5
New ফ্রেশ ফুটপ্রিন্ট
 
 
 
 
 
ফ্রেশ!
REGISTER

আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ৩য় এবং শেষ পর্ব

Now Reading
আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ৩য় এবং শেষ পর্ব

আমাদের বাড়ির পাশেই একটা পুকুর রয়েছে যেটা সে সময় পানিতে ভরা ছিল। চিৎকার শুনে আমি বাইরে বেরিয়ে প্রথমে কিছু দেখতে না পেলেও পুকুরের দিক থেকে আসা পানিতে ছটফটানির এক ধরনের শব্দ শুনি। সাথে সাথে সেদিকে দৌড়ে গিয়ে দেখে বুঝতে পারি তারা দুজনেই পানিতে পড়ে আছে। আমার ইরিনা সাঁতার জানতো না, তারপরেও দেখি সে ডুবে ডুবে তার দুহাত দিয়ে আমাদের তিয়াশাকে পানির উপরে ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। সে এক অনন্য হৃদয় বিদারক ভয়ঙ্কর এবং মধুর দৃশ্য। মা নিজে মরে যাচ্ছে অথচ তার সন্তানকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে, একই সাথে এর মত ভয়ঙ্কর ও মধুর দৃশ্য আর কী হতে পারে? এখনো এই ঘটনাটির কথা আমাদের অঞ্চলের মানুষের মুখে মুখে শোনা যায়। দৃশ্যটা দেখে আমি তৎক্ষণাৎ ঝাঁপ দিয়ে নেমে তিয়াশাকে ওর হাত থেকে নিয়ে এক হাত দিয়ে তিয়াশাকে ধরে রেখে অন্য হাত দিয়ে ওকে তুলে ধরার চেষ্টা করি। এরইমধ্যে আরেকজন ঝাঁপ দিয়ে নেমে আমার হাত থেকে তিয়াশাকে নিয়ে উঠে যায়। আমি এদিকে প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকি ইরিনাকে তোলার জন্য। কিন্তু ওর দিক থেকে কেমন যেন কোনো সাড়া পাচ্ছিলাম না। শরীরটা অনেক ভারী ভারী মনে হচ্ছিল। পুরো দেহটা পানির নিচে ছিল। ইতোমধ্যে আরো কয়েকজন ঝাঁপ দেয় এবং সবাই মিলে একপর্যায়ে ওকে পাড়ে তুলতে সক্ষম হই। পেটে চাপ দিয়ে পানিও বের করেছিলাম অনেক। পানি বের করার সময় একবার শুধু কাশি দিয়েছিল। কে জানতো সেটাই ছিল আমার চোখে দেখা আমার ইরিনার, আমার প্রিয় ইরিনার শেষ স্পন্দন!

