পুরানো তিমির [২য় পর্ব]

Now Reading
পুরানো তিমির [২য় পর্ব]

সারারাত ঘুম হয় নি। সকালে উঠে মাথাটা কেমন ভার ভার লাগছে।পরদিন অফিস।তাই সকাল সকাল নাস্তাটা সেরে জামা কাপড় গুছিয়ে নিলাম।বাহিরের দুনিয়ায় তখনো পুরোপুরি আলো ফুটে নি।সবে ভোর হল।পূর্ব দিগন্তের এক কোণায় সূর্যটা উদয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে।এমন ভোরে হাতে ব্যাগ নিয়ে আমি বেরিয়ে পড়লাম।।ঢাকা যেতে হবে।বাসে উঠে গত রাতের কথা মনে পড়লো।মেয়েটা সম্পর্কে কিছুই জানা হয় নি।রাতে মায়ের ঘুম নষ্ট হবে বলে আমি আর কথা বাড়াই নি।মনে মনে ভেবেছিলাম সকালে ঘুম থেকে উঠে সব জানা যাবে।সে ভাবনা ভাবনাই রয়ে গেল।সব কিছু গোছাতে গিয়ে মা কে জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গেছি।দীর্ঘ পথ জার্নি করে,দশ ঘন্টা বাদে,ঢাকায় পৌঁছে মনে পড়লো,মেয়েটার নাম পর্যন্ত জানা হল না।

হায়রে বেখেয়ালি মন!

মনে মনে আমি হাসলাম।প্রতি রাতে একটা মেয়ে কেন নির্যাতিত হয়,কি কারণ,নির্যাতনকারীর সাথে মেয়েটার সম্পর্ক কি এসব কিছুই জানা হল না।

মা নিশ্চয় সব কিছু জানেন।মেয়েটার সাথে মায়ের সম্পর্ক ভালো।মা’র কথা শুনে মনে হল দু’জনের মাঝে খুব ভাব।সুখ,দুঃখের কথা নিশ্চয় একে অপরকে বহুবার বলেছে।

 

তারপর বহুদিন।

বহু সময় এভাবে কেটে গেল।

সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অফিসের ঝামেলা,নিজের ব্যক্তিগত কাজ,ঢাকা শহরের অসহ্য জ্যাম ঠেলে ব্যস্ত জীবন……সব কিছু মিলিয়ে মেয়েটার কথা ভুলেই গেছি।ভুলে গেছি বললে সম্ভবত ভুল হবে।।বরং মনে করার সময়ই পাই না।

মায়ের সাথে ফোনে রোজই কথা হয়।সে কথা নিজেদের মধ্যে খোঁজ খবর নেয়া পর্যন্তই সীমাবদ্ধ।এই ব্যস্ত নগর জীবনে অন্যকে নিয়ে ভাবার জন্যে কতটুকু সময়ই বা আমরা পাই?

 

তারপর একদিন।প্রায় মাস খানেক পরে একদিন মায়ের কাছে গেলাম।বাবার সাথে বসে রাতের খাওয়া দাওয়া হল।নিজের ঘরে বিছানা পেতে শুয়ে আছি।জার্নি করে বেশ ক্লান্ত লাগছে।কিছুক্ষণ পর মা এসে বিছানার পাশে বসলেন।হাতে পেয়ারা,আপেল ফলমূল আরও কত কি! একটা বাঁটিতে কয়েক রকম পিঠাও আছে।আমি বললাম, “এসব কেন মা? মাত্র ভাত খেলাম। “

“আয়নায় নিজের চেহারাটা একবার দেখেছিস?” মা মুখ ভেংচালেন, “এই বয়সে খাওয়া দাওয়ায় কোন ধরাবাঁধা আছে?”

