চীন সুপার পাওয়ারে পরিণত হলে ১০টি উপায়ে ঘটবে বিশ্বের পরিবর্তন

Now Reading
চীন সুপার পাওয়ারে পরিণত হলে ১০টি উপায়ে ঘটবে বিশ্বের পরিবর্তন

চীন তার লক্ষ্য স্থির করেছে যে আগামীতে তারাই হবে সুপার পাওয়ার দেশের অধিকারী। তারা ইতিমধ্যেই এ লক্ষ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা ও কর্ম কৌশল গ্রহণ করেছে। এ ব্যাপারে চীনের প্রেসিডেন্ট শিং জিং পিং জনসম্মুখে ঘোষণা করেছে, আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে তারা বিশ্ব নেতৃত্ব দেবে। ইরাক-সিরিয়াসহ একাধিক দেশে সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে ব্যস্ত আমেরিকা। এদিকে অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও অর্থনৈতিক সমস্যায় জর্জরিত এককালের দাপুটে রাশিয়া। অন্যদিকে সুনির্দিষ্ট রণকৌশল ও সাহসী পদক্ষেপ নেয়ার অক্ষমতায় ভুগছে ভারতের মতো দেশ। ফলে এই মুহূর্তে একক শক্তির আসন কার্যত টালমাটাল। আর এমন পরিস্থিতিতে সুযোগের সদ্ব্যবহার করে আমেরিকাকে ধরাশায়ী করার ছক কষছে চীন। অঢেল প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য্য, বিশাল মানব সম্পদ এবং শক্তিশালী অর্থনীতিতে ভর করে কিভাবে এগিয়ে যাওয়া যাবে এমন পরিকল্পনাই করছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

যদি চীন তার লক্ষ্য অর্জন করে তবে বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করবে পৃথিবীর আমূল এক পরিবর্তন, হয়ত আমাদের জীবদশায় তা দেখে যেতে পারব। তেমন যদি হয় ইতিহাসে প্রথমবারের মত আমেরিকার প্রভাব প্রতিপত্তি হ্রাস ঘটবে এবং অন্যদিকে বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হবে চীনের। আমাদের স্পষ্ট কোন ধারণাই নেই বিশ্ব কিরুপ অবস্থায় রুপ ধারণ করবে। চীন তাদের ইমেজ প্রতিষ্ঠার জন্য প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছে কিভাবে বৃহৎ শক্তি রুপে নিজেদের জানান দেয়া যায়।

আফ্রিকা হতে পারে বিশ্ব শক্তিধরের একজনঃ চীনের এমন উত্থান আবার তাদের জন্য মঙ্গল জনক নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আফ্রিকা শক্তিধর রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। এদিকে অনেকে কল্পনাই করতে পারবেনা আফ্রিকার বিষয়ে চীন খেলার কি দান টাই চালছে। বর্তমান সময়ে আফ্রিকার সাহায্যকারী প্রধান দেশ হিসেবে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। তারা সেখানে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে এবং অদূর ভবিষ্যতে এই পরিমাণ আরো বাড়বে। তারা সেখানে এমন অনেক প্রকল্প নিয়ে এগুচ্ছে যা ২০২৫ সালের মধ্যে বিনিয়োগের লক্ষ্য মাত্রা হবে ১ট্রিলিয়ন ডলার। পাশ্চাত্য দেশ গুলি অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে এখানে বিনিয়োগ করাতে, কেননা এই অঞ্চলের বেশিরভাগ দেশই স্বৈরচার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। বিভিন্ন দেশে আমেরিকান অর্থ বিনিয়োগ হয় রাজনৈতিক সংস্কার এবং গণতন্ত্রায়নের নিমিত্তে। তবে সে ক্ষেত্রে চীন এসব পরোয়া করেনা, তারা আফ্রিকার দারিদ্র বিমোচনে বিনিয়োগ করে যাচ্ছে। তাদের ভাষ্যমতে, আফ্রিকায় বিনিয়োগ করা প্রতি ডলারের বিপরীতে ৬ডলার আয় করছে। ইতিমধ্যে চীন ও আফ্রিকার মধ্যে বেশ ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। চীন চাচ্ছে সে সম্পর্কের প্রসার ঘটিয়ে ব্যপক বিনিয়োগের। ইতিমধ্যে আফ্রিকাও তার সুফল পেতে শুরু করেছে, আফ্রিকার একশ কোটি লোকের মধ্যে ৩০ কোটি লোক ইতোমধ্যে পৌঁছে গেছে মধ্য আয়ের সারিতে। তাদের দারিদ্রতা বলতে গেলে অনেকটাই বিমোচিত হয়েছে। বলা হচ্ছে চীন ও আফ্রিকার এই সম্মীলনে ভবিষ্যতে বিশ্ব পাবে এক নতুন মাত্রা। ‘সুপার পাওয়ার’ হিসেবে বিশ্বে নিজের দাপট বাড়ানোর নকশা তৈরি করে ফেলেছে চীন। আসুন কিছু বিষয়ে আলোকপাত করি কিকি কারণে চীন তার লক্ষ্যস্থলে পৌঁছাতে পারে।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মন্দাঃ যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে নানামুখি সংকট বর্তমান বিশ্বের এই এক নম্বর সুপার পাওয়ার দেশটির ভবিষ্যৎ অনেকটাই অনশ্চিয়তার মুখোমুখি। যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে এই সংকট হতে উত্তরণ লাভ করলেও দীর্ঘ মেয়াদে দেশটি কোনোভাবেই তার অবস্থান ধরে রাখতে পারবে বলে মনে করছেন না আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান অর্থনৈতিক দুরবস্থার জন্য তারা নিজেরাই দায়ী এই সংকটের প্রধান কারণ তাদের অতিমাত্রায় ভোগবাদিতা এবং বিলাসিতা। জীবনটা বিলাসীভাবে উপভোগ করতে গিয়ে তারা অধিক মাত্রায় ঋণ করার উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আর সাধারণ নাগরিকদের এই মনোভাবকে পুঁজি করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো সে দেশে জমজমাট ব্যবসায় করে যাচ্ছে। এর কারণ বিশ্বের স্বল্প সুদে সহজে ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান সবার শীর্ষে। সেখানকার ব্যাংকগুলো ঋণ আদায়ে যথেষ্ট দীর্ঘ সুত্রিতার সম্মুখীন হচ্ছে। অনেক ব্যাংক ইতিমধ্যেই ঋণ আদায়ে ব্যর্থ হয়ে দেউলিয়া হয়ে গেছে। ২০০৭ সাল থেকে ২০১১ সালের মধ্যে মোট ১৫৪টি বড় আকারের ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেছে। এ ছাড়াও দেশটি উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ না করে অনুৎপাদনশীল খাতে অতিমাত্রায় পুঁজি বিনিয়োগের ফলে ক্রমশ ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। যার প্রভাব সমগ্র অর্থনীতির উপর ভর করেছে। এদিকে দেখা যাচ্ছে যে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে বহির্বিশ্বের দেশগুলোতে চীনের বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি।  তাই অনেক ক্ষেত্রে এই অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণে চীনের ভুমিকাও জড়িত। চীন চাচ্ছে অর্থনৈতিক কৌশল ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান ক্রমশ দুর্বল করে দিতে।

আইন শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাপী ভূমিকাঃ অনেকের অনুমান সত্ত্বেও হয়ত এই মুহূর্তে চীন পৃথিবীর কোথাও তার শক্তি প্রয়োগ করবে না কিংবা কাউকে কমিউনিস্ট হতে প্রলুব্ধ করবেনা। যদি আফ্রিকার সাথে তাদের কোন চুক্তি সম্পাদিত হয়, চীন খুব শান্ত উপায়েই তা নিয়ন্ত্রণ করছে। চীনের সরকারি কিছু চুক্তি আছে আফ্রিকার সাথে যেখানে তারা কোন হস্তক্ষেপ করতে চায়না। যদিও সেক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নীতি সম্পূর্ণ উল্টো, তারা অনুন্নত দেশ এবং স্বৈরশাসক নিয়ন্ত্রিত দেশ সমুহে লিখিত কিংবা অলিখিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু চীন এর নীতি হল তারা সে দেশকে নিজেদের মত থাকতে দিতে চায়। এমনকি সুদান ও জিম্বাবুয়ের মত দেশে বিনিয়োগ সত্ত্বেও তাদের মানবাধিকার, আইন ও বিচার ব্যবস্থায় নুন্যতম প্রভাব বিস্তার করেনি চীন। আর এখানেই পার্থক্য চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। আমেরিকান সামরিক বাহিনী অক্ষম মানেই আমেরিকা অরক্ষিত, এমনকি সমগ্র ইউরোপের যে সকল দেশ গণতান্ত্রিক তাদের ক্ষেত্রেও তাই যারা আমেরিকার সামরিক বাহিনীটিকে তাদের প্রধান রক্ষাকবচ হিসেবে গণ্য করে। কিন্তু চীন এসব গণতন্ত্র নিয়ে ভাবেনা, এবং যদিনা আমেরিকা তার শক্তির প্রদর্শন মাত্রা ছাড়ায় সেক্ষেত্রে অদূর ভবিষ্যতে দেখা যাবে যে চীনা সামরিক বাহিনী সমগ্র বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশ সমূহ গ্রাস করে বসবে। রাজনৈতিক মাপকাঠিতে আপাত নিরীহ মনে হলেও প্রয়োজনে চীন তার ভয়ংকর রুপ প্রকাশে দ্বিধা করবে না হয়ত।