এরপর দ্রুত ডাক্তারও আনা হয়েছিল, কিন্তু ওকে আর ফেরানো সম্ভব হয়নি। শুনেছিলাম সেদিন ডাক্তারের মুখে ওর চলে যাওয়ার কথা শুনে আমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। পাক্কা ছ’ঘন্টা নাকি অজ্ঞান হয়ে পড়েছিলাম। যখন জ্ঞান ফিরে তখন ওর ধোয়ানো শেষ, জানাজা পড়ানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। জানাজা পড়ানোর আগে একবার আর পরে একবার এই দুবার আমায় তাকে দেখতে দেওয়া হয়েছিল। আমি নাকি সেদিন অনেক পাগলামো করছিলাম। তাই কবর দেওয়ার সময় আমাকে যেতে দেওয়া হয়নি। এরপর চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে আমি নাকি আবার অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। মোটামুটি দুদিন পর নাকি জ্ঞান ফিরেছিল, এর মাঝে নাকি স্যালাইনও দিয়ে রাখা হয়েছিল। এভাবেই আমার জীবনের সুখ নামক চশমার একটি হাতল ভেঙে যায় আর সুখটিও খসে পড়ে। এরপর আরো মাসখানেক আমি অপ্রকৃতস্থ ছিলাম। দুনিয়াবি কোন কিছুতে আমার তেমন মনযোগ ছিল না। আমার মেয়েকে দেখলেই আমি কান্না করে দিতাম। এতো বললাম কেবল আমার কথা। এছাড়াও আমাদের উভয়ের পুরো পরিবারটিও একেবারে ভেঙে পড়েছিল। আমার বাবা-মার অতি আদরের পুত্রবধু এবং তাদের দুই বছরের আদরের নাতনীর মার এভাবে চলে যাওয়াটা তারাও কোনভাবে মানতে পারেনি। আর ওদিকে ওর বাবা-মা তাদের একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে স্বাভাবিকভাবেই একেবারে দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। তারপর আস্তে আস্তে মাসখানেকের মাথায় আমরা যখন সবাই কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করি তখন ওর বাবা-মা আমাদের কাছে অনুরোধ করে আদরের নাতনী তিয়াশাকে তাদের কাছে রাখার জন্য। তারা তিয়াশাকে তাদের কাছে রেখে একমাত্র সন্তান হারানোর দুঃখকে কিছুটা প্রশমিত করতে চাচ্ছিল। আমি প্রথমে রাজি না হলেও পরে অনেক চিন্তা করে দেখলাম যে ঢাকায় আমাদের বাসা থেকে তাদের বাসা বেশি দূরে না হওয়ায় ঘন ঘন যাওয়ারও একটা সুযোগ থাকবে এবং তারাও তাদের একমাত্র মেয়ে হারানোর কষ্ট থেকে কিছুটা রেহাই পাবে তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেনে নিই। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ীই তিয়াশাকে তাদের কাছে রাখা হয়। এরপর আস্তে আস্তে আমদের স্বাভাবিক জীবন শুরু হতে থাকে। মা-বাবাকে নিয়ে ঢাকায় গিয়ে আমি আবার অফিস করতে শুরু করি। ওদিকে ইরিনার বাবা-মাও আমাদের তিয়াশাকে নিয়ে জীবন যাপন করতে থাকে। প্রায় প্রতিদিনই আমি অফিস শেষে তিয়াশাকে দেখতে যাই, মা-বাবাও যায় প্রায়ই। উনারও তিয়াশাকে নিয়ে বেড়াতে আসেন মাঝে মাঝেই। এভাবে দেখতে দেখতেই দুটি বছর চলে যায়। এর মাঝে আমার নতুন করে বিয়ের সম্বন্ধ এসেছে অনেক কিন্তু আমি না করে দিয়েছি। একদিন আমার ছোট ফুপু একটি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে, মেয়ের নাম আদ্রিয়ানা। বিয়ে করার ইচ্ছে না থাকায় আমি শুনেই না করে দিলেও মা কেমন যেন এবার আর ছাড়ছিলেন না। মার চাপাচাপিতেই আমি একসময় বিয়ের জন্য রাজি হয়ে যাই। মা নাকি এই ব্যাপারটি নিয়ে আমার ইরিনার বাবা-মার সাথেও কথা বলেছিল। তাদেরও নাকি এই মেয়ের ব্যাপারে পূর্ণ সম্মতি ছিল এবং বলেছিল এই মেয়েকে বিয়ে করলে নাকি তারাও খুশি হবে। কী জানি বাবা কী আছে এই মেয়ের মাঝে, সবারই এতো তোড়জোড়! আমার আর রাজি না হয়ে উপায় ছিল না।

আজ একটু পর এই মেয়েকে বিয়ে করতেই বের হবো। গতরাতে ইরিনাকে স্বপ্নে দেখেছিলাম, স্বপ্নেও ও দেখি আমাকে বিয়েটা করতে বলছে। অবশেষে আদ্রিয়ানা নামক মেয়েটাকে বিয়ে করার জন্য পুরোপুরি মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করি। হয়েও যায় সেদিন আমাদের বিয়েটা। তিয়াশা নতুন মাকে বিয়ের রাতেই বাসায় আনার পর থেকেই যে কী খুশি ছিল বলার মত না। ওর নতুন মাও ওকে কাছে পেয়ে ছাড়ছিল না। ওদের দুজনের কান্ড দেখে শেষমেশ বাসর রাতে তিয়াশাকে আমাদের সাথেই রেখেছিলাম। নতুন মায়ের আদর পেয়ে বাবার কথাতো প্রায় ভুলেই যাবার যোগাড়। ভাগ্যিস নতুন মায়ের সামনেই বাবা বসে ছিল নাহলে নির্ঘাত ভুলে যেতো। তবে নতুন মায়ের নতুন আদরে বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারেনি। তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পড়েছিল। এরপর ওকে পাশে শুইয়ে রেখে সারারাত গল্প করেছিলাম আমি আর আদ্রিয়ানা। আমার আর ইরিনার সকল কাহিনী প্রায় একরাতেই বলে শেষ করেছিলাম ওকে!

