আমার উনি

Now Reading
আমার উনি

“এই যে ম্যাডাম, শুনছেন?”
“জ্বি বলুন।”
“কী বলবো?”
“আপনি কী বলবেন তা আমি কী জানি?”
“আমি কি আপনাকে বলেছি যে কিছু বলবো?”
“তো ডাকলেন যে?”
“ডাকলাম কোথায়? আমিতো কেবল জিজ্ঞেস করেছি আপনি শুনছেন কিনা।”
“আমি শুনছি কিনা তা জেনে আপনার কী হবে?”
“আসলে আপনার কান ঠিক আছে কিনা তা পরীক্ষা করতেই জিজ্ঞেস করেছি শুনছেন কিনা।”
“অদ্ভুত! আমার কান ঠিক থাকলেই আপনি কী করবেন?”
“এটা একটা প্রশ্ন বটে। আসলেইতো কী করবো আমি?”
“আপনিই বলুন না কী করবেন।”
“যাক বাবা, ভুলে গেছি। মনে হলে অন্যদিন বলবো। আজ চলি।”
“হা হা হা! অদ্ভুত আপনি। ভীতুর ঢেঁকি। আচ্ছা, যান তাহলে আজ। আমিও চলি।”

কোনমতে চলে এসেছিলাম সেদিন। আসলে আমি গিয়েছিলাম ওকে প্রপোজ করতে। ‘ওকে’ করে কেন বলছি? আমি কি তার নাম জানি না? সারাদিনইতো তার নাম আওড়াতাম। এখন ‘ওকে’ করে কেন বলছি? উফ! তার নাম ভুলে গেছি আমি! এমন কেন হলো? তার নামইতো আমার বেশি মনে থাকার কথা অথচ তার নামই এখন ভুলে গেলাম? নাহ, ব্যাপারটা মানা যায় না। অবশ্য না মানা গেলেও করার কিছু নেই। যেই গুরু, সেই কাউ।

ওকে ডাক দেওয়ার সাথে সাথে যখনি ঘুরে দাঁড়িয়ে আমার দিকে হা করে তাকিয়েছিল আমার মনে হয়েছে আমি আর আমি নেই। আমি কোনো এলিয়েন হয়ে গেছি। আমার হৃদপিন্ডটা কোনো এক বিশেষ পদার্থে তৈরি যার ভর এক মণেরও বেশি। ধড়াম ধড়াম শব্দে এটি স্পন্দিত হচ্ছে যার শব্দ আমার কান ছাপিয়ে তার কানেও মনে হয় চলে যাচ্ছে। আমার মস্তিষ্কের বিশেষ অংশে ইলেক্ট্রিসিটি সাপ্লাই বন্ধ হয়ে গেছে। স্মৃতি শক্তি হারিয়ে ফেলেছি। তাকে প্রপোজ করার কথা ভুলে গেছি। আমার দেহের ভেতর কোথাও শর্ট-সার্কিট হয়েছে, যার দরুণ আমার দেহের বাইরে ঘাম নামক বিন্দু বিন্দু পানির কণা জমছিল। শুনেছি ঘাম নামক এই পানির কণার স্বাদ নাকি নোনতা। কখনো চেখে দেখা হয়নি। সেই সময় একটু চেখে দেখা যেত। অবশ্য সেই সময় আমার জিহবাটা কাজ করতো কিনা সন্দেহ ছিল। শর্ট সার্কিটের কারণে জিহবার ইলেক্ট্রিসিটির লাইনটাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কিনা কে জানে। শরীরটাও বেশ দুর্বল লাগছিল। মনে হচ্ছিল দেহের পাওয়ার প্লান্টে গোলমাল হয়েছে। যেকোন সময় বিস্ফোরিত হয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে যেতে পারি। অবশ্য মনে মনে তাই চাইছিলাম যেন বিস্ফোরিত হলেও অন্তত তার চোখের সেই দৃষ্টির বাইরে যেতে পারি। তবে ভাগ্য ভালো দেহের অক্সিলিয়ারি পাওয়ার সিস্টেম দ্রুত চালু হয়ে কোনোভাবে আমাকে সেই অবস্থা থেকে বাঁচিয়েছিল।

