একটা চরম অসুস্থ, বিকৃত সমাজে আমরা বাস করছি ।

Now Reading
একটা চরম অসুস্থ, বিকৃত সমাজে আমরা বাস করছি ।

আমি ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি – আমেরিকা ফ্রি সেক্সের দেশ ।
.

ছেলেবেলায় ফ্রি মানে বুঝতাম বিনামূল্যে । এই ধরেন হারপিক কিনলেন দোকান থেকে, মগ ফ্রি । হরলিকস কিনলেন, চামচ ফ্রি । শ্যাম্পু কিনলেন, সাবান ফ্রি। ছোট মাথায় আসতোনা ব্যাপারটা, সেক্স ফ্রি হয় কেম্নে । ব্যাপারটা কি এইরকম, একবস্তা চাউল কিনলে একঘন্টা সেক্স ফ্রি ?
.

তবে দেখতাম, যারা এইটা বলতো, তারা বিশাল ‘ফিল’ নিয়া বলতো । যেন তারা ওইদেশে যাওয়ামাত্র তাদের উপরে কাপড়চোপড় খুলে দুইতিনখান ব্লন্ড সুন্দরী ধামাধাম এসে পড়বে। তাদের এই ফ্যান্টাসীর জন্যই কিনা জানিনা, মানুষ লাইন দিয়ে ডিভি লটারির ফর্ম ফিলাপ করতো ।
.

আমাদের মাতা-পিতারা শিশুবেলায় আমাদের বাগানের গল্প শুনাইতো । ঐ যে বাগানে একদিন তারা হাটতেসিলেন, দেখলেন বিশাল একটা গোলাপফুলের উপর আমি পরে আছি । তারপর তারা তুলে নিয়ে এসে আমাকে পেলেপুশে বড় করলেন শাবানার পার্সোনাল ভার্সন । সেই সময়ে দেশের আপামর বাচ্চাকাচ্চার ধারণা ছিলো বিসমিল্লাহ বইলা চুম্মা দিলেই বাচ্চা হৈয়া যায়।
.

আর একটু বর হয়ে আমরা বুঝি, আওয়ার হোল চাইল্ডহুড ওয়াজ এ লাই।
.

আসেন একটা প্রশ্নের মাধ্যমে আসল টপিকে যাওয়া যাক । আপনি সেক্স সম্বন্ধে জানসেন কিভাবে ? আই মিন টু সে, আপনার সেক্স এডুকেশন হৈসে কেম্নে ??
.

আমি জানি, আমি খুবই শিক্ষিত ও সুসভ্য একটা ফেসবুক সার্কেল মেইনটেইন করি, আপনাদের মেধা, মনন ও মানসিকতার প্রতি পূর্ণাঙ্গ সম্মান রাইখাই বলতাসি – চটি পড়ে অথবা পর্ণ দেখে । অথবা কোন বন্ধুর কাছে যে এগুলো দেখে শিখেছে ।
.

চটি পড়ে বা পর্ণ দেখে সেক্স এডুকেশন পাওয়া মানে সুপারহিরো মুভি দেখে লাইফলেসন নেয়া ।
.

তো ধরেন, আপনি এইসব সুপারহিরো কমিক পড়ে অথবা মার্ভেলের মুভি দেখে জীবন সম্পর্কে জানসেন । তো আপনার মনে তো প্রশ্ন হতেই পারে, আমার সুপারম্যান ক্যান ফ্ল্যাশের মত আচরণ করে ? মাথায় আসতেই পারে, আমার হাল্ক কেন সবসময় ব্রুস ব্যানার হয়ে থাকে ??
.

আপনার কি মনে হয়, বাংলাদেশে এতো এতো কামরুপ কামাখ্যার হাকিম ঘুরঘুর করতেসে কেন ? ঐ যে বুরখা পড়া মেয়েরা লোকাল বাসের জানালা দিয়ে যেই লিফলেটগুলো দিতো ঐগুলার কথা বলতেছি ।
.

এইযে নিজের সুপারহিরোরে নিয়ে বিষন্নতায় ভোগা , সেক্স নিয়ে অবাস্তব ফ্যান্টাসী আর পার্টনারের কাছে অসীম চাহিদা । এইটা একটা সুস্থ সুন্দর মানুষকে মানসিকভাবে অসুস্থ করে তোলে ।
.

এবং একটা চরম অসুস্থ, বিকৃত সমাজে আমরা বাস করছি।

আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের সবার হাতে স্মার্টফোন, এবং সবার স্মার্টফোন ভরা পর্ণ । এসময় লুকিয়ে মানুষ গুপ্তদার বই পড়তো, তারপর সিডির যুগ, এখন সেই বালাইটাও নাই । গ্রামীণফোনের এমবি প্যাকেজ।
.