আস্তে আস্তে বাড়ি থেকে বিয়ের আমেজ শেষ হয়ে যায়। আত্মীয়স্বজন যার যার মনে নিজেদের বাসায় চলে যায়। তিয়াশাকেও ওর নানা-নানী নিয়ে চলে যায়। আমি আর আদ্রিয়ানা অনেক রাখতে বলেছিলাম আর দুটো দিন, কিন্তু নানা অজুহাতে সেদিন আর রাখেনি। আমার নতুন সংসার জীবন শুরু হয়ে যায়। আদ্রিয়ানা মেয়েটা সত্যিই অনেক ভালো। ওর নিজের তুলনা ও কেবল নিজেই ছিল। তবুও আমি আদ্রিয়ানার মাঝে বারবার আমার ইরিনাকে খুঁজেছি। পেয়েছিও অনেক। আদ্রিয়ানাও আমার চাহিদা বুঝে সে অনুযায়ী নিজেকে ইরিনার মত করে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতো। শুনেছি মেয়েরা নাকি তাদের স্বামীর ভালোবাসার ভাগ অন্য কোনো মেয়েকে দিতে চায় না। কিন্তু আদ্রিয়ানার মধ্যে ওমনটা কখনো দেখিনি। ও নিজেই মাঝে মাঝে আমাকে ইরিনার ব্যাপারে গল্প করতে বলতো। করতামও আমি আর ও সেটা মনযোগ দিয়ে শুনতো। কিছুদিন পর পর তিয়াশাকে দেখতে যেতাম দুজনই। এভাবে চলতে চলতেই এসে যায় আমাদের প্রথম বিবাহবার্ষিকী। রাত বারোটায় ও আমাকে সাথে নিয়ে চুপিচুপি ছোট্ট একটা কেক কেটেছিল সে রাতে। এরপর ও আমাকে এমন একটা উপহার দেয় যা আমাকে রীতিমত সে রাতে সারপ্রাইজড করেছিল। সেটা ছিল বিশাল একটি ফ্রেমে বাঁধানো ইরিনার ছবি। তারপর ও নিজেই সেটা সে রাতে দেওয়ালে থাকা আমার একটি বড় ছবির পাশে ঝুলিয়ে দিয়েছিল। সেদিন ওকে জড়িয়ে ধরিয়ে কেঁদেছিলাম আমি অনেক। কিন্তু কে জানতো সকালে এরচেয়েও বড় সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছে! সে রাতে রাতভর আমরা অনেক দুষ্টুমি করেছি, আদর করেছি। সেজন্যে পরদিন সকালে আমার ঘুম ভাঙতে একটু দেরি হয়ে যায়। ঘুমে থেকে জেগে দেখি ও পাশে নেই। বাথরুমের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ভাবলাম ও হয়তো গোসল করছে। একটু দুষ্টুমি করার জন্য বাথরুমের সামনে গিয়ে দরজা ধাক্কা দিতেই দেখি বাথরুম পুরো ফাঁকা। হতাশ হয়ে ভাবলাম হয়তো গোসলের কাজ আগেই সেরে ফেলে এখন রান্না করছে। কিচেনে গিয়ে দেখি সেখানেও নেই, কেবল মা একা রান্না করছে। মাকে জিজ্ঞেস করলাম ও কোথায়। মা বললো জানে না কিছু, হঠাৎ নাকি বেরিয়ে গেছে। আমিতো অবাক, এভাবে হঠাৎতো কখনো কাউকে কিছু না বলে ও বেরোয় না। ফোন দিলাম, বললো কিছুক্ষণের মাঝেই আসছে। কোথায় আছে জিজ্ঞেস করায় বললো সেটা সারপ্রাইজ, বলা যাবে না। কী আর করার! আমি ফোনটা রেখে ভাবতে লাগলাম কী এমন সারপ্রাইজ ও আমাকে আবার দিতে যাচ্ছে। রাতেইনা আমাকে ইয়া বড় একটা সারপ্রাইজ দিলো, ওটা দেওয়ার পর আর কী সারপ্রাইজ হতে পারে! শেষমেশ কোনো কূল-কিনারা করতে না পেরে আমি গোসল করে ফ্রেশ হয়ে ওর জন্য বসে অপেক্ষা করতে লাগলাম। আধঘণ্টা পর কলিং বেল বাজলো। আমি উঠে দরজা খোলার জন্য রুম থেকে বেরুতেই দেখি মা ইতোমধ্যে দরজা খুলে দিয়েছে আর আদ্রিয়ানা একেবারে খালি হাতে প্রবেশ করছে। আমি সারপ্রাইজের আশায় আশায় বসে থেকে ওকে এভাবে খালি হাতে ফিরতে দেখে মনে মনে এক প্রকার সারপ্রাইজডই হলাম। ও হঠাৎ সামনে এসে আমার চোখ বন্ধ করতে বললো এবং না বলা পর্যন্ত খুলতে না করলো। আমিও তাই করলাম। ও আমার হাত ধরে এগিয়ে নিয়ে গেলো। মনে হলো দরজার সামনে নিয়ে গেলো। এবার চোখটা খুলতে বললো। আমি চোখ খুলে যা দেখলাম তাতে আমি সত্যিই হঠাৎ মারাত্মকভাবে সারপ্রাইজড হয়ে গেলাম!

