সেই মেয়েটির প্রেম -২য় পর্ব

Now Reading
সেই মেয়েটির প্রেম -২য় পর্ব

২য় পর্বঃ
‘করিমন’ এ কথা বলিয়া হাঁসিতে লাগল এবং লাবণ্য’র গায়ে পানির ছিটা দিতে লাগল । বিপরীতে লাবণ্যও করিমনের গায়ে পানির ছিটা দিল্ ।লাবণ্য কোন কথা না বলে ,মুখভার করে নদীর পাড় হইতে উঠে আসতে লাগল । ঠিক তখনি করিমন ,লাবণ্য’কে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল এবং বলল, সই কি হইছে বলনা ,সই ?
– না কিছু না । মনের ভীতর কেমন একটা হচ্ছে । নিজে একা একা লাগছে ।
হু বুঝলাম । রসের নাগর আইছে । কিরে সই ; মৌমাছি কি মধু নিয়া পালায় গেছে ? তা হইলে তো এমন হইবই !
– নারে সই এমন কিছু হযনি । পরদেশীরে দেখতে মন কেমন করে । ব্যবস্থা করে দে না সই !
আচ্ছা চল, বাড়তে চল । দেখি কি করা যায় ।
দুজন কাঁকে কলসি নিয়ে, মেঠোপথ ধরে হাটিতেছে । লাবণ্যের পা’য়ে রুপার পায়েল ঝুমুড় ঝুমুড় করে বাজিতেছে । বাড়িতে গিয়ে,কলসি থুয়ে ,করিমন ও লাবণ্য মাজায় কাপড় জড়াইয়া বটবৃক্ষের নীচে গিয়ে বসল । করিমন মাজায় জড়ানো কাপড়ের ভীতর থেকে একটা সাদা কাগজ ও একটা কলম বের করে পরদেশীর নিকট চিঠি লিখিল ।
প্রিয় পরদেশী ,
আমি চলনবিল’র পানির মত ভাসিতেছি । এক কিনার হইতে আর এক কিনারে আছড়ে পরছি । আমার বুকের ভীতরটা পদ্মকাঁটার আছরে ক্ষত-বিক্ষত হয়ে যাচ্ছে । টুপটাপ করে ভালবাসার শিশির বিন্দু জড়ে পরছে । আজ কেন জানিনা ,তোমাকে বড় দেখতে ইচ্ছে করছে । তুমি কেন আসো না? আমাকে কি ভুলে গেছ ? তোমার মুখের হাঁসিটা নিয়ে আমি এখনো বেঁচে আছি । তুমি যত তাড়াতাড়ি পারো আমার কাছে চলে এসো !
ইতি,
সেই মেয়েটি

