যেভাবে ভালো আর্টিকেল লিখবেন

Now Reading
যেভাবে ভালো আর্টিকেল লিখবেন

আমার এই আর্টিকেলটি আমি বাংলাদেশীজম ফুটপ্রিন্টের সকল ফুটপ্রিন্টারদের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করছি।

প্রথমেই বলে রাখা ভালো, ফুটপ্রিন্ট হলো বাংলাদেশের সর্বপ্রথম ফ্রিল্যান্সিং সাইট যেখানে যেকোনো বাংলাদেশী ঘরে বসেই লেখালেখির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন করতে পারবেন। প্রায় এক মাস হতে যাচ্ছে এটির বয়স। অনেক লেখা আমরা দেখতে পাচ্ছি, অনেক লেখক খুব ভালো লিখছেন।

ব্যক্তিগতভাবে আমি আমার ফেসবুকে অনেক মেসেজ পেয়ে থাকিঃ “কিভাবে ভালো লিখতে পারি? একটু হেল্প চাই”- এই টাইপের। কারণ, অনেকেই তাদের লেখালেখি শুরু করেছেন এই ফুটপ্রিন্ট দিয়েই; আমি বলছিনা যে ফুটপ্রিন্টে লেখালেখি করে আপনি মিলিয়নিয়ার হয়ে যাবেন, কিন্তু গাইডলাইন মেনে নিয়মিত লেখালেখি করলে আর আপনার লেখা পাবলিশ হলে অন্তত নিজের হাত খরচটা সহজেই তুলতেই পারবেন।

আজকের এই আর্টিকেল লেখার মূল উদ্দেশ্য হলোঃ

১। ফুটপ্রিন্টাররা যেন আরো ভালো লেখা লিখতে পারেন

২। নির্ভুল বানানে আরো উন্নত ভাষায় ও লেখার মাঝে যুক্তিখন্ডনে আরো বেশি পারদর্শী হতে পারেন

৩। তাদের লেখার মান যেন প্রোফেশনাল লেভেলে আসতে পারে, এছাড়াও

৪। সাবলীল ভাষায় যুক্তিসম্পন্ন লেখা উপহার দিতে পারেন।

আমি ব্যক্তিগতভাবে সব সময় একটা কথা বলে থাকি আমার ফুটপ্রিন্টার বন্ধুদের উদ্দেশ্যে; সেটি হলঃ

“ভালো লেখা লিখতে হলে কিছু ভালো বই পড়তে হয়, ভালো চিন্তায় মগ্ন হতে হয়; কিছু ভালো মানুষের সাথে মিশতে হয়, সমাজ আর চারপাশকে বুঝতে শিখতে হয়”

আর কথা না বাড়িয়ে চলে যাচ্ছি মূল টপিকেঃ

১। কোন বিষয়ের উপর লিখবেন সেটি নির্ধারণ করাঃ

কি নিয়ে লিখবেন, সেটি প্রথমেই ঠিক করে নেয়া উচিত। যেমনঃ আপনার মাথায় এলো, আপনি মিউজিক বা গান-বাজনা নিয়ে কিছু লিখবেন; এখন, গান-বাজনার ব্যাপ্তি তো অনেক বড়, তাহলে এর কোন সাইড নিয়ে লিখবেন? বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে লিখতে পারেন, বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যান্ড দল নিয়ে, তাদের জনপ্রিয় গান, এলব্যাম, ব্যান্ডের জনপ্রিয় লাইন-আপ- ইত্যাদি প্রসঙ্গে। আপনাকে অবশ্যই সঠিক বিষয়বস্তু প্রথমেই নির্ধারণ করে নিতে হবে। আপনি আপনার লেখার টপিক বা বিষয়বস্তু সম্বন্ধে কিছু পয়েন্ট আউট করে রাখতে পারেন যা লেখার ক্ষেত্রে খুব গুরুত্বপূর্ণ।

২। পূর্বপ্রস্তুতি বা পূর্বজ্ঞান থাকাঃ

লেখা শুরু করার আগে কিছুটা পূর্বপ্রস্তুতি কিংবা পূর্বজ্ঞান থাকা প্রয়োজন। যা আপনাকে পুরোদমে লিখতে সাহায্য করবে; লেখার মূল টপিক অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত লেখা লিখতে সহায়ক হবে। যেমনঃ কিছুদিন আগে আমি ড্রোন বিষয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম এই শিরোনামেঃ “যদি বাংলাদেশের ড্রোন বিমান থাকতো!”। তো, এই ড্রোনের ব্যাপারে আমার জ্ঞান খুব একটা ছিলোনা বললেই চলে, আমি কি করলাম? আমি ড্রোন এর ব্যাপারে সময় পেলেই পড়াশুনা করতাম। এটি কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, কিভাবে আকাশে উড়ানো হয়, কোন ধরণের ড্রোন কোন কাজে ব্যবহার করা হয়, এমনকি এটি কিভাবে তৈরী করা হয়। এছাড়াও ড্রোন নিয়ে ইউটিউবে ভিডিও দেখেছিলাম প্রচুর।

