ইসরায়েল প্রতিষ্ঠাঃ পরিকল্পিত এক ষড়যন্ত্রের লোমহর্ষক ইতিহাস

Now Reading
ইসরায়েল প্রতিষ্ঠাঃ পরিকল্পিত এক ষড়যন্ত্রের লোমহর্ষক ইতিহাস

স্রষ্টার অপার অনুগ্রহ-ধন্য ফিলিস্তিন ভূখণ্ডটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভৌগলিক অবস্থানে অবস্থিত। ৬ হাজার বছর পূর্বে কেন’আনীদের ইয়াবুসী গোত্রের লোকেরা  সেখানে বসবাস করত। তারা কুদস তথা জেরুজালেমে বসতি গড়ে তৎকালীন সময় যা  ইয়াবুস নামে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে বহু কেন’আনী গোত্র ফিলিস্তিনের উত্তরাঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। যার ফলে ইতিহাসে এই অঞ্চলকে কেন’আন দেশ বলে উল্লেখ করা হয়।

আর ধারণা করা হয় ফিলিস্তিন নামটি এসেছে বিলিস্তা গোত্রের নামানুসারে যারা সমুদ্র পথে এই অঞ্ছলে প্রবেশ করে এবং এখানকার অদিবাসিদের সাথে মিশে যায়। সে থেকে এ অঞ্চলটি ফিলিস্তিন নামে পরিচিত।

কালের পরিক্রমায় অঞ্চলটি বিভিন্ন জাতি গোষ্ঠীর দ্বারা শাসিত হয়ে আসছে। কেন’আনিদের থেকে শুরু করে দাউদ (আঃ), তার পুত্র সুলাইমান (আঃ), ইসরাইলী রাজত্ব, অ্যাসিরিয় রাজত্ব, বেবিলন, পারস্য সম্রাজ্য, গ্রীক সম্রাজ্য, রোম্যান সম্রাজ্য এবং সর্বশেষ মুসলিম জাতির দ্বারা ১১০০ বছর যাবত শাসিত হয়ে আসছিল।

বিগত শতাব্দীগুলোতে ফিলিস্তিনে প্রতিটি ধর্মের অনুসারীরা মুসলিম, খ্রিষ্টান, ইহুদী সবাই অত্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে সহবস্থান করছিল। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে জায়নবাদী আন্দোলনের সূচনা ঘটে এবং সে থেকেই শুরু হয় ফিলিস্তিনিদের দুর্দশার অধ্যায়। তৎকালীন সময় ফিলিস্তিনের মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৪৬০০০০ হাজার। ইহুদীরা ছিল পুরো জনসংখ্যার মাত্র ৩ শতাংশ। এদিকে ইউরোপীয় জাতীয়তাবাদের উত্থানের ফলে পুরো ইউরোপ জুড়ে ইহুদী নিধন শুরু হয়। তাই ইহুদীরা নিজেদেরকে সঙ্গবদ্ধ করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে এবং ইউরোপ ত্যাগের পরিকল্পনা শুরু করে।

কিন্তু তারা যাবে কোথায়………?

এর উত্তর লিখেছে এক দুর্ধর্ষ ইহুদী সাংবাদিক ডঃ থিওডর হার্জেল তার লিখিত এক বইয়ে যেখানে সে এই বিক্ষিপ্ত ইহুদীদের একত্রীত করে একটি ইহুদী রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানিয়েছে। এর জন্য সে ফিলিস্তিন, আর্জেন্টিনা এবং আফ্রিকার কিছু ভূখণ্ড প্রস্তাব করে। এরপর এ লক্ষ বাস্তবায়নে আর্থিক সাহায্য ও সহযোগিতা অর্জনের জন্য ইহুদীরা বেশ কিছু সম্মেলনের আয়োজন করে এবং ফিলিস্তিনকে তাদের কল্পিত রাষ্ট্র হিসেবে নির্বাচন করে। এদিকে অ্যামেরিকা, ব্রিটেন ও অন্যান্য দেশের প্রভাবশালী ইহুদীরা এই আন্দোলনে সহযোগিতা করতে তাদের সরকারকে চাপ দিতে থাকে। এভাবে শুরু হয় ফিলিস্তিন অভিমুখে ইহুদী শরণার্থীদের যাত্রা।