দৌঁড়াতে দৌঁড়াতে লাবণ্য পৌষ্ট অফিসে গিয়ে চিঠিটি পৌষ্ট করিয়া দিল । অপেক্ষার প্রহর কাটাইতে বেশ দেরি হইলো । একদিন, দুইদিন ,তিনদিন পর অভিরুপ ঠিঠিটি হাতে পেয়েছে । চিঠির উত্তরে অভিরুপ লাবণ্যকে লিখিল ,
প্রিয় মন আঙ্গিনার লাবণ্য,
আমারো একা একা ভাল লাগতেছে না । শুধু তোমাকেই দেখতে ইচ্ছে করছে ।তবে কি আর করার বলো , সময়ের তাগিদে তোমার সঙ্গে দেখা হয়ে গেল,তার পর প্রেম , এখন অনেক দূরে । মনের ভীতর হু হু করে উঠে । আমি খুব তাড়াতাড়ি তোমার কাছে চলে আসবো । তুমি অভিমান করেনা শোনা । আমি ভাল আছি । তুমি ভাল থেকো ।ও… আমাকে ভুলে যেওনা ।
ইতি,
পরদেশী
রাত শেষে ভোর হলো । ‘মা’ অভিরুপকে ডাকতে শুরু করেছে । মসজিদে ফজরের আযান শোনা যাচ্ছে । মোরগ ককরে কক ডাক শুরু করেছে । অভিরুপ ঘুম থেকে উঠলো না । ‘মা’ অভিরুপকে বলতে শুরু করল ,
অভি ..ভোর হয়েছে উঠে তাড়াতাড়ি নামাজ পড়ে আই ।
-মা উঠছি ।তুমি যাওতো । বড্ড ঘুম পাচ্ছে ।
অভিরুপকে ‘মা’ অভি বলেই ডাকে । ‘মা’ চলে গেল । নামাজ শেষ করে দেখল অভিরুপ এখনো ঘুমিয়ে আছে । ‘মা’ অভিরুপের গা’য়ে পানি ঢেলে দিল । অভিরুপ তাড়াহুড়ো করে উঠে বিছানায় বসে পরলো । হাত মুখ ধুয়ে ,অভিরুপ ও ‘মা’ নাস্তার টেবিলে বসলো । অভিরুপের বাবা অনেক আগেই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে । ব্যবসা-বানিজ্য অভিরুপের ‘মা’ দেখাশোনা করে । নাস্তার টেবিলে বসে অভিরুপ ‘মা’কে বলল,
‘মা’ ও .. মা । মা গো তোমাকে একটা কথা বলার ছিলো !
– হু তো বল । এত বাহানার কি আছে ?
‘মা’ আমি হৃদয়পুরের চা বাগানের দেখাশোনা শুরু করবো । বলোনা মা ,যাবো … মা .. মা গো ,বলো না ।
-‘মা’ চুপ করে থাকলো এবং মনে মনে ভাবতে শুরু করলো ,ব্যাপারটা কি !
‘মা’ বলল, না তোমার যাওয়া হবেনা । যে ‘চা’বাগানে আমি আমার সবচেয়ে দামি জিনিস হারিয়েছি , সেখানে তোমার যাওয়া হবে না ।
দামি জিনিস !
হ্যাঃ । দামি জিনিস । তোমাকে নিয়ে আমি, তোমার বাবা এই চা বাগান পরিদর্শ করে গিয়েছিলাম । আর সেখানেই আমি তোমার বাবাকে হারিয়েছি । আর হারাতে চাই না । তোমার যাওয়া হবেনা ।
মুখ গোমড়া করে অভিরুপ নিজেরন ঘরে গিয়ে বসলো । টেবিলের নীচ থেকে কালো রঙ্গের একটা গিটার বের করে গান গাইতে শুরু করলো ।
একা একা যায়না থাকা ..মনে আধার রাতি
তকে ছাড়া এক পলকে ..কি আর আমি দেখি
ও সাথীরে ..সাথীরে ..
বুকের ভীরত তকে আমি সকাল-বিকালে রাখি ..
গানটা শেষে অভিরুপ কেঁদে উঠলো । ‘মা’ গিয়ে অভিরুপের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
আচ্ছা তুই যাবে । তবে আমারএকটা শর্ত আছে ।
-কি শর্ত বলো মা । আমি তোমার সব শর্ত মেনে নিজে রাজি ।
শর্তটা হলো .., শর্তটা হলো ….আমিও তর সঙ্গে যাবো ।
-‘মা’…।
মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে মা’কে কলে তুলে নিলো । ‘মা’ অভিরুপের কপালে দুইটা চুমা খেয়ে ,বুকে জড়িয়ে ধরলো । ছেলের আনন্দে মা’তো খুশি হবেই । মায়ের চোখে পানি চলে আসলো এবং ঘর হইতে অন্য ঘরে গিয়ে বসলো । মায়ের মুখের রায় পেয়ে অভিরুপ আনন্দে নাচতে শুরু করলো এবং লাবণ্যের দেওয়া কাপড়ের টুকরো দেখছে আর বলছে..এই কাপড় তুই জানিস আমি লাবণ্যকে কত ভালবাসি ? আরো তুই জানবি কি করে ? তর তো দেহ, মন ,প্রান কিছুই নাই । আসছি আমি লাবণ্য । । ঘর থেকে বেরিয়ে …
-‘মা’ তাহলে ,আমরা যাচ্ছি কবে ?
যাবো’রে বাবা যাবো ।
– বলো না মা বলো ..!
আমরা আগামীকালি হৃদয়পুর যাবো ।
অভিরুপ ও ‘মা’ দুজনেই বাড়ি থেকে বের হলো এবং স্টশনে এসে পৌঁছাল ।অভিরুপ ট্রেনের টিকিট করলো । মায়ের সুস্থতার জন্য দোকান থেকে একটা পানি ও কিছু খাবার জিনিস কিনলা । ৮ টায় ট্রেন আসার সময় কিন্তু ট্রেন যথাসময়ে ট্রেন স্টশনে এসে পৌঁছালো না । মায়ের চোখকে ঘুমে ধরলো , এমন সময় স্টশনে ট্রেন এসে পৌঁছাল । ‘মা’কে নিয়ে অভিরুপ ট্রেনে উঠলো । ঠিক ভোর হতেই তারা হৃদয়পুর পৌঁছাল । কোন জায়গায় না গিয়ে, সরাসরি ‘চা’বাগানের বাগান বাড়ি পৌঁছাল । ‘মা’ কে বাগান বাড়ি রেখে ,অভিরুপ লাবণ্যের খোঁজে বেরিয়ে পড়ল । কোথায়ও না পেয়ে অভিরুপ ‘চা’ বাগানে গিয়ে পৌঁছাল । ‘চা’ বাগানে দেখল….!