একজন শুভ্র!

Now Reading
একজন শুভ্র!

-নে নে তৈরী হয়ে নে! পাত্রপক্ষ চলে এল বলে!
রুপার মা রুপাকে তাড়া দিতে থাকে। রুপাকে আজ পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে। পছন্দ হয়ে গেলে বিয়েও পড়িয়ে ফেলতে পারে। মায়ের কথা কানে যাচ্ছেনা রুপার। সে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে আয়নার দিকে।

শুভ্রর সাথে যেদিন প্রথম তার দেখা হয় সেদিন সে একটা শপিং মলে ইয়ার রিং দেখছিল। ইয়ার রিংটা হাতে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই পেছনে কালো কুচকুচে কোন একটা ছেলেকে তার চোখে পড়ে। ছেলেটা অত্যন্ত উৎসুক দৃষ্টিতে আয়নায় তাকিয়ে তাকে দেখছিল। শুভ্রকে মিটিমিটি হাসতে দেখে ভীষণ রাগ হয়েছিল রুপার। তার ইচ্ছে করছিল শুভ্রকে কয়েকটা কঠিন কথা বলতে। অনেক কষ্টে সে ইচ্ছা রুপা দমন করেছিল।
রাস্তায় আসতে আসতেই কেন জানি শুভ্রর মুখটা বারবার ভেসে উঠছিল রুপার মনে। সেই কালো মুখটায় যে এত মায়া সেদিন রুপা তা বুঝতে পারেনি।
এরপর তাদের দেখা হয় শুভ্রদের বাসায়। শুভ্রর বোন হিয়া রুপার ক্লাসমেট। রুপা তাদের পরিচয় করিয়ে দেয়। পরিচয় থেকেই বন্ধুত্ব। বন্ধুত্ব থেকে প্রণয়। অথচ হিয়া এখনো জানেনা তাদের সম্পর্কের কথা। জানলে হয়তো আজ যা হচ্ছে তা হতে দিত না।
রুপার চোখের কোণ বেয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে। সে বুঝতে পারে, আজই হয়ত সে অন্য কারো হয়ে যাবে। চোখ মুছে চোখে কাজল পড়তে থাকে রুপা।

.

শুভ্রর কপালে চিন্তার ভাঁজ। দুপুরে ভার্সিটি থেকে ফিরেই সে চিত হয়ে শুয়ে পড়েছে। ওঠার নাম নেই। মা কয়েকবার খাওয়ার জন্য ডেকে গেছেন। শুভ্র তাতে সাড়া দেয়নি। খেতে ইচ্ছে করছে না তার।
সে খুব খারাপ পরিস্থিতি সামাল দেয়ার মত মানসিক শক্তি সঞ্চয়ের চেষ্টা করছে। তার মনে হচ্ছে সবকিছু যেন থমকে গেছে। বড়রকম ঝড়ের আগে প্রকৃতি যেরকম শান্ত হয়ে যায়, সবকিছু যেন সেরকম স্তব্ধ হয়ে গেছে।
একবার এমনই এক রৌদ্রজ্জ্বল থমথমে দুপুরে রুপার ফোনে ঘুম ভেঙেছিল শুভ্রর।

-হ্যালো শুভ্র!
-হু।
-কি করছো?
-কিছু না।
-বাসা থেকে নামো।
-কেন?
-আমি বাসার নিচে।
-বাসার নিচে কী করো?
-রিক্সায় বসে আছি। তুমি তাড়াতাড়ি নামো। এক্ষুনি বৃষ্টি নামবে। তুমি আর আমি রিক্সায় করে ঘুরে বেড়াব।
-রুপা তুমি কি পাগল? বাইরে কাঠাফাটা রোদ।
-আমি বলছি এখন বৃষ্টি নামবে। তুমি বাসা থেকে নামবে?
-নামছি নামছি।
শুভ্র তড়িঘড়ি করে বাসা থেকে নামতেই ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। শুভ্র রিক্সায় চড়ে বসল। রুপা কেন জানি ভীষণ লজ্জা পেল।
সারা বিকেল তারা একসাথে ঘুরল। দুপুরের খাবারও একসাথে খেল।
রুপা প্রায়ই এমন আচরণ করত। শুভ্র অবশ্য বেশ মজা পেত। এসব মনে পড়তেই আবার হাসি পেল শুভ্রর। এইরকম পরিস্থিতিতে হাসি পাওয়ার অর্থ হচ্ছে শুভ্র মাথা ঠান্ডা রাখতে পারছে। এরজন্যই সে স্বাভাবিক আচরণ করছে। আর এই মুহূর্তে স্বাভাবিক থাকাটাই তার জন্য সবচেয়ে জরুরী।
.