আমি দেখলাম আমার মেয়ে তিয়াশা আমার চোখের সামনে দাঁড়িয়ে। আমাকে চোখ খুলতে দেখেই ও দৌড়ে এসে আমায় জড়িয়ে ধরলো। পাশ থেকে আদ্রিয়ানা বলছিলো ও ইরিনার বাবা-মাকে নাকি অনেকদিন ধরেই বোঝানো-সোঝানোর পর আজ থেকে একেবারের জন্যই তিয়াশাকে এনে পড়েছে আমাদের মাঝে। আর উনারা নাকি কথা দিয়েছেন খারাপ লাগলেই এখানে চলে আসবেন, আজকের এই বিশেষ দিনেতো আসবেনই। সব মিলিয়ে সে দিনটাই ছিল ইরিনা চলে যাবার পর আমার সবচেয়ে আনন্দের দিন। তবে সেদিন এটুকুতেই শেষ হয়নি। রাত বারোটা পেরোনোর আগেই আমিও সেদিন আদ্রিয়ানাকে একটা সারপ্রাইজ দিয়েছিলাম। ওরও একটি ছবি আমি ইরিনারটার মতই বড় করে বাঁধাই করে এনে আমার ছবিটার অন্যপাশে লাগিয়ে দিয়েছিলাম। ও সেসময় এতটাই খুশি হয়েছিল যে যতটা খুশি আমি ওকে আমাদের বিয়ের পরে কখনো হতে দেখিনি। সেদিনের সে রাতটি ছিল আমার দ্বিতীয় বিয়ের দ্বিতীয় বাসর। সে রাতে আদ্রিয়ানাকে কানে কানে আরো একটা সারপ্রাইজ দিয়েছিলাম। বলেছিলাম, আগামী এনিভার্সারির আগেই আমাদের জীবনে খোদা চাহেতো নতুন অতিথি চাই।

আগের পর্বগুলো:

আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ১ম পর্ব

আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ২য় পর্ব

আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ২য় পর্ব

Now Reading
আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ২য় পর্ব

সেদিন আন্টির কন্ঠে এমন কি ছিল আমি আর না করতে পারিনি। পরেরদিনই গিয়েছিলাম তাদের বাসায়। তবে এমন সময় গিয়েছিলাম যখন তার আর তার বাবার বাসায় থাকার কথা না। কিন্তু গিয়ে দেখি সে নেই ঠিকই কিন্তু তার বাবা ছিল। আমাকে নিয়ে ড্রয়িং রুমে বসানো হলো এবং কিছুক্ষণ পর তার বাবা-মা দুজনই আসলো। আমি দাঁড়িয়ে সালাম দিলাম। সালামের জবাব দিয়ে আন্টি আমাকে বসতে বললো। তারপর কুশল বিনিময় শেষে আমাকে বলতে শুরু করলো, ‘দেখো বাবা তোমাকে আজ মূলত যা বলতে যাচ্ছি তা তুমি কিভাবে নিবে জানি না কিন্তু আমাদের বলতেই হবে।’
‘আন্টি আপনি নিঃসংকোচে বলুন, আমি কিছু মনে করবো না। আপনার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।’
‘সেদিন তোমার পড়ানো বাদ দেওয়ার ব্যাপারটা যেকোন অজুহাতেই আমাদের মেয়েকে বলার পর থেকেই ও কেমন যেন হয়ে যায়। বুঝতে পারছিলাম ও নিজেও তোমার প্রতি দুর্বল হয়ে গিয়েছিল এবং বাদ দেওয়ায় প্রচন্ড কষ্ট পেয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে আমাদের কাউকে কিছু বলেনি আমরাও ভেবেছিলাম কিছুদিন বাদে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু দিন দিন ওর শরীর-স্বাস্থ্য খারাপ হতে থাকে। পড়াশোনায় অমনযোগী হয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে একটা মারাত্মক খারাপ পরিস্থিতির দিকে যাচ্ছিল ব্যাপারটা। ডাক্তার দেখিয়েছি কয়েকবার লাভ হয়নি। পড়ে বুঝতে পারলাম তোমার সঙ্গ না পেলে ভালো হবে না। এদিকে তুমি ওকে পড়াবে না বলে আমার কাছে হাতজোড় করে অনুমতি নিয়েই গিয়েছ সুতরাং তোমাকে পুনরায় পড়াতে বলার মুখও আমাদের নেই। অনেক চিন্তা-ভাবনা করে দেখলাম একমাত্র বিয়ে ছাড়া তোমাদের একসাথে রাখার কোনো উপায় নেই। তাই আমরা ভাবছি তোমাদের দুজনের বিয়ে দেওয়ার। তুমি হয়তো এখন ভাবছো কেবল ওকে ভালো রাখার জন্যই তোমার সাথে বিয়ে দিতে চাচ্ছি। কিন্তু ব্যাপারটা মোটেও তা নয়। তুমি যেদিন আমাকে তাকে আর না পড়ানোর ব্যাপারে বলেছিলে সেদিনই আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিলাম খোদা চাহেতো তোমার সাথেই ওকে বিয়ে দিব। হয়তো সেটা অনেক দেরী হতো কিন্তু এখন ওর শারীরিক অবস্থার কথা চিন্তা করে এখনই করার কথা ভাবতে হচ্ছে। তোমাকে বিয়ে করতে রাজী কিনা জিজ্ঞেস করায় ও যদিও কিছু বলেনি কিন্তু ওর মুখের ঐ মুহূর্তের অবয়ব দেখে আমার বুঝতে অসুবিধা হয়নি ও এতে কতটা খুশি হবে। ওর মৌন সম্মতি পেয়ে তোমার আঙ্কেল তোমার পরিবারের সাথে যোগাযোগ করেছে। এরমধ্যে তোমাদের গ্রামের বাড়িতেও গিয়েছিল তোমার আঙ্কেল বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে। তোমার পরিবার প্রথমে এতো তাড়াতাড়িই তোমার বিয়ে দিতে অসম্মতি জানালেও সবকিছুর বিবেচনায় পরবর্তীতে রাজী হয়েছে। গত পরশু তোমার বাড়ি থেকে তোমার মা সহ আরো কয়েকজন এসে আমার ওকে দেখেও গেছে। সবাই পছন্দ করেছে এবং চূড়ান্ত ও পূর্ণ সম্মতিও দিয়েছে। আমাদের অনুরোধেই তারা এই বিশাল ব্যাপারটি গোপনেও রেখেছে তোমার কাছে। তোমাকে জানানো এবং বিয়ের ব্যাপারে সম্মতি নেওয়ার দায়িত্বও আমাদের উপরে দিয়েছে। এখন বলো বাবা তোমার এ ব্যাপারে মতামত কী।’

