এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-২)

Now Reading
এক ব্রিটিশ কন্যার প্রেমকাহিনী ও একজন বাংলাদেশী তরুণের গল্প !! (পর্ব-২)

প্রথম পর্বের পর থেকে…..

ইসাবেলার অমন আবেগী প্রশ্নে আমি তার দিকে অবাক চোখে তাকালাম আর উত্তর দিলাম,  “কেউ আমার কাছে আমার মাতৃভাষা শিখতে চেয়েছে আর আমি তাকে তা শেখাবো- এর চাইতে বড় সম্মানের আর কি হতে পারে?”

ইসাবেলার প্রতিউত্তর আমাকে আরো বেশি অবাক করলো। বললো, তোমার দেশ এই পৃথিবীর একমাত্র দেশ যারা মাতৃভাষার জন্য লড়াই করেছে। দেশকে পাকিস্তানিদের থেকে মুক্ত করেছে। মাতৃভাষার প্রতি এমন নজির তো দেখা যায়না। তাইনা?

অস্ফুটভাবে আমার মুখ থেকে বের হয়ে এলো, তুমি কি করে জানো আমার দেশের এত খবর? সে বললো, লন্ডনে এক বাংলাদেশি মহিলার সাথে তার দেখা হয়েছিল, বেশ বয়স্ক।  ৭১’ এ মুক্তিযুদ্ধের সময় তার মেয়েকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয় ও আরো অনেক কথা। এই খবর জানার পর সে বাংলাদেশ সম্পর্কে বিস্তারিত ঘাটাঘাটি শুরু করে। প্রচুর পড়াশুনা করে।  সেই থেকে নাকি আমার দেশ আর মানুষের প্রতি তার এত আগ্রহ।

প্রথম দিনের কাজের অভিজ্ঞতা, নতুন কিছু বন্ধু পাওয়া, ইসাবেলার মত সেকশন বস পাওয়া, সব মিলিয়ে কাজের ক্ষেত্রে এমন দিন আগে কখনো আসেনি।

কাজ শেষে বাসায় চলে এলাম, মশিউর ভাই পরে আসবে বললো। উনি বাসায় এলে ডিনার করতে বসলাম, জিজ্ঞেস করছিলো, কি অবস্থা, ইসাবেলার সাথে প্রথম দিনেই এত খাতির, না জানি পরে কি হয়? ইসাবেলা কিন্তু লাইফ পার্টনার হিসেবে দারুণ মেয়ে। মশিউর ভাই কি বোঝাতে চাইলেন বুঝলাম, বললাম, নারে ভাই, বিদেশিনী ঘরে আনার ইচ্ছে নেই। উনি, মুচকি একটা হাসি দিয়ে খেতে লাগলেন, আর কিছু বললেন না; তবে খাওয়া শেষে রুমে ঢোকার সময় খোঁচা মেরে বললেন, কয়দিন পর যেন এমন না শুনি,”ভাই, আব্বা-আম্মারে একটু বোঝান”; কিংবা “ভাই, কাজী অফিস কোথায় পাবো?” আমাকে লজ্জা দিয়ে উনি রুমে চলে গেলেন। আমিও মনে মনে হাসতে লাগলাম, নাহ, অস্বীকার করি কি করে, সত্যিই ইসাবেলা কিন্তু দারুণ একটা মেয়ে। ভালোলাগার মত, ঠিক যাকে ভালোবাসা যায়।

পরদিন থেকে ইসাবেলার চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে কষ্ট হচ্ছিলো, আর ও আমার সাথে শুধুই দুষ্টুমি করতো। ফুল সাDSC 3009.jpgইজ পিজ্জা এনে একদিন বললো, এই পিজ্জা যদি শেষ করতে পারি, তাহলে আমাকে নাকি Holland – America লাইনে ইংল্যান্ড ঘোরাতে নিয়ে যাবে। বলে রাখা ভালো, Holland – America Line টুরিষ্টদের জন্য খুব নিরাপদ আর বিশ্বাসযোগ্য টুরিজম ভিত্তিক জাহাজ।

অত বড় পিজ্জা সত্যিই শেষ করা সম্ভব নয়। তাই আমিও ওকে ধরলাম, বললাম, ফিফটি-ফিফটি। তুমি যদি তোমার অংশ শেষ করতে পারো, তাহলে তোমাকে আমি বাংলাদেশে নিয়ে যাবো এবং সেটা আমার ভার্সিটি খোলার আগেই। বেশ, যেমন কথা তেমন কাজ, বুঝতে পারছিলাম, ওর শেষ করতে খুব কষ্ট হচ্ছিলো কিন্তু ওর চোখে মুখে তখন আমার সাথে বাংলাদেশে যাবার প্রবল ইচ্ছা। ওর ঐ আগ্রহ দেখে আমিও আমার অংশ শেষ করে ফেললাম। ব্যস, ডিল ফাইনাল: আমি আগষ্টের শেষ নাগাদ ওকে দেশে নিয়ে যাবো আর ও আমাকে ফাইনাল এক্সামের পর ইংল্যান্ড নিয়ে যাবে। ওর বাংলাদেশে যেতে ভিসা লাগবেনা,  আমার ইংল্যান্ড এর ভিসার মেয়াদ শেষ। নতুন করে করাতে হবে। ও বললো, আমি ভিসা করিয়ে দেব আমার রেফারেন্সে যেহেতু আমি তোমাকে আমার দেশ দেখাতে নিয়ে যাচ্ছি। ভিসা নিয়ে টেনশন করোনা।