বিশ্ব বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচি হবে রাজ্য নির্ধারিতঃ চীন এখন ঠাণ্ডা মাথায় তার লক্ষ্য অর্জনে এগুচ্ছে। পৃথিবীর কোথাও অস্ত্র ও বোমা ব্যবহারের পরিবর্তে অন্য পন্থা অবলম্বন করছে। তার মধ্যে আরেকটি হল চীনা শিক্ষা ব্যবস্থার প্রসার। এই পদ্ধতিকে তারা বলছে “ সফট পাওয়ার”। তারা তাদের স্কুল ও বিশ্ব বিদ্যালয় গুলোতে বাধ্যতামূলক রাজ্য নির্ধারিত পাঠ্যসূচি প্রণয়ন করেছে। এসব পাঠ্য সূচি চীন এবং কমিউনিস্ট পার্টির ভাবধারায় প্রবর্তিত। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের তুলনায় তারা এখন আফ্রিকান ছাত্রদের প্রতি বেশি ঝুঁকছেন তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির ব্যাপারে। কেননা সেই ছাত্ররাই হতে পারে ভবিষ্যৎ রাজনীতিবিদ বা নেতা। শুধুই যে চীনে এই ব্যবস্থা আছে তা কিন্তু নয়, চীনের এই ভাবধারাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিতে পৃথিবীর ১৪০টি দেশে চালু হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন ১৫০০টি মত চীনা স্কুল বা শিক্ষা কেন্দ্র।  সেসব শিক্ষা কেন্দ্রে নিয়োজিত আছে বহু চীনা শিক্ষক যারা প্রতিনিয়ত শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন, কিভাবে চীন উন্নয়নের মডেলে রুপান্তর হচ্ছে এবং পাশ্চাত্য ভ্রান্ত ধারণাগুলো সঠিক রুপ কি হবে। পাশাপাশি চীন সম্পর্কে বিশদ ভাবে জানা এবং চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ঐতিহ্য সম্পর্কে ছাত্রদের মধ্যে ধারণা দেয়া। আর এ সব কিছুই চীনের রাষ্ট্রীয়ভাবে অনুমোদিত পাঠ।

নতুনভাবে চীনের ইতিহাস রচিতঃ  চীনের কমিউনিস্ট পার্টির ১৯তম দলীয় অধিবেশনে প্রায় ২,৩০০ প্রতিনিধির উপস্থিতিতে সিপিসি’র মহাসচিব হিসাবে ৫বছরের জন্য মনোনীত হয়ে পুনরায় দেশটির প্রেসিডেন্ট পদে অভিষিক্ত হয়েছেন শি জিনপিং। পার্টির পলিট ব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দলের অভ্যন্তরে তার ক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। এমনকি, বেঁচে থাকলে নজিরবিহীনভাবে তৃতীয় দফাতেও তিনি শীর্ষ পদে আসীন হতে পারেন। পাঁচ বছর অন্তর সিপিসি-র কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয়। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যসংখ্যা প্রায় নয় কোটি যার মধ্যে সেন্ট্রাল কমিটির সদস্যসংখ্যা ২০৪৷ পার্টির সিদ্ধান্তনুযায়ী শি জিনপিং ও তাঁর মতাদর্শকে সরকারিভাবে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে৷ চীনের অবিসংবাদিত নেতা মাও সে তুং এর পর এই বিরল সন্মান ও ক্ষমতা শি জিংকে চীনের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতায় পরিণত করেছে৷ চীনা কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা মাও সে তুং এবং তার উত্তরসূরি দেং জিয়াওপিং এর পর তৃতীয় ব্যক্তি হলেন শি জিং যিনি এই বিরল সম্মানে ভূষিত হয়েছেন।

এদিকে শি জিং এর মতাদর্শের একটি মূল নীতি হলো অর্থনীতি থেকে সোশ্যাল মিডিয়া অবধি সমাজজীবনের প্রতিটি অঙ্গে ও প্রতিটি ক্ষেত্রে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকাকে সম্যক গুরুত্ব দেওয়া৷ প্রেসিডেন্ট শি জিং পার্টির জাতীয় কংগ্রেস উদ্বোধনের সময় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন যে, চীন ২০৫০ সালের মধ্যে ‘‘ বিশ্ব নেতৃস্থানীয় দেশে’’ পরিণত হবে।

ইউরোপে বিভক্তির সম্ভাবনাঃ  ইউরোপের বিভক্তি হবে সমগ্র বিশ্বের জন্য বিপদজনক। তবে শঙ্কার বিষয় হচ্ছে যে, ইউরোপে বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখন বিভক্তি প্রতীয়মান। বিবিসির ‘ক্রসিং ডিভাইডস’ শীর্ষক এক জরিপে দেখা গেছে, অনেক ইউরোপিয়ান মনে করছেন তাদের দেশগুলোতে এখন যেসকল বিভক্তি দৃশ্যমান, দশ বছর পূর্বেও তা ছিল বিরল। শতকরা ৪৭ ভাগ মানুষই মনে করছেন, সমাজে সহনশীলতা অনেকটাই লোপ পেয়েছে, বেড়েছে অস্থিরতা।

‘ইপসস মরি’ নামক অনলাইনের আরেক জরিপের হিসেব অনুযায়ী, ইউরোপের ২৭টি দেশের ৬৬ ভাগ মানুষ মনে করেন তারা জাতিগতভাবে অনেক বেশি বিভক্ত। আর ৪৪ ভাগ মানুষ মনে করেন, বিশ্বব্যাপী যে উত্তেজনা চলছে তার মূল কারণ হচ্ছে রাজনীতি। এছাড়া অধিকাংশ ব্রিটিশ মনে করেন ব্রিটেনে অভিবাসী ও সেদেশের নাগরিকদের মধ্যে স্পষ্ট বিভক্তি আছে। জরিপে ১১টি ইউরোপিয়ান দেশ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। দেশগুলো হলো- জার্মানি, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, হাঙ্গেরি, ইটালি, পোল্যান্ড, স্পেন, সুইডেন, সার্বিয়া, যুক্তরাজ্য এবং রাশিয়া। আর যদি তাই হয় তবে এই বিভক্তি কৌশল হিসেবে কাজে লাগাতে পারে চীন। কেননা যে কোন বিষয়ে বিভক্তি মানেই পরস্পর দুইটি পক্ষ, আর বিশ্ব রাজনীতিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষ হিসেবে চীন বরাবরই ভূমিকা রেখে এসেছে।

তাইওয়ান হতে পারে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুঃ তাইওয়ানকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে চীন-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাইওয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নত করার লক্ষ্যে ‘তাইওয়ান ট্র্যাভেল অ্যাক্ট’ নামক পাস হওয়া বিলে স্বাক্ষর করাতে চীন প্রয়োজনে যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে। মার্কিন সিনেট কর্তৃক সর্বসম্মতিক্রমে পাস হওয়া বিলটিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প স্বাক্ষর করলে তা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আইনে পরিণত হওয়ার অপেক্ষায়। প্রশ্ন জাগতে পারে এমন কি আছে বিলটিতে যা চীনের ঘোরতর আপত্তির কারন। বিলটিতে উল্লেখ আছে, তাইওয়ানের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা ‘সম্মানজনক প্রোটোকলে আমেরিকা সফর করতে পারবেন এবং শীর্ষস্থানীয় মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ এর সুযোগ লাভ করবেন। বিপরীতে যেকোনো পর্যায়ের মার্কিন কর্মকর্তারাও তাইওয়ান সফরে গিয়ে তাদের সমকক্ষদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবেন।

দীর্ঘদিন ধরেই চীন স্বায়ত্বশাসিত দ্বীপ তাইওয়ানকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে দাবী করে আসছে। যে কোন কিছুর বিনিময়ে তাইওয়ান করায়ত্ত করতে তারা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাই যুক্তরাষ্ট্রের আকস্মিক এই সিদ্ধান্তে বেইজিং আপত্তিস্বরূপ প্রতিবাদ জানিয়েছে এই কারণেই যে, বিষয়টি ‘এক চীন’ নীতির পরিপন্থি। এদিকে চীন তার সামরিক শক্তি তাইওয়ান প্রণালি থেকে শুরু করে জেমস শোয়াল অঞ্চল পর্যন্ত মোতায়েন করেছে। এই অঞ্চলেই অবস্থিত বিতর্কিত পার্সেল দ্বীপপুঞ্জ, ম্যাকক্লিসফিল্ড ব্যাংক এবং স্পার্টলি দ্বীপপুঞ্জ। চীনা সেনাবাহিনী তার সর্বশেষ সংস্কারের আওতায় সাব মেরিন বহরকে উক্ত অঞ্চলে মোতায়েন করেছে। তাই ধারণা করা হচ্ছে যেকোন উত্তেজনাকর মুহূর্তে তাইওয়ান আক্রান্ত হতে পারে চীন কর্তৃক।

