মোবাইল আর ইন্টারনেট কি আসলেই আমাদের উন্নত করতে পেরেছে ?

Now Reading
মোবাইল আর ইন্টারনেট কি আসলেই আমাদের উন্নত করতে পেরেছে ?

মোবাইল ফোন আমাদের বেষ্ট ফ্রেন্ডের মত হয়ে গেছে। এখন আমরা সাথে টাকা পয়সা না নিলেও মোবাইল টা নিতে ভুলি না। যেমন আমাদের খিদা লাগে খাওয়ার কথা মনে করার জন্য। তেমন হাতটাও সুর সুর করে ফোনের কথা মনে করার জন্য। জীবনটা কে অনেক সহজ করে দিয়েছে মোবাইল ফোন। কিন্তু আমাদের অবস্থা কোথায় যেয়ে দাড়িয়েছে ভাবতে পারেন? আজ থেকে ১০ বছর আগের কথা চিন্তা করলেই পাবো। আগে কোথাও বন্ধুরা মিলে আড্ডা দিলে সেখানে অনেক কথা হতো, অনেক হাসি, গান বাজনা, ফাইজলামি। সবচেয়ে ভাল ফোন বলতে একজন এর কাছে ছিল নকিয়া এন সেভেন্টি মোবাইল। এখন প্রযুক্তির আধুনিকতায় এন্ড্রয়েড, আই ও এস, উইন্ডোস আরো অনেক কিছু। একজন সেলফি তুলে, একজন অনলাইনে এটাক দিতে ব্যাস্ত। এই এখনকার আড্ডা। আপনি যখন ছোটবেলায় ঈদের ছুটিতে গ্রামের বাড়িতে যেতেন, আপনার মামাতো চাচাতো ভাই বোন দের সাথে মাঠে যেতেন শশা, টমেটো চুরি করতে। পুকুরে ঝাপ দিতেন গাছের উপর থেকে। অনেক ভোরে উঠে যেতেন বকুল আর শিউলি ফুল কুড়াইতে। নানী পিঠা বানাইতো আর আপনারা রান্নাঘরে লাইন দিয়ে বসে পড়তেন। এখন ঈদে বাসায় গেলে কি হয় জানেন? ম্যাসেঞ্জারে ভিডিও কল আসে। “এই দোস্ত এইখানে নেট ভাল না ভিডিও কল হবেনা”। সারা দিন ঘরের কোণায় বসে ফেইসবুক। কেও কেও তো ওয়াই ফাই নাই বলে গ্রামে যায় না।

কি দিন আসলো, মোবাইল ফোনের আবিষ্কার হয়েছে আমাদের উপকারের জন্য। এই যন্ত্রটা নাকি আমাদের টাইম বাচায়। সত্যি? জন্মের পর থেকে এই জিনিসটা আমি টাইম পাসের জন্য ইউজ করি। আসলেই তাই, পড়তে ভাল লাগছে না? একটু নিউজ ফিড ঘুরে আসি। ঘুম আসছে না? ইউটিউবে যাই। মোবাইল আমাদের সবকিছু নিয়ে এসেছে হাতের মুঠোয় নাকি আমরা চলে গেছি মুঠোফোনের মুঠোর মধ্যে। আগে ছোটবেলায় বিকালে মাঠে খেলতে যেতে একটু দেরি হইলে আর জায়গা পাইতাম না। এখন মাঠের সব ঘাস গরুতে খায়। কারণ কি জানেন? এখন অনেক কম দামে ট্যাব পাওয়া যায়। যাতে অনেক গেইম ঘরে বসেই খেলা যায়। এইসবের ফলস্রুতি তে আমরা কি পাচ্ছি জানেন? ক্লাস সিক্সের ছেলের স্ট্যাটাস “অতীত কে ভুলতে চাই”। ক্লাস সিক্সের একটা ছেলের কি অতীত থাকতে পারে। আমার ক্লাস ফোরে থাকতে আমাকে একটা সুন্দর রঙ পেন্সিল এর বক্স কিনে দিছিল আমার মা। সেটা কয়েকদিন পরেই চুরি হয়ে যায়। আমি এই অতীত টা এখনও ভুলতে চাই। বন্ধুদের সাথে হ্যাংআউটে গেছেন? একজন আরেকজন কে বলছে “দোস্ত আমার ক্ল্যানে আয়”। আগে মানুষ ভাল রেস্টুরেন্টে খাইতে গেলে হাত মুখ ধুয়ে বসতো, এখন ক্যামেরা ওপেন করে বসে, চেক ইন দেয়। খাওয়ার আগে সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানাতে ভুলে গেলেও সেলফি তুলতে ভুলি না আমরা। হাইরে যুগের উন্নতি। এখন এমন অবস্থা চলে এসেছে রাস্তায় মানুষ মরে গেলে বাচানো বাদ দিয়ে ছবি তোলে।

