বাংলা সাহিত্যের রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ – দ্বিতীয় পর্ব (ব্যোমকেশ বক্সী)

Now Reading
বাংলা সাহিত্যের রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ – দ্বিতীয় পর্ব (ব্যোমকেশ বক্সী)

ব্যোমকেশ বক্সী। নামটা শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা অবয়ব। সাদাটে পাঞ্জাবী আর ধূতি পরনে, হয়তো গায়ে জড়ানো অনুজ্জ্বল একটা চাদর। গভীর তার দৃষ্টি, গম্ভীর তার গলার স্বর। ধারাবাহিক এই লেখার আজকের আলোচনা এই ব্যোমকেশ বক্সীকে নিয়ে।

গত পর্বের আলোচনায় হেমেন্দ্র কুমার রায়ের দুইটি সিরিজ নিয়ে আলোচনা করেছিলাম। তোতাপাখির মত অনুবাদের গণ্ডি পেরিয়ে, যদিও তিনি সফল ভাবে বাংলায় রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজ শুরু করেছিলেন, কিন্তু তাঁর এই লেখালেখি ছিল মূলত শিশু-কিশোরদের জন্যে। অন্যান্য ভাষায় যেখানে ছোটদের পাশাপাশি বড়দের জন্যেও রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজের বইয়ের জয়জয়কার, সেখানে বাংলায় এমন সিরিজ লেখার কৌশল তখনও কেউ রপ্ত করে উঠেনি। গুণী লেখক শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায় তাঁর অমর সৃষ্টি ব্যোমকেশ বক্সীর মাধম্যে বাংলা সাহিত্যে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্যও রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ এর বই এর চলন ঘটান। ত্রিশের দশকের বাঙ্গালী সমাজ আর সেই সময়কার পরিস্থিতির সাথে তালমিলিয়েই গড়ে উঠে ব্যোমকেশ সিরিজের কাহিনী।

অল্প বয়স থেকেই লেখালেখির শুরু শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায়ের। বিশ বছর বয়সে প্রথম প্রকাশ পায় তাঁর সঙ্কলিত কবিতার বই। লেখালেখিতর অনেক শাখাতেই ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ। সে নাটক বা উপন্যাস হোক অথবা হোক গান বা কবিতা। তবে ব্যোমকেশের মাধ্যমেই বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে অমর হয়ে আছেন এবং থাকবেন শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায়। ১৯৩১ সালে প্রকাশিত হয় সিরিজটির প্রথম কাহিনী। গল্প আর উপন্যাস মিলিয়ে মোট ৩২টি কাহিনী এই সিরিজে লিখে গেছেন তিনি। প্রথমদিকের লেখা গুলো সাধু ভাষায় হলেও পরবর্তীতে চলিত রীতিতে লিখে গেছেন এই সিরিজের বাকি কাহিনী গুলো। মৃত্যুর আগে ব্যোমকেশ সিরিজের আরও একটি লেখার উপর কাজ করছিলেন তিনি, যার নাম ছিল ‘বিশুপাল বধ’। সেই কাহিনী তিনি শেষ করে যেতে পারেন নি। অখণ্ড সঙ্কলনে সেই গল্পও স্থান পেয়েছে অসমাপ্ত হিসেবেই।

কাগজের পৃথিবীর অক্ষরের জাল ছিঁড়ে রুপালী পর্দায় বহুবার সদর্পে পা রেখেছে ব্যোমকেশ। প্রথমবারের মত তাকে চলচিত্রের পর্দায় নিয়ে আসেন আরেক গুণী লেখক এবং নির্মাতা সত্যজিৎ রায়। তাঁর ছবি ‘চিড়িয়াখানা’ (১৯৬৭) এর মাধ্যমে। জানামতে এরপর এখন পর্যন্ত বারো বারের মত রুপালী পর্দায় দেখা গেছে ব্যোমকেশ কে। বইয়ের পাতা ছেড়ে বের হওয়া নায়কের বিচরণ এখানেই শেষ নয়। ১৯৮০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত পাঁচ বার আলাদা আলাদা ধারাবাহিকে ছোট পর্দায় হাজির হয়েছে ব্যোমকেশ। বাংলা ভাষার গণ্ডি পেরিয়ে হিন্দী চলচিত্রেও আত্মপ্রকাশ করে ব্যোমকেশ ২০১৫ সালে। যদিও সেই ব্যোমকেশ বড় বেশী চাঁছাছোলা আর মারকুটে, কেন যেন তার মাঝে পরিচিত এই চরিত্রকে খুঁজে পেতে কষ্ট হয়েছে।

শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায় এক সাক্ষাৎকারে চলচিত্রের ব্যোমকেশ নিয়ে কথা বলেছিলেন। ১৯৬৭ সালে প্রথম ছায়াছবি মুক্তির উপর ভিত্তি করে তিনি বলেন, ব্যোমকেশ কে ছবিতে চশমা পরানো হলেও, তাঁর ব্যোমকেশ জীবনেও চশমা পরেনি। পরবর্তী যুগে পর্দার ব্যোমকেশকে নানান ক্ষেত্রে হুসহাস পিস্তল ব্যাবহার করতে আর হাতাহাতি করতে দেখা যায়। শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায় বলেছিলেন যে, তাঁর লেখা এই চরিত্রকে তিনি সামাজিক ঘরানার রহস্যের মধ্যে রেখেছেন। বাস্তবের সাথে যতটা সম্ভব মিল রেখে সেই কাহিনী বলার চেষ্টা করেছেন। এ জন্যে গোলাগুলি অথবা অযথা মারমারি তিনি গল্পে রাখেন নি।

এবার আসি ‘ব্যোমকেশ বক্সী’ সিরিজের মূল চরিত্রদের বিবরণে। একেবারে প্রথম বইয়ে ব্যোমকেশের বিবরণ দেয়া হয়েছিল কিছুটা এভাবে,“ গায়ের রঙ ফর্সা, বেশ  সুশ্রী সুগঠিত চেহারা, মুখে চোখে বুদ্ধির একটা ছাপ আছে।” এই সময় তাঁর বয়স উল্লেখ করা হয়েছিল ২৩-২৪ বছর। ব্যোমকেশের ধরন-ধারন সাধারণ বাঙ্গালী ভদ্রলোকের মতই। এমনিতে মৃদুভাষী ধরনের মানুষ, কিন্তু কাজের বেলায় যখন প্রয়োজন, সে ক্ষেত্রে তার মত ধারালো কথা বলার ক্ষমতা খুব বেশী মানুষের নেই। নিজেকে গোয়েন্দা বা ডিটেকটিভ বলতে নারাজ সে। তার মতে সে একজন ‘সত্যান্বেষী’। নিজের দেয়া উপাধি, কারন নানান উপন্যাসে তাকে বলতে দেখা যায়, ব্যোমকেশ সত্যকে জানতে চেষ্টা করে তাই সে সত্যান্বেষী। ব্যোমকেশের পরিবার বিষয়ে খুব বেশি না জানা গেলেও, তাঁর বাবা গণিতের শিক্ষক ছিলেন এই কথা উল্লেখ রয়েছে। সেখান থেকেই ব্যোমকেশের ছক কষে রহস্যের জাল ছাড়ানর প্রতিভা এসেছে বলে মনে হয়। মূলত তরুণদের জন্য লেখা এই রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজে ব্যোমকেশকে কখনোই খুব অসাধারণ করার চেষ্টা করা হয়নি। না যে মস্ত পালোয়ান যে  মারামারিতে দক্ষ না সে নিজের গণ্ডির ভেতর নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে। বুদ্ধির চমকে, অবস্থার বিশ্লেষণে রহস্যের সমাধান করাই ব্যোমকেশের কাজের ধরন। সময়ের সাথে চরিতের বয়স বেড়ে চলা অথবা শারীরিক আর মানসিক ক্ষমতার রদবদল শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায় সুনিপুণ ভাবে লিখে গেছেন। আরও অনেক লেখকের মত নিজের ছায়া আদলেই গড়ে ছিলেন ব্যোমকেশের চরিত্রটি। আর বয়সে ধরেছিলেন নিজের থেকে দশ বছরের ছোট হিসেবে।