উৎপাদন খাতে চীনের আমূল পরিবর্তন অভিসম্ভাবীঃ চীনের প্রেসিডেন্ট শিং জিং পিং মেড ইন চায়না : ২০২৫ নামে এক পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন। আর চীনের এই মহাপরিকল্পনায় কার্যত দুশ্চিন্তায় পড়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। প্রশ্ন জাগতে পারে কি এমন আছে সেই পরিকলনায়। পৃথিবীর যে কোন দেশে এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে কোন দোকানে ঢুকে চোখ বুলালেই দেখা যাবে পণ্যের অর্ধেকই চীনের তৈরি। মেড ইন চায়নার এই সাফল্যের কাহিনী কম বেশি সকলেরই জানা। কেননা এত সস্তায় কোন জিনিস পৃথিবীর আর কেউ এখনো পর্যন্ত তৈরি করতে পারেনি। কিন্তু পণ্যের গুনগত মান নিয়ে মানুষের মধ্যে একটি নেতিবাচক ধারণা আছে। কেননা চীনের ব্যর্থতা হচ্ছে তারা এখনো বিশ্ববাজারে নিজেদের ব্র্যান্ডগুলিকে সেভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারেনি, যেভাবে পেরেছিল এশিয়ার অন্য আরেক জায়ান্ট জাপান। চীনের পন্য গুলোতে তাদের কোন নিজস্বতা নেই বলে প্রচার আছে, কেননা তারা পন্যের হুবুহু নকল করতেই অভ্যস্থ। তাই চীন এখন ‘মেড ইন চায়নার’ এই ভাবমূর্তি সম্পূর্ণ বদলে দিতে বদ্ধ পরিকর। চীনের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে তার ম্যানুফাকচারিং খাত। আর সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ভিন্ন কৌশলে নতুন ট্রেড মার্ক সংযোজন করতে চায় চীন।

তারা যে পরিকল্পনাটি গ্রহণ করেছে মূলত তা তিন ধাপের। ২০২৫ সাল সেই পরিকল্পনার প্রথম ধাপ মাত্র। ২০২৫ সাল নাগাদ চীন যেসব পণ্য তৈরি করবে, তার সবকিছুরই গুনগত মান তারা বাড়াতে চায়। এ লক্ষ্যে শিল্প-কারখানাগুলোর উৎপাদনে তারা প্রয়োগ করবে আধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি। এছাড়াও এমন কিছু চীনা ব্র্যান্ড তারা তৈরি করবে, যেগুলো কিনতে ঝাঁপিয়ে পড়বে বিশ্ববাসী।

পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ হচ্ছে ২০৩৫ সাল, এ সময়কালে চীনা কোম্পানিগুলো বিশ্বের বাকী সব কোম্পানিকে প্রযুক্তি, পণ্যের গুনগত মান এবং সুনামে ছাড়িয়ে যেতে চায়। এ লক্ষ্যে তারা নতুন উদ্ভাবনের দিকে মনোনিবেশ করবে এবং বিশ্ব নেতৃত্ব দেবে।

আর ২০৪৯ সাল হচ্ছে পরিকল্পনার তৃতীয় ধাপ, আধুনিক চীন যখন উদযাপন করবে তার প্রতিষ্ঠার একশো বছর। এই মহেন্দ্রক্ষণে চীন ম্যানুফ্যাকচারিং জগতে  বিশ্বের এক নম্বর শক্তি হয়ে উঠার পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছে।

মেড ইন চায়না : ২০২৫ সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে চীনা কম্পানি আর চীনা ব্র্যান্ড বিশ্ব বাজারে চীনা আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করবে তা নিঃসন্দেহে বলা যায়। আর এটাই যুক্তরাষ্ট্রকে মাথা ব্যথার অন্যতম কারণ হিসেবে দেখা দেবে।

চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের সম্ভাবনাঃ সাম্প্রতিককালের ঘটনা প্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে আমেরিকা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দূরত্ব ক্রমশ বাড়ছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন সভায় এখন এই বিষয়টি প্রকাশ্য। যুক্তরাষ্ট্র কোন প্রস্তাব করলে চীন যেমন ভেটো দিয়ে আটকে দেয় ঠিক তেমনি চীনের প্রস্তাবের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র একই ভূমিকা পালন করে। একদিকে চীন মরিয়া সুপার পাওয়ার দেশে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও মরণপণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে নিজের অবস্থান সংহত রাখতে। কেউ যেন কারো চেয়ে কম নয়, আর কেউ কাউকে ছেড়েও কথা বলছেনা। এসবের বাইরেও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে চীন এখন অনেকটাই মুখোমুখি। বিশ্বে প্রবাহমান বিভিন্ন সমুদ্র সীমানা দখল নিতে এই দুই শক্তিধর রাষ্ট্র চেষ্টার ত্রুটি রাখছেনা। কৌশল হিসেবে নিজেদের মিত্র রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে তারা জোটবদ্ধ হয়ে শক্তির মহড়া প্রদর্শন করে তা বাস্তবায়ন করতে চায়। প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান এবং বিমান বাহিনীর বিরুদ্ধে লেজার রশ্মি ব্যবহার করছে চীন, এমনটাই অভিযোগ মার্কিন সেনা কর্মকর্তাদের। চীনের লেজার আক্রমণে অনেকটাই দিশেহারা যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন কর্তৃপক্ষের দাবী, গত বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এমন ২০ টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে যেখানে চীন লেজার ব্যবহার করার সমস্ত প্রমাণ তাদের রয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনী যে লেজার দ্বারা ক্ষতিগ্রস্থ হয়, তা মার্কিন সামরিক ঘাঁটির কাছাকাছি অবস্থিত চীনা সামরিক ঘাটি থেকে এর উৎস বলে মনে করা হয়। তবে চীনের জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগকে ‘ভিত্তিহীন ও অমূলক’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।

এদিকে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং তাঁর সম্প্রতি এক ভাষণে বলেছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে চীনের সেনাবাহিনী বিশ্বের অন্যতম সেরা বাহিনীতে পরিণত হবে। তিনি আরো ঘোষণা দিয়েছেন যে, জাতীয় পুনর্গঠনের লক্ষ্যে নিজেদের পরিবর্তিত করার সময় এসেছে এবং সমস্ত বিশ্বকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক পাওয়ার দেখানোর জন্য তারা তৈরি হচ্ছে।” চীনের সেনাবাহিনী সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টির অধীনস্থ। সেনার হাইকমান্ড হলো সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন, যার চেয়ারম্যান স্বয়ং জিনপিং। তিনি এই বাহিনীর ‘কোর লিডার’ বা সর্বোচ্চ নেতা হিসাবে মনেনীত হয়েছেন। জিনপিং এখন একাধারে দলের শীর্ষ নেতা, দেশের প্রেসিডেন্ট ও সামরিক বাহিনীর সর্বোচ্চ কমান্ডার, যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে তাকে এখন আর বেগ পেতে হবেনা। ২০১২সালে জিনপিং প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকেই ক্রমাগত চীনের সামরিক শক্তি বাড়াতে তৎপর ছিলেন। বর্তমানে চীনের সামরিক বাজেট প্রায় ১৪ হাজার কোটি ডলার এরও অধিক, যা আমেরিকার পর সর্বোচ্চ। ২০৩৫-এর মধ্যে বাহিনীকে বিশ্বের অন্যতম সেরা করার লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছেন জিনপিং। ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মাথা ব্যথার অন্যতম কারন এখন চীনের সামরিক উত্থান। দুই দেশই রয়েছে যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে, তাই আশংকা বিরাজ করছে যেকোন মুহূর্তে পরস্পরের মধ্যে যুদ্ধ বেঁধে যাওয়ার। অভিসম্ভ্যাবি সেই যুদ্ধে দুই দেশই তাদের সর্বশক্তি প্রয়োগ করবে তা আর বলার অপেক্ষা রাখেনা। যদি কোন কারনে যুদ্ধ বেঁধে যায়, সে ক্ষেত্রে বিশ্ববাসীর কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে ভবিষ্যৎ সুপার পাওয়ার কে হবে।

 

প্রত্যাশিত সে বার্গারটি কি খাওয়া হয়েছে দুই শত্রুর!

Now Reading
প্রত্যাশিত সে বার্গারটি কি খাওয়া হয়েছে দুই শত্রুর!