২৫০০০ ইহুদী শরণার্থী ফিলিস্তিনে এসে জমা হয় পূর্ব ইউরোপ ও রাশিয়া থেকে। ফলে ফিলিস্তিনে ইহুদী জনসংখ্যা গিয়ে দাড়ায় ৫ শতাংশে।

এ পর্যায়ে আমরা দেখবো কিভাবে জায়নবাদী চিন্তাধারার এই ইহুদী শরণার্থীদের উপচে পড়া ভীর ফিলিস্তিনের দুঃখ দুর্দশার কারন হয়ে দাড়ায়।

তো একের পর এক ইহুদী শরণার্থী কাফেলার অগমনের সাথে সাথে অদিবাসি ফিলিস্তিনিদের সাথে খাদ্য অহ্ন-বস্ত্র ও বাসস্থানের সংকট বেড়েই চলেছিল।

১৮৯১ সালে জেরুজালেমের গণ্যমান্য ব্যাক্তিবর্গরা অটোম্যান সরকারের কাছে আবেদন জানায় যেন তারা রাশিয়ান ইহুদী শরণার্থীদের আগমন এবং ভুমি দখলের বিরুদ্ধে ব্যাবস্থা গ্রহন করে।

এতদসত্তেও ইহুদী শরণার্থীদের ঢল থেমে থাকে নি। আরও ৪০০০০ শরণার্থী ফিলিস্তিনে এসে একত্রীত হয়। ফলে এবার ইহুদী জনসংখ্যা গিয়ে দাড়ায় ৮ শতাংশে।

১ম বিশ্ব যুদ্ধের পর অটোম্যান সম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ার সাথে সাথে ব্রিটেন এবং ফ্রান্স পুরো শাম অঞ্চলকে সাইক্স পিকট চুক্তি অনুসারে বিভক্ত করে ফেলে। অতঃপর ব্রিটেন সান রিমো চুক্তি অনুসারে ফিলিস্তিনের কর্তৃত্ব দখল করে এবং বালফোর ঘোষণার বাস্তবায়ন করার অঙ্গিকার করে।

তাহলে কি এই বালফোর ঘোষণা?

১৯১৭ সালে ব্রিটেন ইহুদীদেরকে ফিলিস্তিনে যেতে এবং ভুমি দখল করে সেখানে তাদের একটি একক জাতীয় ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে গোপনে সহযোগিতা করার প্রতিশ্রুতি দেয়। এই প্রতিশ্রুতিতে পূর্ণ সমর্থন দেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ফিলিস্তিনের জাতীয় সংকট ও দুঃখ দুর্দশার পেছনে এই ঘোষণা ভীষণভাবে প্রভাব ফেলে। অতঃপর ৩য় দফায় ইহুদী শরণার্থীদের আগমন ঘটে ফিলিস্তিনে। ফলে এবার ইহুদী জনসংখ্যা গিয়ে দাড়ায় ১২ শতাংশে। এতদসত্তেও ইহুদীদের দখলে ছিল মাত্র ৩ শতাংশ ভূখণ্ড।

দফায় দফায় ইহুদীদের আগমনের ফলে ফিলিস্তিনে জনসংখার ব্যাপক পরিবর্তন ঘটে এবং ইহুদী আরব সমস্যা আরও ভয়াবহ রূপ পরিগ্রহ করে। এরই প্রেক্ষিতে বালফোর ঘোষণা প্রত্যাখ্যান করে ফিলিস্তিনে ৭টি বৃহৎ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। তারপরেই ১৯২০ সালে প্রথম ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদা তথা বিপ্লব সংগঠিত হয়। ১৯২১ সালে জাফায় উভয় পক্ষ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে এবং নাব্লিসে একটি সম্মেলনে ইহুদীদের সাথে সকল অর্থনৈতিক সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা দেয়া হয়। ১৯২২ সালে আল হাজ আমিন আল হুসাইনির নেতৃত্বে সর্বচ্চ ইসলামী পরিষদ গঠিত হয়। অপরদিকে ইহুদীরা গোপনে “হাগানা” নামক জায়নবাদি সশস্ত্র সংগঠন গড়ে তলে। ব্রিটেন এই সংগঠনকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে। অথচ একই সময় কোন আরব গোপনে অস্ত্র বহন করলে তাকে তারা সাথে সাথে গ্রেফতার করে নিয়ে যেত।

