প্রতিবিম্বঃ পর্ব ২

Now Reading
প্রতিবিম্বঃ পর্ব ২

ক্যাম্পাসে সকাল সকাল চলে এল জাবির। আজ এক্সাম আছে, আর সে নাকি বাসায় কিছুই পড়তে পারেনি ।এসেই ক্যান্টিন থেকে দুইটা বার্গার নিয়ে  শীট খুলে বসলো।  আর কেউ নাই ক্যান্টিন এ। যাক, এই পরিবেশে পড়া ভাল হবে। আর ক্যান্টিনেই পড়া লাগছে কারন লাইব্রেরীয়ান এখনো লাইব্রেরী খুলে নাই। পড়ার সময় জোরে জোরে না পড়লে জাবিরের নাকি মাথায় পড়া ঢুকেনা। আর আজ তো এক্সাম, টেনশনে গলার শব্দের ভলিউম বেড়ে গেছে কয়েক গুন।

“ এক্সকিউজ মি, আচ্ছা আপনি কি একটু আস্তে পড়ে পারেন? আমার সমস্যা হচ্ছে” – ৩ বার বলার পর জাবির শুনতে পেল। পিছে ফিরে দেখে জান্নাত।  হার্ট বিট বেড়ে গিয়ে বুকে কেউ মনে হচ্ছে দমাদম হাতুড়ি পিটাচ্ছে। “অহ আল্লাহ!! এই মেয়ে এত জোস কেন? কি সুন্দর করে কথা বলে!!” – ভাবতে ভাবতে উত্তর দিল

– আমাকে কিছু বলছেন?

– জ্বী , একটু কম শব্দ করে পড়বেন ? লাইব্রেরী বন্ধ তো, আমার আজেক এক্সাম। তাই পড়তে ক্যান্টিনে এসেছি।

– জ্বী জ্বী , কোন সমস্যা নাই। একদম সাইলেন্ট হয়ে যাব আপনি বললে।

– স্যরি?

– বললাম, সাইলেন্ট হয়েই পড়বো। আর আমি স্যরি জোরে পড়ার জন্য।

– ধন্যবাদ। বাই দ্যা ওয়ে, দুটো বার্গার ই আপনি খাবেন?

– না কিনে রেখেছি, ব্ল্যাকে সেল করে দিব।

– মানে?

– এমনেই ফ্রেন্ড আসবে , কিনে রেখেছি। এদের এখানে বার্গার অলয়েজ থাকেনা।

– জ্বী, আমিও সকালে কিছু খেয়ে আসিনি আর ক্ষুধাও লেগেছে। আমি কি আপনার এই বার্গারটা নিতে পারি য? অবশ্যই যদি কিছু মনে না করেন তাহলে।                 আর হ্যা, আমি এটার দাম দিয়ে দিব।

– অবশ্যই মনে করবো। অনেক কিছু করবো। নিন খান।

– মনে করলে খাবোনা। আপনার বার্গার আপনি রেখে দিন। আমি অপেক্ষা করবো এদের বার্গার আসার জন্য।

– আরে নিন নিন, খান। মজা করছিলাম।

– ধন্যবাদ।

জান্নাত বার্গারটা নিয়ে যেভাবে খাচ্ছে তাতে জাবির এর মনে হলো সে বিরিয়ানিও এত আহ্লাদ করে খায় না। মেয়েটাকে দেখে মনে হচ্ছে প্রতিটা বাইট এর মজা নিচ্ছে।  জাবির এর মনে হলো তারও একবার ট্রাই করা উচিত। আজকের বার্গার কি বেশি টেস্টি? এমনে খাওয়ার কি আছে? মেয়ে মানুষ বেশি আহ্লাদ করে সবকিছুতে। এত আহ্লাদে কান্ড কারখানা জাবিরের মোটেও পছন্দ না। কিন্তু কেন জানি এই মেয়ের আহ্লাদ খুব ভাল লাগছে। নিজেরও ট্রাই করতে ইচ্ছা করছে। বার্গারটা এভাবে। বার্গারের এক কামড় খেল  জাবির। কই? এতো নরম্যাল জিনিস। ফিল তো আসেনা। তাহলে জান্নাত এভাবে খাচ্ছে কেন?

জিজ্ঞেস করে বসলো ,

– আচ্ছা এভাবে কেন খাচ্ছেন?

– কিভাবে খাব তাহলে?

– মানে এত ফীল নিয়ে কিভাবে খাচ্ছেন?