তবে একটা প্রশ্নের ঠিকঠাক উত্তর এখনো আমি পাচ্ছি না। সে আমাকে ভীতু কেন বলেছিল? কয়েকদিন আগে কুকুরের দৌড়ানি খেয়ে তার সামনে দিয়েই পালিয়েছিলাম বলে? এতে ভীতু ভাবারতো কোনো কারণ নেই। তাকে কুকুর দৌড়ানি দিলে সে কি চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতো? তাহলে কেন ভীতু বললো? আচ্ছা এমন কি হতে পারে যে তাকে প্রপোজ করতে গিয়েছিলাম এটা সে বুঝতে পেরেছে? যদি বুঝতেই পেরে থাকে তাহলেতো এটাও বুঝে ফেলেছে যে আমি আর ভয়েই প্রপোজ করিনি পরে। ইশ! কী লজ্জা! এখন আমি ওর সামনে আবার যাবো কিভাবে? আমাকে আশেপাশে দেখলেই বা সে কী ভাববে? ছোটবেলায় একবার কুকুরের কামড় খাওয়ার পর থেকেই কুকুরকে আমি ভীষণভাবে এড়িয়ে চলি। দেখলেই ভয় করে। এখনতো মনে হচ্ছে তার কামড় না খেয়েও তাকে আমার এড়িয়ে চলতে হবে। হয়তো দেখলে ভয় পাবো না, কিন্তু যে লজ্জাটা পাবো তা কি যেকোনো প্রকার ভয়ের থেকে বেশি নয়? বুঝেছি আমার এ জীবনে তাকে আর প্রপোজও করা হবে না, পাওয়াও হবে না। আমার পিউর লাভের এভাবে সমাপ্তি খুবই বেদনাদায়ক। যাই, এবার একটু ঘুমুই। কাল থেকে তাকে এড়িয়ে চলার প্রস্তুতি নিয়ে চলতে হবে।

“এই যে মিস্টার, এতদিন কোথায় ছিলেন? আমার কান ঠিক থাকলে আপনি কী করবেন তা এখনো মনে হয়নি?”

যাক বাবা, ধরা খেয়ে গেলাম। এতো প্রস্তুতি নিয়ে এড়িয়ে চলেও কোনো লাভ হলো না। কিন্তু এখন আমি কি উত্তর দিব? আর আজ যদি কোনো উত্তর না দিই তাহলেতো ও আমাকে পেলেই এটা জিজ্ঞেস করবে আর আমি প্রতিনিয়ত লজ্জার চুকা কামড়ে লাল হবো। উফ! দেরি হয়ে যাচ্ছে। এখনি কিছু একটা উত্তর দিতে হবে। খোদা, আজ একটু সহায় হও। আজ যেন আর এলিয়েন না হই, পাওয়ার সাপ্লাইয়েও যেন আর গন্ডগোল না হয়।

“ইয়ে মানে……ইয়ে মানে আরকি ইয়ে…”
“কিসব ইয়ে ইয়ে করছেন? আমি ইয়ো ইয়ো সং শুনতে আসিনি। কান ঠিক থাকলে কী করবেন সেইটাই বলুন।”
“আসলে হয়েছে কি আপনার কানটা অনেক সুন্দর। ওটা ঠিক আছে কিনা তাই জানতে ইচ্ছা হয়েছিল।”
“কান সুন্দরের সাথে ঠিক আছের কী সম্পর্ক?”
“যেমন ধরুন অভিনেত্রী সারিকা, ওর চেহারাটা কত সুন্দর অথচ কন্ঠটা কেমন ঘেড়ঘেড়ে। তাই ভেবেছিলাম আপনার এতো সুন্দর কানেও কোনো ঘেড়ঘেড়ে সমস্যা আছে কিনা।”
“কানে আবার কীরকম ঘেড়ঘেড়ে সমস্যা থাকে?”
“ইয়ে মানে হতে পারে না যে আমি খুব সুন্দর কন্ঠে কথা বললাম অথচ আপনি সেটা ঘেড়ঘেড়ে কন্ঠে শুনলেন কিংবা একেবারেই শুনলেনও না, আই মিন বয়রা, হতে পারেন না?”
“কী!!! আপনি আমাকে বয়রা বললেন? আপনার বাড়িতে আজ বিচার দিব।”
“না না, আপনাকে আমি বয়রা বলিনি। আপনি বয়রা হলে কি আমাকে আজ এভাবে উন্মুক্ত জেলখানায় বন্দী হয়ে জেরায় পড়তে হতো?”
“ওতসব আমি বুঝি না। এক হয় এবার আসল সত্যটা বলুন, নাহয় আমি আপনার বাড়িতে গিয়ে বিচার দিব যে আপনি রাস্তায় দাঁড়িয়ে মেয়েদের সুন্দর কান খুঁজেন। খুঁজে পেলে সেটা ঠিক আছে কিনা জানার জন্য রাস্তার মাঝেই ডাকও দেন।”