রুপা তৈরী হয়ে বসে আছে। পাত্রপক্ষ আসার নাম নেই। রুপার ভীষণ রাগ লাগছে। প্রায় একঘণ্টা হয়ে গেছে তাকে তৈরী করে এইভাবে পুতুলের মত বসিয়ে রাখা হয়েছে। মার সবকিছুতেই তাড়াহুড়ো।
বিয়ের প্রস্তাবটা পেয়েই মা যে কত খুশি হয়েছিল! মার আনন্দ দেখে রুপা তার মুখে টু শব্দটি উচ্চারণ করেনি। বাবা-মা যা বলেছে বিনাবাক্য ব্যয়ে সে তা পালন করে গেছে।
-জানিস রুপা, ছেলেটা সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। বুয়েট থেকে পাশ করে বেরিয়েছে। কয়দিন পর মাস্টার্স করতে স্কলারশিপ নিয়ে কানাডা চলে যাবে। তোকেও ২ বছরের মধ্যে নিয়ে যাবে। আরে ওর বড় বোন তো কানাডার সিটিজেন। অনেক ভালো হবে কী বলিস?
-হু।
-তখন নিশ্চয়ই আমাদের কথা তুই ভুলে যাবিনা। কিরে ভুলে যাবি?
-হু।
-হু মানে?তুই সত্যিই ভুলে যাবি রুপা?
-না।
রুপা তাকিয়ে দেখে মার চোখে পানি। সে কান্না আড়াল করতে চাইছে। রুপারও ভীষণ কান্না পেল। অনেক কষ্টে সে কান্না চাপল।
-মা আমি তোমাদের কথা কেন ভুলে যাব?প্রতিদিন দশটা করে চিঠি লেখব। আর একশবার করে ফোন দেব। চলবে না মা?তুমি খুশি তো?
বলেই রুপা গটগট করে বেরিয়ে চলে আসে। তার মা অবাক চোখে তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে।
.

শুভ্র একটা জটিল বিষয় নিয়ে ভাবছে। কাল তার মিডটার্ম। অথচ একটা প্রশ্নের উত্তর সে কিছুতেই বের করতে পারছে না। বই ইন্টারনেট ঘাটাঘাটি করেও যখন কোন লাভ হয়নি তখন সে জায়েদকে ফোন দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
জায়েদ শুভ্রর ছোটবেলার বন্ধু। এখনও তারা একইসাথে একই ইউনিভার্সিটিতে পড়ে। জায়েদ ছাত্র হিসেবে যথেষ্ট মনোযোগী এবং মেধাবী। বাবা-মায়ের আদর্শ ছেলে বলা চলে। সে পারেনা এমন কিছু আছে বলে শুভ্রর মনে হয়না। বন্ধুমহলে সে ‘এনসাইক্লোপিডিয়া’ নামে পরিচিত।
ফোনের কন্ট্যাক্টস লিস্ট থেকে জায়েদের নাম্বার বের করে ডায়াল করতে গিয়েও থমকে যায় শুভ্র। কালকের পরীক্ষাটা সে এটেন্ড করতে পারবে তো? তার মনটা খচখচ করতে থাকে। কোনভাবেই নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারানো চলবেনা।

আরো শক্ত হতে হবে শুভ্রকে। কোনভাবেই তার ভেঙে পড়লে চলবেনা। বাবা-মায়ের বড় ছেলে সে। পরিবারকে তার অনেক কিছু দেয়ার আছে। সে জানে সেইম এজ রিলেশনশিপের গ্যাপটা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। রুপাকে সে অনেকভাবে বুঝিয়েছে যাতে কোনভাবে সে বিয়েটা ভেঙে দেয়। রুপা কিছুতেই রাজি হয়নি।
-পারবে না বলছো?
-পারবো না।
-কেন?
-কেনর কোন উত্তর নেই শুভ্র। এর আগে আমি চারটা বিয়ে ভেঙেছি। আমাকে নিয়ে মানুষজনের কানাঘুষা শুরু হয়েছে। এসব আমার পরিবারকেও শুনতে হয়। আমার নাহয় কোন মান-সম্মান নেই, কিন্তু আমার বাবা-মার তো আছে।
এই কথার জবাবে শুভ্র আর কোন কথা বলতে পারেনি। দুইজনই চুপ করে ছিল অনেকক্ষণ।
রুপা ভুল কিছু বলেনি।
.