এবং সেক্স বিষয়ক ট্যাবুটা আমরা এখনো ভাঙতে পারি নাই। এখনো কোন পরিবারে এ বিষয়ক আলোচনা নিষিদ্ধ । কোন বাবা মা তার সন্তানকে এ বিষয়ে জানতেই দিতে চান না । তারা ধরেই নেন, কোন ফেরেশতা এসে তাদের সোনামনিদের শিখিয়ে যাবে ।
.

বেস্ট কেস সিনারিওতে হয়তো, পর্ণ দেখে, বন্ধুদের সাথে, মুভি দেখে একসময় সন্তান শিখেও ফেলে ব্যাপারটা । কিন্তু তার মাঝে বাস করে অনেক প্রশ্ন, অনেক ট্যাবু, অনেক অমূলক ভয়। আর যদি কপাল খারাপ হয়, কোন শিশু মলেস্টারের হাতে পড়ে, অথবা পর্ণ আসক্তিতে যদি আপনার সন্তান বিকৃত যৌণ আচরণকারী দানবে পরিণত হয়, তার দায়ভারও কিন্তু আপনারই ওপর বর্তায় ।
.

আমার মাথায় সবসময় একটা আজব প্রশ্ন ঘুরঘুর করে ।
.

ধরেন, যারা মেয়েদের ইনবক্সে নিজের ইয়ের ছবি পাঠান, তারা কি ভেবে সেইটা পাঠান ? মেয়েরা তার ওইটা দেখে মুগ্ধ হয়ে ‘ওয়াও’ বইলা জামাকাপড় খুলে লাফাতে লাফাতে তার কাছে চলে আসবে ? নাকি সাথে সাথে ফোন করবে – বেবি, তুমি যেইখানেই থাকো, উবার নিয়া আমার বাসায় তাড়াতাড়ি আইসা পড়ো, আমি আব্বারে কইতাসি আম্মারে নিয়া দুইঘন্টার জন্য রমনা পার্ক থিকা ঘুইরা আসতে ।
.

তারা কি মনে করেন ? ইনবক্সে আপনি মেয়েদের ডার্টি জোক্স পাঠালে মেয়েটা গালে হাত দিয়া বলবে – ওয়াও, কি জোস সেন্স অফ হিউমার মাশাল্লাহ । এই আম্মা শুনতাসো, তোমাগো জামাই পাওয়া গেসে ।
.

তাহলে এই ছেলেগুলো দিনের পর দিন যে মেগাবাইট খরচ করে নিজের শ্রীলঙ্কার ছবি মেয়েদের পাকিস্তানের কাছে পাঠাইয়া যাচ্ছে, সেটা কি কারণে?
.

কারণ, সেক্স জিনিসটা তাদের কাছে ফ্যান্টাসী । এইটা একটা ফান । খাইয়া ছাইড়া দেয়া একটা এ্যাচিভমেন্ট । রেপ করা আরো বড় এ্যাচিভমেন্ট । আর কিছুদিন পরে পোলাপান লাইফ ইভেন্ট দেবে ধর্ষন করে ।
.

দেশে রেপ বাড়তেসে । আশঙ্কাজনক হারে বাড়তেসে । সেগুলোর এক হাজার ভাগের একভাগ হয়তো পত্রিকায় আসে, ভাইরাল হয় । চলন্ত বাসে ধর্ষণ হচ্ছে, স্কুলে-কলেজে ধর্ষণ হচ্ছে, ধর্ষণের পর হত্যা হচ্ছে। পহেলা বৈশাখে, মেলায়, কনসার্টে এমনকি রাজনৈতিক মিছিলেও নারীদের উপরে যৌণ হামলা হচ্ছে। আমি আমার স্ত্রীর সাথে রাস্তায় চলি, ছেলেদের চোখ বাংলা সিনেমার ক্যামেরাম্যানের মত দুইটা জায়গায় ফোকাস হয়ে থাকে।
.

সত্যি কথাটা বলি, বাংলাদেশের রাস্তায় একটি মেয়েও আজ নিরাপদ নয়।
.

এরই মাঝে একদল মেয়ে মাথায় বাধাকপির মত কাপড় বাইন্ধা ‘মিষ্টি খোলা রাখলে মাছি’ তো বসবেই তত্ত্ব আওড়াইতেসে । আর একদল মহিলা আছেন যারা ‘ব্রা এর ফিতা দেখাবো’ আন্দোলনের সাথে যুক্ত। যেন ব্রা এর ফিতা দেখাইলেই সমাজের সকল সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে । কিছু লোক এই অবস্থায় পায়জামা হাতাইতে হাতাইতে বলতেছে, বালেগ হওয়ার পরপর বিয়ে দিলেই তো সমস্যা মিটে যায় ।
.