ফাইস্যা গেছি, পুরা মাইনকা চিপায় ফাইস্যা গেছি। খোদা, আমার বুদ্ধিটা একটু খোলে দাও। সত্য না বলে এবার উপায় নাই। পালিয়ে পালিয়ে বেড়ানোর চেয়ে সত্য বলে দেওয়াই ভালো হবে। আর এমন সুযোগ দ্বিতীয়বার আসবেও না। এইতো আমার বুদ্ধি খুলতে শুরু করেছে। এবার তাহলে আরেকটু ভাবি। সেদিন যেভাবে আমাকে ভীতু বলেছে তার মানে ও জানে আমি তাকে প্রপোজ করতে চাচ্ছি। আর জানার পরেও ও যেহেতু আজ নিজেই আমাকে ডেকেছে তার মানে ও চায় আমি তাকে প্রপোজ করি। আর ও যেহেতু চায় আমি তাকে প্রপোজ করি এর অর্থ বেশিরভাগ সম্ভব ও রাজী। মেয়েদের বুক ফাটেতো মুখ ফাটে না স্বভাবের কারণেই হয়তো ও সরাসরি কিছু বলতে পারছে না, আমাকে দিয়েই বলাতে চাচ্ছে। সুতরাং সমস্যা সব ডিশমিশ। এবার প্রপোজটা করেই ফেলি। তবে একটু ভিন্নভাবে করলে কেমন হয়? উইল ইউ মেরি মি কিংবা তোমাকে পছন্দ করি ভালোবাসি কমন হয়ে গেছে, কেমন ক্ষ্যাত ক্ষ্যাত লাগে! একটু ভিন্নভাবে এপ্রুচটা নিই। কান নিয়েই যেহেতু কথা হচ্ছে তাই কান দিয়েই প্রপোজ করি।

“এই যে মিস্টার…, এতো কী ভাবছেন? সত্য বলতে ভয় হচ্ছে? আজ কোনো ভয় টয় মানবো না। এক হয় সত্য বলবেন নাহয় বাড়িতে বিচার যাবে, হু, বলে রাখলাম।”
“আচ্ছা বলছি।”
“হু, বলেন।”
“আপনার ওই সুন্দর কান দুটোকে, মধ্যরাতে, ফিসফিসিয়ে কথা শোনাতে চাই, এবং তা বাকিটা জীবনের প্রতিটা দিনের জন্য। দিবে আপনার কানটা ওই অধিকারটুকু?”
“কানকেই জিজ্ঞাসা করুন।”
“কানতো বলতে পারে না, কেবল শুনতে পায়।”
“তবে কান কথা শুনে সে কথা যাকে পৌঁছে দেয় তাকে জিজ্ঞাসা করুন।”
“কানতো কথাটুকু শুনে নিজের কাছে রেখে দেয়নি। যাকে পৌঁছে দেওয়ার তাকে ঠিকই দিয়েছে। তবে সে কেন উত্তর দিচ্ছে না?”
“তাকে সরাসরি একবার জিজ্ঞেস করেই দেখুন না উত্তর দেয় কিনা।”
“আচ্ছা মেয়েতো বাবা!”
“হুম, আমি আচ্ছা মেয়েই। এখনো সময় আছে ভেবে দেখার। সময় থাকতে সাবধান।”
“যা ভাবার অনেক আগেই ভাবা হয়ে গেছে। এখন আর নতুন করে কোনো ভাবাভাবি হবে না। আচ্ছা, বলছি।”
“হুম, বলুন।”
“বাকীটা জীবনের প্রতিটা মধ্যরাতে আপনার কানে ফিসফিসিয়ে কথা বলার অধিকারটুকু দিবেন আমায়?”
“উফ! কী ক্ষ্যাত! আপনি করে বলে! আপনি করে বললে দিবো না।”
“ওরে বাবা! এ কার পাল্লায় পড়লাম! আচ্ছা তুমি করে বলছি।”
“কার পাল্লায় পড়েছেন পড়ে বুঝাবো। এবার বলুন।”

একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলতে শুরু করলাম, “বাকীটা জীবনের প্রতিটা রজনীর মধ্যাংশে তোমার কানে ফিসফিসিয়ে লজ্জা নম্রত কন্ঠে কথা বলার অধিকারটুকু দেবে আমায়?”

