এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (শেষ পর্ব)

Now Reading
এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (শেষ পর্ব)

আজ প্রথমেই কিছু কথা বলে নিই। অনলাইনে একটা রোমান্টিক ঘটনা বা গল্পের প্রতি মানুষের এত আবেগ, চাহিদা, অনুরোধ, ভালোবাসা- এর আগে কখনোই দেখিনি যা এই ঘটনার ক্ষেত্রে দেখেছি। এটা আমার জীবনের বাস্তব ঘটনা নাকি আসলেই কি , তা আমি রহস্য হিসেবেই রেখে দিতে চাই। শেষটা পাঠকদের মাঝে কিছু একটা জানার প্রবল আগ্রহ আর হাহাকার রেখে শেষ করে দিচ্ছি বলে কিছু মনে করবেন না, শেষটা নিজেদের মতো করে মিলিয়ে নিবেন একটা নিছক গল্প ভেবে। শুধু এতটুকুই বলবো, ঘটনা আজ যেখানে শেষ হয়ে যাচ্ছে, এর পর যেকোন কিছু লেখা বা বলাটা শুধু শুধু বাড়িয়ে বলা হবে।

আজ এতগুলো দিন যারা এক একটা পর্বের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন, তাদের সবার প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা রইলো। আপনারা কমেন্টে কিংবা আমার ফেসবুক ইনবক্সে ব্যক্তিগতভাবে অনুপ্রেরণা যুগিয়েছেন, ভালো কিছু মন্তব্য করেছেন – বলেই আজ শেষ পর্ব পর্যন্ত আসতে পেরেছি। আপনাদের সকলের প্রতি আমার সালাম; পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকুন, ভালোবাসুন নিজের দেশ, মানুষ, ভাষা ও ঐতিহ্যকে। ভালোবাসা অবিরাম…………

 

সপ্তম পর্বের পর থেকে……………

 

খাট কেনার কথা শুনে ইসাবেলার ভ্রু কুচঁকে গিয়েছে। সে আমাকে আবার জিজ্ঞেস করলো, কি হলো, নতুন এই খাট দিয়ে কি হবে? ওকে এক সাইডে ডেকে নিয়ে বললাম, এই খাট আমার জন্য, মানে যতদিন তুমি থাকবে। ইসাবেলা তো সেই রেগে-মেগে অস্থির। আমি ওকে শান্ত করে বললাম, শোনো, একটা পুরুষ আর একটা মেয়ে পাশাপাশি থাকা মানে কি জানো? আগুনের পাশে মোম রাখা। আর আগুনের পাশে মোম রাখলে গলে যাবে এটাই স্বাভাবিক, তো তোমার মতো এতটা আকর্ষণীয় একটা মেয়ের পাশে আমি যদি রাতে ঘুমায়, নিজেকে কন্ট্রোল করাটা খুব বেশী কঠিন, ব্রাসেলস-এ থাকতে বুঝেছি। শয়তান ইবলিস এসে আমার মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভর করে, আর আমি চাইনা শয়তান কোনো সুযোগ পাক। তুমি একটু বোঝার চেষ্টা করো।

ইসাবেলা শান্ত ভদ্র বুঝমান মেয়ে, আমার কথা সহজেই বুঝে নিল, বললো, আমি চাইনা আমার কারণে তোমার কোনো ক্ষতি হোক। ব্যস, একটা খাট কিনে নিলাম, কোম্পানি গাড়িতে করে দিয়ে গেল। পরদিন একসাথে ভার্সিটি গেলাম, বন্ধুদের সাথে ইসাবেলাকে পরিচয় করিয়ে দিলাম। বন্ধুরা তো খুব দুষ্টু। একজন তো বলেই ফেললো “মামা, সেই একটা মাল পটিয়েছিস!” বললাম, এইসব মাল টাইপের শব্দ উচ্চারণ করবিনা তো, তোর বোন থাকলে তাকে কেউ মাল ডাকলে কি তোর ভালো লাগবে বল? যাইহোক জানি বন্ধু একটু মজা করেছে, আকর্ষণীয় ফিগার এর কোনো মেয়েকে দেখলেই আজকাল একটা জেনারেশান তাদেরকে মাল বলে সম্বোধন করে, এটা খুবই খারাপ মনে হয় আমার কাছে।

আমার ক্লাস টাইমে ইসাবেলা ক্যান্টিনে বসে রাগবি খেলা দেখছিল। আমার ক্লাস শেষ হলে আমি আর ও একসাথে ভার্সিটি ক্যান্টিনে খেয়ে নিলাম। খেয়ে বাসায় এসে কাপড় ওয়াশিং মেশিনে দিয়ে আমি ঘুম, বিকেলে আরেকটা ক্লাস আছে। আর ইসাবেলা গিয়েছে কাজ খুজঁতে। ও আমার সাথেই থাকবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ও কাজ পেয়ে গেল একটা শপিং-এ। আর আমি এদিকে ভার্সিটি, ক্লাস, পরীক্ষা – এইসব নিয়ে ব্যস্ত। রাতে দুজন একসাথে ডিনার করি বাসায়, মুভি দেখি। ও অংকে ভালো হওয়াতে আমার জন্য খুব সুবিধা হলো। তাছাড়া ব্রিটিশ একসেন্ট শুনতে শুনতে আমি দিনে দিনে সেটাতেও পারদর্শী হয়ে উঠছিলাম।

আল্লাহর রহমতে সব গুলো টেষ্ট পাস করি, ফলে ফাইনাল এক্সামে যাওয়ার কোনো প্রয়োজন পড়েনা, ইসাবেলাও খুব খুশি, আমাকে বলে, এইবার তো তাহলে নেদারল্যান্ড ইমিগ্রেশনও ফেরদৌসকে আটকাতে পারবেনা। একটা কথা বলে রাখা ভালো, নেদারল্যান্ড-এ উচ্চশিক্ষায় প্রথম দুই বছর খুব বেশী ক্রিটিক্যাল, একবার দুই বছরে মিনিমাম ৬০ ক্রেডিটের ঝামেলা পার করে ফেলতে পারলে বাকি সময়টা অনেক ইজি হয়ে যায়, যদিও অনেকের অনেক বিষয় যা পাস করতে পারেনি, পরে পাস না করতে পারলে ভার্সিটি সেই স্টুডেন্টকে বের করে দেয় আর নতুন ভার্সিটিতে ভর্তি না হতে পারলে মহাবিপদ।

সেমিষ্টারে ভালো রেজাল্ট করাতে মশিউর ভাই আমাকে তথা আমাদেরকে দাওয়াত দিয়েছেন। ডিসেম্বর মাস, কনকনে ঠান্ডা বাইরে। মাইনাস ৫ কিংবা ৭; তুষারপাত এই সময়ে নরমাল। আমস্টারডামের সব লেক বরফে জমে গিয়েছে। স্কেটিং করে সবাই। দেখতে দারুণ লাগে।

ভাই এর বাসায় ঢুকেই বিরিয়ানির ঘ্রাণে তো আমার মাথা নষ্ট। আর ইসাবেলা তো ঘ্রাণ শুকেই পেট ভরিয়ে ফেলবে এমন অবস্থা। ধুমসে খাওয়া শুরু করে দিলাম, সেই স্বাদ, যেন বহুকাল বিরিয়ানি খাইনি। কিন্তু ইসাবেলার তো অবস্থা কেরোসিন, মশিউর ভাই এর খেয়াল ছিলোনা যে আমাদের সাথে একজন নন-দেশী খাবে, ভাই তাই ঝাল দিয়ে রান্না করেছে, আর ইউরোপিয়ানরা ঝালকে খুব ভয় পায়, বরফ পানির সাথে বিরিয়ানি খেতে হলো ওকে। আর খাওয়া শেষে আইস মুখে নিয়ে প্রায় ২০ মিনিট বসে ছিল, সেদিন আমার ওদিকে তাকানোর সময় ছিলো না। আমি বিরিয়ানিতে মজে গিয়েছিলাম, শেষে পেটে একবিন্দু ফাঁকা জায়গা না নিয়েই বাসায় এসেছিলাম, অতিরিক্ত খাওয়ার মজা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। ইসাবেলা তো বলেই বসলো, আমার ঝাল খেয়ে কষ্টের সময় তোমাকে খুঁজে পাওয়া যায়নি, এখন বোঝো কেমন মজা?

পরদিন আমি বন্ধুর বাসায় গিয়েছিলাম, ভুলে মোবাইল রেখে এসেছিলাম, ইসাবেলা ছিল বাসাতে। আম্মু ওদিকে কল দিয়েছিল। আম্মুর সাথে কথা বলে ও জানতে পারে সেই গিফট এর কথা। বাসায় এসে দেখি সবকিছু এলোমেলো মানে ইসাবেলা রাগে কাপড় এলোমেলো করে রেখেছে। মেয়ের রাগ আছে বেশ, তেজী।  আমাকে জিজ্ঞেস করে, কোথায় সেই গিফট যেটা তোমার মা আমার জন্য পাঠিয়েছে? কি করেছো?