শেষ পর্যন্ত সকল জল্পনার অবসান ঘটিয়ে  মি. ট্রাম্প এবং মি. কিম এর মধ্যে শতাব্দীর আলোচিত বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকটি আদৌ অনুষ্ঠিত হবে কিনা তা নিয়েই তৈরী হয়েছিল সংশয়। মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন বিবৃতিতে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংস করে ফেলার বিষয়টির সঙ্গে লিবিয়া বা ইরাকের সরাসরি তুলনা করায় ওয়াশিংটন ও পিয়ংইয়ং’এর মধ্যে বাগবিতন্ডা শুরু হয়। একপর্যায়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার ব্যক্তিগত চিটিতে উত্তর কোরীয় প্রেসিডেন্ট কিম কে জানিয়ে দিয়েছেন, তারা বৈঠকের ব্যাপারে আগ্রহী নয়। পরবর্তীতে মি.কিম ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ব্যক্তিগতভাবে চিঠি লিখলে আবারো বৈঠকের সিদ্ধান্ত হয়।

এদিকে সিঙ্গাপুরের স্যান্টোসা দ্বীপের ক্যাপেলার বিলাসবহুল হোটেলে দুই দেশের প্রধানদের সাক্ষাৎ পরবর্তী কিছু সময় কেটেছে একান্তই ব্যক্তিগতভাবে। মধ্যাহ্নভোজনের পর ক্যাপেলার বিলাসবহুল হোটেলের বাগানে একসাথে হাঁটতে দেখা যায় মি. কিম ও মি. ট্রাম্পকে। তারা হোটেলটির বাগানে কিছুটা সময় হেঁটে একান্ত আলাপ করেন, আর এই সময়টুকুতে দুই নেতাকে বেশ প্রফুল্ল দেখা যায়। হোটেলটির কর্তৃপক্ষ খাওয়া দাওয়ার বেশ আয়োজন করে। তবে খাওয়ার মেন্যুতে সবেচেয়ে স্পেশাল যে আইটেমটি ছিল তার প্রতি সকলের আগ্রহ ছিল খুব বেশি। আর এই আইটেমটি হচ্ছে বার্গার, কেননা ২০১৬’তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনী প্রচারণার সময় মি. ট্রাম্প বলেছিলেন যে তিনি মি. কিম’এর সাথে বার্গার খেতে চান। তাই অন্যান্য আইটেমের পাশাপাশি রাখা হয়েছে সেই প্রত্যাশিত বার্গার।

হোয়াইট হাউজের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে যে মি. ট্রাম্প ও মি. কিমের একান্ত বৈঠকটির স্থায়ীত্বকাল ছিল ৩৮ মিনিট। আর উক্ত বৈঠকটিতে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কিম জং-আনের মধ্যে ছিল যৌথ স্বাক্ষর করা বিবৃতি। কিন্তু ঐ যৌথ বিবৃতিতে কি ছিল তা এখনো স্পষ্ট নয়। এদিকে বৈঠক সম্পর্কে মি. ট্রাম্প বলেছেন, “অত্যন্ত ঘটনাবহুল ২৪ ঘন্টা পার করলাম আমরা। সত্যি বলতে ঘটনাবহুল তিনটি মাস পার হলো।”

এদিকে বৈঠকের আলোচনা পরবর্তী এবং বিবৃতির চারটি প্রধান পয়েন্ট হচ্ছেঃ

  1. যুক্তরাষ্ট্র ও গণপ্রজাতন্ত্রী কোরিয়া নতুনভাবে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থাপনে উদ্যোগী হবে ,যাতে দুই দেশের মানুষের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি ও উন্নতির বিষয়টি প্রতিফলিত হবে।
  2. কোরিয় উপদ্বীপে স্থিতিশীল ও শান্তিপূর্ণ শাসনব্যবস্থা অব্যাহত রাখতে যৌথভাবে কাজ করবে যুক্তরাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রী কোরিয়া।
  3. ২৭শে এপ্রিল ২০১৮’র পানমুনজাম বিবৃতি অনুযায়ী কোরিয় উপদ্বীপকে সম্পূর্ণ পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের অঙ্গীকার রক্ষা করবে গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রী কোরিয়া।
  4. যুক্তরাষ্ট্র ও গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রী কোরিয়া যুদ্ধবন্দীদের নিজ নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভূমিকা রাখবে এবং এরই মধ্যে যেসব যুদ্ধবন্দী চিহ্নিত হয়েছেন তাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া অতিস্বত্তর শুরু করবে।

মি. ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেছেন বিবৃতিটি “খুবই গুরুত্বপূর্ণ” এবং “বেশ সুসংহত” ছিল এবং তিনি ও “চেয়ারম্যান কিম” দুজনই এটি স্বাক্ষর করতে পেরে “সম্মানিত” বোধ করেছেন।

অন্যদিকে মি. কিম বলেছেন তাঁরা একটি “ঐতিহাসিক বৈঠক করেছেন এবং অতীতকে পেছনে ফেলে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।” তিনি “এই বৈঠককে সম্ভবপর” করার জন্য মি. ট্রাম্পকে ধন্যবাদ জানান।

এই দুই নেতার আলোচিত বৈঠকের সময় উপস্থিত ছিলেন দুই দেশেরই শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা। তবে প্রেসিডেন্ট কিম যেহেতু ইংরেজি ভাল বুঝেন না তাই তার দোভাষী হিসেবে ছিল ক্যাথরিন কিলোগ নামের এক সুন্দরি রমণী। এই মহিলাটিকে ঘিরে তৈরি হয়েছিল কৌতহল, কেননা তার উপরও নির্ভর করছে আলোচনা ফলপ্রসূ হবে কিনা। যাই হউক দুই প্রেসিডেন্ট এর ভাষায় আলোচনা বেশ সফল হয়ে বলা যায়।

উত্তর কোরীয় প্রেসিডেন্ট এর সাথে বৈঠকে আরো ছিল:

কিম ইয়ং-চল (কিমের ‘ডানহাত’ হিসেবে পরিচিত), উত্তর কোরিয়ার এই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এমাসের শুরুতে বৈঠকের অগ্রদুত হিসেবে ওয়াশিংটন গিয়েছেন।

রি ইয়ং-হো: তিনি উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী, এই কূটনীতিক ৯০ এর দশকেও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন।

রি সু-ইয়ং: উত্তর কোরিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বর্তমানে পিয়ংইয়ং’এর শীর্ষপর্যায়ের কর্মকর্তা।

আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ছিল:

মাইক পম্পেওঃ যুক্তরাষ্ট্রের নব নিযুক্ত পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সাবেক সিআইএ প্রধান।  

জন কেলিঃ মার্কিন সেনাপ্রধান ।

জন বোল্টনঃ তিনি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা। তার অযাচিত মন্তব্যের কারণেই প্রায় নস্যাৎ হয়ে গিয়েছিল বৈঠকটি।

 

যৌথ বিবৃতির ব্যপারে বিস্তারিত কিছু জানা সম্ভব না হলেও ঘটনা পর্যবেক্ষণে অনুমান করা হয় যুক্তরাষ্ট্রের কাছে কিম জং নিন্মোক্ত বিষয়গুলির সমাধান চেয়েছেনঃ

নিরাপত্তাঃ গত কয়েক দশক ধরেই উত্তর কোরিয়া এই একটি কারনেই তাদের পারমাণবিক অস্ত্র গড়ে তুলেছে যাতে রাষ্ট্রের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রের দাবী অনুযায়ী তারা যদি পারমাণবিক কর্মসূচী বাদ দেয় তবে বিনিময়ে চাইবে যেন, যুক্তরাষ্ট্র কোরীয় অঞ্চল থেকে তার সকল যুদ্ধ বিমান ও সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয় এবং পুনরায় যেন আর না পাঠায়।

সন্মানঃ কিম জং আন বিশ্ব রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে চান। তার ইচ্ছা, উত্তর কোরিয়াকে যেন নিপীড়নকারী দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উত্তর কোরিয়া অন্যদের সমান মর্যাদা চায় আমেরিকা, রাশিয়া, চীন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার পাশাপাশি।

প্রাচুর্যঃ উত্তর কোরিয়ার মূল বিষয় হচ্ছে অর্থনীতি। তারা চায় আন্তর্জাতিক অবরোধ উঠিয়ে নিয়ে তাদের ব্যবসা বানিজ্যের পথ উন্মুক্ত করা হউক।

“Cold War” বা স্নায়ু যুদ্ধের গোড়াপত্তন

Now Reading
“Cold War” বা স্নায়ু যুদ্ধের গোড়াপত্তন

ইংরেজি ‘Cold War’ শব্দের বাংলায় বিভিন্ন প্রতিশব্দ রয়েছে। এগুলো হচ্ছে- ‘ঠাণ্ডা লড়াই’, ‘স্নায়ু যুদ্ধ’, ‘শীতল যুদ্ধ’, ‘প্রচার যুদ্ধ’ ইত্যাদি। আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে “কোল্ড ওয়ার” বা ঠাণ্ডা লড়াই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধত্তোর বিশ্বরাজনীতির চালিকাশক্তি ছিল এই ঠাণ্ডা লড়াই। আন্তর্জাতিক রাজনীতির গতি-প্রকৃতি, বিশ্বের দুই পরাশক্তির মধ্যকার দ্বন্ধ ইত্যাদি সবকিছুই এই ঠাণ্ডা লড়াইকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। মূলত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে বিশ্ব রাজনীতি ও ঠাণ্ডা লড়াই অনেকটা সমার্থক হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সম্পর্কের উত্থান-পতন, উত্তেজনা ও দ্বন্ধ সব কিছুর মূলে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে দায়ী ছিল ঠাণ্ডা লড়াই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধত্তোর পৃথিবীতে যুগপৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের “পরাশক্তি” বা “Super Power” হিসেবে আবির্ভাব ঘটে। উভয়ের মধ্যকার উত্তেজনার সময়কে ঠাণ্ডা লড়াই হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিলো এটি। এই দুই পরাশক্তি সরাসরি যুদ্ধে না জড়িয়ে স্বীয় কূটনৈতিক তথা অর্থনৈতিক, সামরিক ও প্রচারণা শক্তির মাধম্যে ক্ষমতা, প্রভাব ও প্রতিপত্তি বৃদ্ধির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখে এবং পৃথিবীকে দুটি পরস্পর বিরোধী শিবিরে বিভক্ত করে ফেলে। বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্র এভাবে দুটি শিবিরে বিভক্ত হয়ে একটি যুদ্ধোদ্দ্যম অবস্থার সৃষ্টি করে। এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, ঠাণ্ডা লড়াই মূলত একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ বা “Psychological War” যা দুটি বিরোধী মতাদর্শগত দ্বন্ধ থেকে উদ্ভূত। এ দ্বন্ধের অর্থ ছিল সরাসরি প্রথাগত যুদ্ধে অবতীর্ণ না হয়ে একে অপরকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক কলা-কৌশলগতভাবে পরাভূত করা। এ ঠাণ্ডা লড়াইয়ের দুই প্রতিপক্ষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের স্বীয় প্রভাববলয় বা “Sphare of Influence” বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় নিয়োজিত থেকে আন্তর্জাতিক রাজনীতির ক্ষেত্রে সংঘাতময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, যা চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি থেকে শুরু করে নানা চড়াই উতরাই পেরিয়ে নব্বই দশকের গোড়ার দিক পর্যন্ত অব্যাহত থাকে।