আমি এতসব কথা শুনে একেবারে ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিলাম। বারবার মনে হচ্ছিল আমি এমন কী পুণ্য করেছি যেজন্য খোদা আমাকে আমার স্বপ্নের মানুষকে এভাবে আমার হাতে তুলে দিতে চাচ্ছে। তবে আমি সেদিন আমার মতামত জানাইনি। আমার পরিবারের সবাই সত্যিই মন থেকে রাজী হয়েছে কিনা না জেনে আমি কোনভাবেই আমার সম্মতি জানাতে পারি না। একদিনের জন্য সময় নিয়ে সেদিন চলে এসেছিলাম। বাসায় এসে রাতে মাকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম তারা সবাই সত্যিই মন থেকে রাজী কিনা। মার কথা শুনে বুঝেছিলাম তারা সবাই অনেক খুশি মনেই রাজি। তার পরেরদিন আন্টিকে ফোন করে আমার নিজের সম্মতির কথাও জানিয়েছিলাম। এর সপ্তাহখানেকের মাঝেই আমাদের বিয়েটা হয়ে গিয়েছিল। আমার ইচ্ছাতেই কোনো অনুষ্ঠান করা হয়নি। আমি চেয়েছি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ওর ভালোভাবে ভরণ-পোষণ করার মত অবস্থায় পৌঁছে নিজের টাকাতে বড় করে একটা জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান করে ওকে তুলে নিব। তবে আমাদের বাসরঘরটা অনেক জাকজমক করে সাজানো হয়েছিল ওদের বাড়িতেই, ওটা নাকি ওর ইচ্ছা ছিল। বাসরঘরের রাতটা নিয়ে কিছু কথা না বললেই নয়। আমি যখন রাত বারোটার দিকে বাসর ঘরে ঢুকি তখন দেখি ও ইয়া বড় ঘোমটা তুলে বসে আছে। আমাকে ঢুকতে দেখেই অতি মিষ্টি লজ্জামিশ্রিত কণ্ঠে সালাম দিয়েছিল। আমি সালামের জবাব দিয়ে ওর পাশে গিয়ে বসে ঘোমটা তুলতেই ও আমার বুকে মাথা রেখে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। আমি ওর পিঠে হাত রেখে বলি, ‘আজকের এই মধুর আনন্দের দিনে কেন কাঁদছো জানি না। তবে এই তোমার শেষ কাঁদা, যত ইচ্ছা কেঁদে নাও, আর কখনো কাঁদতে দেবো না তোমায়।’
ও অনুযোগের সুরে বলতে থাকে, ‘ওভাবে হঠাৎ করে পড়ানো বাদ না দিলে হতো না? কী এমন তোমার পড়ার চাপ বেড়ে গিয়েছিল যে ওভাবে হঠাৎ করে বাদ দিতে হয়? একটুও খারাপ লাগেনি বুঝি?’
‘খারাপ লেগেছে কি লাগেনি তা যদি জানতে তবে এ কথা কখনো বলতে না। আমি আসলে তোমার প্রতি অনেক দুর্বল হয়ে পড়েছিলাম, নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে কষ্ট হচ্ছিল। তাই বাধ্য হয়েছিলাম তোমার কাছ থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখতে। তবে কথা দিচ্ছি আর কখনো তোমার থেকে দূরে থাকবো না। আজ থেকে আমি তোমার সবসময়ের জন্য প্রাইভেট টিউটর হয়ে গেলাম প্রিয় ইরিনা।’

