সড়ক নিরাপদ হবে কবে?

Now Reading
সড়ক নিরাপদ হবে কবে?

আমরা নড়ে চড়ে বসি তখনি যখন অকালে ঝড়ে যায় তাজা প্রাণ। প্রতিবারই আমাদের হুঁশটা হয় মারাত্মক রকমের ক্ষতি হয়ে গেলে। সবার আগেই সচেতন হতে হবে নিজেকেই কেননা অন্যের উপর দোষ চাপিয়ে কার্যত ক্ষতি হচ্ছে নিজেরই। তার অর্থ এই নয়যে অন্যায়ের প্রতিবাদ করবনা বা দোষীর বিরুদ্ধে সোচ্চার হব না। নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলি, আমি প্রতিদিনকার বাস প্যাসেঞ্জার আর এই প্রতিদিনই ঝুঁকি নিয়ে রাস্তায় চলাচল করতে বাধ্য হই। প্রতিদিনই চড়তে হয় চট্টগ্রামের ১০নং এবং ৪নং রুটের বাসে। এই দুইটা রুটের বাস একই রাস্তায় চলচল করে যা চট্টগ্রামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক হিসেবে খ্যাত সিডিএ এভিনিউ। কিন্তু এই সড়কের প্রতিদিনকার চিত্র হচ্ছে উল্ল্যেখিত ২রুটের বাসের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতা। এমন নয় যে তারা অন্য রুটের বাসের সাথে এই প্রতিযোগিতা করে, বরং তারা নিজেদের মধ্যেই এই প্রতিযোগিতায় মেতে উঠে নিত্যদিনই। বাসের যাত্রীদের কোন কথায় কর্ণপাততো করেইনা উল্টো কড়াভাবে শাসিয়ে দেয় এই বলে যে, তাদের ব্যাপারে যেন কেউ নাক না গলায়। তাদের এহেন আচরণের কারণ হচ্ছে তাদের শক্তিশালী বাস মালিক সমিতি এবং প্রতিটা পয়েন্টেই তাদের একাধিক প্রতিনিধি কিংবা লাইন ম্যানের উপস্থিতি। ফলে তারা যেকোন পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যাকাপ পায়, এই লাইন ম্যানরা পুলিশ ও অন্যান্য সবকিছু ম্যানেজ করে। ফলে তাদের দিনের পর দিন এই বেপরোয়া গাড়ী চালানো কিংবা যাত্রীদের সাথে অভদ্র ব্যবহার করা তাদের কাছে সাধারণ ব্যাপার মাত্র। আমি চ্যালেঞ্জ করে বলতে পারি এসব রুটের গাড়ীর ড্রাইভারদের অধিকাংশরই বৈধ ড্রাইভিং লাইসেন্স নেই। বন্দর নগরীর এই গুরুত্বপূর্ণ সড়কেই রয়েছে চট্টগ্রামের বেশ কিছু স্বনামধন্য স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। সম্প্রতি ঢাকায় ঘটে যাওয়া বীভৎস দুর্ঘটনা আমাকে দারুনভাবে নাড়া দেয় কবে না জানি তা এখানেও ঘটে বসে। কেননা প্রায়ই দেখছি ছাত্র-ছাত্রীরা হুটহাট করেই চলন্ত বাস কিংবা অন্যান্য গাড়ীর সামনে দিয়ে রাস্তা পার হতে। এতে যেকোন মুহূর্তেই দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা থাকে। অন্যদিকে যেটি প্রায়ই প্রত্যক্ষ করি তাহল, বাস চালকদের নিজেদের ভেতরকার অসম একটা প্রতিযোগিতা কে কাকে ওভারটেক করে আগে যাবে। অনেক সময় এক বাসের বডির সাথে অন্য বাসের বডি লেগে ঘষাঘষি খাওয়ার দৃশ্যও দেখেই আর এতে কখনো জুরজুর করে ভেঙ্গে পরে জানালার গ্লাস। সারা দেশেই একই চিত্র প্রতীয়মান। চালকদের এসব হেয়ালিপনার দরুন প্রতিদিন গণমাধ্যমে আমরা দেখতে পাচ্ছি সড়ক দুর্ঘটনার অসংখ্য বিভৎস ছবি। মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় স্বজন হারানোদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠে পরিবেশ। না এসব মোটেও ভাল লাগছেনা, মাঝে মধ্যে হয়ত রাগ সংবরণ করতে না পেরে কোন কোন চালকদের উপর চরাও হই কিন্তু এভাবেতো আর সমস্যার সমাধান হবেনা। আসুন নিজেরাই সচেতন হই নিজেদের নিরাপত্তা বিধানে এবং সম্মিলিতভাবে সোচ্চার হই বেপরোয়া গাড়ী চালনার বিরুদ্ধে।