ও ভাই,১৫ বছরে বিয়ে দিয়ে ৩৫ বছর বয়সে যখন চার সন্তানসহ বিসিএস দিবে, তখন লাঠি নিয়া তোমারে খুজবো সেক্স এডুকেশন দেওয়ার দ্বায়ে ।
.

এই সমস্যার তাৎক্ষণিক কোন সমাধান নেই ।
.

সরকারেরর উচিৎ দেশের প্রচলিত আইন সংশোধন করা । নারী নিপীড়নকারীদের এমন দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি জনসম্মুখে দেয়া যাতে সেটা দেখে আরো একশো পটেনশিয়াল রেপিস্টের মানসিক মৃত্যু হয়।
.

আর আপনি আপনার সন্তানকে বন্ধু বানান । নারীদের সম্মান দেয়া শেখান, এই শিক্ষা পরিবার থেকে আসে, নাহিদ চাচ্চু এইটা দিবে না কোনদিন। নারী মানেই যে খাওয়ার জিনিস না, এবং সেক্স যে কোন রকেট সায়েন্স না, এইটা বোঝান । জানি, লজ্জা লাগে । কিন্তু, আমরা এমন একটা জাতি, গুগলে কোন নারীবোধক শব্দ লিখলে সার্চ রেজাল্টের দিকে তাকাতে আরো অনেক বেশি লজ্জা লাগে । এবং লজ্জাজনক হারে এই লজ্জা বাড়তেসে ।
.
.
.

এই লজ্জার দায় কি আপনি নিতে প্রস্তুত ?
আমরা কেওই প্রস্তুত না , সুন্দর এবং সাবলীলভাবে বুজাতে হবে ।
যাদের বলা দরকার তারা এগুলা কেউ বলেন না। কোন একটা বিশেষ মুভমেন্ট এর তাবেদারী করেন। আমরা যাদের কে বিবেক মনে করি, তারা সবাই কোন না কোন দিকে বায়াসড এই কথাও বেশিরভাগ মানুষ মানতে চায়না। আসলে এই মূহুর্তেই সেক্স এডুকেশন নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবা উচিত। আমরা যে সময়ে এসবের সাথে পরিচিত হয়েছি, এখনকার বাচ্চারা তারও ৩/৪ বছর আগেই সেগুলোর সামনে পড়ে যাচ্ছে। হাতে হাতে স্মার্টফোন। আমাদেরও বাবা মা হিসেবে একটা স্মার্ট পজিশন তৈরী করতে হবে। আর এক্সস্টিং পার্ভার্ট গুলার জন্যে আইনের পরিবর্তন ও শাষণের কোন বিকল্প নাই। এইটা সরকারকেই করতে হবে। একটা দেশের জনগণ অ্যাসেট। তাদের ছোটবেলা থেকে এভাবে ভুল শিক্ষা পেয়ে যৌনউন্মাদ করে তৈরী হলে তারা হবে স্রেফ লায়াবিলিটি। আনফরচুনেটলি সেই লায়াবিলিটি শুধে উঠতে আমাদের তখন একটা জেনারেশন লেগে যাবে। সম্ভব নাও হতে পারে। তাই আজকে থেকেই শুরু করা উচিত।

আমাদের দেশে এখনো একটা ছেলেকে কি বানানো যায়, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল,পাইলট,আর্মি, পুলিশ সেই চিন্তায় বাবা মা অস্থির থাকে আর বেশির ভাগ মেয়েদের দায় সারা ভাবে সামান্য পড়ালেখা শিখিয়ে সুপাত্রের খোঁজ করা যতদিন বন্ধ না হবে ততদিন এই সমস্যা থেকে বের হওয়া কঠিন,দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার সব সময়, যেদিন নারীরা কলকারখানা থেকে শুরু করে যে কোনো প্রতিঠানে লিডিং পজিশনে কাজ করার সাহস দেখাবে সে দিন এই সমস্ত সমস্যা গুলো ধীরে ধীরে অতিক্রম করবে নারীরা, তাদেরকে শুধু এক দৃষ্টিতে আর দেখবেনা সেই সব মানুষ গুলা, এ ক্ষেত্রে নারীদের ও অনেক বড় ভূমিকা আছে, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন খুব দরকার ।