আমি ওকে সবকিছু বোঝানোর চেষ্টা করি, কিন্তু মেয়ে এইবার একদম বেঁকে বসেছে। ওর সামনে সেই গিফট প্যাক রাখলাম, বললাম, দেখো আজ পর্যন্ত ওপেন করিনি, তোমাকে বিশেষ কোনো দিনে উপহার দিবো বলে, কিন্তু তারপরেও তার অভিমান ভাঙ্গার নয়, রাতে ডিনার না করেই ঘুমিয়ে পড়েছে। একটু রাত হলে ( দেশে তখন সকাল ) আমি আম্মুকে কল দিয়ে সব ঘটনা বলি, আম্মু যদিও জানেনা ও আমার বাসাতেই থাকে, মাইন্ড করতে পারে না বুঝেই। আম্মু বলে ওর সাথে আমাকে আবার কথা বলিয়ে দিও, আমি বুঝিয়ে বলবো। পরদিন ব্রেকফাষ্ট আমার সাথে করেনি রাগ করে। বাসায় এলে ওকে বললাম আমার আম্মু তোমার সাথে কথা বলবে। আমার আম্মুর সাথে দেখলাম তার দারুণ ভাব হয়ে গিয়েছে অলরেডি। আম্মু দেশে যেতে বলেছে আমাদেরকে, যেহেতু আমার এক্সাম শেষ। আমি আসলে দেশে যেতে চাইছিলাম না একদম, ভাবছিলাম ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কাজ করে কিছু টাকা জমালে খারাপ হতোনা। তারপরেও কিছু কথা ভেবে দেশে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম, আর ইসাবেলাও খুব চাপাচাপি করছিল, বলছিল ক্রিসমাস আর নতুন বছরটা সে আমার পরিবারের সাথে বাংলাদেশে কাটাতে চায়।

কি আর করা, আম্মু-আব্বুর চাওয়া, ইসাবেলার আগ্রহে ক্রিসমাসের আগেই ইতিহাদ এয়ারলাইন্সে দুইটা টিকেট কেটে নিলাম বার্লিন টু ঢাকা। ভার্সিটিকে জানিয়ে দিলাম আমি ফেব্রুয়ারিতে ব্যাক করবো, ইসাবেলা হয়তো ফিরে আবার রটার্ডামে মশিউর ভাই এর KFC তে জয়েন করবে, কারণ ওখানে স্যালারি ভালো, পুরোনো কাজের স্থান তার।

ফ্লাইট ছিল ১৮ই ডিসেম্বর, ২১শে ডিসেম্বর আমার ছোট বোনের জন্মদিন। আমরা পনেরো তারিখে বার্লিন চলে গেলাম, ইসাবেলার জার্মান বান্ধবী লিনার বাসায় ছিলাম, তার সৌজন্যে পুরো বার্লিন ঘুরে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার। সবার জন্য কেনাকাটা করে নিলাম। ছোট বোনের জন্য একটা ল্যাপটপ জন্মদিনের গিফট।

আচ্ছা, একটা কথা বলে নিই, বার্লিন থেকে আসার মূল কারণ হলো বার্লিন-ঢাকা ফ্লাইটের ভাড়া কম, অনেক কম।

বার্লিনে হঠাৎ একটা ইন্ডিয়ান পার্লার খুঁজে পেয়েছিলাম সৌভাগ্যবশত। (মালিক কোলকাতার মহিলা – সুপ্রিয়া দেবী)। ফ্লাইট ছিলো বিকেলে, লিনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে লাগেজ নিয়ে ইসাবেলাকে সকালেই নিয়ে গেলাম সেই পার্লারে শাড়ি পড়াতে। সুপ্রিয়া তো খুব খুশী ব্রিটিশ কন্যাকে বাঙ্গালী সাজে সাজাতে পেরে। আম্মু টিপ, চুড়ি গায়ে জড়ানো চাদঁর, নূপুর- সব দিয়েছিল যা প্রয়োজন সাজার জন্য। আমি বাইরে বসা ছিলাম, ইসাবেলার সাজতে প্রায় দুই ঘন্টা লেগে গেল, ও যখন বাইরে এলো, মনে হচ্ছিলো এক অপরূপা সুন্দরী যেন তার রূপের সকল সৌন্দর্য নিয়ে আমার সামনে এসে বলছে, আমাকে শুধু তোমার করে নাও। শাড়ির ওপর একপাশে চাঁদর, টিপ, চুড়ি, পায়ে নূপুর। জানিনা কতক্ষণ ওর দিকে এক পলকে তাকিয়ে ছিলাম, ইসাবেলার ডাকে ঘোর ভাঙলো, বললো, চলো এবার, দেরী হয়ে যাবে নাহলে।

সুপ্রিয়াকে ধন্যবাদ আর বাংলাদেশ আসার নিমন্ত্রণ জানিয়ে চলে এলাম আমরা। ট্যাক্সিতে ওঠার পর খুব আবেগী কন্ঠে ইসাবেলা আমাকে আর আমার আম্মুকে ধন্যবাদ জানালো। ইসাবেলা অনেক খুশী যা তার চোখ দেখেই বুঝতে পারছিলাম। ভালোবাসার মানুষের চোখ দেখেই অনেক কিছু আন্দাজ করা যায়। ট্যাক্সি ড্রাইভার একজন অস্ট্রিয়ান, খুব আগ্রহ নিয়ে আমাদেরকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করলেন, শুভকামনা জানালেন যেন একসাথে থাকতে পারি সারাজীবন।

ট্যাক্সি থেকে Berlin Tegel Airport-এ নামার পর থেকে শুরু করে বিমানে ঢোকা পর্যন্ত এমনকি বিমানে ঢোকার পরেও বেশ ভালোবাসাময় বিড়ম্বনা পোহাতে হলো ইসাবেলাকে, সাউথ এশিয়ানরা তো আছেই, ইউরোপিয়ান, আমেরিকান সবাই এসে শুধু ইসাবেলার সাথে সেলফি তোলে আর আমাদের কথা জানতে চায়, সবাই মোটামুটি ভাবে যে আমি ইন্ডিয়ান আর ইসাবেলাকে নিয়ে ইন্ডিয়া যাচ্ছি, কিন্তু তাদের ভুল ভাঙ্গে আমাদের সাথে কথা বলার পরে। আমরা দারুণ উপভোগ করেছি। জার্মান ইমিগ্রেশন অফিসার যখন আমাদের সাথে সেলফি তুললেন, তখন আরেকবার দেখলাম, ভদ্র জাতির ভদ্রতা আর উদারতা। উনি বাংলাদেশ সম্পর্কে অনেক কিছুই জানেন। উনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে এলাম, এদিকে বিমান বালাও সেলফিতে আক্রান্ত, অনেক দেশী ভাই তাদের ফ্যামিলি নিয়ে দেশে যাচ্ছেন যারা জার্মিনিতেই স্থায়ী। তারাও এসে দেখা করে গেলেন, মনে হচ্ছিলো, আমরা বিশেষ করে ইসাবেলা সেলিব্রেটি হয়ে গিয়েছে এক জামদানী শাড়ি পরাতে কিংবা বাঙ্গালীয়ানা সাজে সাজার কারণে। নিজের দেশকে এভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়াতে এক অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করে।

বিমান আর কিছুক্ষণ পরেই আবু-ধাবির উদ্দেশ্যে রওনা দিবে, দুই ঘন্টা ট্রানজিট, তারপর আবু-ধাবি থেকে ঢাকা। বিমান ছাড়ার আগে আম্মুকে কল দিলাম, বললাম, আম্মু আমরা আসছি। ইসাবেলা ভাঙ্গা বাংলায় বললো, আম্মু তোমাকে অনেক ভালোবাসি।

বিমান আকাশে উড়লো।

ইসাবেলা আমার বুকে নিশ্চিত ভরসায় মাথা গুজে দিল। পরম মমতায় ওকে আগলে রাখলাম !!

( শেষ )

এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৭)

Now Reading
এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৭)

ষষ্ঠ পর্বের পর থেকে……

আমি আসলে ইসাবেলার কথা সম্পূর্ণভাবেই বুঝতে পেরেছিলাম, একটু না বোঝার ভান করেছিলাম এই জন্যই যে আমি তার মুখ থেকে শুনতে চেয়েছিলাম।  তার কথাটা ছিল মূলত এটাই যে, সে আমাকে বিয়ে করে ফেললে আমি এমনিতেই ইংল্যান্ড এর বাসিন্দা হয়ে যাবো। এই আর কি!

কিন্তু সত্যি কথা হলো, আমি এমনটা কখনওই চাইনা। পাস তো আছেই সাথে আমার যথেষ্ট যোগ্যতা আছে ৭৫% মার্ক্স তুলে স্কলারশিপ পাবার। কিন্তু স্টাডি যে খুব ইজি তা নয়। আমি যখন কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম, তখন দেখেছি শিক্ষকেরা জানেন না কিভাবে প্রোগ্রামিং করতে হয়। কারণ তারা জানবেন কিভাবে? তারা তো ছাত্র থাকাকালীন সময়ে রাজনীতি আর ভণ্ডামি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। শিক্ষকদের বাসায় ইলিশ মাছ নিয়ে পাস করে লবিং করে শিক্ষক হয়েছেন। আমাদের কি শেখাবেন? আমাদের নিজেদের দায়িত্বে পড়াশুনা করতে হতো। কিন্তু এখানে? বেশিরভাগ শিক্ষক PhD করা। তাদের জ্ঞানের পরিধি সুদূর বিস্তৃত। ক্লাস লেকচার ২ ঘন্টা যে কিভাবে কেটে যায় বোঝায় যায়না। আর বুঝতে না পারলে আপনাকে না বুঝিয়ে সেই শিক্ষকের ভেতর স্যাটিসফ্যাকশন আসবে না।

যাইহোক,  ওর মুখ থেকে সরাসরি বিয়ের কথাটা বের করাতে পারলাম না। লাজুক মেয়ে বলে কথা!

পরদিন দুপুরের ফিরতি ফ্লাইটে আমি চলে এলাম নেদারল্যান্ডস।  ইসাবেলা ইংল্যান্ড রয়ে গেল। বললো, পরে আসবে। আমি আর দশদিন KFC তে কাজ করে ভার্সিটিতে চলে এলাম। মশিউর ভাই আমার বোনাসের ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন।  কারণ কিছুদিন আমি একইসাথে দুই পদে কাজ করেছিলাম। অসম্ভব ভালো একটা মানুষ। আমার জন্য অনেক করেছেন। যখন যেভাবে চেয়েছি ঠিক সেভাবেই।

ভার্সিটি ফিরে আবার বন্ধুদের সাথে দেখা, কে কোথায় ছিল, কে কত ইউরো সেইভ করলো, কেউ দেশে গিয়েছিল কিনা, কে গার্লফ্রেন্ডের সাথে ছিল – অনেক গল্প। নতুন সেমিস্টারে দেশ থেকে নতুন কেউ এলো কিনা। নতুন কোন টিচার আমাদের ক্লাস নেবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

আমার মনটা পরে ছিল ইসাবেলার কাছে। যদিও প্রতিদিন নিয়ম করে অনেক কথা হতো। আমি ঘুম থেকে উঠলেও ইসাবেলা, ঘুমোতে গেলেও সে, ক্লাসে মহিলা টিচারের ভেতরেও ওকে খুঁজে পাওয়া, ওর মতন সোনালী চুলের কাউকে দেখলেই মনে হয় এই বুঝি ইসাবেলা। বড় এক মানসিক যন্ত্রণা।  ভালোবাসাময় এক যন্ত্রণা।