নিজেকে প্রশ্ন করেন তো বাসায় বাবা, মা, ভাই, বোন এর চেহারা টা ভালভাবে শেষ কবে দেখেছেন?  বাসায় এসে ল্যাপটপ আর ফোনের ভিতর মুখ গুজে পড়ে থাকেন। মা এসে খেতে ডাকে আপনি কথা বলেন। তবে চোখ কিন্তু থাকে ওই ডিভাইসের দিকেই থাকে। বাবা রুমে এসে বলছেন তোর সাথে জরুরী কথা আছে। আমি বলি বলেন। আমি তাকিয়েও দেখিনা বাবার দিকে। এই আমার জরুরি মিটিং। যতই জরুরী কথা হোক না কেন আমরা তা বলি মোবাইল এর দিকে তাকিয়ে। সাইকোলজিস্ট রা বলেন কোন মানুষের পছন্দের তালিকায় থাকতে হলে তার সব কথায় পূর্ণ মনোযোগ দিতে হয়। আমরা তো এখন মানুষের চেহারা সামনা সামনির থেকে ফেইসবুক, ইন্সটাগ্রামে দেখি।

মর্ডান যুগে খেলার মাঠের আকার ছোট হচ্ছে আর ফোনের র‍্যাম বাড়ছে। মানুষ টেকনলজিকালি আপগ্রেড হচ্ছে কিন্তু ফিজিকালি, মেন্টালি দুর্বল হচ্ছে। আমি যুগ বা প্রযুক্তি কোনটারই দোষ দিচ্ছি না। আমি শুধু মাত্র বলছি যান্ত্রিক আর আধুনিকতার ছোয়াতে আমরা রক্তে মাংশে গড়া মানুষ গুলাও কেমন জানি যান্ত্রিক হয়ে যাচ্ছি দিন দিন। প্রযুক্তি কে কাজে লাগিয়ে জীবন টা গড়তে হবে। আমাদের প্রযুক্তি কে যথাযথ ভাবে ব্যবহার করতে হবে। প্রযুক্তি যেন আমাদের ব্যবহার না করে বসে এটা খেয়াল রাখতে হবে। আমরা যাদের তৈরি ফেইসবুক, ইউটিউব, গুগল ব্যবহার করছি তারা কি সারাদিন ফেইসবুক চালাতেন ? না তারা প্রযুক্তি কে ব্যবহার করেছে আর বিশ্বকে পালটে ফেলেছে। আর তাদের বানানো প্রযুক্তি গুলো আমাদেরকে ব্যবহার করে আমাদের পালটে ফেলেছে। মনে করেন আপনার খুব খারাপ অবস্থা , আপনি আইসিইউ তে আছেন। বাইরে বসা আপনার বাবা, মা, বন্ধুবান্ধব আর আত্বীয় স্বজন। কিন্তু আপনার তো অনেক পপুলারিটি। আপনি ফেইসবুকে ৫০০০০০ মেম্বার ওয়ালা একটা গ্রুপের মালিক। ইউটিউবে আপনার চ্যানেলে লক্ষাধিক সাবস্ক্রাইবার। তাহলে আজ আইসিইউ এর সামনে কেও নেই কেন? কোথায় আপনার হাজার হাজার ফ্যান ফলোয়ার? কোথায় আপনার সাবস্ক্রাইবার। আপনার বাবা মায়ের থেকে আপন কেও হতে পারেনা। কিন্তু যখন বাসায় ৩ এম্বিপিএস এর ব্রডব্যান্ড কানেকশন থাকে তখন তেই কানেকশনের সামনে মা যদি একটু খেতে ডাকে আপনি তাতেই অসাধারণ এক বিরক্তবোধ প্রকাশ করেন। আপনার জীবন টা কিন্তু এতদুর এই অনলাইনে ব্রাউজিং করে করে আসেনি। এসেছে আপনার বাবা মায়ের ঘামঝরা পরিশ্রমে। তাই তাদের সময় দিন। মাঠে যান, বন্ধুদের সাথে সময় কাটান, ক্রিকেট খেলুন, দুই একটা গল্পের বই পড়ুন। আর মাঝে মাঝে ফেইসবুকে যান, ইউটিউবে যান। আপনি কি আপনার জীবনটা সত্যিই উপভোগ করছেন ? এর উত্তর আমি বলে দিচ্ছি। দিন শেষে আপনার ফোনের ব্যাটারি যদি ৮০% এর বেশি অবশিষ্ট থাকে তাহলেই আপনি জীবনটাকে উপভোগ করছেন। তাছাড়া না। জীবনের জন্য প্রযুক্তি, প্রযুক্তির জন্য জীবন না।

ছবিঃ গুগল