এরপর ওর উত্তর কী হয়েছিল তা বোধ করি না বললেও চলবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো সেই যে ওর নাম ভুলেছি আর মনে পড়েনি। ওকে যে জিজ্ঞেস করবো সে উপায়ও নেই! জিজ্ঞেস করলেই নিশ্চিত বারোটা বাজাবে। সম্পর্ক হতে না হতেই তা হুমকীর মুখে পড়বে। আবার আমি চাইলেই অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করে ওর নামটা জেনে নিতে পারি। ও হয়তো জানবে না ওর নাম ভুলে যাওয়ার ব্যাপারটা, কিন্তু আমি মনে করি আমার ভেতর ওর যে সত্তাটুকু আছে তাকে অপমান করা হবে। আমি ওর নাম ভুলে গিয়ে অন্য কাউকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিয়েছি তা কেমন করে হয়? ওয়েট! ওয়েট!! আমার ফোনেইতো ওর নাম আছে। ওর নামে কয়েকটা কবিতা লিখেছি, সেগুলো ওপেন করলেইতো কবিতার মাঝে ওর নাম পাবো। কিন্তু না, আমি এটাও করবো না। আমি জানি ওর নামটা আমার মনের কোথাও না কোথাও আছে। হয়তো আমার সাথে লুকোচুরি খেলছে। তবে ধরা এক সময় ঠিকই পড়বে। কিন্তু ততদিন? ততদিন ওকে মনে মনে কী নামে ডাকবো? “ও” কেমন হয়? আই মিন “আমার ও”। না না, এটার চেয়েও আরেকটা আদুরে নাম দেওয়া যায়। “উনি”। রুনি, মুনি, ভুনি কত নামইতো হয়। আমি নাহয় আপাতত মনে মনে ওকে “উনি” বলেই ডাকলাম।

ফেসবুকে লেখক: Rihanoor Protik

তারা ফিরেও তাকায় না … (পর্ব ১)

Now Reading
তারা ফিরেও তাকায় না … (পর্ব ১)

পৃথিবীতে এমন কিছু মানুষ আছে যারা সময়ে সময়ে বদলে যেতে পারে খুব অনায়াসেই। তাদের বদলে যাওয়াটা অনেক সময় এতটাই রেডিক্যাল হয় যে কোন ধরনের শব্দ দিয়ে বা ভাষা দিয়ে প্রকাশ করা যায় না। তারা কখনও স্বীকার করে না তাদের এই বদলে যাওয়ার অভ্যাসটা নিয়ে কিন্তু অনেক সময় খুব সহজেই দৃষ্টিগোচরে পড়ে যায় অন্যদের। তবুও জীবন কিভাবে জানি চলতে থাকে আর সেই চলার মাঝে সেসব বদলে যাওয়া চেহারাগুলো বার বার ভেসে উঠে স্মৃতির পাতায়।

আমার এই সিরিজটি শুরু করার আগেই বলে নেই, আমি যা লিখছি সবই কিছু সত্য ঘটনার অনুসরনে। বিশেষ অনুরোধে আমার পরিচয় এই সাইটে গোপন করে রাখা হয়েছে। আশা করি ব্যাপারটা খুব সিরিয়াসলি নিবেন না। আর হ্যাঁ, ফুটপ্রিন্টের মডারেটরদের কাছে আমার আরো একটি অনুরোধ, আমার প্রতিটি লেখা যেন ডি-মনিটাইজ করে দেয়া হয় অর্থাৎ, আমি কোন ধরনের পেমেন্ট চাই না, এমনকি আপনারা দিতে চাইলেও না। দয়া করে অনুরোধটি রাখবেন। এখন শুরু করি। এই গল্পের প্রতিটি নাম ছদ্মনাম থাকবে। 

