মানুষের রক্ত দিয়ে স্নান করা এক সুন্দরী নারীর গল্প

Now Reading
মানুষের রক্ত দিয়ে স্নান করা এক সুন্দরী নারীর গল্প

আপনারা সকলেই একবার হলেও ড্রাকুলার সম্পর্কে শুনেছেন।তাদের অস্তিত্ব নিয়েও রয়েছে আপনার কাছে অনেক প্রশ্ন। প্রথমে বলে রাখি তাদের অস্তিত্ব আছে কি নেই আমরা তার সার্টিফিকেট দিতে যাব না। ব্যাক্তিগতভাবে আমিও ড্রাকুলারে বিশ্বাসী নয়। কিন্তু যখন আমার সামনে এমন একজন নারীর নাম উঠে আসল, যাকে বলা হত ড্রাকুলার এবং তার সাথে সাথে যখন আমি জানতে পারলাম গিনেস ওয়ার্ল্ড বুকে তার নামে একটি রেকর্ড রয়েছে তখন আমি প্রভাবিত হলাম এ বিষয়ে। আর তার এই রেকর্ডটি হল ৬৫০টিরও বেশি কুমারী নারীকে হত্যা করেছিল। হ্যাঁ আজ আপনারা জানতে চলেছেন পৃথিবীর সবচেয়ে অদ্ভুত এবং নারী কিলার এলাজেবেথ ব্যাথোরির সম্পর্কে।
ড্রাকুলা কাউন্টস বা ব্লাডি কাউন্টস নামে পরিচিত এলিজাবেথা ব্যাথোরি ১৫৬০ সালে ৭ আগষ্ট হাঙ্গেরির তখনকার সময় সবথেকে এক ধনী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। স্টেটের প্রাসাদেই কেটেছিল তার শৈশবকাল। ছেলেবেলা থেকে তার কোন অভাব ছিল না। সে ছিল সুন্দরী, শিক্ষিতা ও একটি ধনী পরিবারের মেয়ে। তখনকার সময়ে একজন শিক্ষিতা নারী হওয়ার সুবিধাতে সে সমাজে অনেক বাহবা পেত। এলিজাবেথের লেটিন, জার্মানি এবং গ্রীক ভাষায় সম্পূর্ণ দক্ষতা ছিল। কিন্তু তার জীবনে যখন প্রথম সমস্যা আসে, তার বয়স তখন তের। তখন সে অবিবাহিত অবস্থায় গর্ববতি হয়ে যান। তাদের জমিতে কর্মরত একজন কৃষকের সাথে তার ঘনিষ্ঠ একটা সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। দূর্ভাগ্য আর সৌভাগ্য যেটা হওক না কেন, টাকার বিনিময়ে অন্য একজন মহিলা সে বাচ্চার দায়ীত্ব নিতে রাজি হয়েছিল। এবং বাচ্চাটিকে সে শহর থেকে দূরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এরপর কৃষকের পরিবারের সাথে এলিজাবেথের পরিবার কি করেছিল তার খুজ এখনো মিলেনি। এই ঘটনার ঠিক ২ বছর পরে এলিজাবেথের ১০ বছর বয়স থেকে ঠিক করে রাখা ছেলে কাউন্ট ফেরেনক নাখদাসদির সাথে বিয়ে দেওয়া হয়। সে সময়কার সেরা বিয়ের মধ্যে একটি ছিল এলিজাবেথে এবং কাউন্ট ফেরেনক নাখদাসদির বিয়ের উৎসব। এ বিয়েতে উপস্থিত ছিল চার হাজার পাঁচশ অতিথি। যেহেতু এলিজাবেথের পরিবারের সামাজিক সুনাম বেশি ছিল, তাই বিয়ের পর এলিজাবেথ তার পদবি পাল্টাতে রাজি হননি। পেরেনক বিয়ের উপহার হিসেবে সুন্দরী এলিজাবেথকে তার প্রাসাদের মালিকানা দিয়েছিলেন। এই প্রাসাদকে কেন্দ্র করে ছিল অনেক জমি, সুন্দর ফুলের বাগান এবং সতেরোটা গ্রাম। বিয়ের পর তারা সেখানে থাকতে শুরু করে। ১৫৭৮ সালে পেরেনক এলিজাবেথকে হাঙ্গেরিয়ান সেনাবাহিনীর প্রধান কমান্ডারের স্থান দেয়। এই স্থান পাওয়ার সাথে সাথেই এলিজাবেথের উপর এসে পরে অটোমানদের বিরোদ্ধে চলা যুদ্ধের সকল রকমের দায়িত্ব। এর ফলে তাকে ঘর ও সংসার ছেড়ে যুদ্ধের জন্য দেশের বাহিরে যেতে হয়। যুদ্ধ চলাকালীন এলিজাবেথ তার ব্যবসা এবং