ঢাকার ঐতিহ্যবাহী কিছু মসজিদ !

Now Reading
ঢাকার ঐতিহ্যবাহী কিছু মসজিদ !

ঢাকা কে মসজিদের নগরী বলা হয় ।ঢাকার মতো এতো মসজিদ বাংলাদেশের কোথাও নেই । আপনি যদি সত্যিকার অর্থে মসজিদের নগরী দেখতে চান থামলে আপনাকে যেতে হবে পুরান ঢাকায় । আপনি কিছু দূর যাওয়া মাত্র একটি করে মসজিদ দেখতে পাবেন । পুরান ঢাকার যখন এক সাথে সব মসজিদ আজান দেয়া শুরু করে , আপনি দ্বিধায় পরে যাবেন এইভাবে যে কোনটা কোন মসজিদের আজান ।

আজ আমি সেই রকম ঢাকার মধ্যে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী কিছু মসজিদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিবো । যদি কখনো সময় হয় আপনাদের ইচ্ছে করলে সেখানে গিয়ে নামাজ পড়ে আসতে পারেন ।

১- তাঁরা মসজিদ – পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় অবস্থিত তাঁরা মসজিদ । ঢাকা শহরে যত গুলো ঐতিহ্যবাহী মসজিদ আছে তার মধ্যে আরমানিটোলার তাঁরা মসজিদ অন্যতম । ইন্টারনেট ও স্থানীয় লোকদের থেকে জানা যায় এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয় আঠারো শতকের দিকে মানে ইংরেজদের আমলে । লোক মুখে শুনা যায় মির্জা গোলাম পীর এই মসজিদটি নির্মার করেন । এই মসজিদের নাম তাঁরা মসজিদ হওয়ার কারণ হলো , এই মসজিদের সাদা মার্বেল পাথরের গায়ে অসংখ্য তাঁরা আঁকা রয়েছে । আর এর থেকে তার নাম করুন করা হয় তাঁরা মসজিদ । মসজিদের প্রবেশ পথে আপনার চোখে পর্বে বিশাল আকৃতির একটি তাঁরা । মূলত এই ঝর্ণা । বিকেল বেলা ঝর্ণা ছাড়া হয় । মাঝে মাঝে মানুষ নামাজ পড়ে এসে এখানে বসে । প্রথম দিকে তিনটি গম্বুজ থাকলেও পরবর্তী কালে আরো ২টি গম্বুজ নির্মাণ করা হয় । এখন সর্বমোট ৫টি গম্বুজ আছে । প্রথম দিকে মসজিদটি অনেক সারা মাটা ছিল । পরবর্তী কালে এই সংস্করণ করুন করে বর্তমান রূপ দেয়া হয় । মসজিদের পিছনের বাম সাইডে রয়েছে একটি কবরস্থান । মির্জা সাহেবকে এখানে করব দেয়া হয়েছিল . লোক মুখে জানা যায় মসজিদের প্রথম ইমাম কে এখানে কবর দেয়া হয়েছিল । প্রথম অবস্থায় মসজিদ এর আকার ছোট থাকলো পরবর্তী কালে এর আকৃতি বড় করা হয়েছে । প্রতিদিন এখানে হাজারো দেশি ও বিদেশী দর্শনার্থী ঘুরতে আসেন । আপনি ও ইচ্ছে করলে ঘুরে আসতে পারেন তাঁরা মসজিদ থেকে , আর পুরান ঢাকার খাবার খেতে ভুলবেন না । তাঁরা মসজিদ থেকে একটু সামনে এগিয়ে গেলে আপনি পাবেন ফুচকার দোকান । ঢাকার অন্যতম বিখ্যাত ফুচকার দোকান ।

