দ্যা লাস্ট পিস অফ্ বার্থডে কেক

Now Reading
দ্যা লাস্ট পিস অফ্ বার্থডে কেক

সকালবেলা পুব আকাশে আলোর দেখা নেই কিন্তু আবীর ঘুম থেকে উঠে দিব্যি আরামে তৈরি হচ্ছে। এই চিত্র তো সচরাচর দেখা যায় না কেননা তা কেবল মাঝে মাঝে হয় ।আবীর যেখানে থাকে তা মফস্বল এলাকা শহরের ব্যস্ততার কোলাহল থেকে অনেক দুরে।আবীরের বন্ধুর সংখ্যা ডজন খানেক হবে। এই বন্ধুদের প্রাণভোমরা আবীর কেননা তার মতো মিশুক স্বভাবের কেউ হলে বন্ধুসংখ্যা নেহায়েত বাড়তে পারে।আবীরের বাসা নিয়ে বন্ধুদের কৌতুহল তার যবনিকা আবীর কখনো টানে নি ,তাই এখানে আবীর পদ্মা নদীর মাঝির হোসেন মিয়ার মতো রহস্যময় একটা চরিত্র।

আবীর বেশ পরিপাটি হয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল। আজ তার ডজনখানেক বন্ধুর মধ্যে একজনের জন্মদিন।এই কাজে আবীরের ব্যাপক আগ্রহ আর দক্ষতার কারণে তাকে বন্ধুরা নি:সন্দেহে দায়িত্ব দিয়ে দেয়।বন্ধুদের জন্য ক্ষুদ্র পরিসরে কিছু একটা করতে পেরে আবীর যারপরণাই খুশি।আজকে বার্থডে পার্টি ছুটির দিনে হওয়ায় আবীরদের প্ল্যান পেয়েছে ভিন্নমাত্রা তারা সবাই মিলে আজ সাগর তীরে যাবে সেখানে দুপুরে সমুদ্রস্নান করবে,বোট রাইডিং করবে আরো কত কি ?বিকেলে সাগরের বালুকাময় তটে বসে সূর্যাস্ত দেখে চোখ জুড়িয়ে নির্মল বাতাসে গা এলিয়ে দিয়ে প্রকৃতির একটু কাছাকাছি যাওয়ার প্রয়াস বটে।

আবীরের বন্ধুরা একে একে সবাই চলে আসে তাদের উপস্থিতি দেখে আবীর বেশ খুশি কেননা এটাই হয়তো বন্ধুদের সাথে তার কাটানো শেষ জন্মদিনের পার্টি।

এইতো কিছুদিন পর যে যার যার মতো করে চলে যাবে জীবন সংগ্রামে জড়িয়ে পড়বে।ইতিমধ্যে সবার পড়ালেখার পাঠ চুকিয়ে ফেলেছে কেবল ফলাফলের আশায় বসে আছে।বন্ধুদের অপেক্ষা করতে করতে আবীর এতক্ষণ শুধু এ কথায় ভাবছিল তার এই অকৃত্রিম বন্ধুসঙ্গের তুলনা আসলে কারো সাথে চলে না।

পরবর্তী আধাঘন্টা তারা গাড়িতে হৈ হুল্লোড় আর মাস্তিতে কাটালো,বন্ধুর জন্মদিন কিভাবে উপভোগ্য করা যায় তা কেউ যেন আবীরকে দেখে শিখে।গাড়িতে করে যাওয়ার সময় কি করবে তা বন্দোবস্ত করে রেখেছে।এই কাজে আবীরের দক্ষতা প্রশংসিত বন্ধুদের মধ্যে কেউ কেউ তো আবীরকে ডিরেক্টর বলে ডাকে।