এই সিরিজের আরেক প্রধান চরিত্র ‘অজিত’। পেশায় লেখক। নিজের লেখা নিয়ে মাঝে মধ্যেই পরিহাস করতেও দেখা যায় তাকে। গোয়েন্দা সে হোক সত্যান্বেষী তাতেই কি, সহকারী থাকা কি বারণ তাই বলে? একেবারে প্রথম কাহিনীতে দুইজনের পরিচয় সেখান থেকেই বন্ধুত, এর পর এক বাড়িতে এক পরিবারের মতই থেকেছে সে বহুকাল। ব্যোমকেশের সাথে তার অভিযান আর নিজেদের মধ্যকার মজাদার সংলাপ গুলো এই সিরিজের কাহিনিকে সাবলীল ভাবে এগিয়ে নিতে সাহায্য করে। অনেক রহস্য উপন্যাসের মত তারই লেখনিতে উঠে আসত ব্যোমকেশের অজেয় সব কাহিনী। তবে পরবর্তীতে ব্যোমকেশ নিজেই সেই হাল ধরে, কারন সময় গড়ানোর সাথে সাথে অজিত সফল লেখকে পরিণত হয়। ব্যাস্ত হয়ে পরে ব্যোমকেশ আর নিজের পাবলিকেশন ব্যাবসা আর নিজের লেখালেখির কাজে। অকৃতদার এই লেখকের চরিত্রটিও শরদিন্দু বন্দোপাধ্যায়  অসাধারণ বিবরণের মাধ্যমে জীবন্ত করে তুলেছিলেন।

সাধারণ রহস্য গল্প অথবা যদি আরও নির্দিষ্ট করে বলি, গোয়েন্দা কাহিনীর ক্ষেত্রে প্রেম-ভালোবাসা, বন্ধুত্ব এসব অহরহ দেখা গেলেও, পুরোপুরি সংসার পেতে বসা গোয়েন্দা এই বাংলায় খুব বেশি নেই। ব্যোমকেশের স্ত্রীর নাম ‘সত্যবতী’। সিরিজের পঞ্চম কাহিনীতে প্রথমবারের মত সত্যবতীর আগমন, এক রহস্য উন্মোচন করতে গিয়ে ঘটনাক্রমে ব্যোমকেশের পরিচয় হয় তার। পরবর্তী কাহিনী গুলোতে ধারাবাহিক ভাবে তাদের বিয়ে এবং সাংসারিক খুঁটিনাটির বিবরণ পাওয়া যায়। ব্যোমকেশ এবং সত্যবতীর এক ছেলের কথাও কিছু বইয়ে উল্লেখ রয়েছে। এক বাড়িতে বসবাস করা ব্যোমকেশ পরিবার আর অজিতের কাহিনী সেই সময়কার পাঠকদের যেমন সত্যের কাছাকছি রেখেছিল ঠিক তেমনি আজও রেখে চলেছে।

এই সিরিজের প্রতি আমার বিশেষ আবেগ কাজ করে কারন, বেশিরভাগ সিরিজ বইয়ের ক্ষেত্রে লেখকের মৃত্যুর সাথে অঘোষিত ভাবে তাঁর লেখা সিরিজ এবং এর চরিত্রদেরও মৃত্যু ঘটে। ব্যোমকেশের ক্ষেত্রে লেখকের মৃত্যুর পর তাঁর প্রতি সন্মান জানিয়ে প্রতুলচন্দ্র গুপ্ত বেশ গোছানো আর সুন্দর ভাবে সিরিজের আর এর চরিত্র গুলোর সমাপ্তি টেনেছেন। অখণ্ড সঙ্কলনের শেষে “ব্যোমকেশ ও সত্যবতীর প্রস্থান” নামে সেই কাহিনীটি সংযুক্ত করা আছে। যেই চরিত্রের সাথে অনেকটা সময় কাটানো, অভিযানে বের হওয়া আর রহস্যের সমাধান করা, তাদের বিদায় বেলার হাসিমুখ স্মৃতিতে অম্লান হয়ে থাকবে আজীবন।