বাংলা সাহিত্যের রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ – অষ্টম পর্ব (কাকাবাবু)

Now Reading
বাংলা সাহিত্যের রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজ – অষ্টম পর্ব (কাকাবাবু)

কাকাবাবু, নামের সাথেই চোখের সামনে ভেসে উঠে চওড়া গোঁফ আর ভারী ফ্রেমের চশমা পরা একটি মুখ। দুই হাতে ক্র্যাচ ধরে রাখতে হলেও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের মত শক্তপোক্ত দেহ। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের অসামান্য সৃষ্টি বয়সে নয় বরং অন্তরে তরুণ এই চরিত্র। রহস্যের মলাটে মোড়ানো এডভেঞ্চারের গল্প এই সিরিজের মূল উপাদান। রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজের এই পর্বের আলোচনা কাকাবাবু সিরিজ নিয়ে।

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এমন লেখক হাতে গোণা যে উপন্যাস লেখার পাশাপাশি একজন উচ্চমানের কবি। রহস্য-রোমাঞ্চ লেখকদের মাঝে কবি থাকার সম্ভাবনা আরও অনেক কম। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কেবল সুকবিই ছিলেন না সেই সাথে সামাজিক মৌলিক উপন্যাস আর আত্মজীবনী মূলক কাহিনী লেখায়ও ছিলেন অসাধারণ। আন্তর্জাতিক ভাবে প্রশংসিত তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাসের মধ্যে রয়েছে সেই সময়, পূর্ব পশ্চিম, প্রথম আলো ইত্যাদি। বাংলাদেশের ফরিদপুরে জন্ম এই গুণী লেখকের, মাত্র চার বছর বয়সে কলকাতা চলে যান। লেখালেখির শুরু মূলত কবি হিসেবেই। ১৯৫৩ সাল থেকে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ‘কৃত্তিবাস’ নামের একটি কবিতা পত্রিকা সম্পাদনা  করা শুরু করেন।  এর পাঁচ বছর পর কবি হিসেবে  প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘একা এবং কয়েকজন’ প্রকাশিত হয়।কাকাবাবু সিরিজ ছাড়াও তাঁর আরও একটি বিখ্যাত সিরিজ রয়েছে। ‘নীললোহিত’ নামের এই সিরিজটি নিজের ছদ্মনামের আদলে গড়ে ছিলেন তিনি।

১৯৭৯ সালে কাকাবাবুর প্রথম উপন্যাস প্রকাশ হয় যার নাম ছিল ‘ভয়ঙ্কর সুন্দর’। এরপর ৩৩ বছরে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লিখে ফেলেন এই সিরিজের ৩৯টি উপন্যাস। প্রথমদিকের বইগুলো ছিল ঐতিহাসিক রহস্যের উপর। মূলত অ্যাডভেঞ্চার ধরনের। পরবর্তীতে কাকাবাবু সিরিজের কাহিনীগুলোতে এডভেঞ্চারের পাশাপাশি বিস্ময়কর আর প্যাঁচানো সব রহস্যের আবির্ভাব ঘটে। কাকাবাবু সিরিজের মূল আকর্ষণ এর লেখার ধরন। ঐতিহাসিক ঘটনার চমক আর রহস্যের মায়াজালের মিশ্রণে সিরিজের প্রতিটি কাহিনীকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

কাঁচাপাকা জাঁদরেল গোঁফ আর মোটা ফ্রেমের চশমা আঁটা কাকাবাবুর চারিত্রিক বিবরণে স্পষ্ট গাম্ভীর্য রয়েছে কিন্তু তাই বলে অন্যের উপর হুকুমজারি করবার মত মানুষ নন তিনি। দুর্ঘটনার কারণে একটি পা চিরদিনের মত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় দুই বগলে ক্র্যাচ নিয়ে হাঁটেন সবসময়। কাকাবাবু নামে সবার কাছে পরিচিত হলেও তাঁর পুরো নাম রাজা রায়চৌধুরী। ভারতের প্রত্নতত্ত্ব জরিপ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তিনি। জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়েছেন প্রাগৈতিহাসিক সব রহস্যের ভাণ্ডারের খোঁজে। ইতিহাস থেকে হারিয়ে যাওয়া রহস্যের সন্ধান আর বহুমুল্যবান গুপ্তধনের খোঁজে। চাকরী থেকে অবসর গ্রহণ করেন পায়ের সমস্যার কারণে। অবসর নেয়ার পরও জীবনে একঘেয়েমি আর আলস্য আনেন নি কখনো। রহস্যের সন্ধানে ছুটে চলেন দেশ আর দেশের বাইরে হিম শীতল বরফ মাখা পাহাড়ের চুড়া থেকে ধূ ধূ বালুময় মরুভূমিতে। অবসর সময় নিজের ঘরে বসে প্রাচীন ইতিহাসের বই আর মানচিত্র নিয়ে নাড়াচাড়া করেন। অকৃতদার কাকাবাবু থাকেন বড় ভাইয়ের পরিবারের সাথে।