পাত্রপক্ষ আসার খবরে বিয়েবাড়িরে যে সাজ সাজ রব লেগেছিল, হঠাৎই তা ঝড়ের বেগে উবে গেল। যেন কারো মুখে কোন কথা সরছে না।
রুপার বাবা-মা হাসপাতালে গেছেন। একটু আগে তাদের ফোনে জানানো হয়েছে পাত্রপক্ষের গাড়ি একসিডেন্ট করেছে। ৮ জনের মধ্যে ড্রাইভারসহ ৩ জন স্পটডেড। বাকিদের অবস্থাও আশংকাজনক। এদের মধ্যে পাত্রও আছে।
রুপা চুপচাপ বসে কাঁদছে। সে বুঝতে পারছেনা তার এই মূহুর্তে কাঁদা উচিত কিনা। তবে তার বুক ফেটে কান্না আসছে। খবরটা সে শুভ্রকে জানায়নি। কেন জানায়নি তা সে নিজেও জানেনা। তার কেবল মনে হয়েছে খবরটা শুভ্রকে জানানো উচিত নয়।
একসিডেন্টের খবর পেয়ে রুপার বাবা জামান সাহেব তড়িঘড়ি করে রুপার রুমে আসেন। তাকে বিচলিত দেখেই রুপা বুঝতে পারে তার বাবা কী সংবাদ দিতে এসেছেন।
-মা একটা দুঃসংবাদ আছে।
-আমি জানি বাবা।
-জানিস মানে?কী জানিস তুই?
-পাত্রপক্ষের গাড়ি একসিডেন্ট হয়েছে। সবাই হাসপাতালে আছে। তোমরা এখন হাসপাতালে যাচ্ছো।
জামান সাহেব দুর্ঘটনার সংবাদে যতটা না চমকে গিয়েছিলেন, এবার তারচেয়ে বেশি চমকালেন।
-পাত্রের আঘাত বেশি গুরুতর না মা। সব ঠিক হয়ে যাবে। তুই চিন্তা করিস না।
-আমি জানি পাত্রের অবস্থা গুরুতর বাবা। এও জানি সে বাঁচবে না।

জামান সাহেব আর এক মূহুর্তও সেখানে দাঁড়াননি। রুপার মাকে নিয়ে হাসপাতালের দিকে রওনা হয়েছেন।
রুপা জানেনা তার সাথে কী হচ্ছে। না জানি ঈশ্বর তাকে নিয়ে এ কোন খেলায় মেতে উঠেছেন!

.

শুভ্রকে বাসায় পাওয়া যাচ্ছেনা। গত দুইদিন ধরে সে নিখোঁজ। পরীক্ষা দিতেও যায়নি।
কোন খোঁজ না পেয়ে জায়েদ তার বাসায় গেলে শুভ্রর বাবা হাকিম সাহেব তাকে খবরটা দেয়।
-ওর অন্য কোন নাম্বার আছে তোমার কাছে জায়েদ?
-না আংকেল। শুভ্র সবসময় ওই একটা নাম্বারই চালায়। অন্য কোন নাম্বার থাকার সম্ভাবনা নেই।
-ওর সব বন্ধুদের বাসায় একটু খোঁজ নাও তো বাবা। ছেলেটা যে কই গেল!
জায়েদ তার সব বন্ধুর বাসায় খোঁজাখুঁজি করেও শুভ্রর কোন হদিস পায়না।
তিনদিন পর আবার সে শুভ্রর বাসায় যায়। শুভ্রর বোন হিয়া এবং তার মায়ের শুকনো মুখ দেখে জায়েদের ভীষণ কষ্ট হয়। ওকে দেখেই শুভ্রর মা প্রায় ছুটে আসেন।
-কোন খোঁজ পেলে বাবা?
-চেষ্টা করছি আন্টি। পেয়ে যাব। আপনি কোন চিন্তা করবেন না।
-মিথ্যে আশা দিচ্ছো বাবা?
-না আন্টি। মিথ্যে আশা কেন দেব? হয়তো রাগ করে না জানিয়ে কোথাও গেছে। আবার ফিরবে।
-হুম। হয়তো ফিরবে। আমার ছেলেটা অনেক অভিমানী। ওর অভিমান কে ভাঙাবে বলো?
জায়েদের মনে রুপার চেহারাটা ভেসে উঠল। সে আর এক মূহুর্তও বসল না। উঠে চলে গেল।
কোন উপায়ান্তর না পেয়ে হাকিম সাহেব শেষমেশ থানা, হসপিটাল এবং মর্গগুলোতে খোঁজ করেছেন। পত্রিকায় হারানো বিজ্ঞপ্তি পর্যন্ত দিয়েছেন।
শুভ্রর কোন খোঁজ মেলে না।

.

চার বছর পর।

রুপা সেলাই মেশিনে কাঁথা সেলাই করছে। ২ মাস হলো তার কোলজুড়ে এসেছে ফুটফুটে একটা পুত্রসন্তান। গায়ের রঙটা একটু ময়লা হলেও চেহারা একদম তার মায়ের মতই। সেই চেহারায় অদ্ভুত এক ধরণের মাধুর্য আছে। রুপা কেবলই তার ছেলেকে দেখে। অপলক দৃষ্টিতে দেখে।
রুপার স্বামী হাসান সাহেব নিতান্তই ভদ্রলোক গোছের। রুপা শখ করেছে তার ছেলের জন্য সে নিজেই কাঁথা সেলাই করবে। পাল্টা কোন প্রশ্ন না করেই হাসান সাহেব রুপার জন্য সেলাই মেশিন কিনে এনেছেন। রুপা যা যা আবদার করেছে তার কোনকিছুই তিনি অপূর্ণ রাখেননি।
ছেলের নামও রুপা নিজেই রেখেছে। জন্মের পরই ছেলের মায়াভরা মুখের দিকে তাকিয়ে রুপা শুধু একটি শব্দই উচ্চারণ করেছে,’শুভ্র!’