ভুতের গল্প – পোড়ামুখো

Now Reading
ভুতের গল্প – পোড়ামুখো

গ্রামের নাম চরমিরকামারি। বিদ্যুৎ চলে এলেও ঘন গাছগাছালি এখনো গ্রামটিকে অজপাড়া গাঁয়ের পরিচয় দিয়ে রেখেছে। আজকে যে কাহিনীটা বলবো সেটা এ গ্রামেরই ঘটনা। ঘটনাটা ঘটে আমার এক চাচাতো ভাইয়ের সাথে। তার মুখে যা শুনেছি সেটাই গুছিয়ে লিখা আপনাদের জন্য।

রাত তখন একটা বাজে। আব্বা আম্মার কথা না শুনে ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছি। ঘণ্টায় ঘণ্টায় আব্বার ফোন কতদূর আসলাম, কিন্তু বিরক্ত হলেও মনে কেমন একটা শান্তি পাচ্ছিলাম। আব্বার শত বলা সত্ত্বেও এলাকার বাসস্ট্যান্ডে না নেমে আমি আলহাজ মোড়ে নেমে পরি। তখন ঘড়িতে বাজে ১ টা ৪৫ মিনিট।

“কিবা ঢাকা থেকে আইলা নাকি”, জোরে এক হাক শুনে চমকে পিছু চাইলাম। মোড়ের এক চা দোকানদার ডাক দিয়েছে। একটা দোকানি খোলা। বন্ধের প্রস্তুতি চলছে।”তো যাইবা কই হুনি”, দোকানদার বলে।”চাচা, ওয়াপদা গেট যাব। কলোনির মধ্যে বাসা”। “তো এখানে নামছো কেন?। কোনও গাড়ি থামবো না। বাসস্ট্যান্ডে নামা ভালা ছিল”। কথার উত্তরে শুকনো একটা হাঁসি দিলাম। ” হাঁটা দাও। বেশি না ৩০ মিনিটের রাস্তা।”, দোকানদার চাচা বলল।

দোকান বন্ধ করে দোকানদার হাঁটা ধরলো তার বাসার দিকে। পাশেই ডাল গবেষণা কলোনির মধ্যে তার বাসা( দোকানদারের সাথে কথাবার্তা এখানে উল্লেখ করে আপনাদের বিরক্ত না করাই ভালো)। একবার ভাবলাম সাথে যাবো কিনা ওই লোকের সাথে তারপর আবার কি মনে হলো, ঘুরে বাড়ির দিকে হাঁটা দিলাম। ঘুটঘুটে অন্ধকার, ঠাণ্ডা হিমেল বাতাস বয়ে যাচ্ছে।

“ওই কে যাই?”, সামনের অন্ধকার দোকানের মধ্যে থেকে এক লোক বের হয়ে এল। ” ধুস শালা, আজকে কি হইছে। লোকজন একটার পর একটা আসতেছে”। আল্লাহ্‌র নাম নিয়ে বুকে ফু দিলাম। নাইটগার্ড। বেশ কয়েকটা দোকান আর সাথে ওয়ালটনের শো-রুম আছে মোড়ে উপর, সেটা পাহারা দিচ্ছে এক বুড়া চাচা। আমার গেটআপ দেখে চোর না বুঝে ছেড়ে দিলো। সাথে আবার কিছু দূর এগিয়ে দিয়ে গেল। হাঁটছি তো হাঁটছি। সময় যেন আর যাই না। ভেলুপারা আর বরইচারা এর মাঝামাঝি একটা অনেক পুরানো একটা সাঁকো। কাহিনীর শুরু এখান থেকেই।

সাঁকোর উপর উঠবো এমন সময় দমকা হাওয়া বয়ে গেলে। সাঁকোর চার পাশটা খোলা। আখের চাষ করা হয়েছে। সাঁকোতে যেই পা দিয়েছি অমনি মট করে কি যেন ভাঙলো। চমকে উঠে নিচে তাকালাম কই কিছু তো নেই। খিক খিক করে হাসি শুনলাম। আঁখের পাতা গুলো তুমুল বেগে দুলতে শুরু করলো। মনে মনে আল্লাহ আল্লাহ করা শুরু করলাম। এর মধ্যে কোন ফাঁকে রাস্তার মধ্যে চলে এসেছি টের পেলাম প্রচণ্ড হর্নের শব্দে। জানটা বোধহয় আজকে যাবে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে গাড়িটা আমার মধ্যে দিয়ে চলে গেল। হাসি যেন থামে না কাদের যেন। কে কে বলে উঠলাম। সাঁকো পার করেছি এমন সময় দেখি একটা কঙ্কাল হেটে আমার সামনে এলো। মাথার খুলিটা হাতে ধরা। একবারে মুখের সামনে এসে খুলিটা উঁচু করে আমার মুখের কাছে ধরলো। গরম শ্বাস আমার মুখের উপর পরছিলো। অন্ধকার তারপরও কঙ্কালটাকে আমি পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছিলাম। গায়ে কোন মাংস নেই। কিন্তু চোখ দুটো ঠিকই আছে। ভয় কাহাকে বলে আর কত প্রকার মনে মনে পড়ছিলাম। কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থেকে কঙ্কালটা পাশের আঁখের জমিতে নেমে গেল।