এভাবে “যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়” সাধারনত এ ধরনের সম্পর্ককে বলা হয় ‘Cold War Relationship’। কাজেই ঠাণ্ডা লড়াই ছিল দুই জোটের মধ্যে এমন একটি যুদ্ধোন্মাদ সম্পর্ক, যে সম্পর্ক যুদ্ধ সৃষ্টি করেনি, কিন্তু যুদ্ধের পরিবেশ সৃষ্টি করতে পেরেছিল। উল্লেখ্য যে, ঠাণ্ডা লড়াইয়ের ইঙ্গিত আমরা পাই উইনস্টন চার্চিলের ১৯৪৬সালের ৫মার্চ ওয়েস্ট মিনিস্টার কলেজের এক বক্তৃতার মাধম্যে। অবশ্য চার্চিল সরাসরি ‘Cold War’ কথাটি ব্যবহার করেননি। কিন্তু তিনি বলতে চেয়েছিলেন যে, দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যে মৈত্রীর বন্ধন স্থাপিত হয়েছিল তা অবলুপ্ত হতে চলেছে। তার পরিবর্তে সৃষ্টি হয়েছে সন্দেহ, হিংসা ও অবিশ্বাস। চার্চিল ছাড়া অন্য একজন Cold War শব্দটি ব্যবহার করেন। তিনি হলেন বার্নাড বারুচ, যিনি মূলত একজন আমেরিকান ব্যবসায়ী ছিলেন। পরে তিনি রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং নিরস্ত্রীকরণ সম্মেলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। সাউথ ক্যারোলাইনা হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসে তিনি বলেছিলেন, “Let us not be deceived- today we are in the midst of the Cold War”- তবে আমেরিকার ওয়াল্টার লিপম্যান এই Cold War শব্দটি সংবাদপত্রে প্রথম ব্যবহার করেন ১৯৪৭সালে। এ শব্দের মাধম্যে তিনি আমেরিকা ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে সম্পর্ক বোঝাতে চেয়েছিলেন, যার মধ্যে ছিল বেশ সন্দেহ ও ভীতি।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এই “ঠাণ্ডা লড়াইকে” কেন্দ্র করেই গড়ে উঠেছিল। এই ঠাণ্ডা লড়াইয়ের কতকগুলো বিশেষ বৈশিষ্ট উল্ল্যেখযোগ্য। যেমনঃ

১. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে প্রতিদন্ধিতাই হচ্ছে এ যুদ্ধের মূল কথা। আর ঠাণ্ডা লড়াইয়ের রাজনীতিকে ‘Bipolar Politics’ বা দ্বিপক্ষীয় রাজনীতিও বলা হয়।

২. মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়েই বিভিন্ন রাষ্ট্রের উপর প্রভাব বিস্তার করতে এবং তাদের সাহায্য ও সহযোগিতা লাভ করতে বিশেষভাবে সচেষ্ট হয়।

৩. উভয় পক্ষই ‘স্নায়ু যুদ্ধ’ সম্বন্ধে তাদের নীতিকে রাজনৈতিক মতবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একদিকে গণতন্ত্র ও ব্যক্তি স্বাধীনতার নামে ‘ঠাণ্ডা লড়াই’ পরিচালনা করে। অপরদিকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার নামে ঠাণ্ডা লড়াই পরিচালনা করে। তার ফলে এটি অনেক পরিমাণে ‘ঠাণ্ডা লড়াই’ এর রুপ ধারণ করে এবং উভয় পক্ষই প্রচারনার উপর বেশ গুরুত্ব আরোপ করে।

৪. ঠাণ্ডা লড়াইয়ে দুপক্ষই যথা সম্ভব সামরিক প্রস্তুতি বাড়ানো সত্ত্বেও প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে বিরত থাকে। এ লড়াইকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন অঞ্চলে দুপক্ষের বন্ধু রাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ আরম্ভ হলেও উভয় পক্ষই  যুদ্ধকে সেই অঞ্চলে সীমাবদ্ধ রাখার জন্য চেষ্টা করে।

৫. ঠাণ্ডা লড়াই মূলত সামরিক ও জাতীয় নিরাপত্তার ইস্যুতে অধিক গুরুত্ব প্রদান করে যা পূর্ব ও পশ্চিম এ দুটি বিবাদমান শিবিরে বিভক্ত। এবং সমগ্র বিশ্ব এক অনভিপ্রেত যুদ্ধের চাপে ভীত ও সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে।

যে কারণে ঠাণ্ডা লড়াইয়ের সূত্রপাতঃ

প্রথমত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ইউরোপের যেসব অঞ্চলে বিভিন্ন মিত্রশক্তি প্রবেশ করে তারা সেখানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিজেদের আদিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। সোভিয়েত ইউনিয়ন এর সদ্ব্যবহার করতে সচেষ্ট হয়। অপরদিকে যুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলো দুর্বল হয়ে পড়ায় তাদের মধ্যে সোভিয়েত ভীতি বিশেষভাবে সৃষ্টি হয়। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম ইউরোপের সাথে চুক্তি স্থাপন করে সোভিয়েত বিরোধী এক জোট সৃষ্টি করে।

দ্বিতীয়ত, আদর্শগত সংঘাতও ঠাণ্ডা লড়াইয়ের জন্ম দেয়। আমেরিকা তথা পশ্চিম বিশ্বের ধনবাদী আদর্শ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক আদর্শের দ্বন্ধ এ ক্ষেত্রে উল্ল্যেখযোগ্য।

তৃতীয়ত, প্রযুক্তিগত উন্নতির সাথে সাথে ঠাণ্ডা লড়াইয়ের প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। বৈজ্ঞানিক আবিস্কারের ক্ষেত্রে এই প্রতিযোগিতা পরিলক্ষিত হয়, অস্ত্রসজ্জার খেত্রেও এটা দেখা যায়।

চতুর্থত, পারস্পরিক সন্দেহ ও অবিশ্বাস এই মনস্তাত্ত্বিক কারণের জন্যও ঠাণ্ডা লড়াইয়ের সৃষ্টি হয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, আণবিক শক্তি নিয়ন্ত্রণে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমেরিকান মনোভাব উভয়ের মধ্যে একধরনের সন্দেহ সৃষ্টি করেছিল।

পঞ্চমত, তৃতীয় বিশ্বের স্বাধীন জাতিগুলো নিজেদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক নিরাপত্তার খাতিরে বৃহৎ শক্তিবর্গের ছত্রছায়ায় থাকতে চেয়েছিল। এই নেতৃত্ব লাভের জন্য আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হয় এবং ঠাণ্ডা লড়াই দেখা দেয়।

[email protected]

রাশিয়াকে মোকাবেলায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোটের বিশাল সামরিক প্রস্তুতি

Now Reading
রাশিয়াকে মোকাবেলায় মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোটের বিশাল সামরিক প্রস্তুতি

রাশিয়া প্রশ্নে হটাতই দিশেহারা হয়ে পড়ল যুক্তরাষ্ট্র, তাদের মধ্যে কিসের জানি অজানা আতংক বিরাজ করছে। এজন্য প্রতিপক্ষ হিসেবে তারা রাশিয়াকেই অধিক বিবেচনা করে থাকে। রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলা মোকাবিলায় উত্তর প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোর সামরিক জোট ন্যাটোকে অব্যাহত চাপ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। ব্রাসেলসে মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জিম ম্যাটিস ন্যাটোর সাথে চুক্তির পরিকল্পনা করছেন যেন প্রয়োজনের মুহূর্তে ৩০ দিনের মধ্যে ন্যাটো জোটের ৩০ ব্যাটেলিয়ন স্থল সেনা, ৩০টি যুদ্ধ জাহাজ ও ৩০টি যুদ্ধ বিমান মোতায়েন করা যায়।  আজ ৭জুন বেলজিয়ামের রাজধানী ব্রাসেলসে ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোর প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের বৈঠকে তিনি এই চাপ দেয়ার মানসিক প্রস্তুতি নিয়েছেন বলে সংবাদ মাধ্যমে প্রচার হয়েছে। অবশ্য আগামী জুলাইতে ন্যাটোর শীর্ষ নেতাদের বৈঠকে এই বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবার পরিকল্পনা আছে। এদিকে এই পরিকল্পনার কঠোর নিন্দা জানিয়ে রাশিয়া, তারা পূর্ব ইউরোপের নিরাপত্তা হুমকির জন্য ন্যাটোকেই দায়ী করে আসছে।

যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার মধ্যে সরাসরি কোন দ্বন্ধ না থাকলেও এই দুই দেশ পরস্পর বিরোধী হিসেবে বিশ্বে সমাদৃত। সাম্প্রতিক সময়গুলোতে এই দ্বন্ধ প্রকাশ্যে আশে যখন ২০১৪ সালে রাশিয়া যখন অন্য সকলের মতামত উপেক্ষা করে একক কর্তৃত্বে ক্রিমিয়া দখল করে নেয় এবং ২০১৫ সালে সিরিয়া যুদ্ধে আসাদ সরকারকে সমর্থন দিয়ে সরাসরি অংশগ্রহণ করে। এসব বিষয় ভালোভাবে মেনে নিতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। মূলত এরপর থেকে সৃষ্টি হয়েছে দূরত্ব ফলশ্রুতিতে রাশিয়ার প্রকাশ্য কোণ বার্তাকেই আর গ্রাহ্য কিংবা বিশ্বাসে নিচ্ছেনা ওয়াশিংটন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের সামরিক নীতিতে রাশিয়াকে বরাবরই গণ্য করে এসেছে। চলতি বছরের পেন্টাগনের যে প্রতিরক্ষা নীতি ঘোষণা হয়েছে সেখানে মস্কোকে সবচেয়ে বড় হুমকি বলে বর্ণনা করা হয়েছে। আর ঘোষিত সেই নীতিতে স্পষ্টই বলা আছে ন্যাটো জোটকে ধ্বংসের চেষ্টায় রাশিয়া তৎপর।

তাই আজ ব্রাসেলসে ন্যাটো জোটভুক্ত দেশগুলোর প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের বৈঠকে রাশিয়ার হুমকি মোকাবিলায় যুদ্ধ প্রস্তুতির বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করে চাপ বাড়াতে চাইছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন এই পরিকল্পনায় কি পরিমাণ সেনা এবং যুদ্ধ সরঞ্জাম মোতায়েন করা হবে তা স্পষ্ট নয়। সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাশিয়া সবসময় যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়ে থাকে এবং প্রয়োজনের মুহূর্তে রনাঙ্গনে দ্রুত সেনা পাঠাতেও সক্ষম। সেই জায়গায় ন্যাটো ও অন্যান্য দেশের অনেকটাই ব্যাবধান, তারা দ্রুত চাইলেও তেমনটা পারেনা। আর এই বিষয়টি বিবেচনা করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র চাইছে স্পর্শকাতর জায়গাগুলোতে পূর্ব থেকেই যেন সেনা মোতায়েন রাখা যায়। পরিসংখ্যান বলছে ন্যাটো জোটের প্রতি ব্যাটেলিয়ন সৈন্য সংখ্যা অবস্থাভেদে বিভিন্ন রকম হয়। প্রতি ব্যাটেলিয়ন কমকরে প্রায় ৬০০ থেকে এক হাজার সেনা থাকে। এদিকে নতুন এই মার্কিন পরিকল্পনাকে নাম দেয়া হয়েছে ৩০-৩০-৩০ নামে। এখন দেখার পালা আদৌ মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটো জোট কি পারবে রাশিয়াকে রুখতে!

ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার কবলে ইরান

Now Reading
ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার কবলে ইরান

যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলমান দন্ধের কারণে ইরানের ওপর ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ কঠিন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হচ্ছে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও। তিনি আরো যোগ করেন, ইরানের যেকোনো আগ্রাসন রুখতে যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে তারা যৌথভাবে কাজ করে যাবেন। ওয়াশিংটনে এক বক্তৃতায় তিনি এই হুঁশিয়ারি দিয়ে ইরানকে আগাম সতর্ক বার্তা দিল।  এদিকে রাষ্ট্র বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি সত্যি সত্যি এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয় তবে ইরানকে তার অর্থনীতি সচল রাখতে কঠিন পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে।

সকল জল্পনা কল্পনা অবসান ঘটিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৫ সালের  আলোচিত “ইরান ডিল” নামক পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসেছেন। তিনি বারংবার তার বিভিন্ন বক্তৃতায় উল্ল্যেখ করেছিলেন সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার পথে হাঁটবেন না। যেকোন মুল্যেই এই চুক্তি বাতিল করে দেবেন,  ট্রাম্পের ঘোষণার পর ইরান প্রসঙ্গে এই প্রথম মার্কিন প্রশাসনের নীতি ও দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরলেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর হুমকির প্রতি নিন্দা প্রকাশ করেছে পাল্টা জবাব দিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জাভাদ জারিফ। পম্পেওর হুমকির প্রত্যুতরে জাভাদ জারিফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নিজেদের ব্যর্থ নীতিমালার হাতে বন্দি এবং এর ফলে তাদেরও পরিণতি ভোগ করতে হবে। এদিকে পম্পেওর বিবৃতিতে সমালোচনা করেছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র নীতিমালা বিষয়ক কমিটির প্রধান ফেডেরিকা মোঘেরিনি। তিনি বলেন, ২০১৫ সালের ঘোষিত “ইরান ডিল” থেকে বেরিয়ে গিয়ে কিভাবে মধ্যপ্রাচ্যকে নিরাপদ করা যায় তা কার্যকরভাবে প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন পম্পেও। তিনি বলেন, এই চুক্তির কোন বিকল্প নেই এবং তা রক্ষা করা মার্কিন প্রশাসনের কর্তব্য। উল্লেখ্য যে, ইরানের সঙ্গে পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে গেলেও বাকী ৫সদস্য দেশ জানিয়েছে তারা যেকোন মুল্যে চুক্তি রক্ষা করে চলবে।

ইরান এর বিরুদ্ধে আরোপিত শাস্তিমূলক নিষেধাজ্ঞাকে মার্কিন প্রশাসনের প্ল্যান ‘বি’ বলা হচ্ছে। পম্পেও জোরালোভাবে বলেন, এখন থেকে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার যেকোনো ‘নতুন চুক্তি’ করার পূর্বে ওয়াশিংটনকে ১২টি শর্তের কথা ভাবতে হবে। যার মধ্যে সিরিয়া থেকে ইরানের সেনা প্রত্যাহার করাসহ ও ইয়েমেনের বিদ্রোহীদের ওপর সকল প্রকার সমর্থন প্রত্যাহার আবশ্যক বলে উল্লেখ করেন তিনি। এদিকে পম্পেও বলেন, নতুন এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ইরানের ওপর নজিরবিহীন আর্থিক চাপ প্রয়োগ করা হবে।

তবে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরানের কাছেই এখন একটাই পথ খোলা আর তা হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে নীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা বন্ধ করে তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনা এবং তেহরান তার পারমাণবিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা পরিত্যাগসহ ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি বন্ধ করা। যদি সত্যিই এর পরিবর্তন ঘটে তবেই ওয়াশিংটন তার নিষেধাজ্ঞা থেকে সরে আসার সম্ভাবনা তৈরি হবে।

উত্তর কোরিয়া আদৌ কি তাদের সব পরমাণু স্থাপনা ধ্বংস করবে?

Now Reading
উত্তর কোরিয়া আদৌ কি তাদের সব পরমাণু স্থাপনা ধ্বংস করবে?

উত্তর কোরিয়া প্রেসিডেন্ট মার্কিন প্রশাসনের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে তাদের পরমাণু অস্ত্র নিয়ন্ত্রনে সহনশীল পর্যায়ে পৌঁছেছে। উত্তর কোরিয়া প্রশাসন জানিয়েছে, তারা তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো পর্যায়ক্রমে ধ্বংস করছে। গত সপ্তাহে পিয়ং ইয়ং তাদের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক পরীক্ষা কেন্দ্র পুঙ্গি রি কমপ্লেক্সটি ধ্বংস করেছে দেশটি।

পারমাণবিক পরীক্ষা কেন্দ্র পুঙ্গি রি কমপ্লেক্সটি দেশটির উত্তর পূর্বাঞ্চলীয় পার্বত্য এলাকায়। এই কেন্দ্র থেকেই ২০০৬ সাল থেকে অন্তত ছয়টি পারমানবিক পরীক্ষা চালিয়েছে দেশটি।তারা আগেই ঘোষণা করেছিল যে, এটিকে ভেঙ্গে ফেলার জন্য তারা প্রযুক্তিগত পদক্ষেপ নিয়েছে। উত্তর কোরিয়া এখন অনেকটাই নমনীয় হয়ে বলছে তারা পরমাণু কার্যক্রম থেকে বেরিয়ে আসার বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ কিন্তু সে ব্যাপারে কিছুটা জঠিলতার সৃষ্টি হয়েছে। সম্প্রতি মতবিরোধের জের ধরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে আসন্ন বৈঠক থেকে সরে আসারও হুমকি দিয়েছে দেশটি। আর এরই মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার ব্যক্তিগত চিটিতে উত্তর কোরীয় প্রেসিডেন্ট কিম কে জানিয়ে দিয়েছেন, তারা বৈঠকের ব্যাপারে আগ্রহী নয় যদিনা উত্তর কোরিয়া তাদের সম্প্রতি দেয়া বক্তব্যগুলার বিষয়ে চিন্তাধারার পরিবর্তন না ঘটায়। কিন্তু সারা বিশ্বের কাছে প্রাথমিকভাবে পারমানবিক পরীক্ষা কেন্দ্রটি বন্ধ করা স্বাগত জানানোর মতো একটি পদক্ষেপ। তবে মনে করা হয় যে দেশটি তার পারমানবিক কর্মসূচি যথেষ্ট উন্নত করে ফেলেছে এবং কেন্দ্রটিতে এখন আর পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষার প্রয়োজন নেই। উত্তর কোরিয়া তার পারমানবিক অস্ত্র কার্যক্রম পুঙ্গি রি কমপ্লেক্স কার্যক্রমের চেয়ে অনেক দুর এগিয়ে গেছে। মূলত কেন্দ্রটিতে পারমানবিক সুবিধা রাখা হয়েছিলো পারমানবিক অস্ত্র কর্মসূচির পরীক্ষার জন্য। পর্বতের কাছে মাটির নীচে টানেল করে কেন্দ্রটি স্থাপন করা হয়েছিল এবং যাবতীয় পরীক্ষা ঐ টানেলের মধ্যেই করা হত। ধ্বংস করার পূর্বেই শোনা গিয়েছিল এর একটি অংশ আগেই ধ্বসে পড়েছে।