সাম্রাজ্য দেখা শুনা করতো। ইংরেজি সহ আরো তিনটি ভাষায় পড়তে ও লিখতে পারার দক্ষতা থাকায় নবাবের দায়ীত্ব পালন করতে তার কোন রকম অসুবিধা হত না। যেন সে ছিল ওয়ান ম্যান আর্মি। ১৬০২ থেকে ১৬০৪ এই সময় কালীন বিষয়ে এলিজাবেথের বিষয়ে অনেক রকম কুটুক্তকর কথা মানুষের মুখে মুখে ঘুরতে থাকে। গ্রামবাসীরা তাকে রাক্ষুসী বলতো। শত শত মেয়েরা তার প্রাসাদে যেত কাজের জন্য এবং তারা কোনদিনও আর ফিরে আসতো না। এলিজাবেথ বলতো তারা কলেরা রোগে মারা গেছে এবং তাদেরকে সে নিজে কবর দিয়েছে। বিয়ের পর নাখদাসদি স্টেটের কাউন্টেস বনে যান এলিজাবেথ। তার স্বামীও ছিল প্রজাদের প্রতি প্রচণ্ড নির্মম। ফেরেনক অত্যাচার করবার কিছু কৌশল তার স্ত্রীকে হাতে ধরে শিখিয়ে দেন। স্ত্রীর নির্যাতনের সাথে স্বামীও যোগদান করতেন তবে ১৬০০ সালের দিকে স্বামীর মৃত্যুর পরই আসল চরিত্র বেরিয়ে আসে এলিজাবেথের। কাউন্টের মৃত্যুর পর তিনি স্লোভাকিয়ার দিকে চলে যান এবং একটি দূর্গ তৈরি করেন। তার চারপাশে এমন সব সহচর দিয়ে ঘেরা ছিল যারা বিভিন্ন সময় নির্যাতনে সাহায্য করতেন রানীকে। কিংবদন্তীতে আছে, একদিন এক মেইড চুল আঁচড়াতে গিয়ে রানীর চুল চিরুনি দিয়ে এমন জোরে টান দেয় যে তিনি খুব ব্যথা পান। ক্রোধান্বিত হয়ে মেয়েটিকে হাতের কনুই দিয়ে আঘাত করেন। আঘাতটি এতই জোরে ছিল যে প্রচণ্ড রক্তপাতে মেয়েটি মারা যায়। রানীর হাতে ছিটকে এসে পড়ে তার মুখের কিছু রক্ত। রাতের বেলা ঘুমাতে এসে তিনি দেখলেন যে মেয়েটির রক্ত যে হাতে এসে পড়েছে, তার কিছু জায়গা এমন চকচকে হয়ে আছে যে সেখানে যেন নতুন চামড়া গজিয়েছে। রানী উল্লসিত হয়ে ভাবলেন সামান্য এতটুকু রক্ত যদি এতটা পরিবর্তন করতে পারে চামড়ায়, তাহলে না জানি সমগ্র শরীরে রক্তস্নান করলে কতটা পরিবর্তন আসবে! এই ভাবনায় আরও রক্তপিপাসু হয়ে উঠলেন এলিজাবেথ। নির্মমভাবে হত্যা করতে শুরু করলেন তার মেইডদের, তাদের রক্তে করতে লাগলেন স্নান।
এমন করেই আস্তে আস্তে এলিজাবেথের গ্রাম থেকে উধাও হতে লাগল কুমারী, বিবাহযোগ্য কন্যা এবং কমতে লাগল প্রাসাদ থেকে মেইড। এলিজাবেথ হয়ে উঠতে লাগলেন ভয়ানক এক সিরিয়াল কিলার নবযৌবন পাবার আশায় । অবশেষে এক কুমারীকে হত্যা করবার পর ১৬০৯ সালের দিকে নড়েচড়ে ওঠে প্রশাসন। তার প্রাসাদে হানা দেয় পুলিশ। এলিজাবেথ চেয়েছিল মেয়েটিকে নিয়ে একটি আত্মহত্যার ঘটনা সাজাতে কিন্তু পুলিশের তৎপরতায় সেটি আর হয়ে ওঠেনি। তারা দূর্গে হানা দিয়ে স্তম্ভিত হয়ে যায় পুলিশ। চারদিকে শুধু রক্ত আর রক্ত। সেখানে যে অনেকগুলো গণহত্যা চালানো হয়েছে তার কোন সন্দেহ নেই। ছড়া ছিটা পড়েছিল হতভাগ্য মেয়েদের লাশ। বিচারে এলিজাবেথের সহকর্মীদের মৃত্যুদন্ড হলেও এলিজাবেথের মৃত্যুদন্ড হয়নি। তার সাজা হিসেবে আজীবন একটি কক্ষে কারারুদ্ধ করে রাখা হয় এবং সেখানে অল্প কিছু খাবার ও পানি দেয়া হতো তাকে। এরপর এলিজাবেথ প্রায় সাড়ে তিন বছর বেঁচে ছিলেন ছোট এই ঘরে। ইতিহাসের কুখ্যাত এই সিরিয়াল কিলার।