কৃষ্ণ-কারু

Now Reading
কৃষ্ণ-কারু

পয়তাল্লিশ থেকে পঞ্চাশ বছর আগের ঘটনা। তখন ঢাকা শহরের রূপটা একটু আলাদা ছিল,বর্তমানের মতো  না। গাছপালা অনেক ছিল।আর তখনকার বাড়িগুলোও একটু বড়সড় জায়গাজুড়ে  করা হতো  আর দশটা Horror Story এর মতো এই ঘটনা না।  এরকম একটা ঘটনাই বলছি। বাড়িটা বেশ বড় আশেপাশে অনেক গাছ, ঘনবসতিও ছিল  না। খোলামেলা পরিবেশ। যার সম্পর্কে লিখছি তার নাম ভেনাস। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্রীবাবা-মায়ের আদরের মেয়ে।

ভেনাসের বিয়ে ঠিক হয়েছে। বিয়ে দূরের কারো সাথে ঠিক হয়নি। যার সাথে বিয়ে ঠিক হয়েছে সে ভেনাসের চাচাতো ভাই। সবাই যথেষ্ট আনন্দিত ছিল। কারণ  দুজনই যোগ্য এবং পরিচিত।

ভেনাসের হবু বরের নাম সাজ্জাদ। সে পেশায় একজন ইঞ্জিনিয়ার। ভেনাস এবং সাজ্জাদের পরিবার একটি নির্ধারিত দিনে তাদের engagement এর অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন ।

গণ্ডগোল-টা বাধার আগে স্বাভাবিক ভাবেই চলছিলো সবকিছু। বাড়ির কাজের মেয়ের কিছু অস্বাভাবিক নজরদারি ভেনাস এর মনকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। যেমন, ভেনাস বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছে;

 

“কাজের মেয়েঃ আপা কই যান?

          ভেনাসঃ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

কাজের মেয়েঃ কখন আইবেন?”

 

 আবার, টেলিফোনে কোন কল আসলে ;

 

“কাজের মেয়েঃ আপা, কে ফোন করছে?

          ভেনাসঃ আমার বন্ধু।

কাজের মেয়েঃ মাইয়া না পোলা?”

 

engagement এর পর আনুমানিক দুই সপ্তাহ পর্যন্ত ভেনাস তাদের কাজের মেয়ের এইসব নজরদারি পর্যবেক্ষণ করে এবং সন্দেহ করতে থাকে, বিনুকে ( কাজের মেয়েকে ) কেউ পরিচালিত করছে। এর কদিনের মাথায় ভেনাস বিনুকে বলে,”বিনু, তুই কিন্তু ধরা পরে গেছিস।“ বিনু বলে,”কি হইছে আপা?কি করছি?” ভেনাস বলে,” আমার খবর নিয়ে কাকে দিস?”ঠিকঠাক জবাব দে, নাহলে বাবাকে বলে তোকে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দেব।

এবার বিনুর মুখ ফ্যাঁকাসে হয়ে যায়। কিছুক্ষন চুপ থেকে হড়বড় করে বলতে থাকে সব।

           “ সাজ্জাদ ভাই কইছে, আপনে কখন বাড়ি থাইক্যা বাইর হন, কখন বাড়িতে আসেন, কে ফোন করে আপনার কাছে, এগুলি হ্যারে জানাইতে। এগুলি করলে হ্যায় আমারে দুইশো ট্যাকা দিব। আপা, আপনে খালুরে এগুলি কইয়েন না। আমি আর এগুলি করমু না।“  

  ঐ দিন ভেনাস কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে নি। তার কি করা উচিৎ! বিয়ের দিন ঠিক হয়ে গেছে, কি করে ভেঙ্গে দেবে এই বিয়ে? আবার, এতো সন্দেহ প্রবন ছেলের সাথে জীবন কাটানো তার সম্ভব না । মনে মনে অপমান বোধ হচ্ছিলো। রাতে না ঘুমিয়ে শুধু পরিকল্পনা করেছে কিভাবে সব ম্যানেজ করা যায়।

 