যেই কথা সেই কাজ সারাদিন তারা সাগর জলে লাফালাফি আর বিকেলে পড়ন্ত রোদে সূর্যাস্ত দেখা মাঝখানে দুপুরে ভুরিভোজন তো ছিলই।সারাদিন একে অপরের সাথে খুনসুটি তো ছিলই ।আবীরের এক ডজন বন্ধুর মধ্যে এটা ছিল ১১তম  জন্মদিনের পার্টি বাকি কেবল আবীর। বন্ধুরা সবাই প্ল্যান করে রেখেছে আবীরের জন্মদিনটা তারা বেশ ঝাঁকজমকভাবে করবে।এই যে আবীরের জন্মদিন তার রহস্যে উদঘাটন করতে বন্ধুদের নাকানি চুবানি খেতে হয়েছে।অবশেষে যা তারিখ উদ্ধার হলো তা বেশ জটিল কেননা তারিখটা ছিল ২৯শে ফেব্রুয়ারী। আবীরের যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তা বেশ গভীর যে কেউ চাইলে সহজে তা অনুধাবন করতে পারে না।

সারাদিনের ঘোরাঘুরি করার পর আবীর ও তার বন্ধুরা চলে এল তার এক বন্ধুর বাড়িতে যেখানে রাতে নৈশভোজের আয়োজন করা হয়েছে।সারাদিনের ক্লান্তি সবার উপর ভর করায় সবাই রীতিমতো কাবু।ব্যবসায়ী বাবার একমাত্র সন্তানের বার্থ ডে বন্ধুদের নিয়ে করার জন্য কোন আত্মীয় স্বজনকে দাওয়াত করেন নি । আবীর সহ বাকি বন্ধুদের সবার ঠিকানা আপাতত আজকের বার্থডে বয় নাবিলের বাড়ির ছাদে।খোলা আকাশে চাঁদনী রাতে তারা সবাই মিলে আঁতশবাজি ফাটাবে আর কেক কাটবে।আবীরের চরিত্রের মতো তার চিন্তাগুলোও কি অদ্ভুত তাই না ?

বন্ধুদের এমনই ভাষ্য ছিল।তবে যে তারা আনন্দ উপভোগের কোন কমতি পাচ্ছে না তাও ঠিক।

তাই নির্দিষ্ট সময়ে কেক চলে আসল নাবিল কেক কাটল তারা তাদের পরিকল্পনা মতো হৈ হুল্লোড় করে নিল।এসবের মাঝে যথারীতি ফটোসেশন চলল।সবাইকে কেক বিলিয়ে দেয়ার পর নাবিল আবীরের জন্য একটা ছোট প্যাকেট নিয়ে আসল।এই সময় আবীর অন্যদের সাথে মজা করছিল।নাবিল তাকে একপাশে ডেকে নিল আর বলল আবীর তোর বোধহয় আজ মনে নেই। এই প্যাকেটটা আমি তোর জন্য এনেছি। আবীর একটু চমকে গেল নিজেকে আবার সামলিয়ে নিল।

নাবিলঃ দেখ আবীর প্রতিবারই বার্থডে পার্টি শেষ করে তুই কেবল এক টুকরো কেক আর একটা ফুল নিয়ে যাস। এতদিন আমরা কেউ তোর প্রতি অগাধ বিশ্বাস আর সম্মান রেখে জানতে চাই নি । আজ যখন তুই এর ব্যতিক্রম করলি তাই বন্ধুত্বের খাতিরে তোর কাছে জানতে চাইব ,আসলে কি এমন ব্যাথা যেটা তুই সযতনে লুকিয়ে রেখেছিস।

আবীরঃ আরে ব্যাটা ;তুই তো আমাকে ইমোশনাল করে দিলি।আমি নিজে থেকে বলব বলে তো আজ ওরকম কিছু করি নি।

নাবিলঃ সত্যি বলছিস ?