বলছিলাম বদলে যাওয়া মানুষগুলোর কথা। অনেক অনেক বছর আগে আমি খুব ব্যস্ত, জীবন যুদ্ধের সৈনিক টাইপের মানুষ ছিলাম। আমার জীবনের প্রতিটি দিন ছিল এক একটি যুদ্ধ ক্ষেত্র। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠলেই মনে হত ‘শুরু হচ্ছে আরেকটি কঠিন পরীক্ষার’। আসলে সময়টাই এমন ছিল বিদেশ বিভুইয়ে কোন আপনজন ছাড়াই বড় হচ্ছিলাম আর যুদ্ধ করছিলাম দিনগুলোর সাথে। কখনও এটা-কখনও সেটা। জীবনের চাহিদার অভাব ছিল না। ছিল এক সাগর পরিমান অভাব। সাথে ছিল হাজারো পাওয়া-না পাওয়ার দুঃখ। আশেপাশে সার্থপর মানুষের অভাব ছিল না। সময়ের প্রয়োজনে কত মানুষ আসল গেল, কেউ বন্ধর ছদ্মবেশে, কেউ বা ওয়েল-উইশারের বেশে আবার কেই বা ভালবাসার নেম বেচে। সবারই থাকত কোন না কোন এজেন্ডা।

আমি বড় অদ্ভুত মানুষ ছিলাম। সবকিছুতে নিজেকে বলিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতাম। আসলে বোকা মানুষ ছিলাম বৈকি। সবাইকে নিয়ে থাকা, সবাইকে সুখী করা বা সবার জন্য করা – এগুলো আমার কাছে মনে হতো সাধারন ব্যাপার। একা আমি কোনদিন হ্যাপি হতে পারতাম না। শান্তি পেতাম না। আশেপাশের সবাইকে নিয়ে হ্যাপি হতে পারলে ভাল মনে হত। যদিও এখন অনেক বদলে গেছি সময় এবং মানুষের কারনে। কিন্তু আগের কিছু জিনিষ এখনও রয়ে গেছে।

জীবনের পতন-উত্থানে এক সময় পরিচয় হলো একটি মেয়ের সাথে। প্রথম দেখায় বেশ ভাল লেগে গেল। জীবনে তো প্রেম অনেকবারই এসেছে কিন্তু এত সিরিয়াস মুডে কোনদিন আসেনি। তখন আমার সব জীবন যুদ্ধ প্রায় শেষ। মোটামুটি নিজেকে গুছিয়ে ফেলেছিলাম। সভ্য সমাজে যাকে বলে Established। কিন্তু একাকী জীবনে অভ্যস্ত আমি কোনকিছু হঠাত করে হজম করতে পারি না। কিন্তু প্রথম দেখায় ভাল লেগে যাওয়া বলে কথা। শুরু হলো কথা বলা, আরো ভাল লাগা। এবং প্রেম ভালবাসা। বেশ সিরিয়াস ভাবেই। অন্তত আমার পক্ষ থেকে। সেই মেয়েটি মিষ্টি ছিল দেখতে খুব। কথাবার্তাও। শিক্ষিত। মধ্যবিত্ত পরিবার, শিক্ষিত পরিবার। যদিও কারো ফ্যামিলি স্ট্যাটাসে আমার কিছু যায় আসে না। এসব ব্যাপার আমার কাছে কোন গুরুত্ব বহন করে না। মেয়েটিকে ভাল লেগেছে এটাই যথেষ্ট। মেয়েটি ছিল পৃথিবীর আরেক শহরের। আমি ছিলার অন্য শহরের। কিন্তু ভাললাগার মাত্রা বেশী ছিল। সম্পর্কের ৬ মাস পার হবার পর টানা ১ সপ্তাহ চিন্তা করলাম, ওর জন্য ঠিকানা বদলাবো কিনা। চলে যাব নাকি তার শহরে। নতুন কোন ভেঞ্চারে মনযোগ দিব হয়তো। এর ঠিক ১ মাসের মধ্যে সেই শহরে নতুন অফিস, বাসা নিয়ে চলে আসলাম তার শহরে। শুধু মাত্র তার জন্যই। কারন আমার মনে হয়েছি সে এটি ডিজার্ভ করে। সম্পর্কটিকে আমি খুব গুরুত্বের সাথেই দেখছিলাম। সারাজীবন তার সাথেই কাটিয়ে দেয়ার চিন্তা ভাবনা।