সকালে উঠে প্রথমে ভেনাস বিনুকে দুশো টাকা দেয়। বিনু যদিও লজ্জায় নিতে চায়নি। তবু তখন দুশো টাকার মূল্য অনেক থাকাতে খুব বেশি সাধতে হয়নি।

 

এরপর ভেনাস তার বাবা-মা  কে সব জানায়। বাবা-মা রেগে গেলেও বিয়ে ভাঙার পক্ষপাতি তারা ছিল না। মেয়ের জোরাজোরিতে তারা সিদ্ধান্ত-টিতে সম্মতি জানায় এবং সেইদিন বিকালে সাজ্জাদের পরিবারকে ডেকে সব জানানো হয়। সেই সাথে ভেনাসের বিয়ের প্রতি অসম্মতির কথাও যুক্তি দিয়ে বোঝানো হয়।

 

সাজ্জাদের মা-বাবা ছেলের দোষটা বুঝলেও ভেনাসের সিদ্ধান্তকে তারা মোটেও স্বাভাবিক ভাবে নেয়নি।

 

যাইহোক, ভেনাস-সাজ্জাদের বিয়েটা বন্ধ হলো। বিয়েটা ভেঙে জাওয়াতে ভেনাসের মনে কোন প্রকার আফসোস ছিলোনা। কিন্তু সাজ্জাদের মনোভাব কেউ জানতো না।

 

একসময় সাজ্জাদের বাবা-মা ছেলের বিয়ে ঠিক করে। বিয়ের দাওয়াত দিতে ভেনাসদের বাড়ি আসে। ভেনাসের পরিবারও অতীতের  যাবতীয় ঘটনা ভুলে গিয়ে সাজ্জাদের বিয়ের দাওয়াত গ্রহন করে।

 

ভেনাস বিয়েতে অংশগ্রহন করতে চায়নি। কিন্তু বাবা-মার জোরে রাজি হয়। যেদিন সাজ্জাদের বিয়ে, সেদিন দু’জনের মুখোমুখি দেখা ও কথা হলো। ভেনাস যথেষ্ট স্বাভাবিক আচরণ করলো সাজ্জাদের সাথে। কিন্তু সাজ্জাদের আচরণে ভেনাস খুব ভাল ভাবেই বুঝতে পারে যে সাজ্জাদের জেদটা বিন্দুমাত্র কমেনি।

 

সেদিন বিয়ের খাবার খেয়ে ভেনাস হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে। বমি হয় খুব । ভেনাসের বাবা-মা ভাবে হয়তো একটু অসুস্থ হয়ে পরেছে মেয়ে।

 

কিন্তু ঐদিনের পর থেকে ভেনাস ক্রমাগত অসুস্থ হতেই থাকে। মাঝে মাঝে বলে ,”মা, আমার মনে হয় আমার পেটে  কেউ অনবরত সুঁই দিয়ে খোঁচাচ্ছে”। চিৎকার করে কেঁদে  ওঠে ভেনাস বার বার। ভালো ডাক্তার দেখান হয়। ডাক্তার জানায় ভেনাসের পেটে টিউমার হয়েছে

 

অপারেশন করা হয় । সবাই ধরে নেয় এবার ভেনাস ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু পেটের যন্ত্রণা আগের মতই হতে থাকে। তার সাথে বরং আরও কিছু সমস্যা যুক্ত হতে থাকে। সূর্য ওঠার সময় থেকে ভেনাসের যন্ত্রণা বাড়তে থাকে। দুপুরের কড়া রোদে ভেনাসের আচরণ দেখে মনে হতো তার শরীর জ্বলে যাচ্ছে, মাথা ব্যাথায় নিজের চুল নিজেই টানাটানি করতো।

 

আবার তাকে ডাক্তার দেখানো হয়। এবার ডাক্তার তার কোন সমস্যাই ধরতে পারলেন না। এভাবে বেশ কয়টি ডাক্তারও পরিবর্তন করা হয়। কেউ কিছু ধরতে পারলো না।

 

দিন দিন ভেনাস শুকিয়ে যেতে থাকলো। ওকে দেখতে বদ্ধ পাগল ছাড়া আর কিছুই মনে হতো না। মানসিক ভাবেও ধীরে ধীরে সে অপ্রকৃতিস্থ হয়ে যেতে থাকে।