উত্তর কোরিয়া ইতিমধ্যেই আমন্ত্রণ জানিয়েছে দক্ষিণ কোরিয়ান ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের উক্ত পারমাণবিক কেন্দ্রটি দেখতে যে স্বচ্ছতার সাথেই তারা টানেলটি ধ্বংস করেছে। তবে অনেকেই বলছেন যে উত্তর কোরিয়ার আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়টি পরিষ্কার নয় যে তারা আদৌ বিশেষজ্ঞদের আমন্ত্রণ জানাচ্ছে কিনা। এদিকে পুঙ্গি রি কেন্দ্রটি ধ্বংস করলেও দেশটির পরমাণু স্থাপনা আদৌ অকার্যকর হচ্ছে কি না তা যাচাই করতে বেশ কয়েক বছর লেগে যাবে। পারমাণবিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা নিয়ে কাজ করা জাতিসংঘ সমর্থিত সংস্থা কমপ্রিহেন্সিভ নিউক্লিয়ার টেস্ট ব্যান ট্রিটি অর্গানাইজেশন বা সিটিবিটিও বিশেষজ্ঞরাই মূলত কেন্দ্রটি পুরোপুরি অকার্যকর হয়েছে কি না সেটি বলতে সক্ষম। এ সংস্থাটি বিশ্বব্যাপী পারমানবিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা নিয়ে কাজ করে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ না হলে উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচি কয়েক বছরের মধ্যেই পুনরায় শুরু করতে পারবে। তাছাড়াও পুংরি ছাড়াও দেশটিতে আরো একাধিক পারমাণবিক স্থাপনা আছে বলে সন্দেহ করা হয়। পুঙ্গরি ধ্বংসের মাধ্যমে বোঝা যাবেনা উত্তর কোরিয়া নতুন কোন পরমাণু পরীক্ষা কেন্দ্র অন্যদিকে চালু করছে কিনা। দেশটিতে আরো পারমাণবিক কেন্দ্র চালু করার মতো অনেক পর্বত রয়েছে।

বছরের শুরুতেই কোরীয় উপত্যকায় ক্ষেপণাস্ত্র ও পরমাণু পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছিল উত্তর কোরিয়া। কিন্তু তাদের এ ঘোষণা যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যাশা পুরোপুরি মেটাতে পারেনি, ট্রাম্প প্রশাসন চেয়েছে উত্তর কোরিয়া এমন কিছু করে দেখাক যেখান থেকে বুঝা যায় তারা সত্যিকার  অর্থেই পারমাণবিক কর্মসূচী পরিহার করেছে।

সিঙ্গাপুরের শীর্ষ বৈঠক নিয়ে মার্কিন এবং উত্তর কোরিয়া প্রশাসনের ধোঁয়াশা ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

Now Reading
সিঙ্গাপুরের শীর্ষ বৈঠক নিয়ে মার্কিন এবং উত্তর কোরিয়া প্রশাসনের ধোঁয়াশা ও পাল্টাপাল্টি বক্তব্য

মার্কিন নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরীয় নেতা কিম জং আনের মধ্যে বহু প্রতীক্ষিত বৈঠকটি সম্ভবত হোঁচট খেতে চলেছে। আগামী ১২ই জুন সিঙ্গাপুরে বসার কথা ছিল এই দুই নেতার। তবে এখনি সব কিছু পরিস্কার করে বলা যাচ্ছেনা। শুরুতেই যখন এই দুই নেতার একসাথে বসার কথা উঠেছিল তখন অনেকেই তুলনা করেছিল এক ঘাটে বাঘ আর কুমির কিভাবে মিলিত হবে? কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে বরফ গলতে শুরু করেছে যখনি তখন আবার হতাশার ঘনঘটা। সকল সুযোগ সৃষ্টি হলেও এখন আবার পরিস্থিতি পাল্টে যাওয়ার জোগাড়। উত্তর কোরিয়া পূর্ব থেকেই ঘোষণা দিয়েছিল যে, আমেরিকা যদি পারমাণবিক অস্ত্র নষ্ট করে ফেলার জন্য তাদের ওপর চাপ দেয় তাহলে তারা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে শীর্ষ বৈঠকে বসতে রাজী নয়। এর কারন মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন রোববার এক বিবৃতিতে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র ধ্বংস করে ফেলার বিষয়টির সঙ্গে লিবিয়া বা ইরাকের সরাসরি তুলনা টেনে উদাহরণ দিয়েছেন। আর তাতেই চটেছেন উত্তর কোরীয় প্রশাসন। উত্তর কোরিয়ার জন্য মোটেই সুখকর হয়নি জন বোল্টন এর বিবৃতিটি। আর বোল্টন বরাবরি অপছন্দ করে উত্তর কোরিয়া কেননা পূর্বেও তিনি বলেছেন উত্তর কোরিয়ার ওপর প্রয়োজনে হামলা চালানো আমেরিকার জন্য ”পুরোপুরি বৈধ”। আর এবার আবারো আগুনে ঘি ঢেলে দিলেন, তিনি উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ প্রসঙ্গে লিবিয়াকে মডেল হিসেবে অনুসরণের পরামর্শ দিয়েছেন।

এদিকে উত্তর কোরিয়াও আর দেরী না করে এক বিবৃতিতে, আমেরিকার বিরুদ্ধে ‘অশুভ অভিপ্রায়’ এবং দায়িত্বহীন বিবৃতি দেয়ার অভিযোগ করেন। উত্তর কোরিয়ার উপ-পররাষ্ট্র মন্ত্রী কিম গিয়ে গুয়ান এজন্য সরাসরি দায়ী করেছেন জন বোল্টনকে।

এদিকে উত্তর কোরীয় রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রচারিত মি: কিমের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আমেরিকা যদি আমাদের কোণঠাসা করে একতরফা দাবি করে পারমাণবিক অস্ত্র ছাড়তে হবে, তাহলে আমরা সেই আলোচনায় আর আগ্রহী নই” সেক্ষেত্রে ১২ই জুন সিঙ্গাপুর বৈঠকের বিষয়টি আমাদের আবারো ভাবতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে উত্তর কোরিয়া চায় ওই এলাকাতে যাতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি না থাকে যা যুক্তরাষ্ট্র কোনভাবেই মানতে চাইছে না। এছাড়াও ওই এলাকায় অন্যান্য দেশগুলোর ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্র যে নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে উত্তর কোরিয়া সেটাও চায় না। সবচেয়ে বড় আপত্তি কোরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ সামরিক মহড়া।

উত্তর কোরিয়া বহুবছর ধরেই বলে আসছে রাষ্ট্র হিসাবে টিকতে তাদের পারমাণবিক অস্ত্র থাকা অত্যাবশ্যক। এখন কিমের বক্তব্যের পর দেশটির সেই দাবি আরও স্পষ্ট হল। যদিও উত্তর কোরিয়া চেয়েছে অন্তত আমেরিকার সাথে তাদের বৈরিতার বরফ গলিয়ে দেশের অর্থনীতি সমৃদ্ধ হউক, যা এখন দোদুল্যমান অবস্থায় পড়েছে।

সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার এক ব্যাক্তিগত চিঠিতে উত্তর কোরীয় প্রেসিডেন্টকে বৈঠক বাতিলের সিদ্ধান্ত জানিয়েছেন, যাকে সবাই ‘ট্রাম্প স্টাইল কূটনীতি’ হিসাবে দেখছে। চিঠিতে ট্রাম্প এক প্রকার হুমকি দিয়ে বসেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল আর শক্তিশালী পারমানবিক অস্ত্রের কথা উল্ল্যেখ করে লিখেছেন, তিনি ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন যেন, সেগুলো কখনো যেন ব্যবহার করতে না হয়। কিন্তু এই চিঠির পরবর্তী পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্র বা উত্তর কোরিয়া কিভাবে নিচ্ছে তা এখন দেখার বিষয়!

ইসরায়েল কর্তৃক ৫৮জন ফিলিস্তিনি হত্যার দায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কি এড়াতে পারবেন?

Now Reading
ইসরায়েল কর্তৃক ৫৮জন ফিলিস্তিনি হত্যার দায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কি এড়াতে পারবেন?