তাঁরা মসজিদ

২- লালবাগ শাহী মসজিদ – লালবাগ যেমন লালবাগ কেল্লার জন্য বিখ্যাত , ঠিক অপর দিকে লালবাগ শাহী মসজিদ এর জন্য বিখ্যাত ।প্রায় ৩০০ বছর আগের এই মসজিদ । এর নির্মল কাল ১৭০৩ সাল। ১৭০৩ সালের দিকে ফারুক এই মসজিদটি নির্মার করে থাকেন । ঢাকার মধ্যে যেসব বড় মসজিদ আছে তার মধ্যে এটি অন্যতম , এই মসজিদে এক সাথে প্রায় ১৫০০ লোক নামাজ পড়তে পারে । এই মসজিদের মূল নকশা ঠিক রেখে বহুবার সংস্করণ করা হয় । এই মসজিদের কিবলার উপর দিকে একটি গম্বুজ আছে । যা সচরাচর দেখা যায় না । এর মসজিদের আয়তনের দিক থেকে অনেক বড় । প্রতিবার সংস্করণের সময় মসজিদের আয়তন বৃদ্ধি করা হচ্ছিলো । এই মসজিদের প্রত্যেকটা মিহবারের দিকে ৩ টি করে প্রবেশ পথ রাখা হয়েছে । আপনি যখন লালবাগ কেল্লা ঘুরতে যাবেন তখন ইচ্ছে করলে এই জায়গা ঘুরে আসতে পারেন । আর লালবাগ কেল্লার বিখ্যাত খেতে পুরি আপনি এখানে পাবেন । ঘুরে ঘুরি শেষে ইচ্ছে করলে খেতে দেখতে পারেন ।

লালবাগ শাহী মসজিদ

৩- বিনত বিবির মসজিদ – বিভিন্ন তথ্যমতে ঢাকার সবচেয়ে পুরাতন মসজিদ হিসেবে বিনত বিবির মসজিদ কে ধরা হয় । বিনত বিবির মসজিদ তার নির্মাতা বিনত বিবির নাম অনুসারে রাখা হয়ে । পুরান ঢাকার নারিন্দায় এই মসজিদের দেখা পাওয়া যায় । ১৪৫৭ সালে মারহামাতের মেয়ে মুসাম্মাত বখত বিনত বিবি এটি নির্মাণ করেন । প্রায় ৬০০ বছর পুরাতন এই মসজিদ । আগে যখন মানুষ বাংলায় ব্যবসা করতে আসতো তখন এই মসজিদে নামাজ পড়তো । কারণ নারিন্দায় ছিল বুড়িগঙ্গা নদীর শাখা । বিভিন্ন বার এই মসজিদকে সংস্করণ করা হয়ে । বিনত বিবি কে মসজিদের পাশে শায়িত করা হয় । প্রথম দিকে দুইতলা থাকলেও পরবর্তী কালে সংস্করণ করে উপরের দিকে ৩ তলা করা হয় । নারিন্দা গেলে আপনি ভুলেও বিউটির লাচ্ছি খেতে ভুল করবেন না । ঢাকার যত লাচ্ছি আছে তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো এই বিউটির লাচ্ছি ।

বিনত বিবির মসজিদ

৪- চক বাজার শাহী মসজিদ – এটি বাংলার এমন একটি মসজিদ যা উদ্বোধন করেছিলেন বাংলার শেষ নবাব শায়েস্তা খাঁ । চক বাজার শাহী মসজিদ চক বাজারে অবস্থিত । বর্তমানের এর আয়তন আগে থেকে বৃদ্ধি করে দ্বিগুণ করা হয়েছে ।এটি প্রায় চারশো বছর আগের মসজিদ । আমাদের জন্য দুর্ভাগ্য যে এটি তার আগের যে নির্মাণ হারায় । মানে আগে যেভাবে নির্মাণ করা হয়েছিল , বর্তমানে সংস্কার করে তা পরিবর্তন করে দেয়া হয়েছে । প্রথম দিকে তিনটি গম্বুজ নিয়ে মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল । মসজিদের আয়তন ছোট হওয়ার কারণে সামনের দিকে যে জায়গা রাখা হয়েছিল , পরবর্তী কালে সেই জায়গায় মসজিদ এর কিছু অংশ নির্মাণ করা হয় ।

 চক বাজার শাহী মসজিদ

 

তথ্যসূত্র :