মন খারাপ হলে আম্মু ওর জন্য যে গিফট প্যাক পাঠিয়েছিল,  ঐটা দেখি আর ভাবি ইসাবেলা যেদিন জামদানী শাড়ি পড়বে, কেমন দেখাবে ওকে? কপালে যদি একটা টিপ, হাতে চুড়ি  থাকে? পুরোপুরি বাঙ্গালি মেয়ে সাজলে নিশ্চিত সুন্দর লাগবে ওকে।  ও এখন পর্যন্ত এই গিফট এর কথা জানেনা। সারপ্রাইজ দেবো বলে জানাইনি ওকে।

সেদিন ছিল রবিবার।  ক্লাস নেই। ঘরে বেঘোরে ঘুমোচ্ছি। হঠাৎ বেল। আমার তো মাথা গরম। ছুটির দুইটা দিনও শান্তি করে ঘুমোতে পারিনা। রাগে নিজের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছিল। কিন্তু দরজা খুলে আমি বাইরে দাঁড়ানো মানুষকে দেখে তো মহাখুশী। কি পাঠক- পাঠিকা, কি ভাবছিলেন,  ইসাবেলা এসেছে? নাহ! সে এলে তো হতোই। আমার মনের অব্যক্ত যন্ত্রণার একটু হলেও অবসান হতো। মশিউর ভাই এসেছেন আমার এখানে একদিন বেড়াতে। PSV EINDHOVEN এর ফুটবল ম্যাচ দেখার জন্য। উনি আবার ফুটবল প্রেমী।  আমার জন্যও টিকেট এনেছেন। ভালোই হলো, বিকেলে দুজন একসাথে খেলা দেখতে গেলাম। শেষ মিনিটের নাটকীয় গোলে PSV জিতে যায়। সত্যি কথা, আমার মন ইসাবেলাতে আসক্ত। এসব কি আর ভালো লাগে?  ইসাবেলার মুখটা ছাড়া আর কিছুই ভালো লাগেনা। দিনে দিনে কেমন একটা নেশাগ্রস্ত মানুষের মতো মনে হয় নিজেকে।

দেখতে দেখতে অক্টোবর মাস চলে এলো, ইসাবেলা আর এলো না। আমার প্রতীক্ষার প্রহর দিনে দিনে বাড়তে লাগলো। ফোন করলেই বলে বাবার ব্যবসার কাজে ব্যস্ত। হতেই পারে, অনেক ব্যবসা ওদের।

কম্পিউটার আর্কিটেকচার পরীক্ষা দিয়ে সোজা বাসায় চলে এলাম, পরীক্ষা মন মতো হয়নি তাই মন খুব খারাপ। ফ্রেশ হয়ে মাত্র একটু ঘুমিয়েছি আর এর ভেতর দরজায় নক। মনে হচ্ছিলো, দরজায় এক একটা নক পড়ছিলো আর আমার বুকে গুলি বিধছিল। কারণ, ঘুম হঠাৎ ওভাবে ভেঙে গেলে আমার মানসিক অস্থিরতা বেড়ে যায়। হবে কোনো বাংলাদেশী বন্ধু, ফুটবল খেলার জন্য ডাকতে এসেছে। কি আর করা, দুই-তিন মিনিট ইচ্ছা করে বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে তারপর দরজা খুললাম। কিন্তু এ আমি কাকে দেখলাম? আমি যেন আমার চোখ দুটোকে বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না, আমার বিদেশ জীবনে এত আনন্দ কখনো আসেনি বোধহয়। কি পাঠক, এইবার আর আপনারা হতাশ হচ্ছেন না, আমিও না। হ্যাঁ, অবশেষে ইসাবেলা এসেছে। এক তোড়া ফুল আর আমার প্রিয় Hofner ব্রান্ড এর গীটার নিয়ে। আমি আমার মনের আনন্দ ধরে না রাখতে পেরে যা আগে করিনি তাই করে বসলাম, গালে একটা আলতো চুমু। তারপর কোলে করে ভেতরে ঢোকালাম, ও তো ভয় পেয়েই চিৎকার, “পড়ে যাবো, পড়ে যাবো, আমাকে নামাও”। ওকে বললাম, আজ আমার দিন, আমি যা বলবো তাই হবে, তুমি একদম চুপ। কোলে করে এনে আমার বিছানায় ফেলে দিলাম, ও তো ব্যথায় ওমা! করে উঠলো। আমি ভয় পেয়ে গেলাম, জিজ্ঞেস করলাম কি হলো? বললো সেদিন ঘোড়ায় চড়া শিখতে গিয়ে ঘোড়া নাকি ওকে ফেলে দিয়েছে আর তাতে কোমরে প্রচন্ড ব্যথা পেয়েছে। বললাম, আমার তো মাথা ঠিক নেই, সরি, বুঝতে পারিনি। ও আমাকে স্থির করতে বলে ইটস ওকে, ডন্ট ওরি। ভয় পেওনা, হালকা লেগেছে, ফোমের বিছানা না হলে নিশ্চিত আমাকে আর খুজেঁ পেতেনা। আমি বললাম, এই ধরণের কথা যেন আর মুখ থেকে বের না হয়!

জিজ্ঞেস করলাম, তো কোন হোটেলে উঠেছো? এই কথা শুনে ও যেন আকাশ থেকে পড়লো, বললো, what? Are you kidding? You are here, why should I go for a hotel ah? আমি ওর কথায় দারূণ মজা পেলাম, ইচ্ছে করে ওকে ক্ষেপাতে লাগলাম আরো, বললাম, Who am I to you? I am not even your boy friend, isn’t it? ও তখন কি বলবে বুঝে উঠতে না পেরে মনের কথাটাই বলে ফেললো, You aren’t my boy friend, So? At least you are my best friend forever. কথাটা সিরিয়াসলি নিলাম না, আবার জিজ্ঞেস করলাম, So are you still single? বললো, তা নয়, তবে আমার কেউ একজন তো আছে। রাগের ভান করে বললাম, তো তুমি সেই একজনের কাছে যাও, আমার কাছে কেন থাকতে এসেছো, আমার তো একটাই খাট, তোমাকে কোথায় রাখি?

ওর তখন চোখে মুখে রাগ, পারলে আমাকে ছিঁড়ে-কুটে ফেলে এমন অবস্থা। পাঠক-পাঠিকাদের বলছি, কেউ হাসবেন না কেমন, আমি দেশ থেকে যাবার সময় ইতিহাদ এয়ারলাইন্সে ২৩+২৩ কেজি=৪৬ কেজি বহন করার সুযোগ পেয়েছিলাম, তো আমার প্রিয় কোলবালিশটাকেও সঙ্গে করে এনেছিলাম, আর সেই কোলবালিশ নিয়ে ইসাবেলা আমার দিকে তেড়ে এলো, আমি তো ভয়ে এক দৌঁড়ে টয়লেটে। যাইহোক, দুই মিনিট ভয়ে ভেতরে থেকে বাইরে এসে দেখি ও নেই। আমার তো মাথায় হাত, দেখি দরজা খোলা, সে হনহন করে বাইরে হেঁটে চলেছে, আমি দৌঁড়ে গিয়ে তাকে আটকায়, বলি, কি হয়েছে? এমন কেন করছো? ও বলে, কেন এমন করবো না? আমি তো তোমার কেউ না, সরো, আমাকে যেতে দাও। কিন্তু ও আমার সাথে শক্তিতে কি কুলিয়ে ওঠে? ধরে নিয়ে আবার ঘরে আসি, বলি, আমি তোমার যেই হই না কেন, আমার বাসা মানেই তোমার বাসা, আমি জানি , আমি তোমার বয়ফ্রেন্ড না, আমি এই শব্দটাকে পছন্দ করিনা বলেই তুমি বয়ফ্রেন্ড শব্দ উচ্চারণ করোনা, আমি তো তোমার সেই মানুষ। নাকি? ইসাবেলার মন মরা মুখে সেই ভুবনভোলানো হাসি দেখলাম বহুদিন পরে। বিদেশী মেয়েরা কথায় কথায় এই একটা কাজ খুব পারে, জড়িয়ে ধরা, কি আর করা, আমার কথা শুনে সেও আমাকে জড়িয়ে ধরলো। ঐ জড়িয়ে ধরা পর্যন্তই। কেউ আবার গভীরভাবে নিবেন না প্লিজ, আমি ঐসব বিয়ের আগে পছন্দ করিনা, সেও জানে- আগের এক পর্বে পড়েছিলেন। নিয়ত করেছিলাম ক্লাস টেনে থাকতে, যা হবে বিয়ের পরে বউ এর সাথে। যাইহোক, ওকে বললাম ফ্রেশ হতে, ও শাওয়ার নিতে চলে গেল, আমি গেলাম Lidl-এ । Lidl হলো জার্মান-ভিত্তিক ইউরোপের খুব জনপ্রিয় একটা সুপারমার্কেট। বাজার করে এনে রান্না করতে শুরু করলাম, ও খুব টায়ার্ড থাকায় ঘুম।

বিকেলে গেলাম শপিং করতে।

একটা খাটের দোকানে ঢোকায় ইসাবেলা আমাকে জিজ্ঞেস করলো, এখানে কি কাজ? বললাম, একটা সিংগেল খাট কেনা লাগবে। ও তো অবাক, বলে তোমার তো দুইজন থাকার জন্য বিশাল বড় খাট আছেই, এইটা কার জন্য?

 

চলবে……….  ( তবে ঘটনা শেষের দিকে চলে এসেছে , ঠিক যা ঘটেছিল, যেভাবে ঘটেছিল, সেভাবেই তুলে ধরার চেষ্টা করছি  )

এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৬)

Now Reading
এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৬)

পঞ্চম পর্বের পর থেকে………..

ইসাবেলার বাবা খুব রসিক মানুষ। মজা করে কথা বলেন। এসেই বললেন, একটা ইংলিশ সিংহী রয়েল বেঙ্গল টাইগারের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছে। ভাগ্যিস, বেঙ্গল টাইগার হাতে আচঁড় মারেনি! এটা শোনা মাত্র লজ্জায় ইসাবেলা আমার হাতটাও ছেড়ে দিল। আমরা সবাই হেসে উঠলাম। ওর ফর্সা গাল লাল হয়ে উঠলো।

ইসাবেলা যখন লজ্জা পায়, ওকে খুব মায়াবী লাগে দেখতে। ইচ্ছে করে, সারাজীবন ওর ঐ লাজুক মুখ দেখে যদি সময়টা কাটিয়ে দিতে পারতাম!