সুতারাং, কোন কিছু শূণ্য জ্ঞান নিয়ে না লেখাটাই শ্রেয়।

৩। পাঠকদের চাহিদা বুঝে লেখাঃ

আপনার লেখাটি কোন ধরণের পাঠকের কাছে পৌছাচ্ছে, কোন বয়সী, কোন দেশী, তারা কেমন লেখা আশা করে – সব মিলিয়ে পাঠকের কথা , তাদের চাহিদার কথা মাথায় রেখে লিখতে হবে। যেহেতু, আপনি বাংলাদেশীজম এর একটি প্রজেক্ট থেকে লিখবেন, সুতরাং অবশ্যই এটি মাথায় রাখতে হবে বাংলাদেশের মানুষ কোন ব্যাপারটিকে বেশি প্রাধান্য দেয়।

৪। শব্দশৈলী ও নির্ভুল বানানে মনোযোগী হওয়াঃ

শব্দশৈলীকে একটা আর্টিকেলের প্রাণও বলা যেতে পারে। কারণ, লেখাতে আপনার শব্দ নির্বাচন যত বেশি সাবলীল হবে, প্রাণোচ্ছল হবে, আপনার পাঠকদের কাছে আপনার লেখা তত বেশি আকর্ষণীয় হবে। যেমন, আমার এই লেখাতে আমি বঙ্কিমচন্দ্রের পুরোনো লেখার মত এমন কোনো শব্দের ব্যবহার করছি না, যা কিনা মানুষের জ্ঞানের বাইরে, আবার, এমন কোনো শব্দও ব্যবহার করছিনা যা পড়তে খুব খারাপ শোনায়। আপনার লেখার ভাষাগত দিক নির্ভর করে শব্দশৈলীর উপরে।

এছাড়াও শুদ্ধ বানান প্রকাশ করবে আপনার সেই ভাষার উপর দক্ষতা। শুদ্ধ বানান লিখতে অবশ্যই নিজস্ব জ্ঞান থাকাটা অত্যাবশ্যকীয়। বানানের ব্যাপারটা গড়ে ওঠে সেই প্লে-গ্রুপ বা ক্লাস ওয়ান পরবর্তী সময় থেকেই। যারা স্কুল আর কলেজে বাংলা বানানের প্রতি সমীহ দেখায়নি, তারা তো বাংলা বানান ভুল করবে- এটাই স্বাভাবিক। যারা বানান ভুল করেন, তাদেরকে বলছি, বানান সন্দেজনক মনে হলে বাংলা অভিধান কিংবা অভ্র টাইপিং সফটওয়্যার ব্যবহার করতে পারেন। আপনার বন্ধু বা কাছের কারো সাহায্যও অনেক বড় ভূমিকা পালন করতে পারে বানান শুধরানোর ব্যাপারে। এটি অবশ্যই একদিনে ঠিক হবেনা, কারণ, ভুলের ব্যাপারটা একদিনে গড়ে ওঠেনি; তাইনা? সুতরাং ধৈর্য ধরে চেষ্টা করতে থাকুন।

৫। বাক্যে সঙ্গতি ঠিক রাখা ও যতি চিহ্নের সঠিক ব্যবহারঃ অনেক লেখাতে আমি দেখেছি, বাক্যের সঙ্গতি ঠিক থাকেনা, মানে বাক্য মেলাতে পারেনা ঠিক মত। যা কিনা লেখাকে পাঠকের কাছে জটিল করে তোলে এবং পাঠক সেই লেখা পড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তাই বলি কি, একটা পূর্ণ বাক্য লেখার পরে সেই বাক্যটি ভালো করে পড়ে দেখবেন। এছাড়াও যতি চিহ্নের সঠিক ব্যবহার না হলে লেখার সঙ্গতি এমনিতেই হারিয়ে যাবে। সঠিক স্থানে যতি চিহ্নের ব্যবহার আপনার লেখার সৌন্দর্যকে বাড়িয়ে তোলে বহুগুণ।

