সুজাতারা আর ঘরে ফিরবে না…..

Now Reading
সুজাতারা আর ঘরে ফিরবে না…..

-আপু একটা মালা নিবেন? বেলী ফুলের মালা?

মিষ্টি কন্ঠস্বরটায় সামনে তাকিয়ে দেখি দুহাত ভর্তি ফুলের মালা হাতে সামনে একটা মিষ্টি মেয়ে।

-কিরে কি নাম তোর?
-সুজাতা!

মিষ্টি একটা হাসির সাথে জবাব পেয়ে চমকে গেলাম।

-এত সুন্দর নাম কে রাখলো তোর? জানতে চাইলাম আমি।

– “আমার মায় রাকছে।
এক বাড়িত কাম করতো মায়,তার মাইয়ার নাম আছিলো সুজাতা। মায়ে তারে বেবাক আদর করতো। একদিন মায়েরে পিডাইয়া তারা বাগাইয়া দিলো! হের কয়দিন পর আমি আইলাম দুনিয়ায়,মায় নাম রাকলো সুজাতা।”
বিরাট কাহিনী শেষে আবারো সুন্দর একটা মিষ্টি হাসির ঝলক।

 

মেয়েটাকে বেশ ভালো লাগলো। জ্যামে বসে বসে গল্প করে বেশ ভালোই সময়টা কাটলো। জ্যাম ছেড়ে দিলে মালাটা নিয়ে হাতে কিছু নোট গুজে দিলাম। মেয়েটা হাসিমুখে বিদায় দিলো একদম অনেকদিনের চেনা কেও যেনো!

জীবন চলে জীবনের গতিতে। মাঝে মাঝে পিছু থেকে হাতছানি দিয়ে অতীত স্মরন করিয়ে দিয়ে যায় শুধু।

এই জীবন বড্ড বিচিত্র!
প্রচন্ড শীতেও কোম্পানির প্রচারের চিন্তা করতে হয় কর্পোরেট জগতে! শীতের পোশাক বিতরন হবে এয়ারপোর্ট,শেওরা বাজার এলাকায়। মোট কতঘর বিতরন করবো হিসেবের দ্বায়িত্ব এসেছে আমার উপর। দুজনকে সাথে নিয়ে ভর দুপুরে গেলাম শেওড়া বাজারের পাশের বস্তিতে।

হটাৎ একটা পরিচিত মুখ যেনো চোখে পড়লো।

-এই মেয়ে শুনো! কি নাম তোমার? এখানেই থাকো?

একবার মাত্র ঘাড় ফিরিয়ে তাকালো আমার দিকে ও। চোখ বড় বড় করে আমার সাথের দুজনকে দেখলো তারপরই পড়িমরি করে দৌড়! আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে আছি।

পাশের এক মহিলা ফ্যাক ফ্যাক করে হেসে এতক্ষনে কথা বললো!

-আফা, আপনের লগের স্যারগো রে দেইক্ক্যা ডড়াইছে হেল্লাইগ্গ্যা এমনে দৌড়পারছে। বেডা মাইনষেরে ডড়ায়।

-কেনো! কি হয়েছে ওর! কে মেয়েটা?

– “অয় আমগো পারুলের মাইয়্যা সুজাতা। বড় রাস্তায় মালা বেঁচে। গত মাসে একদিন গেলো সকালে ওইট্টা, সারাদিন আর খবর নাই মাইয়্যার!
মাইঝ রাইতে চাইর স্যার আইয়া গাড়িত্তে ফালাই থুইয়া গেলো। সেই থাইক্কা কোনো স্যার ডাকলেই খালি দৌড়পারে।”

সম্পূর্ণ উত্তাপবিহীন কন্ঠে যেনো সংবাদ পাঠ করে গেলো মহিলা! আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে।

– “লোকগুলোকে পুলিসে দিলেননা কেনো ধরে! মেয়েটাকে ডাক্তার ও দেখায়নি ওর মা?”

-“কি কন আফা! ওগোরে পুলিশে দিলে আমরা আর বাইচ্যা থাকুম? এইরকম তো পেরতিক রাইতেই অয়।
আর ডাক্তরে কি করবো? যার যাওয়ার হেয় তো যাইবোই। মাইন্না লওয়া ছাড়া উপায় নাইগো আফা।”

 

যার যাওয়ার সে যাবেই! কি ভয়ানক সহজ সরল স্বীকারোক্তি এদের মুখে!

বেঁচে থাকার জন্য স্বতীত্বের বলী দেয়াটা এতই সহজে মেনে নেয়া!

নাকি রাতের আধারে নিজের সন্তানের জন্যও গুমরে গুমরে কাঁদেন এই উত্তাপহীন কন্ঠেই???