জানা অজানা রূপকথা | পর্ব -২

Now Reading
জানা অজানা রূপকথা | পর্ব -২

‘ দ্যা লিটল মারমেইড ‘

রূপকথার জগতে বহুল প্রচলিত একটি চরিত্র হলো জলকন্যা বা জলপরী বা মৎস্যকন্যা বা জলকুমারী। অঞ্চলভেদে এদের নিয়ে অনেক রূপকথা পাওয়া যায়। প্রত্যেক অঞ্চলেই এদের নিয়ে কোন না কোন রূপকথা রয়েছে। অনেক লোকগাথা গবেষক মনে করেন জলকন্যার ধারণাটি এসেছে গ্রিক দেবী এফ্রোদাইতি ( ভালোবাসার দেবী) থেকে। অনেকে আবার এর উৎস মনে করেন চাদীয় সমুদ্র দেবতা ওনানেসকে।
তবে আজকে আমরা জানব জলকন্যা নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত রূপকথাটি এবং তার জানা অজানা রূপ নিয়ে নিয়ে।

‘লিটল মারমেইড ‘ বা ‘ ছোট্ট জলকন্যা ‘ জলপরী নিয়ে প্রচলিত রূপকথাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত; যার গল্পটা কিছুটা এ রকম যে, এক স্বাধীনচেতা,চঞ্চল জলকন্যা দেখা পায় এক সুদর্শন রাজপুত্রের। এক জাহাজডুবি হতে সে তার জীবন বাঁচায়,কিন্তু রাজপুত্র তার পরিচয় জানতে পারে না। এক জলদানবীর সহায়তা নিয়ে জলকন্যা স্থলে রাজপুত্রের কাছে আসে, জলদানবী তার বাকশক্তি নিয়ে নেওয়ায় সে রাজপুত্রককে কিছুই বলতে পারে না। তারপর ঘটে যায় বিভিন্ন ঘটনা, রাজপুত্র সত্য জানতে পারে। অতঃপর তাদের বিয়ে হয় এবং তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকে।

জনপ্রিয় এ গল্পটির উৎস ডেনিশ লেখক হান্স ক্রিশ্চিয়ান এনডারসনের ‘ ডে লিল হাফ্রু’ ( ডেনিশ ভাষায় রচিত, যার অর্থ দাঁড়ায় ‘ লিটল মারমেইড’ বা ‘ ছোট্ট জলকন্যা ‘)। এনডারসন এ গল্পটি লেখেন ১৮৩৬ সালে এবং প্রকাশ করেন ১৮৩৭ সালে তার ‘ ফেইরি টেল টোল্ড ফর চিল্ড্রেন ‘ বইতে, যা কোপেনহেগেনে সিএ রেইজেলের প্রকাশনায় প্রকাশিত হয়। পরবর্তীতে অন্যান্য প্রকাশকদের বইতেও তার এ গল্পটি প্রকাশিত হয়, যাদের মধ্যে রয়েছে ১৮৪৯ সালে প্রকাশিত ‘ফেইরি টেলস ‘ এবং ১৮৫০ সালে প্রকাশিত ‘ ফেইরি টেলস এন্ড স্টোরিজ ‘

‘ ডে লিল হাফ্রু ‘ / ‘ দ্যা লিটল মারমেইড’
– হান্স ক্রিশ্চিয়ান এনডারসন

সমুদ্রের অতল তলে অবস্থিত এক অজানা মায়াবী রাজ্য যার বাসিন্দারা অর্ধেক মানুষ-অর্ধেক মৎস্য। সে রাজ্যের রাজা ছিল বিপত্নীক, তার ছিল ছয় কন্যা আর এক সুদৃশ্য প্রাসাদ। প্রাসাদে আরো একজন থাকত,তিনি রাজার মা,যিনি রাজকন্যাদের দেখাশুনা করতেন । তিনি ছিলেন এক জ্ঞানী জলপরী। নিজের জ্ঞান, গরিমা, মর্যাদার প্রকাশস্বরূপ তিনি লেজে বারটি ঝিনুক ধারণ করতেন।
ছয় রাজকন্যার মধ্যে কণিষ্ঠজন ছিল সবচেয়ে সুন্দরী। স্বভাবেও সে ছিল সবার থেকে আলাদা। অন্য রাজকন্যারা যখন জাহাজডুবিতে পাওয়া জিনিসপত্র নিয়ে মেতে থাকত ,তার মনযোগের কেন্দ্রবিন্দু ছিল সাগরের রঙিন ফুল, মাছেদের খেলা। প্রাসাদের সামনে একটি বাগান ছিল যেখানে প্রত্যেক রাজকন্যার জন্যই একটু করে জায়গা ছিল। কণিষ্ঠা রাজকন্যা সেখানে রেখেছিল একটি মার্বেলের মুর্তি যা কোন এক জাহাজডুবির পর সাগরের তলে এসে ঠাঁই নেয়।