এরপর আরো কিছু গল্পগুজব করে বাসায় এলাম সবাই। ইসাবেলার রুমে গেলাম প্রথম। ঢুকেই মনে হলো, একটা ছোট বাচ্চার রুমে ঢুকেছি। খুব বেশি সাজানো গোছানো আর পুতুলে ভরা। সাথে অনেক  ট্রফি। কাছে গিয়ে দেখলাম ট্রফিগুলো সব ক্রিকেটের। আমি তো একেবারেই অবাক! এতদিন দুজন দুজনাকে জানি অথচ সে যে মহিলা লীগে এক সময় ক্রিকেট খেলতো তা আমাকে বলেইনি।

জিজ্ঞেস করলাম, কেন বলোনি যে তুমি ক্রিকেট খেলতে? ও যা বললো, তা একটু কষ্টদায়ক। ফিল্ডিং প্র্যাকটিস করতে গিয়ে তার হাতের হাঁড়ে ফাটল ধরেছিল। বহু দিন ভুগেছিল, অনেক যন্ত্রণা সহ্য করেছিল। তাই ক্রিকেটের প্রতি তার মায়া উঠে গিয়েছিল। আর ক্রিকেট খেলেনি। এমনকি ক্রিকেট খেলাও নাকি সে সহ্য করতে পারেনা।

বললাম, তুমি এগুলো বলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছো না মনে হচ্ছে। থাক বাদ দাও। ইসাবেলাকে বললাম, আমি আজ রাতে সবার জন্য রান্না করি, কেমন? ওরা সবাই তো খুব খুশি। পাশের শপ থেকে বাসমতী চাল আর দুইটা চিকেন আনলাম। বাসায় এসেই রান্না শুরু করে দিলাম। ইসাবেলা আমাকে হেল্প করলো।

আমি সত্যিই জানিনা আমি কেমন রান্না করি, আমার রান্না ভালো কি মন্দ আমার বন্ধুরাই ভালো জানে। তবে বন্ধুরা খেয়ে কোনদিন খারাপ বলেনি। কিন্তু সেদিন জানিনা কি হলো, আমার চিকেন-কারী খেয়ে ওরা সবাই মুগ্ধ। এমনকি আমার নিজের কাছেও অনেক সুস্বাদু লেগেছিল। একটু ধনিয়া পাতা দিতে পারলে আরো স্বাদ হতো কিন্তু কোনো দোকানেই পাইনি। শহরের একটু বাইরে হলে এমন সমস্যা হবে এটাই স্বাভাবিক তাছাড়া ইংরেজরা ধনিয়া পাতার সাথে মনে হয়না অতটা অভ্যস্ত।

ইসাবেলার বাবা আমার রান্না খেয়ে তো বলেই ফেললো, “এখানে অনেক টুরিস্ট আসে পাশের ইকো পার্কের জন্যে। আমি একটা রেস্টুরেন্ট খুলে বসি,  তুমি শেফ হও”।

বাংলাদেশী খাবার মানুষ খুব পছন্দ করবে। ইউরোপিয়ান বা ওয়েস্টার্নদের কাছে  যদিও এগুলো ইন্ডিয়ান ফুড নামেই পরিচিত। আই মিন, কারী, মসলা জাতীয় খাবার গুলো। কিন্তু আমি কখনোই ইন্ডিয়ান বলতে আগ্রহী নই। কারণ,  খাবার প্রায় সিমিলার বলে বাংলাদেশী ফুড তো ইন্ডিয়ান ফুড হবেনা তাইনা?

উনাকে বললাম, আমি যে রেষ্টুরেন্টে রান্না করবো, সেখানে শুধু বাঙ্গালী খাবার তৈরী হবে। সাথে ডাচ, পর্তুগীজ, ইটালিয়ান আর ইংরেজি খাবার তো অবশ্যই। কিন্তু কোথাও লেখা থাকতে পারবেনা ইন্ডিয়ান ফুড। কারণ, মানুষ বাংলাদেশী ফুড খেলেও বলবে ইন্ডিয়ান ফুড। ব্যাপার টা এমনই দাঁড়িয়ে গিয়েছে দেখলাম। তাই আমি চাই আমার দেশের খাবারকে হাইলাইট করতে। এর আগে এক ফরাসি মালিককে একই কথা বলেছিলাম, সে রাজী হয়নি, কিন্তু পরে ঠিকই কল করেছিল,  আমি ফিরিয়ে দিয়েছিলাম।

ইসাবেলার বাবা উদারমনা বাংলাদেশ প্রেমী। তিনি বলেলন, আমিও তো এটাই চাই। উনার কথায় খুব বেশী খুশি হলাম আর আশ্বস্ত করলাম এই বলে যে, আমি যদি কোনদিন ইংল্যান্ডে স্থায়ী হবার চিন্তা করি তাহলে অবশ্যই বাংলাদেশী শেফ হিসেবে দায়িত্ব নিবো। উনিও আমার উত্তরে খুশি হয়ে মজা করে বললেন, “কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার শেফ হলে মন্দ হবেনা, আমি অবশ্য দুইটার জন্যই পে করবো, কারণ আমার পুরোনো ল্যাপটপটা প্রায়ই নষ্ট হয়ে যায় আর আমি ওটাকে এতটাই ভালোবাসি যে ছাড়তেও পারিনা, নষ্ট হয়ে গেলে ঠিক করে দেবে।” উনি বেশ পুরোনো একটা ডেল এর ল্যাপটপ ব্যবহার করেন যেটা ডাক্তারি ভাষায় এক কথায় কোমায় চলে গিয়েছে, মাঝে মাঝে জীবিত হয়, আবার কোমায় চলে যায়।

রাতে ঘুম আসেনা। আকাশে ভরা পূর্ণিমা চাঁদ। ইসাবেলা খুব টায়ার্ড থাকায় ঘুমিয়ে পড়েছে। আমার একদমই ভালো লাগছিলো না। ওকে তারপরেও ফেসবুকে নক করলাম। কল দিলাম। ঘুম জড়ানো কন্ঠে যখন ফেরদৌস নাম ধরে ডাকে, আমার হৃদয়ে কেমন একটা শিহরণ বয়ে যায়। লিখে বা বলে বোঝাতে পারবোনা এই অনুভূতি। আমাকে জিজ্ঞেস করলো, এখনও কেন ঘুমাওনি?

বললাম, তুমি একটু বারান্দায় এসো। বাইরে অনেক সুন্দর পূর্ণিমা চাঁদ। ও চোখ মুছতে মুছতে এলো। বিধাতা যেন ওর চোখে মুখে পূর্ণিমাতিথি ঢেলে দিয়েছেন। এসেই বললো, আমাকে এমন মাঝরাতে না ডাকলে কি হতো না? নাহ, হতো না। তোমার সাথে আমার খুব প্রয়োজনীয় কথা রয়েছে। যা না বলা পর্যন্ত আমি একটুও শান্তি পাচ্ছি না। আমায় একটু শান্তি দাও তুমি, প্লিজ। আমার করুণ চাহনি দেখে মনে হলো ওর চোখের ঘুম চলে গিয়েছে। বলে, প্লিজ এভাবে কথা বলে না ফেরদৌস। আমার সাথে কেন এভাবে অসহায় চোখে কথা বলবে? তুমি কি চাও আমি কষ্ট পাই,  বলো?

আমি বললাম, তুমি কেন কষ্ট পাবে? তুমি কি আমাকে ভালোবাসো? নাকি আমরা শুধুই বন্ধু? আসলে কি?  তুমি আমাকে কোন দৃষ্টিতে দেখো আমি পরিষ্কার জানতে চাই! কষ্টটা কি আমার বেশি না? এভাবে আর কতদিন? আমি তো দিনেদিনে বিরহের অনলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছি। না আমি রাতে ঘুমোতে পারি, না আমি কাজে মন বসাতে পারি, এভাবে চললে তো আমি কয়দিন পর সামনের সেমিস্টারে ফেইল করে বসবো, আর নেদারল্যান্ড সরকার আমাকে বের করে দিবে। কি হবে আমার তখন??

ও বলে, কি আর হবে, তুমি ইংল্যান্ড এর বাসিন্দা হয়ে যাবে। নেদারল্যান্ড সরকার তোমার পরীক্ষায় পাশ না করার দায়ে বের করে দিলেও ইংল্যান্ড সরকার তো তোমাকে সাদরে আমন্ত্রণ জানাবে। নাকি?

আমি ওর কথার আগা মাথা কিছু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করি, মানে কি? কি বোঝাতে চাচ্ছো তুমি? ইংল্যান্ড সরকার বা ইমিগ্রেশন কেন আমাকে আমন্ত্রণ জানাবে? আমি তো এখানে কিছুই না একজন শর্ট টার্ম টুরিষ্ট ছাড়া কিংবা এমন ভিআইপি কেউও হয়ে যায়নি।

আমার কথা শুনে ইসাবেলা হেসে দেয়। সেই ভুবনভোলানো হাসি আমার অন্তর-আত্নাকে কাপিঁয়ে তোলে।

সে আমাকে বলে, এইবার তো শর্ট টার্ম টুরিষ্ট ভিসা নিয়ে কয়েকদিনের জন্য অতিথি হয়ে এসেছো। ইন কেস, কথার কথা বলছি, তুমি যদি আমার কারণে ফেইল করে বসো আর এইজন্য নেদারল্যান্ড ইমিগ্রেশন তোমাকে না রাখতে চায়, পরেরবার ইংল্যান্ড ইমিগ্রেশন তোমাকে সারাজীবন থাকার জন্য আমন্ত্রণ জানাবে! কি জনাব, এখনো আমার কথা কি তোমার মাথায় ঢোকেনি? নাকি মাথা একদম গোল্লায় গেছে যে এই সামান্য ব্যাপারটিও ধরতে পারছো না?

( আমার প্রিয় পাঠকদের উদ্দেশ্যে বলছি, আচ্ছা, আপনারা কি ইসাবেলার কথাটা ধরতে পেরেছেন? নাকি আমার মতো এখনো বুঝে উঠতে পারেননি? )

 

চলবে…….

এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৫)

Now Reading
এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৫)

চতুর্থ পর্বের পর……….

ইসাবেলার ইমারজেন্সী নক পেয়ে মনে হলো আমি হাসপাতালের ইমারজেন্সীতে চলে যাচ্ছি। কারণ অনেক আশা নিয়ে ফোনটা বের করেছিলাম গিফট গুলো দেবো – এই কথা বলার জন্য। অথচ………?

