অভিশপ্ত অহংকারী

Now Reading
অভিশপ্ত অহংকারী

এক জমিদারের গল্প। সে ছিলো সেই সময়কার ঐ অঞ্চলের প্রভাবশালী, অহংকারী জমিদার এবং সম্পদশালী জমিদার। তার সাত ছেলে এবং দুই কন্যা ছিলো। দিন রাত চলে লোকজনের আনাগোনা, ভরপুর জমিদার বাড়ি। রঙ্গশালায় রঙ্গ তামাশায় সবসময় থাকতো মাতামাতি। সে জনগনের সুখ দুঃখ দেখার সুযোগ পেতো না কারণ সে নিজের আনন্দ ফূর্তি নিয়ে ব্যস্ত থাকতো সবসময়। জমিদারের শখ ছিলো শিকার করার। প্রায়ই সে শিকার করতে যেত। সফল হয়ে ফিরে এসে আরো আনন্দ উল্লাসে মাতোয়ারা থাকতো রঙ্গশালায়। সব সুখ, আনন্দ, সম্পদ, প্রতিপত্তি সব যেন শুধু তার একার এবং একচ্ছত্র ! কিন্তু সব সময় যে একরকম যায় না কারো। সে কথা জমিদারও ভুলে গেছে। বরাবরের মত সে এবারও শিকার করতে তার লোকলষ্কর নিয়ে শিকারে যায়। সাথে তার পুত্ররাও যায়। তার অনুপস্থিতিতে জমিদার বাড়িতে মুখোশধারী কিছু ডাকাত হামলা করে সবাইকে বন্দী করে সব অর্থ, অলংকার লুট করে সব লন্ডভন্ড করে দিয়ে যায়।

 

পরদিন জমিদার ফিরে সব দেখে শুনে রাগে হুংকার ছাড়তে থাকে আর সমস্ত দাস দাসী পেয়াদাদের শাস্তি দেয়ার নির্দেশ দেয়। তার ধারণা এ কাজ এই বিশ্বস্ত দাস দাসী দিয়েই হয়েছে। কারণ ওরাই শুধু জানতো জমিদার বাড়ির গোপন কক্ষ ও সম্পদের কথা। তাছাড়া জমিদার বাড়ির চারিপাশ ঘেরা ছিলো জমিদারের তৈরী কৃত্রিম খাল এবং জমিদার বাড়ির আশার সম্মুখ পথে ছিলো কড়া পাহারাদার। পরিচিত চেনা জানা মানুষ ছাড়া এ কাজ কেউ করতে পারেনা। তাহলে এদেরই হাত আছে আর কারো নয় ! কিন্তু রাগ, অহংকারে নিমজ্জিত জমিদার এতটাই অন্ধ হয়ে যায় যে সে এই কথা ভাবেনি, তার অনেক কুচক্রী অসৎ বন্ধুর আনাগোনা ছিলো তার রঙ্গমহলে। অনেকেই তার সম্পদের প্রতি আকৃষ্ট ছিলো। এবং অনেকেই জমিদারের অনৈতিক আচরণ এবং তিরষ্কারের শিকার ছিলো , তারা হয়তো কড়া নজর রেখেছিলো আর সুযোগ খুঁজছিলো প্রতিশোধ নেবার। আজ যখন সুযোগ পেয়েছে তখন সে সুযোগ কাজে লাগিয়েছে !

 

যাই হোক, সে নির্বোধ অহংকারী অত্যাচারী জমিদার অমানুষিকভাবে অত্যাচার করতে লাগলো নিজের বিশ্বস্ত পুরোনো দাসদাসীদের উপরে। নারী, বৃদ্ধ, যুবক কেউ বাদ পড়েনি সেই শাস্তি থেকে। তার এই বর্বর শাস্তি সহ্য করতে না পেরে বেশ কয়েকজন মারা যায়। এদের মাঝে এক মাঝ বয়সী বিধবাও মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে ! কিন্তু সে মৃত্যুর কিছু মুহূর্ত আগে সভায় রক্তাক্ত অবস্থায় চিৎকার করে অত্যাচারী জমিদারকে অভিশাপ দিয়ে যায় !

সে অভিশাপ দিয়ে যায়,‌ জমিদারের খুব শীঘ্রয়ী ব্যাথার কঠিণ এক রোগে মৃত্যু বরণ করবে ! তার বংশের সমস্ত প্রদীপ আস্তে আস্তে নীভে যাবে ! তার বংশে কোন পুরুষ থাকবে না সব অকালে মরে যাবে ! জমিদার বাড়িতে শুধু শোক আর শোক থাকবে ! জমিদারের পত্নী, মেয়েরা এবং পুত্র বধুরা সব অকালে বিধবা হবে !

 

সত্যি এই অভিশাপের একবছর পার হতেই জমিদার হঠাৎ কঠিণ ব্যাথার ব্যাধীতে মারা যায়, কোন কবিরাজ তাকে সুস্থ করতে এমনকি বাঁচাতেও পারেনি। তার মৃত্যুর পরে এক এক করে তার সাত পুত্র অকালে মরে যায়। তাদের ঘরেও কোন পুত্র সন্তান ছিলো না জন্মের পরই মারা যায় ! জমিদারের মেয়ে দুটিও অকালে বিধবা হয়ে ফিরে আসে জমিদার বাড়িতে, মায়ের কাছে। কারণ আস্তে আস্তে জমিদারের এই অত্যাচার এবং জমিদার পরিবারের অভিশাপের কথা লোক মুখে ছড়িয়ে পড়ে ! প্রত্যেকে তাদের ঘৃণা অবজ্ঞার চোখে দেখতে থাকে ! জাঁকজমকপূর্ণ জমিদার বাড়ি আস্তে আস্তে লোক শূণ্য হয়ে যায় ! জমিদার পুত্রবধুরা চলে যায় জমিদার বাড়ি ছেড়ে। পড়ে থাকে শুধু জমিদার পত্নী এবং তার দুই কন্যা। কচি বয়স আর অপরুপ সুন্দরী জমিদার কন্যারা কিন্তু অকালে মৃত্যুর ভয়ে কেউ তাদেরকে বিয়ে করতে আসেনা ! খুব কষ্টে, অভাবে কোনরকমভাবে দিন কাটতে থাকে তাদের। একসময় তারাও মরে যায় আর মরে পড়ে থাকে তাদের নিথর দেহগুলো জমিদার বাড়িতে। কিন্তু কেউ খোঁজও নিতে আসেনি তাদের…! পরবর্তীতে ঐ জমিদার বাড়ি এক অভিশপ্ত জমিদার বাড়ি হয়ে থেকে যায় ! জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কেউ কখনও আসতে রাজি হয় না এখানে। মাটির উপরে জীবন্ত কবরের মহল হয়ে থেকে যায় এ বাড়ি…..।

 

এভাবে কত রাজবাড়ি জমিদার বাড়ি অন্ধকার অভিশপ্ত ভূতুড়ে বাড়ির পরিচয়ে যুগ যুগ ধরে দাঁড়িয়ে আছে কে জানে…!

 

কোন নিরপরাধ কোন দুর্বলের উপরে অত্যাচার করে কেউ কোনদিন রেহাই পায়না। কারো ক্ষতি করে কারো কোনদিন ভালো হয়না। অহংকার, হিংসা, লোভ মানুষকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায় আর এটাই চিরন্তন সত্য।