মাইক্রোবায়োলজি কিংবা অণুজীববিজ্ঞানের ইতিহাস

Now Reading
মাইক্রোবায়োলজি কিংবা অণুজীববিজ্ঞানের ইতিহাস

মাইক্রোবায়োলজি কিংবা অণুজীববিজ্ঞান বললেই আমাদের চোখের সামনে যে সকল বস্তু চলে আসে তা হলো ভাইরাস,ব্যাকটেরিয়া,প্রটোজোয়া ইত্যাদি । মাইক্রোবায়োলজি বর্তমান সময়ে বেশ একটি জনপ্রিয় বিষয় হয়ে উঠেছে । দেশে বিদেশে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই বিষয়টি পড়ানো হয় এবং গবেষণা করা হয় । অত্যন্ত ক্ষুদ্র জীবাণু যা খালি চোখে দেখা যায় না ,এই সকল জীবাণুই এই বিষয় এর অন্তর্ভুক্ত । এই সকল জীবাণু সম্মন্ধে বিস্তারিত আলোচনা ,এদের ক্ষতিক্ষর প্ৰভাৱ এবং এদের কিছু উপকারী দিক সম্মন্ধে আলোচনা করা হয় এই বিষয়ে ।এবার আলোচনা করা যাক এই অণুজীববিজ্ঞানের ইতিহাস নিয়ে। এই সকল ভাইরাস ,ব্যাকটেরিয়া কিন্তু একদিনে আবিষ্কৃত হয় নাই এবং এদের ইতিহাস বৃহৎ ।

১৬৬৫ সালে রবার্ট হুক সর্বপ্রথম প্রাণের অস্তিত্ব খুঁজে পান ।তিনি তার মাইক্রোস্কোপ দিয়ে এগুলো পর্যবেক্ষন করেন ।তিনি এগুলোর নাম দেন ”সেল” কিংবা কোষ ।তার এই পর্যবেক্ষণ মাইক্রোবায়োলোজির ইতিহাসে প্রথম ভীত স্থাপন করে ।এরপর বিজ্ঞানী লিউয়েনহুক প্রথম তার মাইক্রোস্কোপ এ ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবাণু পর্যবেক্ষণ করেন ।তিনি এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবাণুর নাম দেন ”এনিম্যালকুয়েলস”।তিনি এই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবাণুর আকৃতির বর্ণনা দেন এবং এগুলোকে বিস্তারিত তার কাগজে এঁকেছিলেন ।এরপর অনেক দিন অনুজীবিজ্ঞানের অগ্রগতি বন্ধ হয়ে ছিলো ।এই সময় কিছু দার্শনিক এবং বিজ্ঞানীরা বিশ্বাস করতেন যে ,”ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবাণুরা জড় বস্তু দেখে জন্ম নেয় ”।মানুষ বিশ্বাস করতো যে ,ইঁদুর ,স্যাপ এগুলো নোংরা মাটি বা কাদা যুক্ত মাটি দেখে জন্মাতে পারে।এই ধারণাকে বদলে দেওয়ার জন্য জন নিধাম একটি এক্সপেরিমেন্ট অর্থাৎ পরীক্ষা করেছিলেন।প্রথমে তিনি কিছু ফ্লাস্ক অর্থাৎ পাত্র নিয়েছিলেন এবং এই পাত্রগুলো তিনি টুকরো টুকরো মাংস দ্বারা পূর্ণ করেছিলেন তিনি এই পাত্রগুলো কিছু মাংস দ্বারা পূর্ণ করেছিলেন । কিছু পাত্র তিনি সিল অর্থাৎ বন্ধ করে দিয়েছিলেন এবং কিছু পাত্র খোলা অবস্থায় রেখেছিলেন।কিছুদিন পরে তিনি লক্ষ্য করলেন যে খোলা পাত্রে জীবাণুর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া গেছে । কিন্তু যে পাত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল সে পাত্রে কোনো জীবাণুর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় নি ।কিন্তু এরপরেও অনেক বিজ্ঞানী দাবি করেছিলেন যে খোলা পাত্রে বাতাস প্রবেশ করতে পেরেছিলো ,তাই জীবাণু জন্মাতে পেরেছে কিন্তু বন্ধ করা পাত্রে কোনো জীবাণু জন্মায় নি কারণ সেখানে কোনো বাতাস প্রবেশ করতে পারে নি ।১৭৪৫ সালে জন নিধাম আবারো দাবি করলেন যে ,”ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীব জড় বস্তু দেখে জন্মায় ” ।কিন্তু বিজ্ঞানী স্প্যানল্যানজানি নিধাম এর ধারণাকে ভুল দাবি করেন ।তিনি বলেন যে ,”জীবাণুরা সবসময় জীবন্ত কোষ থেকেই জন্মায় ” এবং এরা বাতাসে বর্তমান থাকে ।বাতাসের মাধ্যমে এগুলো কোনো কিছুর সাথে মিশে ওই বস্তুকে দূষিত করতে পারে ।১৮৫৮ সালে রুডলফ ভারচু বিজ্ঞানীদের একটি চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন ।তিনি এই তত্ত্বের নাম দেন ”জীবনজনিতত্ত্ব”।কিন্তু তিনি তেমন কোনো প্রমান দেখাতে পারেন নি তাই এই ধারণা বেশিদূর পৌঁছাতে পারে নি ।