যাই হোক, ব্যাপার না, সময় সব সময় আপনার সাথে ভালো আচরণ দেখাবে এমনটা নয়, সময় বড়ই অদ্ভুত। এই সময়ের সাথে সাথেই আমাদের চলতে হয়, আরো কত কি! সময় নিয়ে এখানে মহাকাব্য লিখতে চাইনা। তাহলে ইসাবেলা কষ্ট পাবে, আমার প্রিয় পাঠকেরা মনঃক্ষুণ্ণ হবেন।

মশিউর ভাই এর কাছে পরে জেনেছিলাম, বাবার কি এক ব্যবসায়িক কাজে ইসাবেলা হঠাৎ লন্ডন গিয়েছে নাকি। নিজের দেশ, নিজের শহর বলে কথা। আমি আর কথা বলিনি তারপর। আমাকে সে ফেসবুকে কল দিয়েছিল, কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে কথা হয়নি, আবার আমি যখন কল দিয়েছিলাম, সে ফোন কেটে দিয়ে মেসেজ করেছিল, বাবা-মা এর সাথে কথা বলছে। এভাবেই আমাদের ব্যস্ততা আমাদেরকে ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে দেয়। আমার মনে সে যে ঝড় তুলেছিল, তা দিনে দিনে বেড়েই চলেছে। আমি এমন প্রেমে পরবো জানলে এই শহরে কোনোদিন আসতাম না। কিন্তু আপনারাই বলেন, প্রেম কি বলে কয়ে আসে? নাহ! প্রেম আসে হঠাৎ বৃষ্টির মতো করে। আবার এসে চলেও যায় দমকা হাওয়ার মত।

দুই সপ্তাহ কেটে গেল, ইসাবেলার কোনো খোঁজ নেই। অথচ সে গিয়েছিল এক সপ্তাহের জন্য। এদিকে তার জায়গাতে এসেছে নতুন ইটালিয়ান সেকশন বস। ব্যাটা বেশী একটা সুবিধার না, মূর্খ টাইপের কিন্তু কাজে ওস্তাদ। মশিউর ভাই এর বন্ধু সে, আর আমি যেহেতু এতদিন ইসাবেলার স্থানে কাজ করেছি, সবাই আমাকে একটু সম্মানের সাথেই দেখে। আসলে যে যত ভালো কাজ পারবে, তার সম্মানটাই বেশী। আবার কেউ কাউকেই ছোট করে দেখেনা। সবাই সবাইকে সম্মান করে বলেই এরা এতো উন্নত।

আমি ইসাবেলার নাম্বারে, ভাইবারে, ফেসবুকে কোথাও কল করে পাচ্ছিলাম না। এদিকে আগষ্ট মাস শেষের দিকে। সেপ্টেম্বরে আমি চলে যাবো EINDHOVEN – আমার ভার্সিটি খুলে যাবে। হঠাৎ মনে পড়লো, আমাদের অফিসের ডিরেক্টরিতে তার লন্ডনের স্থায়ী ঠিকানা দেখেছিলাম, ব্যস, মশিউর ভাই ঠিকানা বের করে দিল। পরদিনই আমি DEN HAAG এ অবস্থিত ইংল্যান্ড অ্যাম্বাসিতে চলে গেলাম। আমার আগে ভিসা থাকায় নতুন ভিসা পেতে খুব একটা অসুবিধা হলোনা। দশদিনের মাথায় শর্ট টার্ম ভিজিট ভিসা পেয়ে গেলাম। এর মধ্যে একবার ওর সাথে কথা হয়েছিল, ও বলেছিল ও অনেক ভেতরের একটা গ্রামের দিকে ছিলো একটা কাজে। সেখানে নেটওয়ার্ক একটু ঝামেলা করে। এখন নাকি ও বাসাতেই আছে। ও বাসাতে থাকলেই হবে, ওকে চমকে দেবো।

দুপুর নাগাদ LONDON CITY AIRPORT- এ পৌছালাম, একটা বাঙ্গালী রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার খেয়ে ঠিকানা অনুযায়ী রওনা দিলাম, ওদের বাসা একেবারে শহরে না, একটু গ্রাম অঞ্চলের দিকে। মাঝে একটা ট্রেন মিস হওয়াতে পৌছাতে পৌছাতে সন্ধ্যাঁবেলা। বাসার দরজাতে নক করলাম। প্রায় ৩মিনিট পর এক বয়স্ক ভদ্রলোক দরজা খুললেন, বুঝলাম সে ইসাবেলার বাবা। নিজের পরিচয় দিলাম, উনি খুব খুশী হয়ে আমাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন। বসতে দিলেন। জিজ্ঞেস করলাম, ইসাবেলা কোথায়? সে কি বাসায় নেই? ওর বাবা জানালো, ও নাকি আবার সেই গ্রামাঞ্চলে গিয়েছে তার মা’র সাথে। মাঝে এসে দুইদিন ছিলো কিন্তু আবার যেতে হয়েছে। সমস্যা হলো, ওদিকে হঠাৎ বন্যায় বেশ কিছু গ্রাম তলিয়ে গিয়েছে।uk flood.jpg

কি ভাবছেন, ইউরোপেও বন্যা হলে শহর কিংবা গ্রাম তলিয়ে যায়? হ্যাঁ, আসলেই তাই, অনেক জায়গা আছে যা খুব নিচু এলাকা, বাঁধ শক্ত হলেও প্রবল জোয়ারে পানি চলে আসে। মানুষ মারাও যায়। এটা খুবই সাধারণ ঘটনা। তো, ইসাবেলা গিয়েছে সেই সব দূর্গত এলাকায় ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে। নেটওয়ার্কও বিচ্ছিন্ন, যোগাযোগ নেই বললেই চলে। নাহ, আমি আসলে এইবার হতাশ হইনি তার সাথে দেখা হলোনা বলে, বরং ইসাবেলা আর তার পরিবারের উদারতায় আমি মুগ্ধ। তার বাবার সাথে কথা বলে জানলাম, উনি উচ্চশিক্ষিত এবং নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্য আছে। নিভৃতে থাকার জন্য শহরের এক কোণায় স্থায়ী হওয়া, দুইদিন ছিলাম ওদের বাড়িতে। ওর বাবা অনেক ভালো রান্নাও জানেন। আমাকে ইংলিশ ফুড খাওয়ালেন, নিজের গাড়িতে করে অনেক স্থান ঘুরিয়ে আনলেন। ফ্যামিলি ফটো এলব্যামে দাদা-দাদীর সাথে ছোট ইসাবেলাকে দেখালেন। তিনি বাংলাদেশ সম্পর্কেও অনেক ভালো জানেন, রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সব দিকেই উনি খোজঁ রাখেন, উনার পূর্ব পুরুষদের একজন সম্পর্কে তার চাচা নাকি এক সময় ব্রিটিশ ইন্ডিয়াতে আমাদের বেঙ্গল অঞ্চলে দায়িত্বরত ছিলেন এবং সেখানেই একজন বাঙ্গালী নারীকে বিয়ে করে স্থায়ী হয়েছিলেন।

এদিকে আমি কি করবো তাই ভাবছিলাম, ইসাবেলার সাথেও মনে হয়না সহজে দেখা হবে। যেহেতু এক সপ্তাহের জন্য এসেছি, তাই ভাবলাম, লন্ডনে গিয়ে মামাতো ভাই এর সাথে দেখা করে আসি। ইসাবেলার বাবাকে বললাম, ইসাবেলার সাথে যোগাযোগ হলে অবশ্যই যেন আমার কথা বলেন আর আমার সাথে যেন যোগাযোগ করে। মামাতো ভাই এর বাসায় গিয়ে ছিলাম দুইদিন। সারা লন্ডন শহর ঘুরেছি। ইসাবেলা ছাড়া ঠিক ভালো লাগেনি। অথচ ইচ্ছা ছিলো ইসাবেলার সাথে লন্ডনের এই প্রান্ত থেকে ওই প্রান্তে ঘুরে বেড়াবো। ভালোবাসার নতুন এক অধ্যায় শুরু করবো। তার টোল পড়া গালে আমার ভালোবাসা একেঁ দেবো। নাহ! কিছুই হয়নি। ওর বাবা আমাকে কল দিয়ে জানালো, “ইসাবেলার সাথে যোগাযোগ হয়নি, তুমি আমার এখানে এসো, দেখি আমরা সেখানে যেতে পারি কিনা, এতো কষ্ট করে এলে, আমি কোনো উপকারে আসতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করবো”। হাতে ছিলো আর দুইদিন। রিটার্ন টিকেট কাটা আছে, যেতেই হবে, তাছাড়া ভার্সিটিতে Re-enrollment করতে হবে। ডেডলাইন পার হয়ে গেলেই বিপদ।

ওদের বাড়িতে পৌছালাম। সকাল বেলাটা একা একা এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করেই কাটলো। বিকেলে রওনা দেবো। রওনা দেয়ার আগে পাশেই একটা কফি শপে টিভি দেখছিলাম আর কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিলাম। হঠাৎ মনে হলো কফি শপে ইসাবেলার মতো কেউ ঢুকেছে। প্রথম পলকে পাত্তা না দিলেও আবার বাধ্য হয়ে ভালো করে দেখলাম এটাই ইসাবেলা, ঘাড়ে ব্যাগ, সাথে একজন মহিলা, মানে ওর মা। তার মানে ওরা এখানে এসে পৌছেই বাসায় না গিয়ে সরাসরি কফি শপে ঢুকেছে কিছু খেতে কিংবা কিনতে। আমি আল্লাহকে ধন্যবাদ দিলাম যে আমার মনের ইচ্ছাটা তিনি পূরণ করেছেন। দেখলাম ওরা সামনের দিকে একটা টেবিলে কফি আর কেক নিয়ে বসেছে। আমি ধীর পায়ে ইসাবেলার পেছনে গিয়ে পেছন থেকে দুই হাত দিয়ে চোখ চেপে ধরলাম আর ওর মা কে ইশারা দিয়ে জানালাম আমি ফেরদৌস। ওর মা ওর মুখোমুখি বসা ছিল। আমাকে দেখে ওর মা খুব খুশি। আমার কন্ঠ শুনলে চিনে যাবে বিধায় ওর মা ইসাবেলা কে জিজ্ঞেস করলো, কে বলোতো? প্রথমে কি বুঝেই বলে, কে? বাবা তাইনা? আমি তো চুপিচুপি হাসি আর ওর মা ও হাসে, ও বুঝতে পারে ওর বাবা না। তাই দুই হাত দিয়ে আমার হাত, আঙ্গুল স্পর্শ করে হঠাৎ বলে ওঠে, Who is this? I know this hand, Ferdous? বলেই আমার হাত সরিয়ে পেছনে তাকিয়ে দেখে আমি। পাগলের মতো আমাকে জড়িয়ে ধরেই কান্নাকাটিঃ Oh Ferdous, I missed you, I missed you too much! I tried a lot to make a connection but I couldn’t. I am so sorry. পুরো কফি শপের সব মানুষের নজর এদিকে। সবাই হাত তালি দিয়ে ওঠে। ও লাজুক স্বভাবের হওয়াতে হাত তালির শব্দে লজ্জা পেয়ে শান্ত হয়। আমার হাত সে মোটেও ছাড়বেনা। হাতের আঙ্গুলগুলো হাতের ভেতর নিয়ে রেখে দিয়েছে যেন ছেড়ে দিলেই হারিয়ে যাবো, ওর মা ব্যাপারটা লক্ষ্য করে মিটিমিটি হাসছিল। আমাকে পেয়ে ইসাবেলার খুশী ধরেনা, আর আমার কথা নাই’বা বললাম। এই কয়দিন কিভাবে কি হয়েছে সব বললাম, এর মধ্যে ওর বাবাও কফি শপে এসেছে আমাকে খুজঁতে কিন্তু এসে দেখে এদিকে মিলনমেলা বসে গিয়েছে।

চলবে…………….

এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৪)

Now Reading
এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৪)

তৃতীয় পর্বের পর থেকে……..

 

আমি আসলে ঠিক কি জবাব দেবো,  বুঝে উঠতে পারছিলাম না।

দোটানায় পড়ে গেলাম। আমি যে ইসাবেলাকে ভালোবাসিনা তা নয় কিন্তু। আমি চাইলাম,  একটু ভিন্নভাবে জবাব দিতে, তাই বললাম, আমি তো পাশেই আছি, আর কোথায় যাবো বলো?

জানিনা, আমার জবাব তার কাছে মনঃপূত হয়েছিল কিনা। ওভাবেই এই সেই গল্প করতে করতে তার চোখে ঘুম চলে এলো, আমি তাই তাকে বিদায় দিয়ে বাসায় চলে এলাম।

বাসায় এসে ভাবতে লাগলাম, ইসাবেলার সাথে যদি সম্পর্কে জড়াই, তবে কি হবে এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ? কারণ, আমি আসলে চাইনা কোনো বিদেশী কন্যা আমার জীবনসঙ্গিনী হোক। বিদেশিনীর জীবনধারা ভিন্ন যদিও ইসাবেলা যে মাত্রায় প্রেমামাইসিন খেয়েছে, তাতে করে বলা যায় সে আমার জীবনধারাতে অভ্যস্ত হতে বেশীদিন সময় নেবে না। আর একটা ব্যাপার,  তা হলো ভাষা। আমি যতই ইংরেজি ভালো জানি বা পারি না কেন, তা আমার মাতৃভাষা নয়। আর মাতৃভাষায় আপনি আপনার ভালোবাসার মানুষের সাথে আবেগের যে লেনদেন করতে পারবেন, তা অন্যভাষাতে কখনোই সম্ভব নয়। আর এটাই বাস্তব সত্য।

সারারাত এইসব ভাবতে ভাবতেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরী হলো। ফলে কাজেও দেরী।

পৌছানোর পরে মশিউর ভাই একটু রসিকতা করে গান ধরলেন, “কি জাদু করিলা, পিরিতি শিখাইলা…….” আমি বললাম,  ভাই মজা নেন,  তাইনা? উনি বলেন, মজা নেবো কেন? মজা তো আমি এমনিই পাচ্ছি, আজকাল সারারাত এপাশ ওপাশ করেও দেখি সাহেবের ঘুম আসেনা, কাজে আসেন দেরী করে, আপনার সেকশন বসেরও কাজে মনোযোগ কম। মনে হচ্ছে, একটা কাজী অফিস খোলা ফরজ হয়ে পড়েছে? বলেই হো হো করে হেসে উঠলেন।  উনার কাজই হলো আমাকে ক্ষেপানো,  মজা করা। উনার মজা করার প্রেক্ষিতে আমিও একটু মজা নিলাম, বললাম, ভাই, আপনি কাজী হলে আগে নিজেই নিজের বিয়ে পড়বেন, তাহলে লাইসেন্স পাবেন, আমি লাইসেন্সহীন কাজীর কাছে বিয়ে করবো না। ( কথাগুলো সম্পূর্ণ অযৌক্তিক, মজা করে বলা)

সেদিন কাজ শেষে ইসাবেলা তার BMW তে করে আমাকে শপিং-এ নিয়ে গেলো।  প্রতি সপ্তাহেই সে শপিং করে, কেনাকাটা ছাড়া থাকতেই পারেনা, কিন্তু সবচাইতে অবাক করা ব্যাপারগুলো কি জানেন?

এই কেনাকাটা সে তার নিজের জন্য করেনা, করে ইউরোপের কিছু গরীব দেশের গরীব মানুষের জন্য, সিরিয়া থেকে আসা রিফিউজি বাচ্চাগুলোর জন্য। পথের পাশে পড়ে থাকা হোমলেস মানুষগুলোর জন্য। যদিও হোমলেস মানুষ নেদারল্যান্ড -এ নেই একদমই। হোমলেসদের জন্য একটা সংস্থায় সে ওগুলো দান করে দেয়- চলে যায় অন্য দেশে।

তার এমন গুণ জেনে আমার চোখ থেকে পানি চলে এসেছিল। মনে হয়েছিল, কত টাকা জীবনে এদিক সেদিক করেছি, অথচ নিজের দেশের না খেয়ে থাকা মানুষগুলোর দিকে কখনো তাকাইনি। হ্যাঁ, আমি স্টুডেন্ট ছিলাম, সেভাবে সম্ভব ছিলোনা,  কিন্তু বন্ধুদের সাথে অহেতুক যে টাকা উড়িয়েছি এদিক সেদিক?

ইসাবেলা এক অন্য মানুষ, অন্য উচ্চতার মানুষ। সে আমাকে অসম্ভব ভালোবাসে,  আমার জন্য H&M,  Denim, Boss যত ব্রান্ড আছে, সেগুলোর পোশাক, পারফিউম গিফট করলো। খুব খুশি হয়েছিলাম তার থেকে গিফট পেয়ে। ভাবছিলাম,  আমি কি গিফট করবো তাকে? আম্মুকে তাই ফোন করে বললাম, আম্মু, একটা সুন্দর জামদানী শাড়ি কিনে পাঠাও আমাকে। আম্মুও মজা করতে ছাড়েনা, বলে শেষমেশ আমার ছেলের শাড়ি পড়ার শখ হয়েছে? আমি জানি, এমন প্রশ্ন কেন করেছে, যাতে করে বলে দিই আসলে কার জন্য লাগবে। আর সেটিই হলো। বললাম,  ধূর, কি যে বলোনা,  পাগল নাকি যে আমি শাড়ি পড়বো?  আম্মু বলে, তো আমার পাগল ছেলেটা কোন পাগলীকে শাড়ি গিফট করবে? – উফফ আম্মু, তুমি খুব চালাক।

কেনরে, চালাকির কি করলাম? আমাকে বলো,  দেখি তার জন্য আরো বাংলাদেশী কিছু পাঠাতে পারি কিনা, শুধুই শাড়ি কেন? আমার দেশের কি আর কিছু নেই? বললাম, আচ্ছা, তোমার আরো যা ইচ্ছে হয়, তুমি কিনে পাঠাও কিন্তু তার নাম বলা যাবেনা। আম্মুও কম যায় না, বলে, নাম দিয়ে কি কাজ সোনা? তুমি আমাকে ভাইবার-এ ছবি পাঠাও, না হলে কোনো পার্সেল নেদারল্যান্ড যাবেনা। কেমন?

কি আর করা, বাধ্য ছেলের মত তার ছবি পাঠিয়ে দিলাম, আম্মুর তো খুব পছন্দ তাকে, বলে, মেয়ে যদি সত্যিই ভালো হয়ে থাকে, তবে এই বিদেশিনী ঘরের বউ হয়ে এলেও আমাদের কোনো সমস্যা নেই। মেয়ের মুখ দেখেই মনে হচ্ছে, নরম স্বভাবের ভদ্র একটা মেয়ে। কি সুন্দর গালে টোল পড়ে? আম্মু পুরোই পাগল হয়ে গিয়েছে বুঝলাম। আম্মু ফোন করেছিল, বললো, পাঠিয়ে দিয়েছে পার্সেল। তিন-চারদিনের ভেতর পৌছে যাবে।

এদিকে ইসাবেলার সাথে অনেক ঘুরাঘুরি হয় প্রতিদিন। বেলজিয়াম এর রাজধানী ব্রাসেলস গিয়েছিলাম দুজন।  সেখানে গিয়ে হোটেলে তিন রাত এক বিছানায় ছিলাম। কি খুব খারাপ শোনাচ্ছে? ফুল সামার, ডাবল বেডরুম সব বুকড। টুরিস্টে ভরপুর আমস্টারডাম ব্রাসেলস, দুই দেশের রাজধানীই। শেষ দিন রাতের বেলা জিজ্ঞেস করেছিলাম,  তুমি কি সেক্সের প্রতি ইন্টারেস্টেড না? এই যে তিন রাত আমার সাথে একই বিছানায় থাকলে, তোমার ভেতর কোনো নমুনাই তো পেলাম না, অথচ ইউরোপে ভালোবাসা মানেই সেক্স।

ও আমাকে বললো, ইউরোপের ৯৫% মানুষই কিন্তু সেক্স লাইফে বিলিভ করে। ভালোবাসা হলেই সেদিকে ঝুঁকে পড়ে, এটাই ইউরোপিয়ান কালচার। আজ একজনের সাথে,  কাল আরেকজন। খুব ভালো করেই জানো বেশির ভাগ ইউরোপিয়ানরা ৩৫-৪০ বছর পর্যন্ত জীবনটাকে উপভোগ করে। তো আমি বোধহয় বাকি ৫% এর ভেতর পড়ে গিয়েছি। আর সবচাইতে বড় কথা কি জানো, ভালোবাসার মানুষের প্রতি সম্মান। তুমি একবার বলেছিলে সেই বয়স্ক ডাচ শেফকেঃ যে তুমি নাকি বিয়ের আগে সেক্স করতে আগ্রহী নও। আমি শুনেছিলাম তোমার সেই কথা, তোমার প্রতি সেদিন সম্মানটা আরো বেড়ে গিয়েছিল। কারণ, আমাদের ধর্ম কিন্তু এমনটাই বলে, তোমার কোরআন শরীফে যেমন বলা আছে, আমার বাইবেলেও তেমন বলা আছে। হয়তো আমি, ধর্ম কর্ম তেমন করিনা, কিন্তু আমি বিশ্বাস করি আমার ধর্মের কথাকে। তাছাড়া, আজ একজন, কাল আরেকজন- নাহ এটা কোনো জীবন হতে পারেনা। এর চাইতে তোমাদের দেশে তোমরা অনেক সুখী। তোমরা যদি একজনের সাথে সারা জীবন কাটিয়ে দিতে পারো, আমরা কেন পারবোনা বলো?

