই মানুষ,ওরাও তো একই পথে হাঁটে, একই মেয়েদের সাথে চলে,কথা বলে, বন্ধু হয়। কিন্তু শুধু বন্ধুত্বের চোখেই দেখে। ওরা প্রমান করে দিতে চাইছে যেন, বিনোদন মানে নির্দোষ বিনোদন, নতুন কোন জায়গা ঘুরে আসা;ঘরে বসে বস্তাপচাঁ টিভি সিরিয়াল দেখা নয়। বন্ধুত্ব মানে বন্ধুর প্রয়োজনে জান বাজি রাখা;উশৃঙ্খলতা নয়। যৌনতা মানে একে অপরের ইচ্ছার প্রাধান্য দেয়া, হিংস্রতা নয়। ওদের জন্য আবার আমার খবরের কাগজ পড়ার ইচ্ছা জাগে। আবার আশাবাদী হই। আবার ভাবতে ভালো লাগে যে কোথাও বিপদে পড়লে তাদের আমি পাশে পাবোই। আমারও খুব ইচ্ছা করে তাদের মতো খুব সাহসী হতে। দেশটাকে একটু হলেও এগিয়ে দিতে সামান্য হলেও ভুমিকা রাখতে। ওরা কারা? যারাই হোক- সশ্রদ্ধ সালাম।