রাজকন্যাদের সাগরের উপরিভাগে যাওয়ার অনুমিত ছিল না যতদিন না তাদের পনের বছর পূর্ণ হয়। একে একে ছোট্ট জলকন্যারা বড় হতে থাকে এবং পনের বছরপূর্তিতে তারা সাগরের উপরিতল ঘুরে আসার সুযোগ পায়। প্রতি বছর বোনদের কাছে উপরের গল্প শুনতে শুনতে কণিষ্ঠা জলকন্যা উপরিভাগে যাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে।এক সময় তারও পনের বছর পূর্ণ হয়। সে উপরের পৃথিবী দেখার জন্য প্রস্তুত, তার লেজে আটটি ঝিনুক লাগিয়ে দেওয়া হল।

উপরিতলে সাগরের মাতাল ঢেউ, তার মধ্যে জলকন্যা একটি জাহাজ দেখতে পেল। জাহাজে নাবিকরা হৈ হুল্লোর করছিল। সে স্রোতে ভাসতে ভাসতে জাহাজের এক জানালা দিয়ে দেখতে পেল এক সুদর্শন রাজপুত্রকে। রাজপুত্র দেখতে ঠিক যেন তার ঐ মুর্তির মতো। জলকন্যা তার প্রেমে পড়ে গেল। সে ভাসতে ভাসতে রাজকুমারকে লক্ষ্য করতে থাকল। জাহাজের আলোকসজ্জা, আতোশবাজি তাকে মুগ্ধ করল।

কিন্তু তার এ মুগ্ধতা বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। হঠাৎ সাগরে এক ভয়ংকর ঝড় উঠল। ঝড়ে জাহাজ চুরমার হয়ে গেল । নাবিকরা ভাঙা কাঠের খন্ড ধরে ভেসে থাকলেও রাজকুমার ডুবে যায়। জলকন্যা নিজের জীবন বাজি রেখে তার জীবন বাঁচায়।
ঢেউয়ে ভাসতে ভাসতে একসময় জলকন্যা স্থল দেখতে পায়। সে রাজপুত্রকে সাগরতীরে একটি গীর্জার পাশে শুয়িয়ে দিয়ে পাথরের আড়ালে লুকিয়ে পড়ে। রাজপুত্র তখনো অজ্ঞান। গীর্জা থেকে এক তরুণী বের হয়ে রাজপুত্রকে দেখতে পায় এবং লোকজন জড়ো করে রাজপুত্রকে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করে। চুপিচুপি এসব দেখে জলকন্যা আবার সাগরে ডুব দেয়। রাজপুত্র জানতেও পারে না কে আসলে তার জীবন বাঁচিয়েছে।
ফিরে এসে জলকন্যা অস্থির হয়ে ওঠে। দাদির কাছ থেকে সে জানতে পারে জলকন্যারা মৃত্যুর সাথে সাথেই সমুদ্রে বিলীন হয়ে গেলেও মানব জীবন অমর, তাদের আত্মার কখনো মৃত্যু ঘটে না। এসব শুনে জলকুমারী মানব জীবনের জন্য আকুল হয়ে ওঠে। সাহায্যের জন্য সে জলদানবীর কাছে যায় যে তাকে একটি জাদুকরি মিশ্রণ পান করতে দেয়, যা পান করলে তার লেজ পায়ে পরিণত হবে; তবে তার সবসময় মনে হবে সে যেন তিক্ষ্ণ ছুড়ির উপর হাঁটছে। কিন্তু এসবের বিনিময়ে তাকে দানবীকে দিতে হবে তার মিষ্টি কণ্ঠ এবং রাজপুত্রের তাকে বিয়ে করতে হবে যাতে তার আত্মার একটা অংশ জলকন্যা পেতে পারে। কিন্তু যদি রাজপুত্র অন্য কাউকে বিয়ে করে তাহলে পরবর্তী দিন ভোরের মধ্যে জলকন্যার মৃত্যু ঘটবে এবং সে সাগরে বিলীন হয়ে যাবে।
এসব শর্তে রাজি হয়েই জলকন্যা পুনরায় সাগরতীরে যায় এবং মিশ্রণ পান করে। রাজপুত্র তাকে খুঁজে পায়, তার সৌন্দর্যে বিমোহিত হয়ে যায়। অপরূপা মেয়েটি কথা বলতে না পারলেও অল্পদিনের মধ্যেই তারা কাছে চলে আসে। কিন্তু ইতিমধ্যে পার্শ্ববর্তী রাজ্যের রাজকন্যার সাথে রাজপুত্রের বিয়ে ঠিক হয়, তবে রাজপুত্র বিয়ে করতে নারাজ কারণ সে ঐ যুবতীকেই বিয়ে করবে যে তার জীবন বাঁচিয়েছে। জলকন্যার মন খুশিতে নেচে ওঠে, কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ; জানা যায় যে পাশের রাজ্যের রাজকন্যাই গীর্জার ঐ যুবতী। রাজপুত্র তাকেই নিজের জীবনরক্ষাকারিনী মনে করে বিয়েতে রাজি হয়ে যায়। ধুমধাম করে তাদের বিয়ে সম্পন্ন হয়। জলকন্যার মন ভেঙে যায়।
নববিবাহিত যুগল যখন এক জাহাজে তাদের বিয়ের উৎসব পালন করতে থাকে, জলকন্যা একাকী তার আসন্ন মৃত্যু নিয়ে ভাবতে থাকে। ভোরের কিছু আগে তার বোনেরা পানি থেকে জেগে উঠে তাকে জানায় তারা তাকে উদ্ধার করতে এসেছে, তারা জলদানবীর কাছ থেকে একটি জাদুকরী ছুড়ি নিয়ে এসেছে তাদের সুদীর্ঘ চুলের বিনিময়ে। এই ছুড়ি দিয়ে যদি জলকন্যা রাজপুত্রকে খুন করে তার রক্তবিন্দু নিজের পায়ে ফেলতে পারে তবে তার পা পুনরায় লেজে পরিণত হবে এবং সে তার জলকন্যার জীবনে ফিরে যেতে পারবে।
জলকুমারী জাহাজে রাজকুমারের কক্ষে যায় তাকে খুন করতে, কিন্তু তার ঘুমন্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে আর খুন করতে পারে না। সে ছুড়িটা সাগরে ফেলে দেয়।
সূর্যের কিরণ চারদিক আলোকিত করতে শুরু করলে সে জলে ঝাপ দেয়। সাগরের জলে তার শরীর মিশে যেতে থাকে।
তবে সে একধরনের উষ্ণতা অনুভব করতে শুরু করে, বিলীন হয়ে যাওয়ার বদলে সে নিজের অস্তিত্ব অনুভব করতে থাকে। সমুদ্রের জল হতে সে বায়ুমণ্ডলের দিকে ভেসে যেতে থাকে যেখানে বায়ুর কন্যারা তাকে স্বাগত জানায়। তারা তাকে জানায় যে তার নিঃস্বার্থতার জন্য তাকে মানবজীবন অর্জন করার সুযোগ দেয়া হয়েছে, সে যদি এই অস্তিত্বে তিনশ বছর মানুষের উপকার করতে পারে তবে মানুষ হিসেবে জন্মগ্রহণ করতে পারবে।