আবীরঃ আমরা তো আজ রাতের খাবার তোর এখানে খাচ্ছি;খাবারের পর এখানে ছাদে এসে না হয় বলব।আগে খাওয়াটা সেরে নিই।আন্টি অনেক কষ্ট করে করেছে আমাদের জন্য।

আবীরকে দেখে নিষ্প্রাণ মনে হল না বাইরে থেকে দেখতে খুব স্বাভাবিক মনে হল।বন্ধুরা সবাই মিলে খাবার খেয়ে নিল সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু কিন্তু আবীর।খাবারের পর জটপট সবাই চলে এল,আবীরকে মধ্যমণি করে বসিয়ে সবাই চক্রাকারে বসেছে।

এবার আবীর একদম সাবলীলভাবে শুরু করল তার কথাটা ……

তোরা হয়ত জানিস না আমি জীবনের বেশির ভাগ সময়টা কাটিয়েছি একটা এতিমখানায়।আমার যেদিন জন্ম হয় সেদিন নাকি আমার মা মারা যায়।তাই আমার মায়ের মৃত্যুর দিন আমি জন্মদিনের উৎসব কিভাবে করব ? সবচেয়ে বড় কথা সঠিক কোনদিন আমার জন্ম হয়েছে নির্দিষ্ট তারিখটা জানি না,যার কারণে মায়ের মৃত্যুদিবসটা পালন করতে পারি না।মূলত জন্মের সময় মাকে হারিয়ে আমি জন্মদিন পালন করার অধিকারটুকু হারিয়ে বসেছি।

তাই তোদের সবার জন্মদিনের দিন আমি এক টুকরো কেক নিয়ে রাতের খোলা আকাশে বসে ঐ হাজার তারার ভীড়ে মাকে খুঁজি আর অনাড়ম্বরভাবে মায়ের সাথে জন্মদিন পালন করি।

আমি জানি তোরা সবাই মিলে এবার ২৯শে ফেব্রুয়ারী আমার জন্মদিন পালন করার প্ল্যান করেছিস। এই জন্মদিনের পিছনে একটা ঘটনা আছে।যখন আমার স্কুলে রেজিস্ট্রেশনের জন্য জন্ম তারিখের প্রযোজন ছিল তখন আমি কোন সুনির্দিষ্ট তারিখ বলতে পারি নি।সেদিন স্যারের ধমক খেয়ে হুট করে ২৯শে ফ্রেবুয়ারী দিনটা বলে দিই।সেদিনের পর এটাই আমার অফিসিয়াল বার্থ ডে। (মুখে একটা চাপা হাসি)

আবীরের কথাটার পর বন্ধুরা সবাই একটু নড়ে বসল এতক্ষণ সবাই মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে শুনেছে।পরক্ষণে আবীর টেনে বলল আরে আমি তো তোদের সবার সাথে জন্মদিন পালন করেছি।

তোদের সাথে এই স্বল্পসময়ে পরিচয়ে আমার বার্থ ডে পালন করার সুযোগটা তোদের দিতে পারলাম না।

আমি আসলেই অভাগা দোস্ত…..

এই সময় একটা পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছিল কেননা আমাদের কথার সময়ে নাবিলের মা এস দাঁড়িয়ে ছিল।উনি আবীরের সমস্ত কথা শুনে আবীরকে এসে জড়িয়ে ধরল।

এই সময় আবীর আবেগাপ্লুত হয়ে সজোরে কেঁদেছে একদম বাচ্চা ছেলের মতো।মায়ের মমতার অতৃপ্তি আর নিজের মনের ক্ষোভের কালো মেঘটা সরিয়ে নিতে তার এরকম একটা বৃষ্টির দরকার ছিল।

সেদিনের রাতের পর অনেক বছর কেটে গেছে।আমি আজ আবীরের মেয়ের বার্থডে পার্টিতে গেস্ট।অফিসের কাজে একটু দেরী হওয়াতে আসতে দেরী হল।আবীর আমাকে কেক দেয়ার সময় বলে দিয়েছে,দোস্ত এটাই কেকের লাস্ট পিস ছিল আমি তোর জন্য রেখেছি। এই কথাটা শোনার পর আমি স্মৃতির করিডোরে হেঁটে এলাম স্মৃতি বড়ই যাতনাময়…..

তবে তার মায়ের জন্য নিশ্চয়ই রাখবে।আবীরের মেয়েটো হয়েছে একদম পরীর মতো দেখতে তবে আবীর ওকে স্রেফ মা বলে ডাকে। সেই অর্থে তো আজ তার মায়ের জন্মদিন।

শুভ জন্মদিন।