দুঃখ পূর্ণ জীবন (পর্ব ০১ )

Now Reading
দুঃখ পূর্ণ জীবন (পর্ব ০১ )

গ্রামের নাম সূর্যদিঘল।এই গ্রামেরই একটি ছেলে নাম সোহান।বাবার নাম আকবর আলী এবং মায়ের নাম সোনালী বেগম।বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান সে।

সোহানের বাবা একজন সাধারণ কৃষক, মানুষের জমি ইজারা নিয়ে কাজ করেন, নিজের বলতে তেমন কোনো জমি তাদের নেই। তার মা একজন দর্জি যিনি বাড়িতেই সেলাই মেশিন দিয়ে মানুষের জামা-কাপর সেলাই করে আয় করেন।

তার বাবা এবং মায়ের এই সামান্য আয় দিয়ে কোনোমতে তাদের দিন কেটে যায়। যদিও এমন অল্প অর্থে  জীবন-যাপন করা খুবই কষ্টকর তবুও তারা তাদের একমাত্র ছেলে সোহানকে পড়ালেখা করান। তার বাবা যদিও তাকে মাঠে কাজ করতে যেতে বলেন কিন্তু তার মা ছিলেন সম্পূর্ণ এর পরিপন্থি তিনি বলেন, সোহান মাঠে কাজ করবেনা ও পড়ালেখা করবে এবং মানুষের মতো মানুষ হবে। অবশ্য এটা তার বাবাও চাইতেন, কিন্তু তার মাঠে একা একা কাজ করতে খুবই কষ্ট হয় বিধায় ছেলেকে মাঠে যেতে বলেন। তবে সোহানও মাঝে মাঝে বাবাকে মাঠের কাজে সাহায্য করে।

আজ রবিবার, সোহানের খুবই চিন্তা হচ্ছিল কারণ আজ তার PSC (Primary School Certificate)  পরীক্ষার ফলাফল বের হবে। অবশ্য সে একজন ভালো ছাত্র ও বটে।

আজ তার মাকে নিয়ে সে তার স্কুলে গেলো, পরীক্ষার রেজাল্ট পাওয়ার জন্য তারা স্কুলেই অপেক্ষা করছিল। কিছুক্ষণ পর তার স্কুলের প্রধান শিক্ষক এসে তার মাকে বলল, আপনার ছেলে পরীক্ষায় A+ পেয়েছে। এমন একটা খুশির খবর পেয়ে কি কেউ আর স্থির থাকতে পারে! তার মা দৌড়ে এসে তাকে কোলে তুলে নিয়ে চুমু খেলো। মায়ের মুখে সুখের হাসি দেখে তার মনটাও আনন্দে ভরে গেলো। বাড়িতে গিয়ে বাবাকে বলার পর বাবাও তাকে খুব আদর করলেন।

তবে তার এই সুখের দিন গুলো বেশি দিন রইল না। তার বাবা মৃত্যুবরণ করেন। তার অনেক কষ্ট হচ্ছিল বাবার জন্য কিন্তু সে এতোটাই মর্মাহত ছিল যে কোনোভাবেই তার দুঃখকে প্রকাশ করতে পারে নাই। তার মা অনেক কাঁদছিল, মায়ের চোখের থেকে গড়িয়ে পড়া জলের দিলে এক দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে ছিল। তার মায়ের এই কান্না যেন তাকে আরও হতভম্ব করে দিয়েছিল।

তার বাবা মারা যাওয়ায় তাদের পরিবারে নেমে এলো দারিদ্রের কালো ছায়া। আর এমন দুঃখ ভরা জীবনে তার পাশে কেউ নেই, আর থাকবেইবা কে? তার কোনো কাকা নেই, কোনো মামা নেই তাই তাদের জীবন চলার পথ আরও দুর্বিষহ হয়ে পরলো। তার মায়ের সেলাইয়ের সামান্য আয় দিয়ে তাদের সংসার চলে। কোনো দিন খেয়ে আবার কোনো দিন না খেয়েই দিন কাটাতে হয় তাদের। তবুও তার মা তাকে পাশের গ্রামে অবস্থিত একটি উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেন। তবে বিদ্যালয়টি বেসরকারি হওয়ায় পড়ার খরচ টা খুবই বেশি লাগতো। তার মায়ের ইচ্ছা সোহানকে মানুষের মতো মানুষ করবে, তাই সে তার উপার্জনের সামান্য অর্থ দিয়েও তার ছেলেকে পড়ালেখা করান। আর সোহানও মেধাবী ছাত্র বলে শিক্ষকরা তাকে একটু আলাদা নজরে দেখতেন। তার আরও গুণ ছিল, সে কারো সাথে মারামারি, ঝগড়া-বিবাদ এসব করে না। প্রতিদিনের পড়া সে খুবই সুন্দরভাবে উপস্থাপন করতে পারে। এছাড়া সে আবার গানও করতে পারে। বলা বাহুল্য যে তার গানের কণ্ঠটা অনেক সুন্দর, তাই সে এ বছর বিদ্যালয়ে সেরা কণ্ঠ প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়েছে।