৬। সমসাময়িক বা ট্রেন্ডিং ব্যাপারগুলোতে প্রাধান্য দেয়াঃ শুধুমাত্র টাকার জন্য লিখে গেলে শুধু টাকাই পাবেন। টাকার দিকে মনোযোগী হয়ে গেলে দেখবেন, আপনার লেখা পাঠকপ্রিয়তা পাচ্ছেনা। একজন লেখকের লেখা কিন্তু তখনই সার্থক হয়, যখন তার সেই লেখা পাঠকপ্রিয় হয়, সমাজ কিংবা দেশে আলোচনার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়। তাই সময় ও চারপাশের পরিস্থিতি বুঝে, সমাজ ও দেশের অবস্থা বুঝে ট্রেন্ডিং ব্যাপারগুলোতে মনোযোগী হওয়ার চেষ্টা করুন এবং সেইসব বিষয় নিয়ে লেখার চেষ্টা করুন; তাতে করে আপনার লেখাও পাঠকপ্রিয় হবে ফলে আপনার মনের উপর তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। ফলে আরো ভালো এবং আকর্ষণীয় কিছু লেখার আগ্রহ পাবেন সামনের সময়গুলোতে।

৭। লেখা শেষে কয়েকবার লেখাটি মনোযোগ সহকারে রিভাইজ দেয়াঃ যে এই কাজটি মনোযোগ সহকারে করতে পারবে, তার লেখাটাই সেরা হবে; বিশ্বাস করুন, আমি নিজের কথাই বলি, আমি জানি, আমার লেখাতে বানান ভুল কিংবা কোন প্রকার শব্দ বা বাক্যগত ভুল হয়না, কিন্তু তারপরেও লেখা শেষে বা সাবমিট করার পূর্বে মিনিমাম ৪ থেকে ৫বার রিভাইজ দিই, কারণ অভ্র তে টাইপ করার সময় লেখা এদিক সেদিক হবেই, হতে বাধ্য, ঠিক এই বাক্যটি লেখার সময় ৩বার সমস্যায় পড়তে হয়েছে আমাকে। তাই আপনাদেরকেও বলছি, লেখা শেষে বারবার রিভাইজ দেয়ার অভ্যাস গড়ে তুলুন।

সবশেষে- খুব গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকরী একটি উপায় বলে দিচ্ছি ভালো আর্টিকেল বা লেখা লিখতে। এর চাইতে বড় ঔষধ মনে হয়না আর আছে; এটি আপনাকে ভালো আর্টিকেল লেখার ক্ষেত্রে সবচাইতে বেশি সাহায্য করবে এবং সব সমস্যা থেকে মুক্তি দেবে। কি, কবিরাজি স্টাইলে কথা বলে ফেললাম নাতো?

সেটি হলোঃ

আপনাকে প্রচুর পরিমাণে ভালো বই ও দৈনিক পত্রিকা পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

উপরের এই ঔষধের ব্যাখ্যাতে আমি যাবোনা। কারণ, এর ব্যাখ্যা খুজেঁ বের করাটা আপনাদেরই কাজ। এই সু-অভ্যাসটি গড়ে তুলে লেখালেখি করতে থাকুন, বিশ্বাস করুন, আগামী তিন মাসের মাথায় আপনিই আমাকে লেখকদের গ্রুপে কিংবা আমার ফেসবুকের ইনবক্সে নক করে বলবেন, “ডাক্তার ভাই, আপনার ঔষধে আমার কাজ হয়েছে! আমার লেখা এখন সকল প্রকার জীবাণুমুক্ত!” হাহাহা, একটু মজা করলাম; কিন্তু সত্যটাই বললাম।

আমি ছোটবেলা থেকেই প্রচুর বই পড়ি, দৈনিক পত্রিকা না পড়লে আমার খাবার যেন হজমই হতো না; না, আমাকে পিটিয়ে আমার বানান শুদ্ধ করাতে হয়নি কাউকে, নিজের থেকেই ছোটবেলা থেকে শুদ্ধ বানান শিখে বড় হয়েছি, কারণ আমি ভুল বানান সহ্য করতে পারতাম না; আর লেখনী ভালো হয়েছে সাহিত্যের বই পড়াতে। আমার মা কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের প্রথম ব্যাচের ছাত্রী, সেখান থেকেই তার অনার্স-মাষ্টার্স, তাই হাতের কাছেই ছোট বয়সে অনেক বড় মাপের লেখকদের বই পেয়েছিলাম, তেমন বুঝতাম না তখন কিন্তু কিসের এক অজানা আগ্রহে পড়ে যেতাম, পরে বই পড়া আর লেখালেখিটা নেশার মত হয়ে উঠেছিল। আর নিজের ব্যাপারে বলতে চাচ্ছিনা। এই পর্যন্তই থাক।

এগারোশো শব্দের বেশি এই লেখাটি শুধুমাত্র আপনাদের উদ্দেশ্যেই লেখা। আশা রাখি, আমার এই লেখা আপনাদের একটু হলেও উপকারে আসবে। আর আপনাদের উপকারে এলেই তবে আমার স্বার্থকতা !

আজ থেকেই তাহলে শুরু হোক নতুন উদ্যোমে লেখালেখি……….