এরপর থেকে আমি যে তাকে কত পড়িয়েছি! আর সে যে কত রকমের পড়া হিসাব নেই! বইয়ের পড়া, তার থেকেও বেশি ভালোবাসার পড়া; আদরের পড়া, টক-মিষ্টি-ঝালঝাল পড়া। মাঝে মাঝে মান-অভিমানের পড়াও পড়াতাম। সব মিলিয়ে মারাত্মক সুন্দর ভালোবাসাময় দিন অতিবাহিত করছিলাম আমরা। ওর বাবা-মা আমাকে ওদের বাসাতেই থাকতে বলেছিল কিন্তু আমি তাতে রাজি হয়নি। ঘর জামাই হয়ে আমার পক্ষে থাকা সম্ভব না। আমি আমার আগের মত মেসেই থেকেছি। তবে প্রতিদিন ওকে পড়াতে যেতাম। পড়ানোর সময় আদর, ভালোবাসা, খুনসুটি সবই হতো। আর ওর অনেক অনুরোধে সপ্তাহে একদিন থেকে যেতাম ওদের বাসায়। মাঝেমাঝে বের হতাম ওকে নিয়ে, হারিয়ে যেতাম দূর দিগন্তে। হানিমুনও করে ফেলেছিলাম এর মাঝে। গিয়েছিলাম সপ্তাহখানেকের জন্য কক্সবাজার। প্রতিদিন একসাথে সমুদ্রের জলে গোসল করেছি, একসাথে সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত দেখেছি। সেসব কেবলই আজ স্মৃতি। আজ এতদিন পর মনে হওয়াতেও চোখ ভিজে যাচ্ছে। কোনভাবেই মেনে নিতে পারছি না। কথায় আছে, সুখ বেশিদিন সয় না। কথাটা যে কতটা সত্যি তা হারে হারে টের পাচ্ছি।

যথারীতি আমার গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট হয়ে যায়। কয়েকমাসের ব্যবধানে ভালো একটা চাকরীও জুটে যায়। চাকরীর পাশাপাশি পোস্ট-গ্র্যাজুয়েশনটাও কমপ্লিট করি। এরপর অনেক ভালো একটা মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানি থেকে উচ্চ পদস্থ একটা চাকরীর সুযোগও আসে। দেরি না করে সেটাও লুফে নিই। ইতোমধ্যে নিজে একটা ভালো ফ্লাট বাসাতেও থাকা শুরু করেছি, ইরিনাকেও এনেছি। ও নিজেও এখন গ্র্যাজুয়েশন করছে, ফ্যাশন ডিজাইনিংয়ের উপর। ওর আর এক বছর আছে গ্র্যাজুয়েশন কমপ্লিট করতে। চিন্তা করছি ওর গ্রাজুয়েশনটা কমপ্লিট হলেই একটা জাকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান করে পূর্ণ মর্যাদায় ওকে আমাদের বাড়ির বউ করে নিয়ে যাবো। হলোও তাই। আত্মীয় স্বজন সবাই এসেছিল। প্রত্যেকেই অনেক খুশি। পুরোদমে আমাদের সাংসারিক জীবন শুরু হয়ে যায়। এরই এক বছরের মধ্যে আমাদের একটি মেয়েও হয়। নাম রাখি তিয়াশা। যদিও ওর ইচ্ছা ছিল ছেলে কিন্তু আমি মনে মনে মেয়েই চেয়েছিলাম। খোদা আমার ইচ্ছাই পূরণ করেছিলেন। দেখতে দেখতে আমাদের তিয়াশা মার দুই বছর হয়ে যায়। এরমধ্যে সবকিছু ভালোই চলেছে। সুখের কোনো ঘাটতি ছিল না। একবার রোজার ঈদের কিছুদিন আগে বাবা-মা সহ পুরো পরিবার নিয়ে গ্রামে চলে যাই ঈদ করতে। বলে রাখা ভালো আমি ইতোমধ্যে আমার বাবা-মাকে ঢাকায় আমার নতুন কেনা ফ্লাটে পাকাপাকিভাবে নিয়ে এসেছিলাম। সবাই মিলে খুব আনন্দেই দিন কাটছিল আমাদের। মা-বাবাও তাদের নাতনীকে সারাক্ষণ কাছাকাছি পাওয়ার সুযোগ পেয়ে অনেক খুশিই ছিল। তো যথারীতি ঈদের কয়েকদিন আগে একদিন সকাল বেলায় ইরিনা তিয়াশাকে নিয়ে বাইরে হাটতে বের হয়। আমাকেও বলেছিল কিন্তু আমার চোখে অনেক ঘুম থাকায় আর বের হয়নি। ওর আগে থেকেই সকালে হাটাহাটির অভ্যাস ছিল তাই সেদিনও বেরিয়েছিল। ইতোমধ্যে আমাদের তিয়াশা মা ভালোই হাটতে ও দৌড়াতে শিখেছে। তো তারা হাটতে বের হওয়ার পর হঠাৎ ঠিক কিভাবে কী হয়েছিল আজও জানি না, কিন্তু বাইরে কিছুটা দূর থেকে প্রচন্ড একটা চিৎকার শুনি। দ্রুত উঠে দৌড়ে গিয়ে যা দেখি তা আজও আমার জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্কর এবং মধুর একটা দৃশ্য হয়ে রয়েছে।

আগের পর্ব: আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ১ম পর্ব

[আগামী পর্বটি হতে যাচ্ছে ৩য় এবং শেষ পর্ব। আজকের পর্বটি কেমন লেগেছে জানি না, তবে এটুকু আশা করতে পারি আগামী পর্বটি অনেক চমক, উত্তেজনা ও ভালোলাগায় ভরপুর থাকবে।]

আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ১ম পর্ব

Now Reading
আমার দ্বিতীয় বিয়ে – ১ম পর্ব

আজ আমার দ্বিতীয় বিয়ে। আমি এখন বারান্দায় বসে সন্ধ্যের তারা ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছি। কিছুক্ষণ পর ফুলে সজ্জিত গাড়ি করে আমাকে মেয়ে বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হবে বিয়ে পড়ানোর জন্য। বিয়ে এবং বাসর নিয়ে প্রতিটা ছেলের মাঝেই অনেক আগে থেকে নানা ধরণের ফ্যান্টাসি কাজ করে, বিয়ে করতে যাওয়ার আগ মুহূর্তে সেটা হয় প্রকট। তবে আজ আমার সেরকম কিছু কাজ করছে না। হয়তোবা কাজ করতো যদি এটা আমার দ্বিতীয় বিয়ে না হতো। আজ এই মুহূর্তে এই তারা ভরা আকাশের দিকে তাকিয়ে আমার বার বার ইরিনার কথা মনে পড়ছে। প্রথম বিয়েটা আমার ইরিনার সাথেই হয়েছিল।

তখন আমি ভার্সিটির চতুর্থ বর্ষে পড়ি। প্রাইভেট ভার্সিটি, বাড়ি থেকে প্রচুর টাকা নিতে হয়। প্রথম তিন বছর বাবার টাকা দিতে কোনো সমস্যা হয়নি। কিন্তু চতুর্থ বর্ষ শুরু হওয়ার পর থেকে বাবার টাকা দিতে একটু সমস্যা হচ্ছিল। বাবা মুখে আমাকে কিছু না বললেও আমি বুঝতে পারছিলাম। তাই নিজে নিজেই সিদ্ধান্ত নিই বাবার উপর চাপ কিছুটা কমাবো। হঠাৎ করে যেহেতু চাকরী পাওয়া সম্ভব নয় তাই সিদ্ধান্ত নিলাম টিউশনি করানোর। লিফলেট ছাপানো মারফত অতি সত্ত্বর একটি টিউশনি জুটে যায় গুলশানের অভিজাত এলাকায়। স্টুডেন্ট একটি মেয়ে ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী। শুরুতে অনেক অবাক হয়েছিলাম এটা ভেবে যে ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারে পড়া একটা মেয়ের অভিভাবক কিভাবে তার মেয়েকে পড়ানোর জন্য একজন ইয়াং হাউজ টিউটর রেখে দিল। পরবর্তীতে আস্তে আস্তে বুঝতে পেরেছি তারা অনেক আধুনিক হওয়াই এসবকে আমলে নিত না। মেয়েটি অনেক মেধাবী এবং ভদ্র ছিল। আমি পড়িয়ে খুব মজা পেতাম বুঝানোর জন্য পরিশ্রম কম হতো বলে। দুই মাস পড়ানোর পর আস্তে আস্তে আমি অনুভব করতে শুরু করলাম আমি মেয়েটির প্রতি দুর্বল হয়ে যাচ্ছি। এজন্যে অবশ্য আমি নিজেকে দোষ দিতাম না, আমি জানতাম এটা আমার বয়সের দোষ। তবে আমার যেটা করার ছিল তা হলো নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা। আমি নিজেকে প্রতিনিয়ত বুঝানোর চেষ্টা করেছি ও আমার ছাত্রী আর আমি তার শিক্ষক। শিক্ষক আর ছাত্রীর মধ্যে এটা এভাবে কখনোই হতে পারে না। কিন্তু আমি দিন দিন তার প্রতি আরো দুর্বল হয়ে পড়ছিলাম। অবস্থা এতটাই বেগতিক হয়ে গেলো যে একপর্যায়ে আমি সিদ্ধান্ত নিই এই টিউশনিটা আর করাবো না। হুট করেতো আর যাওয়া বন্ধ করে বাদ দেওয়া যায় না, এতে অভদ্রতা হয়ে যায়। তাছাড়া তার বাবা-মা আমাকে তার শিক্ষক হিসাবে সর্বোচ্চ সম্ভব সম্মান করতো, তাই হুট করে বাদ দিয়ে তাদেরকে অসম্মান করতে পারি না। সেজন্যে সিদ্ধান্ত নিলাম তার মা-বাবার সাথে কথা বলে কোনো একটা অজুহাত দেখিয়ে বাদ দিব। এদিকে তার মা-বাবা আমার সাথে প্রায়ই গল্প করতো, আমার সকল খোঁজ-খবর রাখতো বলে তাদেরকে দেখানোর মত কোনো যুক্তিযুক্ত অজুহাত পাচ্ছিলাম না। অবশেষে সিদ্ধান্ত নিই কেবল তার মার সাথে আমার সমস্যাটার ব্যাপারে খোলাখুলি কথা বলে বাদ দিব এবং এমন সময়ে তাদের বাসায় যাবো যখন সে কলেজে আর তার বাবা অফিসে থাকবে। যেদিন গেলাম সেদিন যাওয়ার আগেই তার মাকে ফোন করে বলে রেখেছিলাম আমার অসময়ে আসার কথা। তো আমি কথা অনুযায়ী গিয়ে কলিং বেল চাপলাম। সাথে সাথে কাজের লোক এসে দরজা খুলে দিয়ে ড্রয়িং রুমে গিয়ে বসতে বললো। আমি বসে মাত্র পত্রিকাটা হাতে নিয়ে চোখ বুলাতে শুরু করছি আর তখনি তার মা এসে বলছে, ‘আরে বাবা তুমি এসে পড়েছ, আমি তোমার জন্যই অপেক্ষায় ছিলাম। তা কী এমন তোমার জরুরি কথা বলো দেখি।’