KFC এর কাজ তেমন কঠিন না, প্রতিদিন সময় করে সে ৩০ মিনিট বাংলা শিখতো আমার কাছে। আর আমি শিখতাম ব্রিটিশ একসেন্ট। বাংলা শিখতে ওর যতটানা বেগ পোহাতে হচ্ছিলো, ওর ইংরেজি উচ্চারণ শিখতে আমার দাঁত ভেঙে যাচ্ছিলো।

যাইহোক, এভাবেই অনেক আনন্দের সাথে দিনগুলো কাটছিল। মশিউর ভাইও মাঝেমাঝে যোগ দিতো আমাদের আড্ডায়। ডাচ বন্ধুরাও বাংলা শেখার চেষ্টা করতো; আমিও টুকটাক ডাচ শেখার চেষ্টা করতাম। নতুন ভাষা শেখার মজাটাই অন্যরকম।

একদিনের কথা, সেদিন শুক্রবার কিংবা শনিবার ছিল, সঠিক দিনটা ঠিক মনে করতে পারছি না। রাত ১টা বাজে। মশিউর ভাই আমস্টারডাম বন্ধুর বাসায়। আমি একা।  হঠাৎ ইসাবেলার ফোন, বললো, ফেরদৌস তুমি কি এখনই একটু মিউনিসিপাল হসপিটালে আসতে পারবে? কন্ঠ শুনে বুঝতে বাকি রইলো না, ও দারুণ অসুস্থ। তাই কিছু আর জিজ্ঞাসা করিনি, দেরী না করে মশিউর ভাই এর BMW নিয়ে ঝড়ের বেগে হসপিটালের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম, তখনও আমার ইউরোপিয়ান লাইসেন্স হয়নি। কন্ট্রোল ধরলে বড় বিপদ, আনুমানিক ১২০০ ইউরো ফাইন। সাথে বোনাস মশিউর ভাইকেও জরিমানা।

ফাইনের কথা ভুলে আল্লাহর নাম ডাকতে ডাকতে পৌছে গেলাম, গিয়ে দেখি ইসাবেলার খুব জ্বর সাথে আরো শারীরিক সমস্যা। আমাকে দেখে একটা হাসি দিয়ে আমার হাত তার হাতের ভেতর নিয়ে বললো, তুমি এসেছো তাহলে? আমি জানতাম তুমি আসবে। বিশ্বাস করো, আমি এখানে একদম একা। দেখার কেউ নেই। এক ঘন্টা হলো হসপিটালে…… ওকে থামিয়ে দিয়ে বললাম, চুপ থাকো, আর কারো থাকার দরকার নেই, আমি আছি তো! তুমি সুস্থ হয়ে যাবে। আমার কথা শুনে আমার হাতের পিছে একটা চুমু দিলো আর হাতটা ওর হাতের ভেতর নিয়ে রেখে দিল।  আমি ওর সোনালী চুলে হাত বিলিয়ে দিচ্ছিলাম,  ডাক্তার এসে বললো, চিন্তা করার মত কিছু নেই, আজ রাতেই জ্বর নেমে যাবে। আরো বললো, সে যদি সত্যিই সুস্থ আর ভালো থাকতে চায়, তাকে বিয়ার কিংবা অ্যালকোহল থেকে দূরে থাকতে বলুন। তার লিভার বেশ খানিকটা ক্ষতিগ্রস্ত।  শুনে খুব বেশি অবাক হলাম, কারণ যে মেয়েকে কখনো ধূমপান করতে দেখলাম না, সে কি করে এত অ্যালকোহল নেয় তা আমার মাথায় ঢুকলো না; আর এতটাই নেয় যে তার লিভারে সমস্যা হয়ে গেছে?

ও তখন ঘুমে বিভোর, রাত তিনটা বাজে। আমার দু-চোখে ঘুম নেই, এক অজানা অস্থিরতা বয়ে চলেছে মনের ভেতরে। নিজেকে বোঝাতে পারছিনা, কেন এই ব্রিটিশ কন্যার জন্য আমার মন এত ব্যাকুল হয়ে পড়েছে? আমি কি তবে তার প্রেমে পড়ে গিয়েছি? এমন ভাবতে ভাবতেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম ঠিক খেয়াল নেই!

হঠাৎ আমার গালে কারো হাতের ছোয়াঁতে ঘুম ভেঙে গেল। জেগেই দেখি ইসাবেলা। আমাকে জাগতে দেখে তার মলিন মুখে এক রাশ হাসি ছড়িয়ে পড়লো। আমাকে বললো, “তুমি আমার বিয়ার/অ্যালকোহল নেওয়ার কথা শুনে খুব বিচলিত তাইনা ফেরদৌস? ইউরোপিয়ানদের এই একটা অভ্যাস আছে, জানোই তো; আমার বদ অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল। এই তোমাকে ছুঁয়ে আমি প্রতিজ্ঞা করলাম, আর কখনো কোনদিন অ্যালকোহল নেব না। তোমার বাবা তোমার জন্য বাংলাদেশ থেকে যে আম পাঠিয়েছে, সেগুলো দিয়ে আমাকে প্রতিদিন জুস বানিয়ে দেবে তো?”

চলবে……………