১- https://bn.wikipedia.org/wiki/

২-http://bn.banglapedia.org

৩- http://parjatan.portal.gov.bd/site/page/2e69b14b-6f96-4606-9fba-dbc70fc411b5

৪- https://bn.wikipedia.org/wiki/

একটি অসাম্প্রদায়িকতার নিদর্শনঃ নয়াবাদ মসজিদ

Now Reading
একটি অসাম্প্রদায়িকতার নিদর্শনঃ নয়াবাদ মসজিদ

আমাদের বাংলাদেশের সর্ব উত্তরে অবস্থিত দিনাজপুর জেলা। এখানে বছরের প্রায় সময়েই প্রচুর পরিমাণে পর্যটকের আনাগোনা লেগেই থাকে এই জেলার প্রত্নত্বাত্ত্বিক নিদর্শনগুলো দেখার জন্য। কান্তজিউ মন্দির, রামসাগরের পাঁড় কিংবা শহরের কেন্দ্রে অবস্থিত পুরোনো রাজবাড়ী ও মন্দির এগুলোই বেশির ভাগ পর্যটককে আকর্ষণ করলেও শহর থেকে মাত্র ২২ কি.মি. দূরে নয়াবাদ গ্রামের মুঘল আমলে নির্মিত মসজিদটিও এখন বেশ সমাদৃত।

তৎকালীন সময়ে এই বাংলার জনপদ দিনাজপুরের জমিদার রাজা রামনাথ কান্তজিউ মন্দির নির্মাণ কাজ শুরু করেন। ১৮ শতকের শুরুর দিকে এই নির্মাণকাজ শুরু হয়। সে সময় মুঘল সম্রাট ছিলেন দ্বিতীয় শাহ আলম। জমিদার রামনাথ সে সময়ের সবচেয়ে নামকরা রাজমিস্ত্রিদের বিভিন্ন দেশ থেকে আমন্ত্রণ জানিয়ে নিয়ে আসেন এই মন্দির নির্মাণের জন্য। এর মধ্যে অনেকেই ছিলেন সুদূর পারস্যদেশ (বর্তমান ইরান) থেকে আগত। যাদের পূর্ব পুরুষগণ অনেকেই তাজমহলের নির্মাণকর্মী ছিলেন।

এই মন্দির নির্মাণকালে একদিন জমিদার রামনাথ আসেন নির্মাণকাজ পর্যবেক্ষণের জন্য। সে সময় তিনি লক্ষ্য করলেন পারস্যদেশ থেকে আগত মুসলমান নির্মাণকর্মীরা নামাজ পড়ার জন্য উপযুক্ত স্থান পাচ্ছে না। যেহেতু মন্দির নির্মাণ কাজ চলছে তাই সেখানে বা তার আশেপাশে কোনো পরিষ্কার জায়গা না থাকায় তাদের নামাজের অসুবিধা হচ্ছে। আবার মন্দিরের উলুধ্বণি, ঘণ্টার শব্দও তাদের নামাজ ব্যাহত করে মাঝে মাঝে। তাই তিনি তাৎক্ষণিকভাবে নির্দেশ দেন এমন একটি জায়গা খুঁজে বের করতে যেখান থেকে মন্দির খুব বেশি দূরে নয় আবার মন্দিরের ঘণ্টার শব্দ মসজিদ থেকে কিংবা মসজিদের আযানের শব্দ মন্দির থেকে শোনা যাবে না। তেমনই একটি জায়গায় নির্মাণ করা হয় এই নয়াবাদ মসজিদ।

কান্তজিউ মন্দির থেকে ৪ কি.মি. দূরে নির্মাণ করা হয় এই মসজিদ। এটি দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার মাঝে অবস্থিত। ছোট্ট আর ছিমছাম এই মসজিদের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে ‘ঢেপা’ নামের একটি ছোট নদী। প্রায় ১.১৫ বিঘা জমির উপর নির্মাণ করা হয় এই মসজিদটি। এই মসজিদকে ঘিরেই সেই নির্মাণ কর্মীরা এই এলাকায় থাকতে শুরু করেন। এর ফলে পরবর্তীতে এই এলাকার নামই হয়ে যায় ‘মিস্ত্রীপাড়া’। এখানে যাওয়ার পথে রাস্তার দু’ধারে দেখা যায় অসংখ্য ফলের বাগান। যা আপনাকে যাত্রাপথে দিয়ে যাবে সবুজের ছোঁয়া।