‘সত্যিই ব্যাপারটা অনেক জরুরি। কিন্তু ঠিক কিভাবে যে বলবো বুঝতে পারছি না। আপনিই বা কিভাবে নিবেন ভেবে অনেক অস্বস্তি হচ্ছে।’
‘ডোন্ট হেজিটেট মাই বয়। তুমি যেকোন বিষয়ে খোলাখুলি আমাকে বলতে পারো। টাকা-পয়সার প্রয়োজন হলেও বলে ফেলো, একটুও দ্বিধা করো না। তোমার বিপদে টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করতে পারলে আমি অনেক খুশিই হবো।’
‘না না আন্টি, টাকা-পয়সার কোনো ব্যাপার না। আপনারা আমাকে যে সম্মানী দেন তাতে আমার খুব ভালোভাবেই চলে যায়। আসলে বিষয়টা অন্য ধরনের। এখনো বুঝতে পারছি না কিভাবে বলবো কিন্তু আমি জানি আমাকে এটি বলতেই হবে।’
‘তো বলে ফেলো মাই বয়।’
‘আসলে আন্টি আমি এখন যে বয়সটা পার করছি তা খুবই বিপদজনক। এই বয়সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা অত্যন্ত কঠিন। আপনিও যেহেতু এই বয়স পার করে এসেছেন সেহেতু আপনারও বুঝার কথা। একদিন দুইদিন হয়তোবা নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়, কিন্তু প্রতিদিনের ব্যাপারে ভরসা করা যায় না। আমি গত একমাস থেকে আপনার মেয়ের প্রতি দুর্বল হয়ে গিয়েছি। গত একমাসই নিজেকে অনেক কষ্টে নিয়ন্ত্রণে রেখেছি কিন্তু নিজের প্রতি আর ভরসা করতে পারছি না। আশা করি আপনি বুঝতে পারছেন আমার কথা। এমতাবস্থায় আমি আর তাকে পড়াতে চাচ্ছি না। আপনার কাছে হাতজোড় করে অনুরোধ করছি তাকে আর না পড়ানোর জন্য আমাকে অনুমতি দিন। এতে আমার এবং আপনাদের সকলের জন্যেই ভালো হবে।’
কথাগুলো আমি নিচের দিকে তাকিয়ে বলছিলাম। কেবল হাতজোড় করে অনুমতি চাওয়ার সময় আমি আন্টির দিকে তাকিয়েছিলাম। সে সময় আমি নিজের জল ভরা চোখে আন্টির চোখেও জল দেখেছিলাম।
‘তোমাকে অনুমতি দিলাম বাবা, দোয়া করি তুমি অনেক বড় হও।’
এটা শোনার পড়েই আমি আন্টিকে বললাম, ‘আজ তাহলে উঠি আন্টি। আপনার কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আঙ্কেলকে আশা করি আপনি বুঝাতে পারবেন। আর…আর ওকে যেকোন একটা অজুহাত দেখিয়ে দিবেন। ওর মুখোমুখি আমি আর হতে চাই না। ভালো থাকবেন, আসসালামু আলাইকুম।’

আমি বাসা থেকে বের হয়ে রাস্তায় হাটছি। চোখ দিয়ে সমানে জল গড়িয়ে পড়ছে। রুমালটা ভিজে একাকার। টিস্যু সব শেষ হয়ে গিয়েছে। রুমালটা একটু চেপে ওটাই আবার ব্যবহার করতে লাগলাম। বারবার কান্না পেলেও খুব হালকা মনে হচ্ছে নিজেকে। আজ হয়তো আমি আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন এবং যৌক্তিক সিদ্ধান্তটা বাস্তবায়ন করতে পারলাম। এরপর আরো সপ্তাহখানেক অনেক খারাপ লেগেছে, ওর মুখটা বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে, কিন্তু একসময় সয়ে গিয়েছে। দু মাস পর একদিন হঠাৎ তার মার নাম্বার থেকে ফোন, ‘বাবা তুমি কোথায়? একদিন বাসায় আসতে পারবা? প্লিজ না করো না।’

চলতে থাকবে…