অবশেষে ১৮৬১ সালে সকল জল্পনা কল্পনা অবসান ঘটে ।লুই পাস্তুর ধারণা দেন যে ,জীবাণুরা বাতাসে থাকে এবং তারা যেকোনো জিনিসকে সংক্রমিত করতে পারে ।তার এই ধারণা প্রমান করার জন্য পাস্তুর একটি পরীক্ষা করেছিলেন যেখানে তিনি দেখিয়েছেন যে ,জীবাণুরা আপনা আপনি জড় বস্তু থেকে তৈরী হয় না ।তিনি প্রথমে কিছু ফ্লাস্ক নিয়েছিলেন এবং ফ্লাস্কগুলো মুরগির সুপ্ দ্বারা এবং পূর্ণ করেছিলেন ।এরপর সেগুলোকে তিনি তাপ দিয়েছেন বিশুদ্ধ করেছিলেন । এরপর তিনি সেগুলো তাপ দেন এবং কিছু ফ্লাস্ক সিলগালা করে দেন অর্থাৎ কিছু ফ্লাস বন্ধ করে দেন। বাকি কিছু ফ্লাস্ক তিনি খোলা অবস্থা রেখে দেন । তিনি কিছুদিন পরে খোলা পাত্রে কিছু জীবাণু দেখতে পেয়েছিলেন এবং যেইগুলো বন্ধ করে দিয়েছিলেন সেখানে কোনো জীবাণু দেখতে পান নি।এরপরেও কিছু দার্শনিক এবং বিজ্ঞানীরা দাবি করলেও যে বন্ধ করা ফ্লাস্কগুলোতে বাতাস প্রেস করতে পারে নি তাই জীবাণুরা জন্মাতে পারে নি। এবার তিনি তিনি অন্য পদ্ধতিতে তার এক্সপেরিমেন্ট করেন এবং এর সময়ে তিনি কিছু ফ্লাস্ক আবারো চিকেন সুপ্ নিয়েছিলেন । এবার পাত্রগুলো ছিলো লম্বা গলা ওয়ালা এবং সেখানে বাতাস প্রবেশ করার ব্যবস্থা ছিলো । কিন্তু পাত্রগুলোর ডিজাইন এমনভাবে করা হয়েছিলো যে পাত্র গুলোতে কোনো বাতাসের জীবাণু প্রবেশ করে পারবে না । এরপর তিনি ফ্লাস্ক কিংবা পাত্র গুলোকে খোলা জায়গায় রেখে দিয়েছিলেন । কিছুদিন পরে তিনি পাত্রের মুখে কিছু জীবাণু আবিষ্কার করেছিলেন । অর্থাৎ তিনি প্রমান করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে ,জীবাণুরা বাতাসে থাকে এবং তারা যে কোনো কিছুর সাথে মিশে সংক্রমিত হতে পারে এবং জীবাণুরা সবসময় জীবিত কোষ থেকেই উৎপন্ন হয় ।

এই লুই পাস্তুরের দ্বারাই মাইক্রোবায়োলজি সোনালী যুগের শুরু হয়েছিলো । পাস্তুর এরপর ফার্মেন্টেশন পদ্ধতি সম্মন্ধে বিস্তারিত ধারণা দেন ।তিনি পাস্তুরাইজেশন এর আবিষ্কারক। এই পাস্তুরাইজেশন বর্তমান সময় বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে । অনেক পানীয় ,দুধ ,বেভারেজ ,এগুলো কোম্পানিতে প্যাকিং এর সময় এই মেথড ব্যবহার করা হয় ।

এরপর আসে রবার্ট কোচ এর তত্ত্ব এবং এর কিছুদিন পর পর ই মানুষ বুঝতে পারে যে , ”জীবাণুরা রোগ তৈরী করতে পারে ”। অর্থাৎ এই অণুজীববিজ্ঞানের ইতিহাসে এইদুইজন বিজ্ঞানীর ভূমিকা অপরিসীম । এই মাইক্রোবায়োলজি বর্তমান সময়ের একটি চমকপ্রদ সাবজেক্ট এবং এর চাকুরী ক্ষেত্র অনেক বিশদ ।মাইক্রোবায়োলজি নিয়ে যারা ডিগ্রী লাভ করে তাদের মাইক্রোবায়োলোজিস্ট বলা হয়। আর এই মাইক্রোবায়োলোজিস্টদের এইসব ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জীবাণু যা খাল চোখে দেখা যায় না তাদের নিয়ে সুস্পষ্ট ধারণা থাকতে হয় । এই সেক্টরে গবেষণার খাত অনেক বড়। বাংলাদেশেও দিনে দিনে এর বড় খাত তৈরী হচ্ছে।

সোর্স,cliffsnotes.com

পিকচার সোর্স,bsnscb.com