সড়ক দুর্ঘটনার কতিপয় কারনঃ সার্বিক বিবেচনায় দেখতে পাইযে দেশের আন্তজেলা মহাসড়কগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনার হার কিছুটা বেশি হয়ে থাকে কেননা সেখানে যানবাহন চলাচলের বেগ থাকে দ্রুত। এসব সড়কগুলোতে মুখোমুখি যানবাহন চলাচল করলেও দেখা যায় সড়কগুলো বেশ প্রশস্ত নয় এবং কোনো কোনো জায়গায় ডিভাইডার একদমই নেই। ফলে যানবাহনগুলোতে নিরাপদ দুরত্ব না থাকায় মুখোমুখি সংঘর্ষ ঘটে। অন্যদিকে এসব গাড়ীগুলোর মধ্যে নিরাপদ দুরত্ব রাখতে হলে রাস্তা ছেড়ে যানবাহনগুলো অনেক ক্ষেত্রে নিচে নেমে আসে। ফলে নিয়ন্ত্রন হারিয়ে খাদে পড়ে যায় অথবা রাস্তার ধারে দাড়িয়ে থাকা যাত্রী কিংবা পথচারীর উপর আঁচড়ে পড়ে।

বাংলাদেশ দ্রুত উন্নয়নশীল দেশে পরিণত হতে চলেছে, সুতরাং দেশের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো সেকেলে ধাঁচের করে রাখা উন্নয়নের অন্তরায় স্বরূপ। কেননা সড়কপথ একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে থাকে। যেকোন ধরনের সড়ক নির্মাণে আমাদের অধিক যত্নবান হতে হবে। মহাসড়কের রাস্তা তৈরির পূর্ব শর্ত হচ্ছে যুগোপযোগী, টেকসই, ভালো বা উন্নতমানের ব্যবহার উপযোগী করে তোলা। কিন্তু উল্টো দেখতে পাই দেশের অধিকাংশ রাস্তঘাটগুলো জোড়াতালি দিয়ে তৈরি করা হয় যা তৈরির ছয়মাসের মধ্যেই ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে সড়ক নির্মাণে সরকারের নজরদারি আরো বাড়ানোসহ আন্তরিকতার প্রয়োজন।

সড়ক দুর্ঘটনায় অদক্ষ ড্রাইভারদের ভূমিকা সবেচেয়ে বেশি বলে মনে করেন অনেকেই। যদিও এই মনে করাটা অমূলক নয় কেননা দেশের বেশির ভাগ দুর্ঘটনার জন্য দায়ী থাকে চালকের অদক্ষতা। ড্রাইভিং পেশাটা আমাদের দেশে এখনো নিম্নমানের পেশা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে গরীব খেটে খাওয়া মানুষ অভাবের তাগিদে এই পেশায় জড়িয়ে পড়েন। আর এই আধিক্ষের কারণে এ পেশায় অদক্ষ ড্রাইভারদের ব্যাপকতাও বেশি। অধিকাংশ চালকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা দেওয়ার মতো অবকাঠামোগত সরকারী ব্যবস্থা এখনো গড়ে উঠেনি। ড্রাইভিং পেশার উৎকর্ষ বাড়াতে সচেষ্ট হতে হবে সরকারকেই। এদিকে বাস ও ট্রাক চালকরা দিনে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টাই পরিশ্রম করে থাকেন। এই দীর্ঘ সময় পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার ফলে তাদের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করে। এরা শারীরিক ও মানষিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন, যার ফলে সঠিকভাবে তারা তাদের পেশায় মনোনিবেশ করতে পারেন না। এটিও দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ হিসেবে বিবেচ্য।

সড়ক দুর্ঘটনার আরেকটি অন্যতম কারণ হচ্ছে রাস্তায় চলাচলকারী ফিটনেসবিহীন লক্কর ঝক্কর মার্কা পুরানো গাড়ী। সরকারের উচিৎ দ্রুত পুরোনো এবং ফিটনেস বিহীন যানবাহনগুলো রাস্তা হতে দ্রুতই সরিয়ে নেয়া। যদিও বছরখানেক আগে ঢাকার ভেতর চলাচলকারী ২৫ বছরের পুরোনো যানবাহনগুলো সরিয়ে নিতে সরকার একটি পদক্ষেপ নিয়েছিলো। কিন্তু তা বাস্তবায়নের মুখ দেখা যায়নি। ঢাকার বাইরেতো বছরের পর বছর অসংখ্য পুরাতন ও ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলছে যেগুলো দুর্ঘটনা ঘটানোর অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচ্য। বাংলাদেশের ট্রাফিক সিগনাল ব্যবস্থা পুরাতন পদ্ধতি অনুসারেই চলছে। এই ট্রাফিক সিগনালিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করে গতি পরিমাপক, ওজন পরিমাপক, জিপিএস প্রযুক্তি ইত্যাদির অন্তর্ভুক্তি এখন সময়ের দাবীতে পরিণত হয়েছে। সড়ক দুর্ঘটনা নির্দিষ্ট কোন গণ্ডীতে সীমাবদ্ধ নয়, বিভিন্ন কারণেই অহরহ ঘটছে তা। যোগাযোগ মন্ত্রনালয়, বিআরটিএ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি এবং পরিবহন সেক্টরের নেতৃবৃন্দের সমন্বয়ে  সরকারের উচিৎ এসকল বিষয়ের দ্রুত নিষ্পত্তি করার পদক্ষেপ নেয়া।