কাহিনীর ভিন্নতা

এনডারসনের লেখায় সাগরের নীল জলরাশি, লাল ফুল এসব বিষয় সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে। জলকন্যার বর্ণনায় সবচেয়ে বেশি ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়। পূর্বের অধিকাংশ লেখকের বর্ণনায় জলকন্যাদের শারীরিক গঠন সম্পূর্ণ মানুষের মতো বর্ণনা করা হয়েছে,যদিও তাদের বাস জলে। তবে এনডারসন তাদের বর্ণনা করেন মানুষ ও মাছের মিশ্রণ হিসেবে। তাদের দেহের উর্ধাঙ্গ মানুষেরর মতো, নিম্নাঙ্গ মাছের মতো।

কিছু বিতর্ক

রূপকথাটির সবচেয়ে জটিল অংশ মনে করা হয় এর সমাপ্তিকে। অনেক গবেষক মনে করেন এনডারসনের লিখিত রূপকথাটির এর মূল থেকে ভিন্নদিকে মোড় নিয়েছে । এনডারসনের সমালোচকদের মধ্যে জ্যাকব বগিল্ড আর পারনিল হিগার্ড অন্যতম। তাদের মতে রূপকথাটির সমাপ্তি বিয়োগান্তক। ‘মেরি পপিন্স’ -এর লেখক পি.এল. ট্রেভারের লেখনীতেও এনডারসনের সমালোচনা শোনা যায়।

বহু বিতর্ক সত্ত্বেও ‘ লিটল মারমেইড’ রূপকথাটি সারাবিশ্বে ব্যাপক জনপ্রিয় রূপকথাগুলোর একটি।

| রেফারেন্স –

১. https://en.m.wikipedia.org/wiki/The_Little_Mermaid
২. http://www.surlalunefairytales.com/littlemermaid/index.html
৩. http://andersen.sdu.dk/forskning/konference/resume_e.html?id=9708
৪. http://www.surlalunefairytales.com/littlemermaid/notes.html