 

ভোর হতে না হতেই চিৎকার শুরু হয় ভেনাসের । আবল তাবল বকতে বকতে বলে,”মা, আমার ভিতরের কলকব্জা ওলট পালট করছে কেউ।“ ভেনাসকে দেখে মনে হতো যেন ও ধীরে ধীরে মৃত্যু মুখে পতিত হচ্ছে।

 

কিছু আত্মীয় স্বজন ভেনাসের বাবাকে কোন ফকির-কবিরাজের স্মরণাপন্ন হয়ে কোন একটি ব্যাবস্থা করার পরামর্শ দেয়। কিন্তু ভেনাসের বাবা আধুনিকমনা মানুষ সে কবিরাজ বা ফকিরের পরামর্শকে ভেলকিবাজি ছাড়া আর কিছুই মনে করেন না।

ভেনাসের শারীরিক ও মানসিক  অবস্থা করুণ থেকে করুণতর হতে থাকে। কোন ডাক্তার সমাধান দিতে না পারায় ভেনাসের বাবা-মা যখন হতাশ, তখন ভেনাসের মা নিজের স্বামীকে অনুরোধ করে চিকিৎসার মোড়টা একটু অন্যদিকে ঘোরাবার জন্য।

 

কিন্তু তিনি কিছুতেই মানতে রাজি ছিলেন না। সত্যি কথা বলতে ভেলকিবাজি বা ধর্ম এবং মন্ত্রের নামে প্রতারণা বহুকাল হতেই প্রচলিত। তাই কারো ওপর বিশ্বাস করাটা সত্যিই জটিল বিষয়।

কোন অভিভাবক যদি ফকির বাবার কাছে গিয়ে বলে,” বাবা, আমার ছেলের লেখাপড়ায় মনোযোগ নাই। ওর মাথা নাকি ভারি ভারি লাগে।“

তখন ফকির বাবাদের উত্তর থাকে,” হবেই তো। আপনাদের ছেলের দুই কাধে দুইটা জিন বসে  থাকে। তাই এই অবস্থা। আপনাদের ঘনিষ্ঠ কেউই এমন আছে যে চায়না আপনাদের ছেলের উন্নতি হোক। তাই জিন-চালান দিয়েছে।“ এইসব বলে তাদের পড়া পানির course complete করতে বলে। সন্তানের ভালোর জন্য চড়া course fee দিয়ে ফকির বাবাদের ফুঁ দেয়া অস্বাস্থ্যকর পানি সন্তানদের পান করান।

 

বাচ্চারা লেখাপড়ায় ফাঁকিবাজির জন্য হাজারো ছল করতে অভ্যস্ত। আর হায়রে ফকির বাবারা, জিনের বসার যায়গার কি এতই অভাব যে চাপাচাপি করে বাচ্চার কাঁধে বসতে যাবে?

 

যাইহোক, শেষমেশ ভেনাসের বাবা তার স্ত্রীর কথায় সম্মতি দেন। একজন আত্মীয়ের পরামর্শে কোনএক বুজুর্গ বেক্তির কাছে তিনি যান। সব সমস্যা খুলে বলেন। সব শুনে তিনি ভেনাসের বাবাকে বলেন, “ আপনি এখন বাড়ি যান, আমি কাল ভোঁরে আপনার বাড়িতে আসব। “ ভেনাসের বাবা বলেন,” আপনিতো আমার বাড়ি চেনেন না, বরং আমি কাল ভোঁরে আপনাকে নিতে আসবো। “ উত্তরে সেই বুজুর্গ (সাধক) বলেন, “তার দরকার নেই, আমি একাই যাবো।“

 