মায়ের ধারণা আমি ঢাকা গেলেই ভীষণ শুকিয়ে যাই।যদি পাঁচ কেজি ওজন বাড়িয়েও বাড়ি ফিরি,তারপরও মায়ের চোখে আমি শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছি।মায়েরা এমন।তাই অগত্যা আমাকে বাড়ি এলে ভুরি ভুরি খাবারের অত্যাচার সহ্য করতে হয়।কথা সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন,ভালোবাসার অত্যাচার কঠিন অত্যাচার।সত্যিই তাই।

 

মা বিছানার পাশে বসে আছেন।আমরা সংসারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করছ।আত্মীয় স্বজন,তাদের সুখ,দুঃখ……কার কি অবস্থা এইসব।আলোচনার ফাঁকে ফাঁকে আমার খাওয়া কার্যক্রমও বেশ চলছে।বাঁটি থেকে একটা তেলে ভাজা ডিমের পিঠা নিয়ে মুখে দিলাম।

“বাহ! খুব মজা হয়েছে এই পিঠা।অসাধারণ।”

মা কিছু বললেন না।আমার দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হাসলেন।তৃপ্তির হাসি।

মায়ের হাসি বেশিক্ষণ মুখে টিকলো না।পরক্ষণে কি ভেবে যেন গম্ভীর হয়ে গেলেন।

“আহাদ!”

“কি মা?”

“তুই দেখি কিছুই খেয়াল করিস না।এখন যে পিঠাটা খেলি,এমন পিঠা আমি তোকে এর আগে কোনদিন বানিয়ে খাইয়েছি?”

আমি কিছুক্ষণের জন্যে চুপ মেরে গেলাম।মায়ের দিকে তাকিয়ে আছি বোকার মত।ছোটবেলা থেকেই মা নানা রকম পিঠা বানিয়ে আমাদের খাইয়েছেন।মা বাইরের খারার পছন্দ করেন না।তাঁর রান্নাবান্নায় বিশেষ সখ আছে।আমি লজ্জিত কন্ঠে জানতে চাইলাম, “এই পিঠা তুমি বানাও নি?”

“হ্যাঁ,আমিই বানিয়েছি…”

“তাহলে……”

“আমি আগে এই পিঠা বানাতে পারতাম না তো।অল্পদিন আগে শিখলাম।আশা শিখিয়েছে।”

“আশা কে?”

মা বিরক্ত হলেন।বৃদ্ধরা খুব সহজে বিরক্ত হয়ে যান।জীবনের সাথে দীর্ঘ সময় লড়াই করে শেষ বয়সে আর ধৈর্য্যের কিছু অংশ বাকি থাকে না।মা ভুরু কুটি করে বললেন, “গতবার এসে যে মেয়েটার কান্না শুনেছিলি সেই মেয়ে।”

আমি ধাক্কার মত খেলাম।মেয়েটার কথা ভুলে গিয়েছিলাম অনেক আগেই।মা’র মুখে শুনে এখন আবার হুট করে মনে পড়লো।

“ওহ্‌…মেয়েটার নাম আশা?”

“জানি না।আমি ওকে আশা বলে ডাকি।”

“কেন?”

মা দ্বিতীয় বারের মত বিরক্তি প্রকাশ করলেন, “তুই দেখি সবকিছু ভুলে যাস! “

তাঁর ধারনা তিনি আমার সাথে মেয়েটাকে নিয়ে অনেক কথা বলেছেন।বৃদ্ধ বয়সে এমন স্মৃতি বিভ্রাট হয়।

আমি মায়ের হাত দুটা ধরে ক্ষীণ স্বরে বললাম, “ভুলব কি মা?তুমি তো মেয়েটা সম্পর্কে আমাকে বেশি কিছু বল নি।গতবার তো আমরা এ নিয়ে বেশি কথা বলার সুযোগই পাই নি। “

মা কিছু বলছেন না।চুপ করে বসে আছেন।আমি নিরবতা ভাঙতে মাকে প্রশ্ন করলাম, “তুমি মেয়েটাকে আশা ডাক কেন?”

“ভালো লাগে তাই।প্রথম দিন থেকেই মেয়েটার মুখে কত আশা ভরসার কথা শুনি।মেয়েটার চোখে অনেক স্বপ্ন রে আহাদ! পোড়া কপালি! কে জানে জীবনে কোন আশা পূরণ হয় কি না।পড়ে আছে একটা কসাইর কাছে।বদলোক!”

“কোনদিন নাম জিজ্ঞেস কর নি?”