এদিকে ইহুদী শরণার্থীরা অবিরতভাবে পোল্যান্ড, রাশিয়া, জার্মানি ও অন্যান্য দেশ থেকে ফিলিস্তিনে  আসতেই থাকে। ফলে ইহুদী জনসংখ্যা গিয়ে দাড়ায় ১৭ শতাংশে। এরই মদ্ধে আল আকসা মসজিদের western wall খ্যাঁত আল বুরাক ওয়ালে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বেধে যায়। এই বিপ্লবে দলে দলে ফিলিস্তিনিরা যোগ দিতে থাকে এবং ১৯৩৩ সালে বৃহৎ ফিলিস্তনি বিপ্লব সংগঠিত হয়। এর দুবছর পরেই বিখ্যাত ফিলিস্তিনি যোদ্ধা ইজ্জুদ্দিন আল কাসসাম দখলদার ব্রিটিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করে শহীদ হন।

অতঃপর আড়াই মিলিয়ন ইহুদী শরণার্থীদের আরেকটি দল এসে পৌঁছে ফিলিস্তিনে।  এবার ইহুদী জনসংখ্যা গিয়ে দাড়ায় ৩০ শতাংশে।

বৃহৎ ফিলিস্তনি বিপ্লবঃ পুরো ফিলিস্তিন জুড়ে ব্রিটিশ ও ইহুদী বিরোধী বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে। এই বিপ্লব ছিল অতিতের যেকোনো বিপ্লবের চেয়ে বৃহৎ এবং তীব্র যার সূচনা হয়েছিল ৬ মাসের ধর্মঘটের মাধ্যমে। এ বিপ্লব চলাকালে ব্রিটেন পিল (peel) নামক একটি সংস্থা গড়ে তলে যা প্রস্তাব দেয় যে ফিলিস্তিনকে ইহুদী ও আরব দুটি রাষ্ট্রে বিভক্ত করা হবে আর জেরুজালেম থাকবে ব্রিটিশ কর্তৃত্বাধীন এবং সকল আরব  ইহুদী রাষ্ট্র থেকে আরব রাষ্ট্রে চলে যাবে। ঐ সময়ে ইহুদীরা ফিলিস্তিনি মাত্র ৫.৫% ভূখণ্ডের এর কর্তৃত্ব করত, অথচ প্রস্তাবিত ইহুদী রাষ্ট্রের আয়তন দাড়ায় ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ৩৩% । ফলে সাভাবিকভাবেই ফিলিস্তিনিরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং তা আর বাস্তবায়ন হয়নি।

ফিলিস্তিনিদের চাপের মুখে ব্রিটিশ সরকার MacDonald white paper খ্যাত একটি ফরমান পেশ করে যাতে ৫ বছর পরে ইহুদীদের অনুপ্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয় এবং ১০ বছরের মদ্ধে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা প্রদানের ঘোষণা দেয়া হয়। ইহুদীরা এ প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করে। এরপরেই হাগানা, ইরগুন, ইস্টার্ন প্রভৃতি সশত্র ইহুদী সংগঠনগুলো ভয়াবহ আক্রমন শুরু করে। তা শুধুমাত্র ফিলিস্তিনিদের উপরেই নয়, বরং ব্রিটিশদের উপরেও যাতে তাদেরকে হটিয়ে একক ইহুদী রাষ্ট্র গঠন করা যায়। এ অভিযানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল জেরুজালেমে কিং ডেভিড হোটেলে বিস্ফোরণ যেখানে ব্রিটিশ কর্মকর্তারা সাক্ষাৎ করত।

ফিলিস্তিন বিভক্তির পরিকল্পনাঃ ১৯৪৭ সালে ব্রিটেন ফিলিস্তিন ত্যাপের সিদ্ধান্ত নেয় এবং এ বিষয়ে জাতিসংঘকে প্রস্তাব পেশ করার অনুরধ জানায়। জাতিসঙ্ঘ এ বিষয়ে একটি সম্মেলনের আয়োজন করে যেখানে ফিলিস্তিনকে বিভক্ত করার প্রস্তাব দেয়া হয় যা resolution 181 নামে খ্যাঁত। প্রস্তাব অনুযায়ী পরিকল্পনা করা হয় ফিলিস্তিনকে আরব ও ইহুদী দুটি রাষ্ট্রে বিভক্ত করার যেখানে জেরুজালেম থাকবে বিশেষ আন্তর্জাতিক অঞ্চল হিসেবে। জাতিসঙ্ঘের এই প্রস্তাবে সমর্থন দান করে যুক্তরাষ্ট্র ও তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন।