আমি যতই ইসাবেলার কথা শুনি, ততই অবাক হই। জানিনা, এই মেয়ে কোন ধাতুতে গড়া, এই কিনা ব্রিটিশ কন্যা?

আমরা রটার্ডাম ফিরে এলাম, দেখি মশিউর ভাই পার্সেল রিসিভ করেছে। খুলে মশিউর ভাইকে দেখাতে চাইলাম, উনি বললেন, একবারে ইসাবেলার সামনে খুলতে, সেটাই ভালো হবে।

খুব উল্লসিত আমি এই ভেবে যে ব্রিটিশ কন্যা অবশেষে বাংলাদেশী জামদানী শাড়ি গায়ে জড়াবে। ওকে দেখা করতে বলবো বলে কল দিতে ফোন বের করলাম, ঠিক এমন সময় ইসাবেলার কল, বললো, “ফেরদৌস, আগামীকাল তুমি একটু কিচেনটা সামলাবে তাই সকাল সকাল যেও, আমি বসকে (মশিউর ভাই) বলে দিচ্ছি আসতে পারবো না, ছুটি লাগবে। সপ্তাহখানেকের জন্য লন্ডন যেতে হবে। ইমারজেন্সী”

চলবে…………

এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৩)

Now Reading
এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-৩)

 

দ্বিতীয় পর্বের পর থেকে………..

ইসাবেলাকে জুস বানিয়ে খাওয়াবো নাকি খাওয়াবো না- এই প্রশ্নের কোনো উত্তর দিলাম না; কথার টপিক ঘুরিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, তোমার বাবা-মা কে জানিয়েছ যে তুমি অসুস্থ? ও বললো, থাক দরকার নেই। আমি তো আগামীকাল নাগাদ আশা করি সুস্থই হয়ে উঠবো,  তাদের টেনশন দিয়ে লাভ নেই। এই বলে ও ভেতরে চলে গেল।

DSC 3008.jpg

মশিউর ভাই এসে ইসাবেলাকে দেখে গেল আর গাড়িটা নিয়ে গেল। সাথে আমাকে সতর্কবাণী।  তার গাড়ি বা জরিমানা নিয়ে টেনশন না; টেনশন হলো আমাকে নিয়ে। কারণ এতে করে আমার রেসিডেন্স হারানোর ভয় আছে।

পরদিন থেকে যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আমি এক ব্যাগ আম এনে ইসাবেলার সামনেই কিচেনের এক কোণায় ফেলে রাখলাম। কাজ চলে কাজের গতিতে কিন্তু আড্ডা কমে গেছে। আমিও অত আগ্রহ দেখাই না, ইসাবেলাও হঠাৎ চুপচাপ। এভাবেই সপ্তাহখানেক কেটে গেল। পরের সপ্তাহও ওভাবেই কাটছিল, দেখলাম আমগুলো আর এক সপ্তাহ ওভাবে থাকলেই পঁচে যাবে। যাক না! টেবিলের এক পাশে ওগুলো ছিল। লাঞ্চ শেষ করে মাত্র কিচেনে ঢুকেছি আর ইসাবেলা হিংস্র বাঘিনীর মতো করে এসে আমার হাতটা ধরে দ্রুত পায়ে দোতলার স্টোর রুমে নিয়ে গেল। গিয়েই অঝোরে কান্না। আমি জানতাম, থমথমে আবহাওয়ার পরে এমন ঝড়-বৃষ্টিই আসবে। আমাকে তার প্রশ্ন, “কি করেছি আমি? কি দোষ আমার? সেদিন হসপিটালে আমাকে কোনো উত্তর না দিয়েই চলে গেলে, আম নিয়ে এসে এক কোণায় ফেলে রাখলে। কথা বলো না ঠিক করে। কি করেছি আমি বলো?”

তারপর আবার কান্না। জানি মেয়েদের চোখের কোণায় কান্না রেডিই থাকে। তারা অনেক কাঁদতে পারে, আর এই অভিমানের কান্নার সৌন্দর্য সেই বুঝতে পারে যে সেই মেয়েকে ভালবাসে। আমি আসলেই অবাক, কারণ ইউরোপিয়ান মেয়েদের আবেগ খুব সামান্যই কাজ করে, এরা অঝোরে সহজে কাঁদতে পারেনা। এদের কাছে কোনো একজনের প্রতি ভালোবাসা আর আবেগ সাময়িক।

কিন্তু এই ব্রিটিশ কন্যা আমার সকল ধারণাকে পালটে দিতে শুরু করলো। আসলে কাছ থেকে কারো সাথে না মিশলে অনুধাবন করাটা বেশ কঠিনই।

সত্যি কথা বলতে আমি অমনটা করেছিলামই আমার প্রতি তার আবেগ কিংবা অনুভূতি বোঝার জন্য। ও চুপ করে তখন দাঁড়িয়ে আছে। কাছে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরলাম বুকের ভেতরে। ও ওভাবেই রইলো। বুঝলাম,  অভিমান ভাঙেনি। কপালে ছোট করে একটা চুমু দিয়ে আমি ওকে ছাড়তে যাবো, ঠিক তখনই ও আমার হাতটা টেনে ধরলো। বেশ কিছুক্ষণ দুজন দুজনার চোখের দিকে তাকিয়ে ছিলাম। মনে হচ্ছিলো, বছরের পর বছর যদি ওভাবে নীল নয়নার দিকে তাকিয়ে থাকতে পারতাম? এমন ভাবতে ভাবতেই নিচ থেকে কলিগের ডাকে ঘোর ভাঙলো। ওরা বুঝতে পারছিলো,  আমাদের ভেতরে এক ঠান্ডা ঝড় বয়ে যাচ্ছে।

আমি নিচে এলেও ইসাবেলা উপরেই রয়ে গেল। পরে ও নিচে নেমে এলো, কোনো কথা হলোনা আর। বাসায় আসার সময় আমগুলো নিয়ে এলাম; আমার মনের অবস্থা তখন খুব খারাপ। শেয়ার করারও কেউ নেউ। মশিউর ভাইকেও বলতে পারছিনা লজ্জায়। ভেতরে ভেতরে শেষ হয়ে যাচ্ছি, ভালোবাসার আগুন কি ভয়ানক টের পাচ্ছিলাম তখন।

ইসাবেলাকে একটা কল দিলাম, ফোন ধরলো না। কিছু সময় পর ও নিজেই নক করলো, বললো গোসলে ছিল। জিজ্ঞেস করলাম, এখন কিসের গোসল? ও জবাব দিল, “আমার যখন মন খারাপ থাকত তখন আমি বিয়ার খেতাম, কিন্তু কাউকে প্রতিজ্ঞা করার পর আমি নিজেকে কন্ট্রোল করতে শাওয়ার এর নিচে গিয়ে নিজেকে শান্ত করছি।”

ভালো করছো বলে ফোনটা রেখে দিলাম। তারপর রান্না ঘরে গিয়ে মশিউর ভাই এর জন্য কিছু আম রেখে সব আম বের করে কেটে ব্লেন্ডার এর ভেতর দিলাম।

আধা ঘন্টার ভেতর পুরো তিন জগ জুস বানিয়ে ৬ লিটারের বড় বোতলে ভরে রওনা দিলাম ইসাবেলার বাসার উদ্দেশ্যে। ওকে না বলেই। ওর বাসার সামনে গিয়ে কল দিলাম, জিজ্ঞেস করলাম, বাসায় আছে কিনা! বললো, হ্যাঁ, ডিনার রেডি করছি, কেন? কিছু বলবে?

আমি ঐ মানসিক কষ্টের সময়টাতেও কিভাবে যেন রসিকতা করে বললাম, তোমার জন্য একটা “ওয়ার্কার-রোবট”  পাঠিয়েছি। দরজা খোলো, বাইরে সে দাঁড়িয়ে আছে।

দরজা খুলে আমাকে দেখে সে একটুও বিস্মিত হয়না। বুঝেছিল হয়তো যে আমিই হবো কারণ ওয়ার্কার রোবট খুব দামী আর সেটা কেনার সামর্থ সবার নেই। জুসের বোতলটাও কালো কাপড়ের ব্যাগে ঢুকিয়ে এনেছিলাম। আমাকে ভেতরে ঢুকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, এদিকে কি কাজে এসেছিলে? বললাম, আমস্টারডাম থেকে এক বন্ধু কিছু জিনিস এনেছিল আমার জন্য; সেগুলো বাস স্টপেজ থেকে আনতে আরকি! জিজ্ঞেস করলো, ডিনার করেছো? না বোধক উত্তর পেয়ে আমার অনুমতি না নিয়েই আমার জন্যও ডিনার রেডি করছিল। দুজন নীরবে ডিনার করলাম। একটা দুইটা কথা হয়েছিল মাত্র। আমি খাচ্ছিলাম আর ভাবছিলাম, খুব বেশী  আবেগী মেয়েদের অভিমানটাও খুব বেশী হয় আসলে। ইসাবেলার ক্ষেত্রে সেটাই প্রযোজ্য। বড় বেশী অভিমানী।

চিন্তায় চিন্তাগ্রস্ত ছিলাম, আমের জুস দিয়েও অবশেষে তার রাগ ভাঙবে কিনা।

খাওয়া শেষে ও কিচেনে ঢুকলে আমি সাথে সাথে ব্যাগ থেকে বোতলটা বের করে টেবিলে রাখি আর রান্না ঘরে গিয়ে পেছন থেকে ওর দুই চোখ হাত দিয়ে চেপে ধরি। ও একটু ভয় পায়, জিজ্ঞেস করে, কি করছো তুমি? বললাম, আমাকে ভয়ের কিচ্ছু নেই। আমার সাথে চলো, এই বলে ওর চোখ বেঁধে ওকে টেবিলের কাছে এনে ওর চোখ খুলে দিলাম। আমের জুস দেখেই মুখে হাসি তার। ভাবলাম বেঁচে গেলাম এইবারের মতো। কিন্তু না। এক ঝলক হাসি দিয়েই সে থম করে থমথমে মুখ নিয়ে গাল ফুলিয়ে আবারো চেয়ারে বসে পড়লো।

বুঝলাম কি করতে হবে।

তার পাশে চেয়ার নিয়ে বসে এক গ্লাস জুস নিয়ে নিজ হাতে খাইয়ে দিলাম, বললো, আরো দাও; তিন গ্লাস জুস শেষ করে হঠাৎ আমার বুকের উপর মাথা এলিয়ে দিল। এমন আচরণে আমি অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম।

ইসাবেলা আমার বুকে মাথা রেখে খুব আবেগী কন্ঠে বললো, “ফেরদৌস, আমি খুব একা, আমাকে ছেড়ে যেওনা প্লিজ।”

আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়। কি জবাব দেবো ভাবছিলাম।  এমন মুহূর্তে আসলে কি জবাব দেয়া উচিত?