মসজিদটির স্থাপত্য কৌশল তৎকালীন সময়ের অন্যান্য স্থাপত্যের মতই। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদের মূল আকর্ষণ এর দেয়াল জুড়ে অসাধারণ সব কারুকাজ। ফুল ও বিভিন্ন গাছের পোড়ামাটির নকশা করা টেরাকোটা সমৃদ্ধ এই মসজিদটি এক অপরূপ মোহ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে বছরের পর বছর। মসজিদের চার কোণায় চারটি অষ্টভুজ মিনার দাঁড়িয়ে আছে। যা একে আরও সৌন্দর্যমন্ডিত করেছে। মসজিদের দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় ১.১০ মিটার। এর উত্তর ও দক্ষিণ দেয়ালে একটি করে জানালা আছে। আবার পশ্চিম দেয়ালে ৩টি মিনার আছে যেগুলো মসজিদের প্রবেশদ্বার বরাবর নির্মাণ করা হয়েছে। মাঝখানের মিনারটি অন্য দুটি মিনার থেকে একটু বড়। প্রায় ১৩০ মিটার উঁচু আর প্রস্থ ১.০৮ মিটার। সময়ের জাঁতাকলে মসজিদের অনেক কারুকাজই প্রায় বিলীন হয়ে যাচ্ছিল। অনেক টেরাকোটাই নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল বা ভেঙ্গে পড়ছিল। আর মাত্র ১০৪ টি টেরাকোটা অবশিষ্ট ছিল। এই টেরাকোটাগুলো আয়তাকার এবং আকার ০.৩০ মিটার থেকে ০.৪০ মিটার। এমতাবস্থায় প্রত্নত্বাত্ত্বিক বিভাগ এটি সংস্কারের উদ্যোগ হাতে নেয় এবং এর পুরনো জৌলুস ফিরে আসে। এছাড়াও এই মসজিদের সামনে এখন ফুল ও ফলের বাগান করা হয়েছে। বসার জন্য টালীর ঘর করা হয়েছে যা এই স্থানটিকে আরও বেশি দর্শনীয় করে তুলেছে। পুরনো কিছু গাছের চারপাশে বসার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। প্রায় প্রতি মাসেই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নত্বাত্ত্বিক বিভাগের শিক্ষার্থীরাও এই স্থাপত্যশিল্প দেখতে আসে।

এই মসজিদের চারপাশে বেশ কয়েকটি কবর রয়েছে। উক্ত এলাকায় কথিত আছে যে, ওই কবরগুলো সেই নির্মাণকর্মীদের যারা এই মসজিদ ও কান্তজিউ মন্দির নির্মাণ করেন। বর্তমানে মসজিদের আশে পাশের এলাকায় তাদের বংশধরদের বাড়িঘর রয়েছে।

আজকের যুগে অনেক জায়গাতেই সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ফ্যাসাদ হয়। এতে অগণিত মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। আজো অনেক মানুষই আছেন যারা অন্য ধর্মের মানুষকে বিশ্বাস করতে পারেন না, তাদের সাথে চলতে কিংবা কথা বলতে অপছন্দ করেন। অনেক সময় অন্যের ধর্মকে নিয়ে মজাও কুড়ান। অথচ আজ থেকে শত শত বছর আগে যে ইট, বালু, চুন আর সুরকী দিয়ে একদল হিন্দু ও মুসলমান নির্মাণকর্মী দ্বারা একটি মন্দির নির্মিত হয়েছিল সেই একই ইট, বালু, চুন আর সুরকী দিয়ে এই মসজিদটিও নির্মিত হয়েছিল। তারা একবারও মনে করেননি আমি কেন অন্যের পূজার বা নামাজের জায়গা তৈরির জন্য কাজ করব। তারা আমাদের মত শিক্ষিত ছিলেন না। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এত জ্ঞান আর এত নামী দামী প্রযুক্তিও তাদের ছিল না কিন্তু একে অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ, আন্তরিকতা আর ভ্রাতৃত্ববোধ ঠিকই ছিল। যার সাক্ষী হয়ে আজো দাঁড়িয়ে আছে শতাব্দী পুরনো এই ‘নয়াবাদ মসজিদ’।