হঠাৎ যেমন শুরু হয়েছিল তেমনি হঠাৎ করে থেমে গেল সব। জোরে হাঁটা ধরলাম। পণ করলাম আর কোন দিকে তাকাবো না। ভয় দুর করার জন্য গান গাওয়া শুরু করলাম। বাড়ি সেখান থেকে আরও ১০-১২ মিনিটের দূরে। তার মাঝে একটা নিরিবিলি রাস্তা। আগের রাস্তার মতো এটা অত ফাঁকা ছিল না। এই জায়গাটা সব থেকে ভয়ংকর ছিল। রাস্তার ধার ধরে টানা ঝাউ গাছ শাকরেগাড়ি মোড় পর্যন্ত, তারমাঝে ছোট একটা সাঁকো। সাঁকোর কাছাকাছি এসে দেখি, সেটার উপরে একটা লোক বসে। এতরাতে এখানে কাউকে দেখে আমার গলা শুকিয়ে এল।” ভাই কাউকে পাইলাম অবশেষে”, লোকটা বলে উঠলো। ” ভাইজান ম্যাচ আছে, একটা সিগারেট খাব”। একে তো অমাবস্যা রাত তার উপর জায়গাটা অনেক অন্ধকার। লোকটার মুখ দেখতে পাচ্ছিলাম না। দৌড় দেবার সাহস হচ্ছিলো না, পায়ে বল পাচ্ছিলাম না। মনে শক্তি সঞ্চার করে এগিয়ে গেলাম। সিগারেট যদিও খাই না, তবু লাইটার পকেটে থাকে আমার কখন কি কাজে লেগে যাই।

লাইটার জ্বালিয়ে যেই মুখের কাছে ধরেছি তারপর যা দেখলাম সেটা বুঝি না দেখলেই ভালো করতাম। বীভৎস একটা মুখ আমার সামনে। পোড়া চামড়া বের হয়ে ঝিকঝিকে সাদা দাঁত দেখা যাচ্ছে। চোখের একটার পাতা নাই আর আরেকটা চোখ তো পুরাটাই নাই। চুল পুড়ে চকচকে খুলি বের হয়ে এসেছে। লাইটারের আলোয় অর্ধ পোড়া চোখের তারা মিটমিট করে জ্বলছে। “ভাইজান ভয় পেলেন নাকি”। পোড়া হাতের ছোঁয়া আমার চমক ভাঙলো। ঠিক সেই সময় আগের খিক খিক হাসিটা আবার শুনতে পেলাম। লোকটার দিকে তাকাতেই দেখলাম এই সেই একই হাসি। দাঁত বের করে লোকটা হাসছে। হাত সরিয়ে নিতে চাইলাম। কিন্তু গায়ের সব শক্তি যেন কেউ শুষে নিয়েছে। টানতে টানতে আমাকে রাস্তা থেকে নামিয়ে নিয়ে যেতে লাগলো পাশের জমিতে। খোলা মাঠের মত কিন্তু আম গাছের সারি আছে চারদিকে। মট করে শব্দ হলো। চিনচিন করে উঠলো বুকের ভেতর।” কি করলেন? কি করলেন?”, লোকটা বলে উঠলো। লোকটার ধরা হাতটার দিকে আমি তাকালাম। ৯০ ডিগ্রি অ্যাঙ্গেলে হাতটা উল্টা দিকে বেকে গেছে। ভয় ও ব্যথায় জোরে চীৎকার করে উঠলাম। বুঝলাম যে কোন মুহূর্তে জ্ঞান হারাবো। চোখ বন্ধ হবার আগ মুহূর্তে শুনতে পেলাম,” এত নড়াচড়া করলে তো এমন হবেই। একটু গল্প করতে চাইলাম আর মামা আপনি”।

পরদিন সন্ধ্যার দিকে আমার জ্ঞান ফিরে। পরের কাহিনীটুকু হলো, আব্বা আমাকে ফোন দিয়ে না পেয়ে, চাচা আর আমাদের মিলের লোকজন নিয়ে খুঁজতে বের হন। আমার চীৎকার শুনতে পেয়ে ওই জায়গাতেও আসেন কিন্তু ওখানে ছিলাম না আমি। আমাকে নাকি বাসার দরজার সামনে পাওয়া যায়। আমার জামা চিরে নাকি আমার ভাঙ্গা হাতটা বাঁধাছিলো। হাতের যে জায়গাটা লোকটা ধরেছিল ওই জায়গাটা কালো ফোস্কা ভরা ছিল।