 

চলবে………..

এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-১)

Now Reading
এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-১)

DSC 1202.jpg

গত গ্রীস্মের কথা বলছি।

ভার্সিটি বন্ধ হয়ে গেছে আড়াই মাসের জন্য। ইউরোপের সকল স্কুল, কলেজ আর ভার্সিটি জুলাই থেকে সেপ্টেমবর পর্যন্ত বন্ধ থাকে। ভার্সিটি বন্ধ হয়ে যাওয়া মানেই একটা কাজ খুজেঁ কিছু অর্থ উপার্জন করা যেন পরের সেমিষ্টারে পকেটে টান না পড়ে। আর বাবার কাছেও না বলা লাগে, বাবা টাকা পাঠাও; যদিও স্কলারশিপ রয়েছে কিন্তু নেদারল্যান্ডের মত ধনী আর খরুচে ইউরোপিয়ান দেশে তা দিয়ে চলাটা খুব কষ্টসাধ্য হয়ে যায়।

ভার্সিটি বন্ধ হয়ে গেলে রাজধানী আমস্টারডামে একটা কাজ পেলাম, কিন্তু তা দিয়ে ঠিক আমার পোষাচ্ছিল না। তাই বড় ভাই-বন্ধু মশিউরকে বললাম বন্দর নগরী রটার্ডামে আমার জন্য একটা কাজ দেখার জন্য। তিনি সেখানে তখন কেএফসিতে ম্যানেজার। তিনি বললেন, আমার এখানেই লোক লাগবে, দেরী না করে চলে আসো।

আর কে ঠেকায় আমাকে? পরদিনই লাগেজ গুছিয়ে ভোরের ট্রেনে বসে পড়লাম। আমস্টারডাম থেকে রটার্ডাম পৌছাতে ২ ঘন্টা মত সময় লাগে। সুপার স্পিড ট্রেনে বসে চিন্তা করি, আমাদের বাংলাদেশে কবে এমন ট্রেন হবে? খুলনা থেকে ঢাকা যেতে মাত্র আড়াই ঘন্টা লাগবে!

রবিবার ছুটির দিন, স্টেশনে মশিউর ভাই এলেন আমাকে রিসিভ করতে। উনার বাসাতেই থাকা যাবে শুনে খুব ভালো লাগলো। ফ্লাটে আমি আর উনি দুই বাংলাদেশী আর দুইজন বেলজিয়ান। বেলজিয়ানরা কাপল।

বাসে করে বাসায় গেলাম, আধা ঘন্টার পথ। যাওয়ার পথে দেখালেন কোথায় কাজ করতে হবে। বাসা থেকে বাসে ১৫ মিনিটের পথ। বাসায় ঢুকলাম, ফ্রেশ হলাম, দুই ভাই এক সাথে খেলাম। সারা নেদারল্যান্ডে এই একটা মানুষই আছে যাকে বিশ্বাস করা যায়। বেলজিয়ান কাপলদের সাথে দেখা হলো কিচেনে। খুবই মিশুক।

রুমে গিয়ে ফেসবুকিং করতে করতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম,  খেয়ালই নেই। দুপুরে খেয়ে বিকেলে একটু রটার্ডাম শহরে ঘুরতে বের হলাম। অসম্ভব সুন্দর শহর। নেদারল্যান্ড এর প্রত্যেকটা শহরই সুন্দর। গরমকাল হলেও খুব একটা যে গরম তা নয় কিন্তু। রাতে কোম্বল ব্যবহার করা লাগে। দারুণ আবহাওয়া। সব মিলিয়ে ভালোই লাগছিল।

রাতে ডিনার করতে গেলাম একটা ইতালিয়ান রেষ্টুরেন্টে। আমি ইতালিয়ান খাবারের কঠিন ভক্ত। মশিউর ভাই বললেন, সকাল সকাল ঘুমিয়ে পড়তে কারণ সকাল সাড়ে আটটায় কাজে ঢুকে যেতে হবে। তাই বাসায় এসে দ্রুত ঘুমিয়ে পড়লাম।

সকাল আটটার বাসে দুই ভাই রওনা দিলাম কাজের উদ্দেশ্যে। আমস্টারডাম এর কেএফসিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা থাকায় কাজ বা কাজের ধরণ নিয়ে তেমন টেনশান হচ্ছিলো না। গিয়েই সবার সাথে পরিচিত হলাম, আমাকে সহজেই তারা গ্রহণ করে নিল। প্রতিষ্ঠানের টি-শার্ট পরে নিলাম; মশিউর ভাই আমাকে জানিয়ে দিলেন চিকেন-বাকেট সেকশনে আমার কাজ। কিন্তু কি করতে হবে সেটা ঠিক করে দিবে সেকশন বস। কিন্তু তিনি তখনও না আসায় বসে নতুন কলিগদের সাথে গল্প করছিলাম। একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, বস ডাচ কিনা? উত্তরে জানলাম তিনি ব্রিটিশ মহিলা, খুব বেশি বয়সও না নাকি, ৩০ এর নিচে হবে। উনার কথা বলতে বলতেই উনি রুমে ঢুকলেন, ব্যাগ রেখেই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, So, you are the new guy? Are you alright? বললাম, Yes, I am; উনি হ্যান্ডশেক করার জন্য হাত বাড়িয়ে দিলেন আর বললেন, I am Isabella and you? I am Ferdous from Bangladesh……. মুখের কথা কেড়ে নিয়ে উনিও আমার সাথেই বাংলাদেশ উচ্চারণ করলেন; এটাই বোঝাতে চাইলেন যে উনি জানেন আমার ব্যাপাDSC 2122.jpgরে। মশিউর ভাই এর কাছ থেকে জেনেছে আরকি! তারপর বললেন, Really It is my pleasure to have a Bangladeshi in my section, I love Bangladeshi people. Our Boss Moshiur is so kind and helpful. I hope you will be enjoying a lot with us – বলেই সুন্দর একটা হাসি দিয়ে ব্যাগ থেকে একটা কিটক্যাট বের করে দিলেন আর বললেন, I love chocolates. তাকে বললাম যে আমিও চকোলেট পছন্দ করি; উনি জেনে খুব খুশি হলেন। এরপর জিজ্ঞেস করলেন আমার কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে কিনা? আমি বললাম আছে, শুধু একবার কি করতে হবে বুঝিয়ে দিলেই চলবে। আমার কাজের পূর্ব অভিজ্ঞতা আছে জেনে উনাকে যেন নির্ভার মনে হচ্ছিলো। এটাই স্বাভাবিক, কারণ কাজ না জানলে মিনিমাম এক সপ্তাহ থেকে দুই সপ্তাহ নতুন ব্যক্তির পেছনে আলাদা সময় দেয়া লাগে এবং কাজও ধীরগতিতে চলে অনেকটা। বিকেল পর্যন্ত ভালোই ব্যস্ত ছিলাম আমরা। লাঞ্চ টাইমে একটা টেবিলও ফাঁকা ছিলোনা, বুঝলাম, রটার্ডামেও আমস্টারডামের মত ভালো ব্যবসা হয়।

দুপুরের খাবার খেলাম তিনিটার দিকে। আমি, আমার ডাচ কলিগ এঞ্জেলিনা আর বস ইসাবেলা বাকি ছিলাম খেতে। একই টেবিলে বসে খাচ্ছিলাম আর অনেক গল্প হচ্ছিলো। ইসাবেলা কয়েক ঘন্টার ভেতরেই আমার খুব ভালো বন্ধু হয়ে উঠলো, ইউরোপিয়ান দেশগুলোতে বন্ধু হতে কেউ বয়স দেখেনা, ইসাবেলা হয়তো আমার থেকে ৪-৫বছরের বড় হবে। সে আমার ব্যাপারে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করলো, কোথায় পড়াশুনা করছি, কি নিয়ে পড়ছি, কি টার্গেট ভবিষ্যতে, দেশে কে কে আছে ইত্যাদি ইত্যাদি। আর দেখলাম উনি বাংলাদেশ সম্পর্কে অনেক কিছুই জানেন। লন্ডনে প্রচুর বাংলাদেশী বসবাস করে এটাও জানালেন, তার ভার্সিটি লাইফে অনেক বাংলাদেশী বন্ধু ছিল। উনি নিজের ব্যাপারেও অনেক কিছু বললেন, উনার মা ডাচ, আর বাবা ব্রিটিশ। কিন্তু উনি নাকি নেদারল্যান্ডকেই বেশি পছন্দ করেন বলে এখানেই বছরের ৯-১০ মাস থাকেন। ভালো ডাচও বলতে পারেন। ডাচ কলিগ এঞ্জেলিনা আমাকে জিজ্ঞেস করলো, আমি ডাচ জানি কিনা? না বোধক উত্তর পেয়ে বললো, হুম, তোমাকে আমি ডাচ শেখাবো, পরে মজা করে বললো, চিন্তা করোনা! আমার দেশে থাকবে আর আমার ভাষা জানবেনা, উহু তাতো হবেনা, অবশ্য তুমি যদি আমাকে বাংলা শেখাও। এটা শুনে তিনজনই একসাথে হেসে উঠলাম।  ইসাবেলা তখন খুব আগ্রহ সহকারে আমাকে জিজ্ঞেস করলো, ফেরদৌস, আমাকে বাংলা শেখাবে?

চলবে…………