যাই হোক, সময় জিনিষটা খুব তাড়াতাড়ি বয়ে চলে। এর মাঝে চলে গেল ১টি বছর। মেয়েটি ভাল ছিল তবে একটু কেমন জানি নিজেকে নিয়ে থাকত। নিজের ভেতরে থাকত। বয়সে আমার ছোট । হয়তো এখনও ছোটবেলার ভাব কাটেনি মনে করতাম। অনেক সময় অনেক কথা বলত যেগুলো খুব সার্থপর শোনাত কিন্তু আমি ওভারলুক করে চলে যেতাম। ভাবতাম, হয়তো আমাকে আপন ভেবেই কথাগুলো বলছে। আরো দিন যায়, সম্পর্ক নানা দিকে মোড় নেই। বয়সও দুইজনেরই বাড়ে প্রতিদিন, প্রতিমাসে। একসময় বিয়ের কথা উঠল। কিন্তু বিয়ের কথায় মেয়েটি কেন যেন এড়িয়ে গেল। ভাবলাম, হয়তো পরে। সেও বললে পরে। এরকম করে চলে গেল আরো সময়। এর মাঝে মেয়েটির সমস্ত দায়িত্ব বা অনেক দায়িত্ব নিজের হাতে নিলাম। আপন মানুষ বলে কথা। তাই তাকে দিয়ে গেলাম সব ধরনের সাপোর্ট – এডুকেশন, মোরাল সাপোর্ট, ফিনান্সিয়াল সাপোর্ট বা যেকোন কিছু। আমি মানুষটা একটু এমন টাইপের। একবার যাদের কাছের মানুষ মনে করি, তাদের জন্য নিজের সামর্থের বাইরে গিয়েও করতে সমস্যা নেই। একারনে অনেকেই আমাকে অনেকেই বোকা বলে। যাই হোক, বছর ঘুরে বিয়ের কথা অনেকবার আসল, কিন্তু মেয়েটি বিয়ের ব্যাপারটা এড়িয়ে যায় সবসময়। একথা-সেকথা বলে উড়িয়ে দেয়। কোন ধরনের অসম্মতি কোন পরিবার থেকেই ছিল না। ২ পরিবারের জানাজানি অনেক আগেই হয়ে গিয়েছিল এবং সবাই খুব পজিটিভলি ব্যাপারটা নিয়েছিল। এর মাঝে মেয়েটির জন্য অনেক এফোর্ট দেয়া হলো। কাছের মানুষ বলে কথা – সবভাবেই। মাথায় ছিল, একদিন তো আমারই পরিবার হবে তো সমস্যা কি?