– খাবার তো ফীল নিয়েই খাবো। নাইলে মজা কিভাবে পাবো?

– ফীল নিয়ে খেলে মজা পাওয়া যায়?

– জ্বী, ফীল নিয়ে খেলে স্বাদহীন খাবারেও অনেক মজা পাওয়া যায়।

– আচ্ছা খেয়ে দেখি ফীল নিয়ে।

এবার সে বার্গার এ কামড় দেয়ার সময় মনে মনে ভেবে নিল নানীর হাতের রান্না করা বিরিয়ানী খাচ্ছে। বার্গারের ভিতরের ইনগ্রিডিয়েন্স কে তার মনে হল নরম মাংসের টুকরা আর বান টাকে মনে হলো বাসমতী রাইস। অহ! কামড়ের সাথে সাথে সেই টেস্ট আসলো মুখে। মনে হলো আসলেই অমৃত খাচ্ছে জাবির।

– এবার বুঝেছেন?

– জ্বী জ্বী ম্যাডাম। ধন্যবাদ অখাদ্য-কুখাদ্যকে সুখাদ্যে পরিনত করার উপায় শিখিয়ে দেবার জন্য।

– আচ্ছা আসি, লাইব্রেরী খুলে ফেলেছে হয়ত।

– আপনি নতুন ভর্তি?

– জ্বী মেকানিক্যাল ডিপার্টমেন্ট এ।

– আমি জাবির, মেকানিক্যাল ৭ম সেমিস্টার।

– আমি জান্নাত। আপনি তো তাহলে আমার অনেক সিনিয়র।

– ২ বছর খুব বেশি না।

– আমি আসি, আর এইযে বার্গারের টাকা।

– এটা লাগবেনা, রেখে দেও।

– না না, আপনার বন্ধুর জন্য কেনা বার্গার আমি ফ্রিতে কেন খাবো?

– রেখে দিতে বলেছি, রেখে দাও। সিনিয়র রা কিছু বললে শুনতে হয়।

– তারপরেও ……

– তারপরে কিছু নেই। যাও ক্লাসে যাও।

– বাই।

জান্নাত চলে গেল। সাথে সাথে মনে হল পিঠের মেরুদন্ড দিয়ে শীতল একটা বাতাস নেমে এলো। কি সুন্দর করে কথা বলে এই মেয়ে! দেখলে দেখতেই মন চায়। এই মেয়ের মাঝে জাদু আছে। পকেট থেকে মোবাইলটা  বের করে জান্নাতের নাম্বারটা দেখলো। খুব শীঘ্রই এই নাম্বারে কল দেবার মত অবস্থা তৈরী করতে হবে। আগে সব ঠিক ছিল, জান্নাতকে দেখার পর সব কাজেই তালগোল লেগে যাচ্ছে জাবিরের। এর সমাধান একটাই, এই মেয়েটাকে তার জীবনে চাই। এ ছাড়া দ্বিতীয় কোন উপায় নেই।

ভাবতে ভাবতে ডর্মের দিকে হাটা শুরু করলো । গিয়ে নাহিদ কে জাগাতে হবে। আলসে হারামী ইউনিভার্সিটির ডর্মেটরিতে থাকার পরেও রোজ লেট করে। প্রায় জাবির গিয়ে নাহিদের ঘুম ভাঙ্গায়।

দরজায় প্রচন্ড জোরে জোরে আঘাত করার পরো নাহিদ রুমের দরজা খুলছে না। মোষের মত পড়ে ঘুমাচ্ছে নাকি? এক হাতে মোবাইল দিয়ে কল দিচ্ছে নাহিদের নাম্বার এ, আরেক হাতে দরজা নক করছে। তাও দরজা খুলছে না কেন নাহিদ? মিনিট বিশেক পর জাবির আর ধৈর্য্য ধরে না রাখতে পেরে ডর্মের কেয়ারটার কে জানাল। কেয়ারটেকার গিয়ে ডর্ম মনিটর কে জানাতে উনি ছুটে এলেন। অনেক ক্ষন ধরে উনিও ট্রাই করলেন , কিন্তু নাহিদ এর কোন সাড়া নেই।  শেষে যোগালী এনে রুমের দরজা ভাঙ্গা হলো।

ভিতরে তাকিয়ে জাবির ছিটকে পড়লো ডর্মের বারান্দায়। ওর চোখ নিজেকেই বিশ্বাস করতে পারছে না। সিলিং এর সাথে নাহিদ এর আধা পোড়া শরীর টা ঝুলছে।