কাকাবাবুর চরিত্রের বয়স প্রায় ৬০ এর কাছাকাছি হলেও বৃদ্ধ তাকে কোন ভাবেই বলা চলে না। বয়স এখানে কেবলই একটি সংখ্যা আর অভিজ্ঞতার পরিমাপ। সরকারের আমন্ত্রণে হোক অথবা বন্ধুদের অনুরোধে  কখনো আবার কাকতালীয় ভাবেই তিনি জড়িয়ে পরেন নানান রহস্যে। এডভেঞ্চারের ছকে আটা এই সব শ্বাসরুদ্ধকর কাহিনীতে কখনো কাকাবাবুকে দেখা যায় ইতিহাসের হারিয়ে যাওয়া কোন নিদর্শন খুঁজে বের করতে, কখনো সেই নিদর্শন রক্ষায় মোকাবেলা করতে ভয়ংকর কোন শত্রুকে। সিরিজের প্রথম দিকের বইগুলোতে কাকাবাবুর পায়ে জখম হবার কারণ আফগানিস্তানে মোটরগাড়ি দুর্ঘটনা হিসেবে লেখা হয়েছে। পরবর্তীতে ‘কাকাবাবুর প্রথম অভিযান’ কাহিনীতে লেখক এই ঘটনার মূল কারণ সবার সামনে তুলে ধরেন। অকুতোভয় এই মানুষটি বন্ধুর প্রাণ বাঁচাতে কিভাবে নিজের পা বিসর্জন দেন সেই কাহিনী বিস্তারিত ভাবে লেখা আছে এই বইয়ে। বগলে ক্র্যাচ থাকলেও দুই হাতে অসুরের ক্ষমতা ধরে কাকাবাবুর। খালি হাতেই নাস্তানাবুদ করতে পারেন অপরাধীদেরকে। অনেক সময় ক্র্যাচগুলোও অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেন তিনি। রিভলভার আর তলোয়ার চালনায়ও সিদ্ধহস্ত কাকাবাবু। ঠিক গোয়েন্দা না হলেও একবার রহস্যের মায়াজালের সন্ধান পেলে এর সমাধান না করে ছাড়েন না তিনি।

বেশিরভাগ রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজেই মূল চরিত্রের একজন সহকারী থাকে। কাকাবাবু সিরিজেও রয়েছে এমনই এক চরিত্র। কাকাবাবুর এই সহকারী চরিত্রের নাম সন্তু। পুরো নাম সুনন্দ রায়চৌধুরী। কাকাবাবুর বড় ভাইয়ের ছেলে সন্তু, স্কুল ফাইনাল শেষ করে কলেজে পড়ছে। আর দশটা ছেলের মত বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিয়ে সময় না কাটিয়ে সন্তুর সময় কাটে কাকাবাবুর সাথে দেশে বিদেশে অভিযানে। লেখা পড়ায় বেশ মেধাবী আর ব্যবহারে নিতান্তই অমায়িক সে। ক্ষুরধার বুদ্ধি আর বিপদে তাৎক্ষণিক সমাধান করতে পারার বিশেষ গুন দেখা যায় সন্তুর মাঝে।

কাকাবাবু সিরিজের আরও এক অন্যতম প্রধান চরিত্র জোজো। সন্তুর সহপাঠী আর প্রিয় বন্ধু। সিরিজের একেবারে প্রথম দিকের বইগুলোতে না থাকলেও পরবর্তীতে নিয়মিত চরিত্র হিসেবে দেখা যায় তাকে। সন্তুর প্রায় বিপরীত চরিত্র এই জোজো। সারাক্ষণ গল্প করতে ভালবাসে আর অবাস্তব হাস্যকর সব গল্প বানিয়ে বলে সবাইকে হাসিয়ে নাস্তানাবুদ করে।বন্ধুর জন্যে নিবেদিত প্রাণ জোজোর রঙ্গরসে ভরা কাহিনীগুলো কাকাবাবু সিরিজের গল্পগুলোকে আরও মজাদার করে তোলে।

প্রধান এই তিন চরিত্র ছাড়াও কাকাবাবু সিরিজের বইগুলোতে বেশ কিছু চরিত্র মাঝে মাঝেই দেখা যায়। সন্তু আর জোজোর বান্ধবী দেবলীনা আর রিনি, কাকাবাবুর বন্ধু সিবিআই অফিসার নরেন্দ্র ভার্মা, প্রতিবেশী পাইলট বিমান ব্যানার্জি এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

রহস্য রোমাঞ্চ সিরিজের বই হিসেবে বিখ্যাত হলেও কাকাবাবু বড় পর্দায় এখন পর্যন্ত দেখা দিয়েছেন চারবার। বর্তমানে কাজ চলছে এই সিরিজের উপর আরও একটি ছবির। রুপালী পর্দার বাইরেও কাকাবাবুকে ছোট পর্দায়ও বহুবার উপস্থিত হতে দেখা গেছে। রঙ তুলির কারসাজীতে কমিক্স বইয়ের পাতায় উঠে এসেছে কাকাবাবুর অভিযান সেই সাথে আধুনিক যুগের অ্যানিমেটেড সিরিজেও কাকাবাবুকে নিজ মহিমায় বিরাজমান হতে দেখা গেছে।

লেখকের মৃত্যুর সাথে তাঁদের গড়া চরিত্রও থেমে যায়, কিন্তু বিলীন হয়ে যায় না। ৩৩ বছর রহস্য-রোমাঞ্চ সিরিজের জগতে বিরাজ করা কাকাবাবু সিরিজের পর্দা নামে ২০১২ সালে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। সিরিজের নতুন বই আসা বন্ধ হয়ে গেলেও পাঠকের মনে গেঁথে যাওয়া কাকাবাবু সন্তুরা আজীবন বেঁচে থাকবে চরিত্ররা। কাকাবাবু ক্র্যাচে ভর করেই আজীবন ছুটে চলবেন পাঠকের হৃদয়ে।