ভেনাসের বাবার কাছে ওনার কথা স্বাভাবিক মনে হয়নি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, সত্যি পরের দিন ভোঁরে বয়স্ক সাধকটিকে ভেনাসের বাবা বাড়ির বাগানের সামনে দেখতে পেয়ে ছুটে এগিয়ে যান। ততক্ষনে ভেনাসের বাবার মনের কোন এক কোণ থেকে আশার আলো জেগে ওঠে। কিন্তু বয়স্ক সাধক কিছুই না বলে বাড়ির সামনের পুরো বাগানটা ঘুরে ঘুরে দেখতে থাকেন। দেখে মনে হচ্ছিলো উনি কিছু খুঁজছেন। বাগানের প্রতিটা কোণের  বড় গাছ -ছোট গাছ খুঁটে খুঁটে দেখছিলেন। হঠাৎ এক গাছের সামনে উনি থমকে দাঁড়ালেন। ভেনাসের বাবা তার পাশে দাড়িয়ে   ছিলেন। সাধক এবার ভেনাসের বাবাকে গাছের গায়ের একটি অঙ্কিত চিত্রকে আঙ্গুল দিয়ে দেখান। গাছটির গায়ে একটি নারী চিত্র আঁকা ছিল। নারী চিত্রটির নাভি বরাবর একটি পেরেক বিঁধে রাখা ছিল।এই চিত্রটি ভেনাসের বাবা এর আগে কখনই দেখেনি। সাধকটি এবার বললেন,” আপনারা অনেক দেরি করে ফেলেছেন।মনে হয়না আমি কিছু করতে পারব।তবু দেখি কতটা করা সম্ভব?”

গাছটি মৃতপ্রায় ছিল। সাধক গাছটি কাটার নির্দেশ দেন। ভেনাসের বাবা তার নির্দেশ অনুযায়ী গাছটি কাটার বন্দোবস্ত করেন। কিন্তু কুড়াল দিয়ে সামান্য কয়েকটি কোপেই গাছটি উপড়ে পড়ে। অবাক ব্যাপার গাছটির বাহিরের অংশ শক্ত হলেও  গোঁড়া থেকে গাছটির ভিতরের অনেকটা অংশ গদগদে পচা। এবার এক কথায়  সাধক  বললেন,” আমি আপনার মেয়েকে বাঁচাতে পারবো না। ও এখন অন্তিম পর্যায়ে আছে। খুব দ্রুতই মারা যাবে। আর এক সপ্তাহ আগেও আমাকে জানালে হয়তো কিছু করা সম্ভব হতো। আপনার মেয়ের ওপর জাদুটোনা করা হয়েছে। শুধু বলতে পারি যে এই কাজ করেছে সে আপনাদের পরিচিত। তার নাম আমি যদিও  আপনাকে বলবো না, কিন্তু  আপনি তার পরিচয় পেয়ে যাবেন। শীঘ্রই সে পাগলের মতো আচরণ করবে। তার অপ্রকৃতস্থ  আচরণ আপনাকে তার পরিচয়ের জানান দেবে। “

শয়তানের সহায়তা নিলে শয়তান সহজেই সাড়া দেয়,কিন্তু সবশেষে একটি অশুভ প্রতিক্রিয়া সাহায্য গ্রহণকারীর ওপরও প্রভাব ফেলে।

সেদিনই ভেনাস মারা যায়। ভেনাস মারা যাবার পর থেকে  তার বাবা অনেক কিছুই  বিশ্বাস করতে শুরু করে যার বা যেসবের পদার্পণ সে আগে  মানতেন না। ভেনাসের বাবা বুঝতে পেরেছিল  কে এই কাজ করেছে। মেয়ের মৃত্যুর প্রায় সপ্তাহ খানেক পর ভেনাসের  বাবার কাছে একটি ফোন কল আসে। ফোন কলটা ছিল তার ভাইয়ের অর্থাৎ ভেনাসের চাচার। ফোন কল করে তিনি বলেন,” সাজ্জাদ পাগলের মতো বাড়ির সবকিছু ছুড়ে ছুড়ে ফেলছে। কোন কথা না বলে হাতের কাছের সবকিছু নষ্ট করছে। সে কোন কথাই বলতে পারছে না।“

সব ভেনাসের বাবার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়। সে বুঝতে পারে কার কারনে ভেনাসকে এই অস্বাভাবিক মৃত্যু বরণ করতে হয়েছেকোন সে অদৃশ্য হাত, কোন অদৃশ্য কারন,কিভাবে মারা গেল ভেনাসএটাই তাহলে সেই black  magic বা কাল জাদু অথবা কৃষ্ণ- কারু।