“না……আমার আশা ডাকতেই ভালো লাগে। “

“বদলোকটা মেয়েটার কি হয়?…স্বামী?”

“হু…”

“এখন আর ওদের মাঝে ঝগড়া হয়?যেদিন যেমন শুনলাম। “

“জানি না। “

“কেন……এখন আর সেদিনের মত হৈ চৈ,হট্টগোল শুনো না?”

“না রে আহাদ! গত একমাস কিছুই শুনি নি। “

মায়ের গলাটা খুব শান্ত হয়ে গেল।জানালার ফাঁক দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে আছেন।মুখে হতাশা আর ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট।গভীর অনুতপ্তের একটা ভারী নিঃশ্বাস ফেললেন।

আমি বললাম, “দেখেছ মা,আমি বলি নি,সংসারে এমন মাঝেমাঝে হয়। ওসব কিছু না। “

“মাঝেমাঝে না প্রতিদিন তুই কেমনে জানিস? তুই কি মেয়েটার কাছে গিয়ে বসে আছিস?” মা হঠাৎ রেগে গেলেন।

আমি আমতা আমতা করে বললাম, “প্রতিদিন ঝগড়া হলে তো তুমি শুনতে মা।সেদিন যেমন শুনেছিলে……“

মা আগের চেয়ে আরও বেশি গম্ভীর হয়ে গেলেন।মায়ামাখা করুণ সুরে বললেন, “গত একমাস ধরে মেয়েটার কোন খোঁজ পাচ্ছি না আহাদ।কয়েকবার ওদের বাসায়ও গিয়েছিলাম,পাই নি।বাসায় তালা দেয়া ছিল। “

“আশপাশের কাউকে জিজ্ঞেস কর নি?”

“করেছি,কেউ জানে না।লোকটার স্বভাব চরিত্র ভালো না।তাই কেউ তাদের সাথে তেমন একটা মিশতে চায় না।তাদের পাশের বাসার এক লোক শুধু বলল, মাস খানেক আগে একদিন সকালে তারা নাকি বাসায় তালা দিয়ে কোথায় গিয়েছিল।তারপর আর ফিরে নি। “

 

তারপর অনেক্ষণ নিরবে কেটে গেল।মা মনমরা হয়ে বসে আছেন।আমিও চুপচাপ।এমন পরিস্থিতিতে আমার কি বলা উচিত তাও বুঝতে পারছি না।কি ভাবে মাকে সান্ত্বনা দেয়া উচিত ভেবে পাচ্ছি না।ভাবতে ভাবতে অনেক্ষণ গেল।শেষে মায়ের মন অন্যদিকে ফেরাতে মুখ হাসি হাসি করে বললাম, “মেয়েটা তোমাকে কি সব আশা ভরসার কথা বলে মা?কয়েকটা বল দেখি,শুনি।”

“ওসব ছেলেমানুষি স্বাদ-আহ্লাদ তুই কি শুনবি? মেয়েছেলেদের সব কথা শুনতে নেই।”

আমি আবার কথার খেই হারিয়ে ফেললাম।মাকে কি বলে ভোলান যায় বুঝতে পারছি না।আমি প্রসঙ্গ পালটে মায়ের সাথে আত্মীয় স্বজনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করতে চাইলাম।কথাবার্তা তেমন জমলো না।মা বারবার ঐ মেয়েটার কথা টেনে আনেন।আমি একবার বলে ফেললাম, “বাদ দাও তো মা।কোথাকার কোন মেয়ে,দুদিনের পরিচয়,ওকে নিয়ে চিন্তা করে তোমার লাভ কি?”

মা কিছু বললেন না।শুধু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আমার ঘর থেকে চলে গেলেন।

 

সারারাত আমার তেমন আর ঘুম হয় নি।বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করেছি শুধু।গভীর দুশ্চিন্তায় মাথা ভার হয়ে আছে।আমার চিন্তা মেয়েটাকে নিয়ে নয়,মাকে নিয়ে।তাঁর বয়স হয়েছে।এ ভাবে দিনের পর দিন দুশ্চিন্তা করলে,কে জানে কখন কি হয়ে যায়!