গতকাল সোমবার পবিত্র জেরুজালেম শহরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস খোলাকে কেন্দ্র করে ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভ দমনে ইসরায়েলি সৈন্যরা গুলি চালিয়ে ৫৮জন ফিলিস্তিনিকে নির্মম ভাবে হত্যা করে।  বিগত দু’ সপ্তাহ ধরেই গাজা সীমান্তে চলছে ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভ আর এমনি সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র তেলআবিব থেকে তাদের দূতাবাস স্থানান্তর করল জেরুজালেমে। যুক্তরাষ্ট্রের এমন সিদ্ধান্তে ফুঁসে উঠেছে ফিলিস্তিনের জনগণ গতকালের বিক্ষোভে তাদের ওপর ইসরায়েল সেনারা গুলি ৫৮জন নিরস্ত্র জনগণকে হত্যা করল। ইসরায়েলের এই হত্যাকাণ্ডের ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে বিশ্ব জুড়ে। নিহতদের মধ্যে অনেক শিশুও রয়েছে। ইসরায়েলের সৈন্যদের গুলিবর্ষণে  প্রায় আড়াই হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি আহত হয়েছে।

পরিসংখ্যান মতে ২০১৪ সালে গাজায় ইসরায়েলের হামলার পর এক দিনে এত বেশি সংখ্যায় ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার ঘটনা এ পর্যন্ত ঘটেনি।

এদিকে এই হত্যাযজ্ঞের প্রতিবাদে জাতিসংঘে ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রদূত রিয়াদ মনসুর জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের জরুরী বৈঠক ডাকার আহ্বান জানিয়েছেন। ফিলিস্তিনি দূত গাজায় যা ঘটছে তাকে এক বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড বলে বর্ণনা করেছেন।

তবে ইসরায়েল এর পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যারা সীমান্তের দেয়াল টপকানোর চেষ্টা করেছে এবং অস্ত্র ও বিস্ফোরক ব্যবহার করেছে – শুধু তাদেরকেই তারা চেজ করেছে। আর তাদের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেছেন, তাদের সেনারা গাজার ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা কট্টরপন্থী ইসলামিক সংগঠন হামাসের আক্রমণ ঠেকাতেই কেবল আত্মরক্ষা করেছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপটঃ  

১৯৪৮ সালের ১৫ মে লাখ লাখ ফিলিস্তিনিকে তাদের ভূখণ্ড থেকে উচ্ছেদ করে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়।  দিনটি স্মরণে প্রতিবছর নাকবা (মহাবিষাদ) দিবস পালন করে ফিলিস্তিনিরা। ফিলিস্তিনি জনগণকে যে অঞ্চল থেকে জোরপূর্বক উৎখাত করা হয়েছিল, সেখানে প্রত্যাবর্তনে গাজার বর্তমান নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ হামাসের নেতৃত্বে ছয় সপ্তাহব্যাপী আন্দোলন চলমান আর তারই অংশ হিসেবে গতকালও ওই বিক্ষোভ এর আয়োজন করা হয়েছিল। ফিলিস্তিনিদের এই বিক্ষোভ ছিল ইসরায়েলের করায়ত্ত করা সীমানার ভেতরে তাদের হারানো বাড়িঘরে ফিরতে দেবার দাবি। তাছাড়া দিনটি দুই পক্ষের জন্য অনেকটা উত্তেজনাকর ছিল এই কারণে যে, এই দিনেই তেল আবিব থেকে মার্কিন দূতাবাস জেরুসালেমে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।  প্রাচীন এই জেরুসালেম শহরটি ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি বিরোধের একদম কেন্দ্রে। ফিলিস্তিনিদের ধারণা, যুক্তরাষ্ট্রের এই দূতাবাস খোলার অর্থ পুরো জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে ইসরায়েলকে ওয়াশিংটনের স্বীকৃতি দেওয়া। আর এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে ফিলিস্তিনের জনগণ। আর দূতাবাস সরিয়ে নেয়ার ঠিক কয়েক ঘণ্টা আগে ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারীদের উপর ইসরায়েলি সেনারা গুলি চালায়।

যুক্তরাষ্ট্র তাদের দূতাবাস জেরুজালেমে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে ইসরায়েল। অন্যদিকে ইউরোপসহ সারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এর তীব্র নিন্দা জানিয়ে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে।

ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ইসরায়েলের এই আক্রমণকে ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যায়িত করেছে। আর এ ঘটনার নিন্দা জানাতে গিয়ে জাতিসংঘ বলছে, ‘ভয়ানক মানবাধিকার লঙ্ঘন’ হয়েছে।

শান্তির পথে উত্তর কোরিয়া

Now Reading
শান্তির পথে উত্তর কোরিয়া

শেষ পর্যন্ত লড়াকু মনোভাব পরিত্যাগ করে সকল প্রকার ক্ষেপণাস্ত্র ও পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা সাময়িকভাবে স্থগিত করলেন উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন। তার এই ঘোষণায় কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি প্রতিস্থাপন করতে ২১ এপ্রিল থেকে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক পরীক্ষা ও আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘোষণা না দেয়া পর্যন্ত এর সকল প্রকার পরীক্ষা বন্ধ রাখবে। তাছাড়া কোরীয় উপদ্বীপে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়ানো ও শান্তির প্রয়োজনীয়তা দেখছে দেশটি তাই পূর্বের অবস্থা থেকে সরে এসে নমনীয় হয়েছে প্রেসিডেন্ট কিম। যদি এটি ঘটে, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ও উত্তর কোরীয় নেতার মধ্যে এটি প্রথম কোনো বৈঠক হবে।

North Korean nuclear warhead

উল্লেখ্য, গেল বছরের নভেম্বরে আন্তঃমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রের একটি সফল সফল পরীক্ষা চালায় উত্তর কোরিয়া। এতে কোরীয় উপদ্বীপের রাষ্ট্রসমূহ এবং আন্তর্জাতিক চাপে পড়ে দেশটি। উত্তর কোরিয়া দাবী করে তাদের পরীক্ষাকৃত ক্ষেপণাস্ত্রটি যুক্তরাষ্ট্রের যে কোনো জায়গায় সফল আঘাত হানতে সক্ষম। মূলত এ পরীক্ষার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বেশ তৎপর হয়। তাদের দাবী উত্তর কোরিয়া বিভিন্ন সময় আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে ক্ষেপণাস্ত্র ও পরমাণু অস্ত্র পরীক্ষা করে আসছে।

এদিকে কিমের ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার এক টুইট বার্তায় বলেছেন- ‘এটি একটি বিশাল অগ্রগতি এবং উত্তর কোরিয়া ও বিশ্বের অন্যদের জন্য খুব ভালো খবর’। ট্রাম্প আরো বলেন, উত্তর কোরিয়া পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ করলে সামনে তার জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। আর দক্ষিন কোরিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে এক বিবৃতিতে তাদের মুখপত্র বলেছেন- উত্তর কোরিয়ার এই সিদ্ধান্ত যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ এবং অর্থবহ অগ্রগতি।

আগামী জুনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও উত্তর কোরিয়ান প্রেসিডেন্ট কিমের মধ্যকার এক সামিট আয়োজিত হতে পারে যা নজিরবিহীন। যদি এমনটা হয় তবে, ক্ষমতাসীন মার্কিন কোন প্রেসিডেন্টের সাথে উত্তর কোরিয়ার কোনো নেতার এটাই হবে আনুষ্ঠানিক প্রথম বৈঠক। সম্প্রতি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইন এবং উত্তর কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট কিম জং উন এর মধ্যে টেলিফোনে সংযোগ স্থাপিত হয়।  এদিকে এই দুই কোরীয় নেতার বৈঠকের বিষয়েও অগ্রগতি হয়েছে, তাই আশা করা যাচ্ছে আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই হয়ত তা হবে। দুই চির শত্রুভাবাপন্ন দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে এই সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হলে তা হবে গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে দুই কোরিয়ার শীর্ষ নেতাদের মধ্যে প্রথম বৈঠক।

মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএর সাবেক পরিচালক মাইক পম্পিও এক গোপন সফরে উত্তর কোরিয়া গিয়ে ওই দেশটির নেতা কিম জং আনের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন। তাই সবার ধারণা ট্রাম্প ও কিম জং ইনের মধ্যকার বৈঠকের  প্রস্তুতি হিসেবেই পম্পিওর ওই সাক্ষাৎ। কিছুদিন আগেই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তার সরকারে নতুন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে পম্পিওর নাম ঘোষণা করেছিলেন। ট্রাম্প নিজেও কিছুদিন পূর্বে বলেছেন, উত্তর কোরিয়ার সাথে উচ্চ পর্যায়ে সরাসরি যোগাযোগ চালিয়ে যাচ্ছে মার্কিন প্রশাসন।

এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও উত্তর কোরিয়া সফরের পরিকল্পনা করছেন, অবশ্য কিছুদিন আগেই কিম জং ইন নিজেও বেজিং সফর করে এসেছেন। এদিকে সবকিছু সামনে রেখেই প্রভাবশালী দেশসমূহ কোরীয় দ্বীপের রাষ্ট্রটির সাথে নানামুখী ব্যাপক কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে লক্ষ্য করা যাচ্ছে প্রায় প্রতিটি দেশই উত্তর কোরিয়াকে শান্ত রাখতে কৌশল অবলম্বন করেছে, আর তাদের সে উদ্দ্যেগকে শ্রদ্ধা জানিয়ে উত্তর কোরিয়াও নমনীয় হয়ে এই ঘোষণাটি দিল।