সে সময়ে  ফিলিস্তিনের মাত্র ৬.৫ শতাংশ ভুমি ইহুদীদের দখলে ছিল। অথচ গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদেরকে দেয়া হয় ৫৬ শতাংশ ভুমি। তাই ফিলিস্তিনিরাসহ পুরো আরব বিশ্ব এই বিভক্তির প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং এ পরিকল্পনাও ব্যর্থ হয়।

ফলে আর বুঝার বাকি থাকে না যে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে পড়েছে। অতঃপর ‘হাগানা’ সংগঠন সৈন্য নিয়োগ দিতে শুরু করে এবং সামরিক সেবার জন্য  ১৭ থেকে ২৫ বছরের সকল ইহুদীর নাম নিবন্ধন করা হয়। অপরদিকে আরবরা জাইশুল ইনকাজ নামে আরব লিবারেশন আর্মি গঠন করে।

এমন সময় ইহুদী শরণার্থীদের আরও একটি দল ফিলিস্তিনে আসে। ফলে যুদ্ধের আগ মুহূর্তে ইহুদী জনসংখ্যা বৃদ্ধি পায় ৩১.৫ শতাংশে। এদসত্তেও ফিলিস্তিনের ৮.৮ শতাংশ ভূখণ্ড তাদের দখলে ছিল। ছবিতে দেখতে পাচ্ছেন ইহুদীদের দখলকৃত ভূখণ্ডের পরিমান।

১৯৪৮ সালে ব্রিটিশরা ফিলিস্তিন ত্যাগ করে এবং আরব ও ইহুদী বাহিনী যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ইহুদীদের বিজয়ের মাধ্যমে যুদ্ধের পরিসমাপ্তি ঘটে। তারা ৭৮ শতাংশ ভূখণ্ড দখল করে নেয় এবং সেখানে তারা ইহুদী রাষ্ট্র গঠন করে। সাথে সাথে যুক্তরাষ্ট্র তাদেরকে স্বীকৃতি দান করে। পরবর্তী বছর ইজরাইল স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে জাতিসংঘে যোগদান করে।

৪৮ এর যুদ্ধের ফলে জেরুজালেম দুটি অংশে বিভক্ত হয়ে পড়ে। পশ্চিম জেরুজালেম যা ইহুদীদের দখলে চলে যায় এবং পূর্ব জেরুজালেম যা আরবদের কাছে অবশিষ্ট থাকে। অতঃপর ১৯৬৭ সালে যুদ্ধের পর পূর্ব জেরুজালেমও ইহুদীরা দখল করে নেয়।

যুদ্ধের আগে ৯ % ভূখণ্ডের কর্তৃত্ব আর যুদ্ধের পরে ৭৮% ভূখণ্ডের কর্তৃত্ব লাভ। এটাই ছিল ৪৮ এর আরব ইজরাইল যুদ্ধের ফলাফল।

আমরা যদি ফিলিস্তিনিদের দুর্দশার মূল কারন অনুসন্ধান করি তাহলে দেখবো যে সেটা ছিল জায়নবাদি চিন্তাধারা ললনকারি ব্যাপক সংখ্যক ইহুদী শরণার্থীদের ঢল যাদের বিশ্বাস এই ফিলিস্তিন শুধুমাত্র তাদেরই এবং মূল বাসিন্দাদের কথা বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে যেকোনো মুল্যে নিজেদের জন্য একটি জাতীয় ভূখণ্ড প্রতিষ্ঠা করাই যাদের একমাত্র লক্ষ। এছাড়াও ঔপনিবেশিক শক্তিগুলো সর্বতোভাবে তাদেরকে দখলদারি প্রতিষ্ঠায় সাহায্য করে যা এই অঞ্চলে তাদের কৌশলগত স্বার্থ উদ্ধারে সহায়ক হয়। এ সমস্ত বিষয়গুলোই আজ ফিলিস্তিন সংকটের কারন হয়ে দারিয়েছে।