ইতিমধ্যে বিয়ের কথা অন্তত হাজারবার উঠল কিন্তু প্রতিবারই নানা ধরনের অজুহাত। সেই অজুহাত ধীরে ধীরে জিদে রুপান্তরিত হলো। অদ্ভুদ সেই জিদ আর সেই জিদের অজুহাত। কখনও বলত, আমি জীবনে এস্টাব্লিশ না হয়ে বিয়ে করব না। কিন্তু সে কথা বলছে বছরের পর বছর। কিন্তু সেই এস্টাব্লিশমেন্ট আসলে কি এটা কোনদিন সে বলতে পারত না। তার ক্যারিয়ার বা ফাইনান্স বা পরিবার – সবকিছুতেই আমার সাপোর্ট ছিল। কিন্তু সেটি হয়তো যথেষ্ট ছিল না। কখনও আবার অজুহাত, তার শহরের বাইরের কাউকে সে বিয়ে করবে না – এরকম নানা ধরনের অদ্ভুত অজুহাত। কখনও অস্বীকার করে বসত সবকিছু। আবার কোন দরকার হলে সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ দিত। আমি খুব দ্বিধার মাঝে পড়ে যাই। এত বছর পর আসলে এগুলো কি দেখছি। এর মাঝে কিন্তু ৬-৭ বছর কেটে গেছে। এডাল্ট হবার বয়সও পেরিয়ে যাচ্ছে একদিক দিয়ে। কিন্তু অজুহাত কমে না। এমনকি তার বিয়ে না করার জিদ ধরে রাখতে সে যেকোন ধরনের লেভেলে যেতে রাজী ছিল। ধীরে ধীরে আমি বুঝতে পারলাম, আমি হয়তো ভুল মানুষের সাথে আছি। আমি অনেক বেশী বুঝে শুনে চলি। যেকোন কাজ করার আগে হাজারবার চিন্তা করি এরপর পা বাড়াই। হঠাত করে সবকিছু আনফেয়ার মনে হওয়া শুরু করল। তবে কি সবকিছু একটা অভিনয় ছিল? আমি তবে একটা ফাঁদে ছিলাম? এদিকে এই এক বিয়ের কারনে হাজারো সামাজিক ঝামেলায় পড়ছিলাম। নিজের পরিবারকে এত বছর নানা অজুহাত দেখিয়ে চলছিলাম। সেই অজুহাতের লিস্টও শেষ হয়ে গেছে এর মাঝে। কিন্তু অবস্থার কোন পরিবর্তন হয় না। কিন্তু প্রয়োজনে বা দরকারে তার পাশে আমি ছাড়া কেউ থাকে না। যদিও তার কথায় মাঝে মাঝে সে বলে এমন হাজারো মানুষের কথা কিন্তু তাও আমি তার পাশে ছিলাম তাকে সাপোর্ট দিয়ে চলতে, কারন আমি জানতাম আমি ছাড়া আর কেউ কোনদিন তার পাশে দাঁড়াবে না। সম্ভবত এটা সে নিজেও জানত। কিন্তু রাত গভীর হলে আমার মাথায় ভাবনা চলত – এ কেমন সম্পর্ক যেখানে সম্পর্কের মুল ভিত্তিগুলোই নড়বড়ে?

ধীরে ধীরে আরো অনেক কিছুই গায়ে খোটা দিতে লাগল। আরো বেশী ভাবিয়ে তুলতে লাগল সবকিছু। কমিটমেন্টের কথায় বার বার কেন সে পিছলে যাচ্ছে? এর মাঝে হাজারখানেক বার মুখের উপরে না করে দিল । প্রতিবারই ব্যাপারগুলো আমার মনের খুব ভেতরে গিয়ে আঘাত করল। কিন্তু আমি জন্ম থেকেই পোকার ফেইস – অর্থাৎ আমার এক্সপ্রেশন থাকেনা কোন। তাই কেউ কোনদিন বুঝতে পারে না আমি আসলে কেমন বোধ করছি। এর মাঝে আরো অনেক ঘটনা ঘটল। যেমন, অনেক অপমানিত হয়ে আমি সেই শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিলাম। পরে আবারো সেই শহরে ফিরে যাই তার অনুরোধেই, পরে আবারো সেই শহর ছেড়ে দেই অপমানে। নিজেকে খুব সস্তা মনে হচ্ছিল। কিন্তু আমি তো গুরুত্ব দিয়েই সম্পর্ক করেছিলাম। চাইলে তো অন্যভাবেও দেখতে পারতাম আজকাল যেটা স্টাইল, কিন্তু আমার ডিগনিটি আমাকে ঐ পথে চলতে দেয় না। নাহলে সম্পর্কের দাম কজনে দেয়। একসময় সম্পর্ক লং ডিস্ট্যান্স হয়ে গেল। মাঝে মাঝে গিয়ে দেখা করে আসতাম। তবে ভেতরে একটা চাপা কষ্টে থাকতাম। সবাইকে সার্থপর মনে হত আমার। কিন্তু তাও তার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলাম যেকোন কিছু তে কারন আমি জানতাম, আমি ছাড়া আর কেউ থাকবে না তার পাশে বিশেষ করে খারাপ সময়ে। বিয়ের কথাও হাজারো বার আসল। কিন্তু বার বারই পিছলে গেল সে। কঠিন এক দন্দে পড়ে গেলাম – সেকি আসলেই আমার সাথে সত্যিকারের সম্পর্ক করেছিল নাকি সবকিছুই একটা সাজানো নাটক ছিল? কিছু ঘটনা, কিছু কথা যেগুলো আমাকে আরো ভাবিয়ে তুলল। সবকিছু এবার অন্যদিকে গড়াতে শুরু করল। (চলবে)