সোহানের চেহারাটাও খুব সুন্দর, মনে হয় যেনো চাঁদের স্নিগ্ধ আলো তার মুখে আলতো করে ছুঁয়ে গেছে।

একদিন বিকেলে সোহান তার বন্ধুদের সাথে একটি নদীর তীরে বসে গল্প করছিল। তারা সবাই আড্ডায় মেতে ছিল আর একজন হাসতে হাসতে অন্যজনের গায়ের ওপর পড়ছিল। এমন সময় কয়েকটি মেয়ে তাদের সামনে দিয়ে যাচ্ছিল। বলা বাহুল্য মেয়ে গুলো দেখতে খুব সুন্দর ছিল আর তারা হেলে দুলে যাচ্ছিল। সোহান একটি মেয়েকে দেখে একটু আসক্ত হয়। তার বন্ধুদের সাথে এটা নিয়ে আলোচনা করে। তার বন্ধুরাও মজা নেওয়ার উদ্দেশ্যে তার কথায় সায় দেয়। বন্ধুদের এই সায় দেওয়ায় তার মনবল আরও বেড়ে যায়।

আজ ষষ্ঠ শ্রেণীর বার্ষিক পরীক্ষার রেজাল্ট বের হবে। সোহানের বন্ধুরা তার বাড়িতে গিয়ে তাকে ডেকে নিয়ে আসে স্কুলে। তারা সবাই স্কুলে এসে তাদের রেজাল্ট দেখার জন্য নোটিশ বোর্ডের কাছে যায়, গিয়ে দেখে সোহানের রেজাল্ট তৃতীয় নম্বরে আছে। এটা দেখে তার মনটা খুবই খারাপ হয়ে যায়, সে ভাবতে থাকে এতোদিন তাহলে আমি কি পড়ালেখা করলাম, মাকে গিয়ে কি বলব এমনি আরও কতকি। তার বন্ধু আসিফ প্রথম হয়েছে আর একটি মেয়ে হয়েছে দ্বিতীয়।

সোহান বাড়িতে যাওয়ার পর তার মাকে রেজাল্টের কথা বলে। তার মা একটি দীর্ঘ শ্বাস ফেলে ওকে রেখেই ঘরে চলে যায়। সে ওখানে দাঁড়িয়ে ভাবতে থাকে যে, আমি এটা কি করলাম যার জন্য আমার মাও আমার সাথে কথা বলতে চাচ্ছে না।

যাইহোক, এভাবে কয়েকদিন যাওয়ার পর এখন তার সপ্তম শ্রেণীর ক্লাস শুরু হয়েছে। কিন্তু এখনও তার মনে ঐ বিষয়টি খেলা করে। হঠাৎ করে সে ভাবে যে, কোন মেয়েটি দ্বিতীয় হয়েছে তাকে দেখতেই হবে। তাই সে সেদিন স্কুলে গিয়ে তার বন্ধুদের বলে যে, ওই মেয়েটাকে সে দেখবে। তার বন্ধুরা বলে ঠিক আছে, আজ আমরা যাব মেয়েটাকে দেখতে।

মেয়েদের ক্লাস রুম আলাদা হওয়ায় তাদের অন্য একটি রুমে যেতে হবে, তারা সবাই প্রস্তুত হয় যাওয়ার জন্য। তারা যখন মেয়েদের ক্লাস রুমের সামনে যায় দেখে অনেক গুলো মেয়ে কিন্তু ওই মেয়েটি কে তা তারা বুঝতে পারছে না।

হঠাৎ করে সোহানের একটি মেয়ের দিকে চোখ যায়, আরে! এতো সেই মেয়েটা যাকে নদীর তীরে দেখেছিল। তার বন্ধুদের বলে দেখ তো মেয়েটাকে চিনিস কিনা? তার বন্ধুরাও মেয়েটাকে চিনতে পারে। সোহানের মনের সেই সুপ্ত আকাঙ্ক্ষাটা আবার জাগ্রত হয়ে ওঠে। সে ওই মেয়েটার সাথে কথা বলার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে, তার বন্ধুরাও তাকে কথা বলিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দেয়। এটাই হয়তো সোহানের জীবনের সবচেয়ে বড় ভূল ছিল। তার দুঃখ পূর্ণ জীবনে আরও দুঃখ বাড়িয়ে দেওয়ার বুঝি একটা পহ্নাই ছিল এটা।